📄 অতিভোজন কুলক্ষণ
অতিভোজন কুলক্ষণ। কুলক্ষণ মানে- যা খারাপ কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বাজারে গোলাম কিনতে গেলেন। গোলাম কিনার আগে গোলামের সামনে কিছু খাবার পেশ করলেন। দেখলেন যে, গোলাম সব খাবার খেয়ে শেষকরে দিলো। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, বেশি খাওয়া ভালো কোনো কিছুর আলামত বহন করে না। এই গোলাম ভালো না। এর দ্বারা ভালো কোনো কাজ হবে না।
এখন তো আমরা গর্ব করি যে, কে কতো বেশি খেতে পারি। খাওয়া নিয়ে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিযোগিতাও করে থাকি। বিষয়টা সত্যিই দুঃখজনক। কারণ, আমাদের জানা থাকতে হবে যে, মুমিন ব্যক্তি কখনোই বেশি খেতে পারে না। বেশি খাওয়া আর বেশি খাই খাই করা তো কাফেরদের কাজ। কাফেররা খায় সাত পেটে! ওদের পেট ভরতে অনেক লাগে। শুদ্ধ বাংলায় আমরা যেটাকে 'টাগারী' বলে থাকি। টাগারী মানে- হাতির মতো ইয়া বড় পেট।
পক্ষান্তরে, মুমিন ব্যক্তি খায় এক পেটে। অর্থাৎ, অল্পে তুষ্টি। অল্পতেই তার পেট ভরে যায়। বেশি খাই খাইও করে না। এজন্যই আমরা দেখতে পাই যে, যে যতবড় মুত্তাকী বা পরহেজগার; তার খাবার-খোরাক ততকম। কেনো? কারণ, অল্পতেই তার পেট ভরে যায়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য কী? হাতির মতো টাগারী ভরে খাওয়া নাকি শুধু তৃপ্তি নেওয়া?
আচ্ছা ধরুন! একলোক সাত ঘন্টা ঘুমালো। ঘুম থেকে উঠার পর, তার চেহারা সুরত এমন বিশ্রি দেখাচ্ছে যেনো দেখলে বমি আসতে চায়। এর কারণ হচ্ছে- ভদ্রলোকের ঘুম পূরণ হয়নি। ব্রেণ ফ্রেশ হয়নি। ঘুমের অতৃপ্তি এখনো রয়েই গেছে। অপরদিকে আরেকলোক মাত্র দুই ঘন্টা ঘুমালো। বেচারার ঘুমও পূরণ হলো। ব্রেণও ফ্রেশ হলো। চেহারার বদসূরত তো দূরের কথা বরং চেহারায় নূর ভেসে আসছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ব্যক্তির সময়ে বরকত হলো? নিশ্চই যে দুই ঘন্টা ঘুমালো তার। তাহলে একজনের দুই ঘন্টা ঘুমিয়ে ঘুম পূরণ হয়ে গেলো, আরেকজন সাত ঘন্টা ঘুমিয়েও ঘুম পূরণ হলো না; এর রহস্য হচ্ছে- যে দুই ঘন্টা ঘুমালো, সে ওজুকরে দোয়া দুরূদ পড়তে পড়তে ঘুমিয়েছে। ফলে তার ঘুমও পূর্ণ হয়েছে আবার সময়েরও বরকত হয়েছে।
পক্ষান্তরে, একজন এক টাগারী খেলো কিন্তু তৃপ্তি মিটলো না; আরেকজন এক প্লেট খেয়েই তৃপ্তি মিটিয়ে ফেললো, এর রহস্য হচ্ছে- যে এক প্লেট খেলো, সে দোয়া পড়ে সুন্নত তরীকায় খেলো। তার সমস্ত কাজগুলোই যেনো একমাত্র রবকে রাজি-খুশি করার জন্যই হলো। অপর ব্যক্তি খাওয়ার সময় দোয়াও পড়লো না, সুন্নত তরীকায়ও খেলো না। ফলে তার খাবারের সাথে শয়তান শরীক হলো। এইজন্য সাত প্লেট খাওয়ার পরও তার খাওয়ার চাহিদা রয়ে যায়। তার তৃপ্তি মিটে না।
হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে, একবার আমি প্রচন্ড ক্ষুধা অনুভব করলাম। তখন আমি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে সাক্ষাত করে তার থেকে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পবিত্র কালামুল্লাহর একটি আয়াতের পাঠ শুনতে চাইলাম। তিনি আয়াতটি পাঠ করে নিজ গৃহে চলে গেলেন। এদিকে আমি কিছু দূর চলার পর ক্ষুধার প্রচন্ডতায় উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। একটু পর দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার মাথার কাছে দাঁড়ানো। তিনি বললেন, হে আবূ হুরাইরা! আমি লাব্বাইকা ওয়া সা'দাইকা বলে সাড়া দিলাম। তিনি আমার হাত ধরে তুললেন এবং আমার অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি আমাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে এক পেয়ালা দুধ দেওয়ার জন্য আদেশ করলেন। আমি কিছু পান করলাম। তিনি বললেন, আবূ হুরাইরা! আরো পান করো। আমি আবার পান করলাম। তিনি আবার বললেন, আরো। আমি আরো পান করলাম। এমনকি আমার পেট তীরের মতো সমান হয়ে গেলো।
এরপর আমি উমরের সাথে সাক্ষাত করে আমার অবস্থার কথা জানালাম এবং বললাম, হে উমর! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার এমন একজন লোকের মাধ্যমে এর বন্দোবস্ত করেছেন যিনি এ ব্যপারে তোমার থেকে বেশি উপযুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কসম! আমি তোমার থেকে আয়াত পাঠ শুনতে চেয়েছি অথচ আমি তোমার থেকে ভালো পাঠ করতে জানি।
হযরত উমর রাযিআল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কসম! তোমাকে আপ্যায়ন করতে পারলে তা আমার নিকট আরবের লাল বর্ণের উটের চেয়েও অধিক প্রিয় হতো। সাহাবায়ে কেরাম রাযিআল্লাহু তা'য়ালা আনহুম আযমাইনগণ খানার ব্যপারে কতো কষ্ট করেছেন, কতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আর উনাদের তুলনায় আমরা তো শুধু বিলাসিতার উপর বিলাসিতা করেই দিনকাল পাড় করে দিচ্ছি। আমরা তো মনেকরি যে, বেশি খেতে পারলেই যেনো আমাদের সফলতা। কিন্তু আমাদের দৃষ্টির অগোচরে আমাদের শরীরের উপর কতোটা অন্যায় অবিচার করছি তা কী আদৌ আমরা একবার ভেবে দেখেছি?
বর্তমানে বারবার একথার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে যে, কম আহার করুন বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে পারবেন। আর জনসাধারণকে বারবার একথার উপকারিতাও বর্ণনা করা হচ্ছে। বেশি খেলে যে সকল রোগ সৃষ্টি হয় তার একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন প্রফেসর রিচার বার্ড। নিম্নে তা দেওয়া হলো।
১. মস্তিষ্কের ব্যাধি।
২. চক্ষু রোগ।
৩. জিহ্বা ও গলার রোগ।
৪. বক্ষ ও ফুসফুসের ব্যাধি।
৫. হৃদ রোগ।
৬. পিত্তের রোগ।
৭. ডায়াবেটিকস।
৮. উচ্চ রক্ত চাপ।
৯. মস্তিষ্কের শিরা ফেটে যাওয়া।
১০. দুশ্চিন্তা গ্রস্ততা।
১১. অর্ধঙ্গ রোগ।
১২. মনস্তত্ত্বিক রোগ।
১৩. দেহের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যাওয়া।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, এই তালিকা প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর তালিকা, যা প্রফেসর সাহেব গভীর চিন্তা ও গবেষণার পর প্রকাশ করেছেন।
অপর দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বর্ণনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, তিনি বলেন- পেটের এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য। একজন দার্শনিক এর নিকট যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই নির্দেশ শুনানো হলো, তখন সে বলতে লাগলো, এর থেকে উত্তম ও শক্তিশালী কথা আমি আজ পর্যন্ত শ্রবণ করিনি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে অল্পে তুষ্টি থাকার তৌফিক দান করুন, আমীন।
টিকাঃ
৮. মুসলিম শরীফ ৩৬/১৩
৯. 'সান' উইকলি সুইডেন
১০. সহীহ ইবনু মাজাহ ৩৩৪৯
📄 সত্য সমাগত মিথ্যা বিতাড়িত
আচ্ছা বাথরুমে তো আমাদের কমবেশি সবারই যাওয়া হয়। এখন যে কথাটা বলবো এটা অবশ্যই সামনে বাথরুমে যাওয়ার সময় একবার হলেও এর সত্যতা যাচাই করে নিবেন।
আমরা যে কেউ বাথরুমে ঢুকার সাথে সাথেই আমাদের চেহারার অঙ্গভঙ্গি পাল্টে যায়। 'উহ হু... গন্ধ' বলে আমাদের মুখ থেকে শব্দহীন একটা বাক্য বেরিয়ে আসে। এটা মোটামুটি সব জায়গাতেই। বাসা-বাড়ি, কলেজ-অফিস তো আছেই; তবে শহরের মোবাইল কোর্ট আর পাবলিক টয়লেট হলে তো কোনো কথাই নেই।
আচ্ছা বাথরুমে ঢুকার পর আমাদের নাকে এই গন্ধটা কতোক্ষণ সময় পর্যন্ত স্থির থাকে? বড়জোর পাঁচ থেকে সাত সেকেন্ড। এরপর কিন্তু আমরা সেই গন্ধটা পাই না। অর্থাৎ বাথরুমে ঢুকার সাথে সাথেই আমরা যে গন্ধটা পেয়ে থাকি এটা কিন্তু পাঁচ সাত সেকেন্ড পরে আর পাই না। অথচ বাথরুমের গন্ধটা কিন্তু বাথরুমে ঠিকই আছে, কিন্তু আমরা পাচ্ছি না কেনো? কারণ আমাদের নাক এটা গ্রহণ করে নিয়েছে। এখন আর এটাকে কোনো গন্ধই মনে হয় না।
ঠিক তেমনিভাবে, আমরা যখন সৎ পথে চলতে চাইবো, সত্যকে উন্মোচন করতে চাইবো, হকের আওয়াজকে উঁচু করতে চাইবো, তখন নানা দিক থেকে আমাদের উপর বাঁধা আসবে। নানা দিকের ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধগুলো আমাদেরকে জড়িয়ে ধরতে চাইবে। আমরা যদি প্রথমত একটু সহ্য করতে পারি; তাহলে এগুলো আমাদের জন্য কোনো গন্ধই মনে হবে না। আমাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। বিজয় আমাদের জন্য নিশ্চিত, ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেন,
وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
আর বলো, হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিলো।
قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ
বলো, সত্য এসেছে এবং বাতিল কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না আর কিছু পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না।
وَيَمْحُ اللَّهُ الْبَاطِلَ وَيُحِقُّ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি মানুষের অন্তর সমূহে যা আছে, সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
টিকাঃ
১১. সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৮১
১২. সুরা সাবা, আয়াত: ৪৯
১৩. সুরা শু'রা, আয়াত: ২৪
📄 আমাদের ক্রিয়েটিভিটি
আমরা সকলেই ক্রিয়েটিভ। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে এমন কিছু গুণাগুণ আছে যা দিয়ে আমরা সৃজনশীল কিছু তৈরী করতে পারি। আচ্ছা ধরুন, আপনি আপনার বিশেষ গুণ দিয়ে কিছু তৈরী করলেন, এরপর যদি আপনার সেই সৃষ্ট বস্তুটা নিয়ে কেউ কটু বাক্য বলে কিংবা তা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়, তখন আপনার কেমন লাগবে?
আচ্ছা আরেকটু সহজকরে বলি, আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই মা বোন আছে। তারা নিয়মিত আমাদের জন্য বিভিন্ন আইটেমের খাবার প্রস্তুত করেন। তাদের কষ্ট শুধুমাত্র আমদের খুশি করার জন্য, আমাদের মন পাবার জন্য। এখন আপনি যদি তাদের সে রান্না করা খাবার নিয়ে কটু মন্তব্য কিংবা তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দেন, তাহলে পরের বেলায় আপনার কপালে ভালো খাবার জুটবে কিনা সন্দেহ আছে।
আমরা সবাই সবার স্থান থেকে নতুন কিছু করে দেখাতে চাই শুধুমাত্র অন্যরা আমাকে উৎসাহ দিবে, আমাকে নিয়ে গর্ব করবে এই জন্য। আমরা কেউ কখনোই উপহাসের পাত্র হতে চাই না। সাধারণত আমরা ফেসবুকে একটা পিকচার আপলোড দিয়েই সবার ভালো কমেন্টের আশা করি। আর ভালো লিখতে পারলে সেখানে কেউ নেগেটিভ মন্তব্য করুক আমরা তা মেনে নিতে পারি না। কারণ এটা আমাদের সৃষ্টি। সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনার কারণেই আমরা তা করে দেখাতে সক্ষম হয়েছি। এবার আপলোড দিয়ে সবার ভালো মন্তব্যের আশা করছি।
ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা দুনিয়ার মাঝে আমাদেরকে অনেক অনেক নেয়ামত দান করেছেন। আসমান-জমিন, পাহাড়-সাগর, নদী-নালাসহ আঠারো হাজার মাখলুকাতের এক বিশাল নেয়ামত দান করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে এতো এতো কিছু দিয়েছেন শুধুমাত্র এই জন্যই যে, আমরা যেনো তার নেয়ামত দেখে তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। এই সবকিছু দেখে আমরা যেনো মুখে উচ্চারণ করি 'সুবহানাল্লাহ' 'আলহামদুলিল্লাহ' 'আল্লাহু আকবার'। তাহলেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদের উপর রাজি খুশি হবেন। আমাদেরকে ভালোবাসবেন আর আমরা তার প্রিয় পাত্র হবো। একজন মা যেমন সন্তানের জন্য ভালো খাবার রান্না করে তার মন পাবার আশা করে, ঠিক তেমনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা দুনিয়ার মাঝে এতো বেশি নেয়ামত দান করেছেন, বান্দা যেনো তার নাম 'আল্লাহ আল্লাহ' বলে জপতে থাকে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, 'যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দিবো আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার আযাব বড় কঠিন।
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে করেছেন বিছানা, আসমানকে ছাদ এবং আসমান থেকে নাযিল করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর তার মাধ্যমে উৎপন্ন করেছেন ফল-ফলাদি, যা তোমাদের জন্য রিস্কিস্বরূপ। সুতরাং তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না।
تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَجَعَلَ فইহা سِرَاجًا وَقَمَرًا مُنِيرًا
বরকতময় সে সত্তা যিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন বিশালকায় গ্রহসমূহ। আর তাতে প্রদীপ ও আলো বিকিরণকারী চাঁদ সৃষ্টি করেছেন।
أَمَّنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلٰلَهَا أَنْهَارًا وَجَعَلَ لَهَا رَوَاسِيَ وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا أَإِلٰهُ مَّعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
বরণ তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সাথে কি অন্য কেনো ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই তা জানে না।
وَلَقَدْ جَعَلْنَا فِي السَّمَاءِ بُرُوْجًا وَ زَيَّتُهَا لِلنَّظِرِينَ
আর আমি আসমানে স্থাপন করেছি কক্ষসমূহ এবং তাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছি দর্শকের জন্য।
وَ إِلَى الْجিবَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ
আর পর্বতমালার দিকে দেখো, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে?
وَ جَعَلْنَا فِيهَا رَوَاسِيَ شُمِخٰتٍ وَ أَسْقَيْنَكُمْ মَّاءً فُرَاتًا
আর এখানে আমি স্থাপন করেছি সুদৃঢ় ও সুউচ্চ পর্বতমালা এবং তোমাদেরকে পান করিয়েছি সুপেয় পানি।
টিকাঃ
১৪. সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭
১৫. সুরা বাকারা, আয়াত: ২২
১৬. সুরা ফুরক্বান, আয়াত: ৬১
17. সুরা আন-নামল, আয়াত: ৬১
১৮. সুরা হিজর, আয়াত: ১৬
১৯. সুরা গাশিয়াহ, আয়াত: ১৯
২০. সুরা মুরসালাত, আয়াত: ২৭
📄 স্কুলে বাচ্চাদের প্যারেড
আমরা আমাদের বাচ্চাদের প্রতি খুবই কেয়ারফুল। প্রতিটা মুহূর্তে তার গতিবিধি লক্ষ্য করি। কখন কোথায় কী করছে না করছে তার দিকে খেয়াল রাখি। একটু বড় হলে আমরা তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই কিংবা মক্তবে পাঠিয়ে দেই। আচ্ছা ধরুন, আমাদের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিলাম। নিয়মানুযায়ী স্কুলে প্রত্যেহ সকালে বাচ্চাদের প্যারেড হয়। সকল বাচ্চা একসাথে দাঁড়িয়ে স্কুলের বড় মাঠে প্যারেড করে। একদিন আমি কোনো আয়োজন ছাড়া আচমকা মাঠে চলে গেলাম। সবার দিকে নজর বুলাতে লাগলাম। প্রশ্ন হতে পারে, 'এতোগুলো বাচ্চার মাঝে আমার উৎসুক দৃষ্টিটা কার উপর পড়বে'? উত্তর 'নিশ্চই আমার আদরের কন্যার উপর'। কিন্তু এমনটা কেনো? বাচ্চাতো আরো অনেক ছিলো। পুরো মাঠ ভরা। সকলের মাঝে আমি আমার মেয়েকে খুঁজে বের করলাম কেনো? এতো এতো বাচ্চার উপর আমার সাধারণ দৃষ্টি, আর আমার আদুরে কন্যার উপর বিশেষ দৃষ্টি এর রহস্য কী? এর মূল রহস্য হচ্ছে, সে আমার।
যখন আমার মেয়ে আমাকে দূর থেকে দেখবে যে, আব্বু আমাকে দেখতেছে। তখন ওর মনে কিন্তু আরো সাহস বৃদ্ধি পাবে। ও মুচকি মুচকি হাসবে। ওর দিলে প্রচুর পরিমাণে উৎফুল্লতা আসবে।
ঠিক তেমনিভাবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সকল বান্দাদের উপর সাধারণ দৃষ্টি ও বিশেষ দৃষ্টির উদাহরণ হলো এই- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার সকল বান্দাদের উপর সাধারণ রহমত দিয়ে রেখেছেন। তবে তার বিশেষ রহমত তিনি শুধুমাত্র তার বিশেষ বান্দাগনকেই দিয়ে থাকেন।
যেমন ধরুন! সরকার প্রধানের সাধারণ দয়ার মাঝে দেশের সকল জনগন বসবাস করে। তবে তার বিশেষ দয়াও রয়েছে। আর তার বিশেষ দয়ায় তো কেবলমাত্র তার বিশেষ লোকগুলোই প্রাধান্য পায়। যেমন তার দলীয় নেতাকর্মী তার আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি। এদের মধ্যেও আবার বিশেষ কিছু নেতাকর্মী আছে যাদের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে। সুযোগ সুবিধাও বিশেষ। আবার তাদের দাপটটাও বিশেষ। অর্থাৎ বিশেষের উপর বিশেষ।
আমাদের জগতটা ঠিক যেভাবে চলে, উপরের জগতটাও সেভাবেই চলে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সকল বান্দারাই তাঁর সাধারণ রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাকে বেশি মানে, তাঁকে বেশি বিশ্বাস করে, তাঁর জন্যে খালেস দিলে বেশি বেশি আমল করে আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সৃষ্ট নিদর্শনগুলো দেখে বলে যে, 'এও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা সৃষ্টি করেছেন? এও আমাদেরকে ফায়দা পৌঁছাবে? সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ'!! তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা পৃথিবীতে মানবজাতির জন্য বহু নিদর্শন সৃষ্টি করে রেখেছেন। বহু নেয়ামত দান করেছেন। এর উদ্দেশ্য একটাই, যাতেকরে সৃষ্টিজীব একমাত্র স্রষ্ঠা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাকে চিনতে পারে, তাঁকে ডাকতে পারে, তাঁর পরিচয় পেতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন-
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ إِذَا أَنْتُمْ بَشَرٌ تَنْتَشِرُونَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, অতপর কিছুকাল পরেই তোমরা মানবরূপে (ভূপৃষ্ঠে) ছড়িয়ে বিচরণ করতে লাগলে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের প্রথম নিদর্শন: মানুষের মতো সৃষ্টির সেরা জীবকে তিনি মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিজগতে যতো প্রকার উপাদান রয়েছে, তন্মধ্যে মাটি সর্বনিকৃষ্ট উপাদান। এতে অনুভূতি, চেতনা ও উপলব্ধির নাম গন্ধও দৃষ্টিগোচর হয় না। অগ্নি, পানি, বায়ু ও মাটি এই চারটি উপাদানের মাঝে মাটি ছাড়া বাকী সবগুলোতেই কিছু না কিছু গতি ও চেতনার আভাস পাওয়া যায়। মাটি তা থেকেও বঞ্চিত। মানব সৃষ্টির জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা একেই মনোনীত করেছেন। ইবলিসের পথভ্রষ্টতার কারণও তাই হয়েছে যে, সে অগ্নি উপাদানকে মাটি থেকে সেরা ও শ্রেষ্ঠ মনে করে অহংকারের পথ বেছে নিয়েছিলো। সে বুঝলো না যে, ভদ্রতা ও আভিজাত্যের চাবিকাঠি একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই মহান করতে পারেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের দ্বিতীয় নিদর্শন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য হতে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন, যেনো তোমরা তাদের হতে শান্তি লাভ করো আর তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন; এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
মানুষের মধ্য থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা নারীজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তারা হলো পুরুষের সঙ্গিনী। একই উপাদান থেকে একই স্থানে এবং একই খাদ্য থেকে উৎপন্ন সন্তানদের মধ্যে এই দুটি প্রকারভেদ তিনি সৃষ্টি করেছেন। তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মুখশ্রী, অভ্যাস ও চরিত্রে সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পূর্ণ শক্তি ও প্রজ্ঞার নিদর্শনস্বরূপ এই সৃষ্টিই যথেষ্ট। এরপর নারীজাতিকে সৃষ্টি করার রহস্য ও উপকারিতা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, 'তোমরা যেনো তাদের কাছে শান্তি লাভ করতে পারো' সে উদ্দেশ্যে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পুরুষদের যত প্রয়োজন নারীর সাথে সম্পৃক্ত; এগুলো সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, এগুলোর সারমর্ম হচ্ছে মানসিক শান্তি ও সুখ। আর এ থেকেই বুঝা যায় যে, বৈবাহিক জীবনের যাবতীয় কাজ-কারবারের সারমর্ম হচ্ছে মনের শান্তি ও সুখ। যে পরিবারের মাঝে এটা বর্তমান আছে, সেই পরিবার সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল। আর যে পরিবারে এটা বর্তমান নেই, অর্থাৎ মানসিক শান্তি অনুপস্থিত, সেখানে আর যাই থাকুক না কেনো; বৈবাহিক জীবনের কোনো সাফল্য নেই।
দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রীতি-ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন এই জন্যে, যাতে করে দাম্পত্য জীবন সফল হয়, পারিবারিক জীবনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা যায়, মানবতার উন্মেষ ঘটে, সভ্যতার ক্রমবিকাশে প্রতিটি মানুষ তার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করে'। একথাও বলা বাহুল্য যে, পারস্পরিক শান্তি তখনই সম্ভবপর যখন নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তি শরীয়তসম্মত বিবাহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। যেসব দেশ ও জাতি এর বিপরীত হারাম রীতি-নীতি প্রচলিত করেছে, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, তাদের কোথাও শান্তি নেই। জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় সাময়িক যৌন বাসনা চরিতার্থ করার নাম শান্তি হতে পারে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের তৃতীয় নিদর্শন:
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জবান (অর্থাৎ ভাষা অথবা আওয়াজ ও কথন ভঙ্গি) বর্ণ পৃথক পৃথক করেছেন। এতে জ্ঞানবানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন। বিভিন্ন স্তরের মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি এবং বিভিন্ন স্তরের বর্ণবৈষম্য। যেমন; কেউ শ্বেতকায় আবার কেউ কৃষ্ণকায়। কেউ লালচে আবার কেউ হলদেটে। এখানে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন তো শক্তির মহানিদর্শন বটেই; মানুষের ভাষার বিভিন্নতাও কুদরতের এক বিস্ময়কর লীলা। ভাষার বিভিন্নতার মাঝে অভিধানের বিভিন্নতাও অন্তরভূক্ত রয়েছে। আরবি, ফারসি, হিন্দী, তুর্কি, ইংরেজী ইত্যাদি কতো ধরনের ভাষা রয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এগুলো বিভিন্ন ভূখন্ডে প্রচলিত। তন্মধ্যে কোনো কোনো ভাষা পরস্পর এতো ভিন্নরূপ যে, এদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনেই হয় না। স্বর ও উচ্চারণভঙ্গির বিভিন্নতাও ভাষার বিভিন্নতার মাঝে শামিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা প্রত্যেক পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরে এমন স্বতন্ত্র সৃষ্টি করেছেন যে, একজনের কণ্ঠস্বর অন্যজনের কণ্ঠস্বরের সাথে মিল রাখে না। কিছু না কিছু পার্থক্য অবশ্যই থেকে যায়। অথচ এই কণ্ঠস্বরের যন্ত্রপাতি তথা জিহ্বা, ঠোঁট, তালু ও কণ্ঠনালী সবার মধ্যেই এক ও অভিন্ন। এমনিভাবে বর্ণবৈষম্যর কথাও বলা যায়। একই পিতা-মাতা থেকে একই প্রকার অবস্থায় দুই সন্তান ভিন্ন বর্ণের হয়ে জন্মলাভ করে। এটা হচ্ছে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সৃষ্টি ও কারিগরির নৈপুণ্য।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের চতুর্থ নিদর্শন:
وَمِنْ آيَاتِهِ مَنَامُكُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَابْتِغَاؤُكُمْ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَسْمَعُونَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, তোমাদের জন্য রাত্রিকালে ও দিবাভাগে নিদ্রা এবং তার প্রদত্ত রিজিক অন্বেষণ করা। এতে সেই লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা শ্রবণ করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার এই আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, নিদ্রার সময় নিদ্রায় যাওয়া এবং জাগরণের সময় জীবিকা অন্বেষণ করাকে মানুষের জন্মগত স্বভাবে পরিণত করা হয়েছে। এই উভয় বিষয়ের অর্জন মানুষের চেষ্টা-চরিত্রের অধিন নয়; বরং এগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার দান। আমরা দিন-রাত প্রত্যক্ষ করি যে, নিদ্রা ও বিশ্রামের উৎকৃষ্টতর আয়োজন সত্ত্বেও কোনো কোনো সময় নিদ্রা আসে না। মাঝে মাঝে ডাক্তারী বটিকাও নিদ্রা আনয়নে ব্যর্থ হয়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা যাকে চান তাকে উন্মুক্ত মাঠে রোদ ও উত্তাপের মধ্যেও নিদ্রা দান করেন। জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি যে, দুই ব্যক্তি সমান সমান জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন। সমান অর্থসম্পন্ন। সমান পরিশ্রম সহকারে জীবিকা উপার্জনের একই ধরণের কাজ নিয়ে বসে। কিন্তু একজন উন্নতি লাভ করে এবং অপরজন ব্যর্থ হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের পঞ্চম নিদর্শন:
وَمِنْ آيَاتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّমَاءِ মَاءً فَيُحْيِي بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, তিনি তোমাদেরকে বিদ্যুৎ দেখিয়ে থাকেন, যাতে (বজ্রপাতের) ভয়ও হয় আবার (বৃষ্টিপাতের) আশাও হয় এবং তিনিই আসমান হতে পানি বর্ষণ করে থাকেন। অতঃপর তা দ্বারা জমিনকে তার মৃত হওয়ার পর সজীব করেন। এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।
পঞ্চম নিদর্শন এই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা মানুষকে বিদ্যুতের চমক দেখান। এতে পতিত হওয়ার এবং ক্ষতিকারিতারও আশঙ্কা থাকে এবং এর পশ্চাতে বৃষ্টির আশাবাদও সঞ্চার হয়। তিনি এই বৃষ্টির দ্বারা শুষ্ক এবং মৃত মাটিকেও জীবিত ও সতেজ করে থাকেন। এবং এতে তিনি বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষ ও ফল-ফুল উৎপন্ন করেন। এই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে যে, 'এতে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে'। কেননা বিদ্যুৎ ও বৃষ্টি এবং তা দ্বারা উদ্ভিদ ও ফল-ফুলের সৃজন যে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার পক্ষ থেকেই হয়। একথা কেবলমাত্র বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দ্বারাই বোঝা যেতে পারে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার কুদরতের ষষ্ঠ নিদর্শন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ تَقُوْمَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً مِنَ الْأَرْضِ إِذَا أَنْتُمْ تَخْرُجُونَ
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার নিদর্শনসমূহের মাঝে একটি এই যে, আসমান ও জমিন তাঁরই নির্দেশে স্থির রয়েছে। অতঃপর যখন তোমাদেরকে ডেকে ভূগর্ভ হতে (বের হওয়ার) আহ্বান করবেন, ততক্ষণাৎ তোমরা বের হয়ে পড়বে।
ষষ্ঠ নিদর্শন এই যে, আকাশ ও পৃথিবী একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার আদেশেই কায়েম আছে। হাজার হাজার বছর সক্রিয় থাকার পরেও এগুলোতে কোথাও কোনো ত্রুটি দেখা দেয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা যখন এই ব্যবস্থাপনাকে ভেঙ্গে দেওয়ার আদেশ দিবেন, তখন এই মজবুত ও অটুট বস্তুগুলো নিমিষেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। অতঃপর তাঁরই আদেশে সব মৃত পুনরুজ্জীবিত হয়ে হাশরের মাঠে সমবেত হবে।
এগুলো ছাড়াও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আরো বহু নিদর্শন সৃষ্টি করে রেখেছেন। যা আমাদের চর্মচক্ষু দিয়ে দেখে যদি শুধুমাত্র বলতে পারি যে, 'সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদের জন্য এগুলোও সৃষ্টি করেছেন'!! তাহলেই আমাদের জীবন কামিয়াব। মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার জন্য বিশেষ বান্দা হওয়ার চেষ্টা করবে, তার সৃষ্ট নিদর্শনসমূহ দেখে 'সুবহানাল্লাহ' বলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে, মানুষের মাঝে রবের সৃষ্টবস্তু নিয়ে আলোচনা করবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাও ফেরেশতাদের মজলিসে তার আলোচনা করবেন এবং তার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাবেন।
টিকাঃ
২১. সুরা রুম, আয়াত: ২১
২২. সুরা রুম, আয়াত: ২২
২৩. সুরা রুম, আয়াত: ২৩
২৪. সুরা রুম, আয়াত: ২৪
২৫. সুরা রুম, আয়াত: ২৫
২৬. সুরা রুম, আয়াত: ২৬