📄 অটোর গতি
আমাদের দেশে অটোরিকশা এখন এভেইলেবেল। একটা সময় ছিলো, যখন অটোরিকশার কথা মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না। তখন সর্বত্র পা-চালিত রিকশা ছিলো। খুব কষ্ট করে তাদেরকে রিকশা চালাতে হতো। প্যাডেল দিলে রিকশা সামনে আগাবে, নয়তো না। এ যাত্রায় মুরব্বি রিকশা চালকদের অনেক বেশি কষ্ট হয়ে যেতো। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমি কখনো মুরব্বি রিকশা চালকের রিকশায় উঠতাম না। এটা আমার বিবেক বাঁধা দিতো। মুরব্বিদের রিকশা চালাতে দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে; আর সেটা এখনও। যদিও এখন অটোরিকশা অহরহ; তবুও মুরব্বি তো মুরব্বি-ই।
এইতো কিছুদিন আগে চাচা হৃদয় ছোঁয়া এক কারগুজারি শোনালেন। আজ থেকে বিশ বছর আগে আমাদের এলাকায় জর্ডান থেকে একটি তাবলিগের জামাত আসে। বয়ষ্ক আমির সাহেব খুব নম্র-ভদ্র গোছের লোক। পাশের মহল্লার মসজিদে তাকে আসরের নামাজের পর বয়ান করতে হবে। বাবা আমির সাহেবকে সাথে নিয়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে আসরের আগে আগেই বেরুলেন। তখন পথের একমাত্র জানবাহন পা-চালিত রিকশা। একজন রিকশাওয়ালাকে ডাকা হলো। বাবা আমির সাহেবকে বললেন রিকশায় উঠতে, কিন্তু তার কপালে চিন্তার ভাঁজ; 'একজন মানুষ আমাদের দু'জনকে টেনে নিয়ে যাবে এটা কোন ধরণের মানবতা!' কোনে মতেই আমির সাহেবকে রিকশায় উঠানো গেলো না। বেচারা আমির সাহেব পায়ে হেঁটে যেতে রাজি, তবুও তিনি রিকশায় উঠবেন না। পায়ে হেঁটেও মসজিদে যাওয়া যেতো; কিন্তু মসজিদ এতোটুকু দূর যে, পায়ে হেঁটে গেলে নামাজ তো দূরের কথা বয়ান ধরতে পারবে কিনা সন্দেহ। অবশেষে বাবা তাকে বেবি (সি.এন.জির আগের ভার্সন, তেলে চালিত) ভাড়া করে সেই মসজিদে নিয়ে গেলেন। কারগুজারি শোনার পর আমি চাচাকে বললাম, 'আমির সাহেব যদি এখন আমাদের দেশে আসতেন, তাহলে নির্দিধায় তিনি অটোরিকশায় চড়ে বসতেন।'
বর্তমান সময়ে অটোর সাথে সাথে পা-চালিত রিকশাও আমাদের দেশে এভেইলেবেল। এখন ইচ্ছেটা শুধুমাত্র আপনার, আপনি অটো চালাবেন নাকি পা-চালিত রিকশা চালাবেন! কেউ যদি আমাকে এই দুটি অপশন দেয়, তাহলে আমি অটোকেই বেছে নিবো। কারণ সারাদিন আমাকে কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে না, ঘন্টাখানেক পর পর আমাকে বিশ্রাম নিতে হবে না, দিনশেষে আমার পা'ও ব্যথা করবে না। শুধুমাত্র রিকশার স্টিয়ারিংটা ধরে বসে থাকলেই হলো। আমার ফোকাস ঠিক থাকলে অটো আমাকে নিয়ে যাবে দূর হতে বহুদূর। অটোরিকশা একদিনে যে পরিমাণ লক্ষ্যবস্তু স্থির করতে পারে, পা-চালিত রিকশার একদিনে ঐ পরিমাণ কখনোই সম্ভব না। অটোতে এটা কেনো সম্ভব? কারণ তার পেছনে ব্যাকাপ আছে। পেছন থেকে ধাক্কা দেয় আর সে নিশ্চিন্তে সামনে আগায়। ফলে চালকের তেমন কষ্ট হয় না, দিনশেষে তার ক্লান্তিও আসে না।
অপরদিকে পা-চালিত রিকশার পেছনে ব্যাকাপ না থাকায় পেছন থেকে তাকে কেউ ধাক্কাও দেয় না আর সে দ্রুত গতিতে সামনেও আগায় না। যতোটুকু সামনে আগায় নিজের পায়ের জোরে আগায়। বেচারা অর্ধদিনেই হাঁপিয়ে ওঠে। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যায়। কেউ কেউ যদিওবা পূর্ণদিবস কাজ করে, কিন্তু একজন অটোওয়ালা যে পরিমাণ লক্ষ্যবস্তু স্থির করতে পারে, পা-চালিত রিকশাওয়ালা তার ধারে কাছেও যেতে পারে না। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে- অটোর যতো গতিই থাকুক, দিনশেষে কিন্তু তাকে চার্জে ঠিকই বসাতে হয়। একরাত চার্জে না বসালে পরেরদিন সে অটো আর রাস্তায় বেরুতে পারে না, চলতেও পারে না।
ঠিক তেমনিভাবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, এখন ইচ্ছেটা আমাদের। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ বুকে ধারণ করে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পথে চলবো নাকি রাসূলুল্লাহ'র আদর্শে চুনকালি মেখে উযবুকের ন্যায় ঘুরে বেড়াবো!
রাসূলুল্লাহ'র আদর্শ মেনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পথে চলার অর্থ হলো অটোরিকশার মতো পেছনে ব্যাকাপ থাকা। আমরা শুধু ইসলামের হুকুম-আহকামের স্টিয়ারিংটা ধরে রাখবো, গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার। আর যদি ব্যাকাপ না থাকে, তাহলে শতকষ্ট করেও লক্ষ্যবস্তু স্থির করা যাবে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- অটোর যেমন চার্জ শেষ হয়ে যায়, অনুরূপ আমাদের ঈমানেরও পাওয়ার কমে যায়। এজন্য আমাদেরকে বেশি বেশি বড়দের মজলিসে বসা চাই। তাদের কথা শুনে নিজের ঈমানকে আরো অনেকগুণ বেশি পাকাপোক্ত করা চাই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাঁর পবিত্র কুরআনের মাঝে উল্লেখ করেন যে,
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
বলো, ' তোমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো'। তারপর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।
تِلْكَ حُدُودُ اللهِ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذُلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
এগুলো হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সীমারেখা। আর যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা।
وَمَنْ يَّعْصِ اللّٰهَ وَرَسُوْলَهٗ وَيَتَعَدَّ حُدُوْدَهٗ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيْهَا وَلَهٗ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ
আর যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।
يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰমَنُوْٓا اَطِيْعُوا اللّٰهَ وَاَطِيْعُوا الرَّসُوْলَ وَاُولِي الْاَمْرِ مِنْكُمْۚ فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرুদُّوْهُ اِلَى اللّٰهِ وَالرَّসُوْলِ اِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِۗ ذٰلِكَ خَيْرٌ ওَّاَحْسَنُ تَاْوِيْلًا
হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার ও তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করাও, যদি তোমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।
وَمَنْ يُّطِعِ اللّٰهَ وَالرَّসُوْলَ فَاُولٰٓئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيّٖনَ وَالصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصّٰلِحِيْنَۚ وَحَسُنَ اُولٰٓئِكَ رَفِيْקًا ذٰلِكَ الْفَضْلُ مِنَ اللّٰهِ وَكَفٰى بِاللّٰهِ عَلِيْمًا
আর যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তার রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন- নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম। এই অনুগ্রহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পক্ষ হতে। আর সর্বজ্ঞ হিসেবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাই যথেষ্ট।
টিকাঃ
৫২. সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩২
৫৩. সুরা নিসা, আয়াত: ১৩
৫৪. সুরা নিসা, আয়াত: ১৪
৫৫. সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯
৫৬. সুরা নিসা, আয়াত: ৬৯-৭০
আমাদের দেশে অটোরিকশা এখন এভেইলেবেল। একটা সময় ছিলো, যখন অটোরিকশার কথা মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না। তখন সর্বত্র পা-চালিত রিকশা ছিলো। খুব কষ্ট করে তাদেরকে রিকশা চালাতে হতো। প্যাডেল দিলে রিকশা সামনে আগাবে, নয়তো না। এ যাত্রায় মুরব্বি রিকশা চালকদের অনেক বেশি কষ্ট হয়ে যেতো। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমি কখনো মুরব্বি রিকশা চালকের রিকশায় উঠতাম না। এটা আমার বিবেক বাঁধা দিতো। মুরব্বিদের রিকশা চালাতে দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে; আর সেটা এখনও। যদিও এখন অটোরিকশা অহরহ; তবুও মুরব্বি তো মুরব্বি-ই।
এইতো কিছুদিন আগে চাচা হৃদয় ছোঁয়া এক কারগুজারি শোনালেন। আজ থেকে বিশ বছর আগে আমাদের এলাকায় জর্ডান থেকে একটি তাবলিগের জামাত আসে। বয়ষ্ক আমির সাহেব খুব নম্র-ভদ্র গোছের লোক। পাশের মহল্লার মসজিদে তাকে আসরের নামাজের পর বয়ান করতে হবে। বাবা আমির সাহেবকে সাথে নিয়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে আসরের আগে আগেই বেরুলেন। তখন পথের একমাত্র জানবাহন পা-চালিত রিকশা। একজন রিকশাওয়ালাকে ডাকা হলো। বাবা আমির সাহেবকে বললেন রিকশায় উঠতে, কিন্তু তার কপালে চিন্তার ভাঁজ; 'একজন মানুষ আমাদের দু'জনকে টেনে নিয়ে যাবে এটা কোন ধরণের মানবতা!' কোনে মতেই আমির সাহেবকে রিকশায় উঠানো গেলো না। বেচারা আমির সাহেব পায়ে হেঁটে যেতে রাজি, তবুও তিনি রিকশায় উঠবেন না। পায়ে হেঁটেও মসজিদে যাওয়া যেতো; কিন্তু মসজিদ এতোটুকু দূর যে, পায়ে হেঁটে গেলে নামাজ তো দূরের কথা বয়ান ধরতে পারবে কিনা সন্দেহ। অবশেষে বাবা তাকে বেবি (সি.এন.জির আগের ভার্সন, তেলে চালিত) ভাড়া করে সেই মসজিদে নিয়ে গেলেন। কারগুজারি শোনার পর আমি চাচাকে বললাম, 'আমির সাহেব যদি এখন আমাদের দেশে আসতেন, তাহলে নির্দিধায় তিনি অটোরিকশায় চড়ে বসতেন।'
বর্তমান সময়ে অটোর সাথে সাথে পা-চালিত রিকশাও আমাদের দেশে এভেইলেবেল। এখন ইচ্ছেটা শুধুমাত্র আপনার, আপনি অটো চালাবেন নাকি পা-চালিত রিকশা চালাবেন! কেউ যদি আমাকে এই দুটি অপশন দেয়, তাহলে আমি অটোকেই বেছে নিবো। কারণ সারাদিন আমাকে কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে না, ঘন্টাখানেক পর পর আমাকে বিশ্রাম নিতে হবে না, দিনশেষে আমার পা'ও ব্যথা করবে না। শুধুমাত্র রিকশার স্টিয়ারিংটা ধরে বসে থাকলেই হলো। আমার ফোকাস ঠিক থাকলে অটো আমাকে নিয়ে যাবে দূর হতে বহুদূর। অটোরিকশা একদিনে যে পরিমাণ লক্ষ্যবস্তু স্থির করতে পারে, পা-চালিত রিকশার একদিনে ঐ পরিমাণ কখনোই সম্ভব না। অটোতে এটা কেনো সম্ভব? কারণ তার পেছনে ব্যাকাপ আছে। পেছন থেকে ধাক্কা দেয় আর সে নিশ্চিন্তে সামনে আগায়। ফলে চালকের তেমন কষ্ট হয় না, দিনশেষে তার ক্লান্তিও আসে না।
অপরদিকে পা-চালিত রিকশার পেছনে ব্যাকাপ না থাকায় পেছন থেকে তাকে কেউ ধাক্কাও দেয় না আর সে দ্রুত গতিতে সামনেও আগায় না। যতোটুকু সামনে আগায় নিজের পায়ের জোরে আগায়। বেচারা অর্ধদিনেই হাঁপিয়ে ওঠে। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যায়। কেউ কেউ যদিওবা পূর্ণদিবস কাজ করে, কিন্তু একজন অটোওয়ালা যে পরিমাণ লক্ষ্যবস্তু স্থির করতে পারে, পা-চালিত রিকশাওয়ালা তার ধারে কাছেও যেতে পারে না। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে- অটোর যতো গতিই থাকুক, দিনশেষে কিন্তু তাকে চার্জে ঠিকই বসাতে হয়। একরাত চার্জে না বসালে পরেরদিন সে অটো আর রাস্তায় বেরুতে পারে না, চলতেও পারে না।
ঠিক তেমনিভাবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, এখন ইচ্ছেটা আমাদের। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ বুকে ধারণ করে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পথে চলবো নাকি রাসূলুল্লাহ'র আদর্শে চুনকালি মেখে উযবুকের ন্যায় ঘুরে বেড়াবো!
রাসূলুল্লাহ'র আদর্শ মেনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পথে চলার অর্থ হলো অটোরিকশার মতো পেছনে ব্যাকাপ থাকা। আমরা শুধু ইসলামের হুকুম-আহকামের স্টিয়ারিংটা ধরে রাখবো, গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার। আর যদি ব্যাকাপ না থাকে, তাহলে শতকষ্ট করেও লক্ষ্যবস্তু স্থির করা যাবে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- অটোর যেমন চার্জ শেষ হয়ে যায়, অনুরূপ আমাদের ঈমানেরও পাওয়ার কমে যায়। এজন্য আমাদেরকে বেশি বেশি বড়দের মজলিসে বসা চাই। তাদের কথা শুনে নিজের ঈমানকে আরো অনেকগুণ বেশি পাকাপোক্ত করা চাই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাঁর পবিত্র কুরআনের মাঝে উল্লেখ করেন যে,
قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
বলো, ' তোমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো'। তারপর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না।
تِلْكَ حُدُودُ اللهِ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذُلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
এগুলো হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সীমারেখা। আর যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা।
وَمَنْ يَّعْصِ اللّٰهَ وَرَسُوْলَهٗ وَيَتَعَدَّ حُدُوْدَهٗ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيْهَا وَلَهٗ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ
আর যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।
يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰমَنُوْٓا اَطِيْعُوا اللّٰهَ وَاَطِيْعُوا الرَّসُوْলَ وَاُولِي الْاَمْرِ مِنْكُمْۚ فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرুদُّوْهُ اِلَى اللّٰهِ وَالرَّসُوْলِ اِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِۗ ذٰلِكَ خَيْرٌ ওَّاَحْسَنُ تَاْوِيْلًا
হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার ও তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করাও, যদি তোমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখো। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।
وَمَنْ يُّطِعِ اللّٰهَ وَالرَّসُوْলَ فَاُولٰٓئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيّٖনَ وَالصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصّٰلِحِيْنَۚ وَحَسُنَ اُولٰٓئِكَ رَفِيْקًا ذٰلِكَ الْفَضْلُ مِنَ اللّٰهِ وَكَفٰى بِاللّٰهِ عَلِيْمًا
আর যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তার রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন- নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম। এই অনুগ্রহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পক্ষ হতে। আর সর্বজ্ঞ হিসেবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাই যথেষ্ট।
টিকাঃ
৫২. সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩২
৫৩. সুরা নিসা, আয়াত: ১৩
৫৪. সুরা নিসা, আয়াত: ১৪
৫৫. সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯
৫৬. সুরা নিসা, আয়াত: ৬৯-৭০
📄 রান্নাঘরের ধোঁয়া
ছোটবেলা থেকে লাকড়ির চুলায় রান্না দেখতে দেখতে আমরা বড় হয়েছি। গ্যাসের চুলা এখন আমাদের দেশে অহরহ। একটা সময় আমাদের মা-চাচিরা লাকড়ির চুলায় রান্না করতে অভ্যস্ত ছিলেন। শহরে এখন গ্যাসের প্রচলন থাকলেও আমাদের দেশ-গ্রামে লাকড়ির চুলার প্রচলন অনেক বেশি। গ্যাসের রান্না থেকে যে লাকড়ির চুলার রান্না বেশি মজা হয়- সে দলিল প্রমাণ দিতে না হয় না-ই গেলাম।
আজকে লাকড়ির চুলার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে গেলে ধোঁয়া বেরোয়। কালো ধোঁয়া। চোখে মুখে আসলে অন্ধকার লাগে। মাঝে মধ্যে চোখ জ্বালাপোড়াও করে।
আবার চুলার উপর যে পাত্র বা পাতিল বসানো থাকে, সে পাত্র থেকেও ধোঁয়া বেরোয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে- দুইটা দু'রকমের ধোঁয়া। পাত্র থেকে যেটা বেরোয়, সেটা বাষ্প জাতীয়। খানিকটা উপরে উঠে কুয়াশার পানির মতো মিশে যায়। আর চুলা থেকে যেটা বেরোয়, সেটা অন্ধকার-কালো।
দুটো ধোঁয়া একই সাথে উঠতেছে কিন্তু পাতিলের ধোঁয়াটা একটু উপরে উঠেই হাওয়ার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে আর চুলোর সে কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষিত করছে। যেমন- পাতিলে লেগে তা কালো হয়ে যাচ্ছে, দেয়াল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিংবা উপরের টিনের চালে জড়িয়ে আছে। পাতিল থেকে বের হওয়া সেই বাষ্প নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কারণ ধোঁয়ার মতো দেখালেও বাষ্পের মতো সহজেই মুছে যাচ্ছে। আমাদের মাথা ব্যথা হলো- চুলো থেকে বের হওয়া সেই কালো ধোঁয়া নিয়ে। ওটা যেখানে লাগছে সেখানেই ডিটারজেন্ট পাউডার কিংবা ভীম সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুতে হচ্ছে। ধোঁয়াগুলো এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, যদি সাবান দিয়ে তা ঘসে মেজে না ধোয়া হয়; তাহলে তা কিছুতেই উঠছে না।
ঠিক তেমনিভাবে, আমাদের জীবনে আমরা দু'ধরণের গুনাহ করে থাকি। ১. গুনাহে ছগীরা। ২. গুনাহে কবীরা। ছগীরা গুনাহ হচ্ছে পাতিল থেকে বের হওয়া সেই বাষ্পের মতো। যা সামান্য ভালো কাজের দ্বারাই মুছে যাচ্ছে। যেমনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুম'আ হতে আরেক জুম'আ, এক রমজান হতে আরেক রমজান এর মধ্যবর্তী সকল গুনাহের কাফফারা হবে যদি কবীরা গুনাহ সমূহ থেকে বিরত থাকা যায়'।
দ্বিতীয়ত হলো কবীরা গুনাহ। এই গুনাহ চুলো থেকে বের হওয়া সেই কালো ধোঁয়ার মতো। তাওবা না করলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে ক্ষমা করবেন না। এই গুনাহের জন্য আমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করতে হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাঁর পবিত্র কুরআনের মাঝে উল্লেখ করেন যে,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا تُوبُوا إِلَى اللهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيَآتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَ الَّذِينَ آمَنُوْا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا آتِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিকট তাওবা করো, খাঁটি তাওবা। আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। নবী ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা লঞ্চিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, 'হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।'
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوْا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পথে বাঁধা দিয়েছে; অতঃপর কাফির অবস্থায় মারা গেছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কখনই তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।
قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيمُ
সে বলল, 'হে আমার রব, নিশ্চয়ই আমি আমার নফসের উপর জুলুম করেছি। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন'। অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللهُ سَيَأْتِهِمْ حَسَنَتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًا
তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
وَ أَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّতَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِير
আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তারে কাছে ফিরে যাও, (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দিবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের উপর বড় একদিনের আযাবের ভয় করছি।
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
তখন তুমি তোমার রবের প্রশংসা তাসবীহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী।
গল্পের পরিশিষ্টঃ
ছগীরা গুনাহ- ছগীরা গুনাহ অর্থ ছোট গুনাহ। যে সকল গুনাহের ব্যপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন কিন্তু কোনো শাস্তির কথা বলেননি। যা নেক আমল করলেই ক্ষমা হয়ে যায়, তাওবার প্রয়োজন হয় না। যেমনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুম'আ হতে আরেক জুম'আ, এক রমজান হতে আরেক রমজান এর মধ্যবর্তী সকল গুনাহের কাফ্ফ্ফারা হবে যদি কবীরা গুনাহ সমূহ থেকে বিরত থাকা যায়'।
ছগীরা গুনাহের উদাহরণঃ
১. নামায অবস্থায় কাপড়, দাঁড়ি বা শরীরের কোনো অঙ্গ নিয়ে খেলা করা।
২. কাউকে গালি প্রদান করা।
৩. হিংসা করা।
৪. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া।
৫. নামাযরত অবস্থায় এদিক-সেদিক দৃষ্টিপাত করা।
৬. জুম'আর ২য় আযানের সময় বেচা-কেনা করা।
৭. কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাবের উপর তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অন্যজন প্রস্তাব করা।
৮. বেচাকেনার ক্ষেত্রে কেউ দরদাম করছে এমতাবস্থায় তার শেষ হওয়ার আগে আরেকজন এসে দরদাম শুরু করা।
৯. স্ত্রীকে এক বৈঠকে একাধিক তালাক দেয়া।
১০. অতিরিক্ত ঝগড়া-ঝাটি করা।
১১. গীবত শুনে চুপ থাকা।
১২. পাপাচারী লোকদের সাথে (সংশোধন ও দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া) উঠবস করা।
১৩. খোলা স্থানে কিবলার দিকে মুখ করে বা কেবলাকে পেছনে করে পেশাব-পায়খানা করা।
১৪. বিনা প্রয়োজনে অহেতুক কথাবার্তা বলা।
১৫. বিনা কারণে পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া, ইত্যাদি।
একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, ছগীরা গুনাহ বারবার করলে তা কবীরা গুনাহে পরিণত হয়। যেমনঃ হযরত উমর ও ইবনে আব্বাস প্রমুখ সাহাবা থেকে বর্ণিত আছে যে,
لَا صَغِيرَةً فِي الْإِصْرَارِ وَلَا كَبِيرَةً فِي الاسْتِغْفَارِ
বারবার ছগীরা গুনাহ করলে সেটি আর ছগীরা থাকে না এবং ক্ষমা প্রর্থনা ও তাওবা করলে আর কবীরা থাকে না। যেমন পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া ছগীরা গুনাহ কিন্তু বারবার তাকালে তা কবীরা গুনাহ হয়ে যাবে। সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে তাকীদ করেছেন। তিনি বলেন, 'হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। '
কবীরা গুনাহ- কবীরা গুনাহের আভিধানিক অর্থ বড় গুনাহ। আর শরী'আতের পরিভাষায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল কাজ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং সে সকল কাজের জন্য শাস্তির বিধান অথবা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার রাগের কথা ঘোষণা রয়েছে, তাকে কবীরা গুনাহ বলা হয়।
কবীরা গুনাহের সংখ্যা কতো?
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে হাদীস শরীফে কবীরা গুনাহ তিন, চার বা সাতটি বলা হয়েছে। আল্লামা জাহাবি (রহঃ) 'আয-যাওয়াজের' নামক গ্রন্থে কবীরা গুনাহ ৪৬৭টি বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা মুফতি শফি (রহঃ) 'ইনযারুল আশায়ের' নামক গ্রন্থে কবীরা গুনাহ ৮৩টি ছগীরা গুনাহ ১২৬টি বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রসিদ্ধ কিছু কবীরা গুনাহঃ
১. শিরক করা।
২. মাতা-পিতাকে কষ্ট দেওয়া।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা।
৪. ব্যভিচার করা। নিজের স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো নারী বা নিজ স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা।
৫. চুরি করা।
৬. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা।
৭. মিথ্যা অপবাদ ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
৮. পণ্যে ভেজাল মিশ্রিত করা।
৯. ওয়াদা ভঙ্গ করা।
১০. মিথ্যা বলা ও ধোঁকা দেওয়া।
১১. খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখা।
১২. মাপে কম দেওয়া।
১৩. অন্যায়ভাবে কারো জমি দখল করা।
১৪. শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া বা না দেওয়া।
১৫. জুয়া খেলা ও লটারি ধরা।
১৬. নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়া বা পান করা।
১৭. সুদ খাওয়া।
১৮. ঘুষ খাওয়া।
১৯. চাঁদাবাজি বা জোর-জুলুম করে অর্থ-সম্পদ লুটে নেওয়া।
২০. অনাথ, এতিম ও বিধবাদের সম্পদ গ্রাস করা।
২১. আমানতের খিয়ানত করা।
২২. অহংকার করা, অন্যকে হেয় করা।
২৩. কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া।
২৪. নিজের স্ত্রী, কন্যা, বোন ও অন্য অধীন নারীদের পরপুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে দেওয়া।
২৫. স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে আবার তাকে নিয়েই ঘর-সংসার করতে থাকা।
২৬. চোগলখুরি করা।
২৭. গীবত-পরনিন্দা তথা কারো অগোচরে তার বদনাম করা, যদিও তা সত্য হয়।
২৮. হস্তমৈথুন করা।
২৯. অসৎ কাজ দেখে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাঁধা না দেওয়া।
৩০. তাকদিরের উপর আস্থা ও বিশ্বাস না রাখা।
৩১. অবহেলেলা করে নামাজ কাজা করা, রোজা না রাখা, যাকাত না দেয়া ও হজ্জ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করা।
টিকাঃ
৫৭. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৪
৫৮. সুরা তাহরীম, আয়াত: ৮
৫৯. সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ৩৪
৬০. সুরা ক্বাসাস, আয়াত: ১৬
৬১. সুরা ফুরক্বান, আয়াত: ৭০
৬২. সুরা হুদ, আয়াত: ৩
৬৩. সুরা নাসর, আয়াত: ৩
৬৪. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৪
৬৫. নববী, মুসলিম ২/৮৭
৬৬. ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমূ' ফতওয়া ১৫/২৯৩
৬৭. ইবনু মাজাহ হা/৪২৪৩; মিশকাত হা/৫৩৫৬
৬৮. বুখারী হা/৬৮৫৭; ফতওয়ায়ে আলমগিরি ৩/৫৩২; মিরকাত ১/২২১
📄 শীতের আনন্দ পা ঢেকে রাখা
ছয় ঋতুর ভিন্ন ভিন্ন রঙে রঙিন আমাদের প্রিয় দেশ। কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়ই গরমে আমাদের জীবন কাটে। মাত্র দু'তিন মাসের জন্য আমাদের বাংলার বুকে নেমে আসে এক আশ্চর্য শীতলতা। হেমন্তের অন্তে শীতের কোমল ছোঁয়া লাগে সর্বত্র। পৌষ, মাঘ মাসে কয়েকদিনের জন্য শীতের প্রবল প্রকোপ পড়ে আর সেটার টের পাই আমরা শীতের সকালে। শীতের সকাল থাকে শীত আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা। সবকিছু খুব ঘোলা দেখায়। ঘাস ভেজা থাকে শিশিরে। সূর্য উঠলে শিশির ফোঁটা মুক্তোর মতো ঝরঝরে হয়। দরিদ্র লোকেরা প্রচণ্ড শীতে খড় জড়ো করে আগুন জ্বালায়। প্রাণীগুলোও অসহায় হয়ে পড়ে। তারা নিজেকে ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখে এবং বাহিরের ঠাণ্ডা থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
শীতের সকাল মানুষের মনের মাঝে এক বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি করে। কুয়াশায় ঢাকা চারপাশে তাকালে মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। শীতকালে আমরা একটু কাবু হয়ে পড়লেও শীতের সকালে রয়েছে এক অপরূপ রূপ। রাত্রির কালো পর্দা সরিয়ে এক রৌদ্রদীপ্ত সোনালী দিন উপহার দেয় শীতের সকাল।
কখনো কখনো সারাদেশে শৈত প্রবাহ বয়ে যায়। আমরা তা থেকে বাঁচতে বিভিন্ন জামা কাপড়ের সাহায্য নেই। জামা কাপড়ের সাহায্যে আমরা সবথেকে বেশি আনন্দলাভ করি তখন; যখন আমাদের পা ঢাকা থাকে। কারণ, শীতকালের নিয়ম হচ্ছে- পা ঢেকে রাখা, তাহলে পুরো শরীর গরম থাকবে। আর গ্রীস্মকালে পা খোলা রাখা, তাহলে পুরো শরীর ঠান্ডা থাকবে। এটাই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে উভয়কালেই খুব শান্তিতে থাকা যাবে।
ঠিক তেমনিভাবে, রাস্তা-ঘাটে বেরিয়ে যদি আমরা আমাদের চোখ খোলা রাখি; অর্থাৎ দৃষ্টি অবনত না রাখি, তাহলে আমাদের ঈমানটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমাদের ঈমান আর গরম থাকবে না। ঈমানে কোনো নূর থাকবে না। ব্যক্তির নূরহীন ঈমান দিন দিন নষ্ট হয়ে যায়। কারণ, ঈমান ঠান্ডা মানে অন্তর ঠান্ডা। ঈমানে কোনো তেজ নেই অর্থাৎ গোনাহে ভরপুর।
পক্ষান্তরে, আমরা যদি বাহিরে বেরিয়ে চোখ বন্ধ রাখি, দৃষ্টি অবনত রাখি। তাহলে আমাদের ঈমান গরম থাকবে। ঈমানে নূরও থাকবে। এই নূরের কারণে আমাদের ঈমানী শক্তিটাও সতেজ থাকবে, ইন শা আল্লাহ। শীতকালে যেমন পা ঢেকে রাখতে হয় আর গরমকালে পা খোলা রাখতে হয়। ঠিক তেমনি, রাস্তায় বেরুলে চোখ বন্ধ রাখতে হয় আর ঘরে প্রবেশ করলে চোখ খোলা রাখতে হয়। কারণ, রাস্তা-ঘাটে বেগানা নারীদেরকে দেখলে আমাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ঈমান দিনদিন নিস্তেজ হয়ে পড়বে। কিন্তু ঘরে এর সম্পূর্ণ বিপরীত, ঘরে এসে আমাদের স্ত্রীকে দেখলে গুনাহ তো দূরের কথা, উল্টো আরো আমাদের আমল নামায় সাওয়াব লিখা হবে।
হযরত আলী রাযিআল্লাহু তা'য়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় এক লোক মদিনায় কোনো এক গলি পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। তখন একটি রমণীর প্রতি তার দৃষ্টি পতিত হয়। রমণীরও তার প্রতি দৃষ্টি পতিত হয়। শয়তান সে দু'জনের মাঝে কু'মন্ত্রণা যুগিয়ে দেয়। ফলে তারা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকিয়েই থাকে। পুরুষ লোকটি একটি দেয়ালের দিকে চলতে ছিলো। দেয়ালের কাছে গিয়ে পৌঁছে হঠাৎ করে দেয়ালে জোরে ধাক্কা খেলো। এতে তার নাক ফেটে গেলো। রক্তও বেরুলো। তখন সে বলল, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কসম! আমি এই রক্ত ধৌত করবো না।
সুতরাং সে লোকটি রক্তাক্ত অবস্থাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলেন। ঘটনার বর্ণনা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এটা হলো তোমার গুনাহের শাস্তি।' এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে আয়াতও নাযিল করেন। তিনি বলেন-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
আপনি মুসলমান পুরুষদেরকে বলে দিন, যেনো তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজ নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কথা। নিশ্চই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা সবকিছুই জানেন তারা যা কিছু করে থাকে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন যেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা হারাম করেছি ওগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করো না। হারাম জিনিস হতে চক্ষু নিচু করে নাও। যদি আকস্মিকভাবে পড়েই যায়, তবে সাথে সাথে দৃষ্টিকে ফিরিয়ে নাও।
হযরত বুরাইদা রাযিআল্লাহু তা'য়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রাযিআল্লাহু তা'য়ালা আনহুকে বলেন, 'হে আলী! তুমি দৃষ্টির উপর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ যে দৃষ্টি পড়ে ওটা তোমার জন্য ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য ক্ষমার যোগ্য নয়।'
টিকাঃ
৬৯. সুরা নূর, আয়াত: ৩০
৭০. আবূ দাউদ শরীফ
📄 যার চেহারা সুন্দর তার প্রতি সবার নজর
একটি মজলিসে অনেকগুলো লোক বসে আছে। তারা পরস্পর গল্প কিংবা কোনো পরামর্শ করছে। এখানে সাধারণত আমাদের দৃষ্টি কার উপর পড়বে? নিশ্চয়ই মজলিসের মাঝে যে সবথেকে সুন্দর, গুছিয়ে কথা বলছে তার উপর। অন্য কারো উপর সাধারণত আমাদের দৃষ্টি পড়বে না। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম।
ঠিক তেমনিভাবে, যে ব্যাক্তির দিল সুন্দর। অন্তর পরিস্কার। আমল ভালো। চরিত্র সুন্দর; তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার প্রতিই তাকান। তার প্রতিই তাঁর রহমতের দৃষ্টি দেন।
আজকের সমাজের যুবকেরা নারীর দৃষ্টিতে আকর্ষিত হওয়ার জন্য কতো কিছুই না করে থাকে... এতো কিছু করার কারণ কী? কারণ হলো, যুবক সর্বদা মানুষিক কষ্টে ভোগে। ভাবে- আমাকে কেনো নারীরা পছন্দ করে না! কেনো আমার প্রতি নারীরা আকর্ষিত হয় না! কেনো আমার দিকে তারা তাকায় না!
যাতেকরে, মানুষ তার দিকে তাকায়, নারী তার প্রতি আকর্ষিত হয়, এই জন্য যুবক ছেঁড়া প্যান্ট পরে। বাজার থেকে নতুন প্যান্ট কিনে এনে বিভিন্ন জায়গায় কেটে ডিজাইন বানায় আর মনে মনে বলে যে, 'আমার দিকে তাকাবি না আবার; এবার এমন ডিজাইন করেছি যে, তোর তাকাতেই হবে, এতে আমাকে পাগল বলো আর ছাগল বলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না!’
আচ্ছা এরপরেও যদি না তাকায় তখন কী করবে? ছেলে হয়ে মেয়েদের মতোকরে চুল রাখবে, সজারু কার্টিং করবে, দুইপাশ দিয়ে নাই; মাঝ দিয়ে ইয়া বড় বড় রাখবে, বানরের মতো কালার করবে, লাল-নীল-সবুজ আরো কতো কী...! এতো কিছু করার পরও মানুষ তার দিকে তাকায় না, তাকে পাত্তা দেয় না; তখন সে কানে দুল পরে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ওকে বানাইছে পুরুষ, আর ও কানে পরছে দুল। নারীর রূপ ধারণকরে বলবে যে, 'দেখো দেখো আমি নারীর বেশ ধারণ করেছি, তোমরা এবার আমার দিকে তাকাও!’
মানুষ তারপরও যদি তার দিকে না তাকায়, তখন সে হাতে টায়ার-টিউব-লোহা-লক্কর কতো কিছু যে পরে... গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে কিনে এনে হাতের আঙ্গুলের মাঝে কী কী যেনো দেয়! প্রত্যেক আঙ্গুলের বৈশিষ্টও নাকি আলাদা আলাদা।
আচ্ছা যুবকের এতো আয়োজন কেনো? এতো কিছু কেনো করে? কারণ একটাই- ওর মনে শান্তি নেই। ও যার, তাঁর সাথে কানেকশন নেই। যুবকরা আজ দিশেহারা। মানুষিক কষ্টে ভোগে। মানুষ ওর প্রতি তাকায় না। আচ্ছা মানুষ ওর প্রতি তাকাবে কী করে? যে রব ওকে মায়া মুহাব্বাত করে সৃষ্টি করেছে; সেই রবের সাথেই তো ওর কোনো কানেকশন নেই। রবের জন্য ওর ভালোবাসা নেই। মায়া-মুহাব্বাত নেই। ওর অন্তরে রবের পক্ষথেকে বিন্দুমাত্র রহমতও নেই। অন্তরে শুধু আগুন আর আগুন। আর বাস্তব কথা হলো, যার প্রতি রবের রহমত নেই তার প্রতি কারো রহমত নেই।
আরেকটু সহজকরে বলি, এতিম শিশুকে কে দাম দেয় বলুন তো? কে ওকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে? কে ওর প্রতি তাকায়? দু'একজন অতি মানবিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার বান্দা ব্যতীত কেউ ওর খোঁজ-খবর নেয় না। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে না। আর যে শিশুর বাবা-মা আছে। ভালো বংশ আছে। পোশাকে বোঝা যায় যে, ও ভালো ঘরের সন্তান; তো ওর প্রতি সবাই তাকায়। সবাই ওকে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে। খোঁজ-খবর নেয়। যে পথশিশু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। রেল লাইনে ঘুমায়। চুরি-বাটপারি করে। ওর প্রতি কেউ তাকায় না। কেউ ওকে মূল্যায়ন করে না। ওর হালপুরুস্তি কেউ জিজ্ঞেসও করে না।
ঠিক তেমনি, যুবকের সাথে যদি সরাসরি রবের সাথে কানেকশন থাকে, তাহলে যুবক যেনো ভালো ঘরের সন্তানের মতো। নতুবা, উদভ্রান্ত যুবক এতিমের সমতুল্য।
যুবকের সাথে রবের সম্পর্ক- হযরত সুহাইব রাযিআল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: পূর্ববর্তী যুগে এক বাদশাহ ছিলো। তার ছিলো এক যাদুকর। বার্ধ্যক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, 'আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন যুবককে আপনি আমার নিকট প্রেরণ করুন, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিবো।' যাদুকরের কথামতো বাদশাহ তার কাছে এক যুবক প্রেরণ করলো। যুবকের যাত্রাপথে ছিলো একজন আলেম। যুবক তার কাছে বসলো এবং তার কথা শুনলো। তার কথা যুবকের খুবই পছন্দ হলো। এরপর থেকে যুবক যাদুকরের নিকট যাত্রাকালে সর্বদাই তার কাছে বসতো ও তার কথা শুনতো। তারপর সে যখন যাদুকরের নিকট যেতো দেরি হওয়ার কারণে যাদুকর তাকে মারধর করতো। ফলে যাদুকরের ব্যাপারে সে আলেমের নিকট অভিযোগ করলো। আলেম বলল, 'তোমার যদি যাদুকরের ব্যপারে ভয় হয় তবে বলবে, আমাকে বাড়ি থেকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি গৃহকর্তার ব্যপারে আশঙ্কাবোধ করো তবে বলবে, আমাকে যাদুকর বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।
যুবকের দিনগুলো এভাবেই অতিবাহিত হচ্ছিলো। একদিন হটাৎ সে এক ভয়ানক প্রাণীর সম্মুখিন হলো, যা লোকদের পথ আটকিয়ে রেখেছিলো। এ অবস্থা দেখে সে বলল, 'আজই জানতে পারবো যাদুকর উত্তম না আলেম উত্তম।' এই বলে একটি পাথর হাতে নিয়ে সে বলল, 'হে আল্লাহ! যদি যাদুকরের চাইতে আলেম আপনার নিকট পছন্দনীয় হয়, তবে এই পাথরাঘাতে আপনি হিংস্র প্রাণীকে নিঃশেষ করে দিন, যেনো লোকজন চলাচল করতে পারে। যুবক পাথরটি জন্তুর প্রতি ছুঁড়ে মারলো। সাথে সাথে সেটা মারা গেলো। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত শুরু করলো।
এরপর সে আলেমের কাছে এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলল। আলেম বলল, 'বৎস! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এই পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীগ্রই তুমি পরিক্ষার সম্মুখিন হবে। যদি পরিক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা গোপন রাখবে।'
এদিকে যুবক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে লাগলো এবং লোকদের সমুদয় রোগ-ব্যাধির নিরাময় করতে লাগলো। বাদশাহর পরিষদবর্গের একলোক অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার ব্যাপারে জানতে পেরে সে বহু হাদিয়া-উপঢৌকন নিয়ে আসলো এবং তাকে বলল, 'তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পারো তাহলে এসব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দিবো।' যুবক বলল, 'আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দান করেন একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা। তুমি যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার উপর ঈমান আনো তাহলে আমি তোমার আরোগ্যের জন্য দোয়া করবো, এতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। লোকটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার উপর ঈমান আনলো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাকে রোগ মুক্ত করে দিলেন।
অন্যান্য দিনের মতো লোকটা বাদশার দরবারে এসে বসলো। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো, 'কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? সে বলল, 'আমার পালনকর্তা।' এ কথা শুনে বাদশাহ তাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, 'আমি ছাড়া তোমার অন্য আর কোনো পালনকর্তা আছে কী?' লোকটা বলল, 'আমার ও আপনার সকলের পালনকর্তাই হলেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা। বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে লাগলো। অবশেষে সে ঐ যুবকের সন্ধান দিলো। যুবককে নিয়ে আসা হলো। বাদশাহ তাকে বলল, 'প্রিয় বৎস! তোমার যাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকেও নিরাময় দান করতে পারো।' যুবক বলল, 'আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় তো করেন একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা।
ফলে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগলো। অবশেষে সে এই আলেমের কথা বলে দিলো। বাদশার আদেশে আলেমকেও ধরে আনা হলো। তাকে বলা হলো, 'তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে আসো।' সে অস্বীকার করলো। ফলে তার মাথায় করাত রেখে তাকে দু'টুকরো করে দেওয়া হলো।
এরপর ঐ যুবকটিকেও আনা হলো। তাকে বলা হলো, 'তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে আসো।' সেও অস্বীকার করলো। বাদশাহ তাকে তার কিছু সহচরের হাতে অর্পন করে বলল, 'তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সহ তোমরা পাহাড়ে আরোহণ করো। পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছার পর সে যদি তার ধর্ম থেকে ফিরে আসে তো ভালো; নতুবা তাকে সেখান থেকে ছুঁড়ে মারবে।' তারা তাকে নিয়ে গেলো এবং পর্বতে আরোহণ করলো। তখন যুবক দোয়া করলো, 'হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা তুমি আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করো।' ততক্ষণাৎ পাহাড় কেঁপে উঠলো। ফলে তারা পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়লো। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশার দরবারে চলে এলো। এ দেখে বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করলো, 'তোমার সাথীরা কোথায়?' সে বলল, 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করেছেন।'
আবারো বাদশাহ তার কতিপয় সহচরের হাতে সমর্পণ করে বলল, 'তোমরা তাকে নিয়ে যাও এবং নৌকায় উঠিয়ে তাকে মাঝ সমুদ্রে ফেলে আসো।' তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেলে সে আবার দোয়া করলো। ফলে ততক্ষণাৎ নৌকাটি তাদের সহ উল্টে গেলো। তারা সবাই ডুবে গেলো আর যুবক বাদশার দরবারে হেঁটে হেঁটে উপস্থিত হলো। এ দেখে বাদশাহ তাকে আবার প্রশ্ন করলো, 'তোমার সাথীরা কোথায়?' সে বলল, 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করেছেন।'
এরপর যুবক নিজেই বদশাহকে বলল, 'তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না; যে পর্যন্ত তুমি আমার নির্দেশিত পথ অবলম্বন না করবে।' বাদশাহ বলল, 'সে আবার কী পথ?' যুবক বলল, 'একটি ময়দানে তুমি লোকদেরকে জমায়েত করো। এরপর একটি কাষ্ঠশূলিতে আমাকে উঠিয়ে আমার তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে সেটাকে ধনুকের মাঝে রাখো আর 'এই যুবকের রবের নামে' বলে আমার দিকে নিক্ষেপ করো। এমনটা করলেই তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারবে।
বাদশাহ তাই করলো। এই দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন সমস্বরে বলে উঠলো, 'আমরাও এই যুবকের রবের উপর ঈমান আনলাম।' বাদশাহ আরো বেশী রাগান্বিত হলো। রাস্তার দু'পাশে গর্ত খননকরে অগ্নি জ্বালানো হলো। এরপর বাদশাহ বলল, 'যে তার ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে এই অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হবে।' অথবা সে বলল, 'ধর্মমত বর্জন না করলে সে যেনো এই অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করে।' লোকেরা দলে দলে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লো। এক মহিলা আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততবোধ করছিলো। মহিলার কোলে একটা দুধের শিশু বাচ্চাও ছিলো। সে বাচ্চা মাকে বলল, আপনি আগুনে ঝাঁপ দিন, নিশ্চই আল্লাহ আপনার সাথে আছেন।
টিকাঃ
৭১. মুসলিম, আসসাহিত, কিতাবুল যুহদ: ৭৪০১