📘 লিডারশিপ > 📄 একজন সফল নেতার নেতৃত্বের পিছনে ৮ম গুপ্ত রহস্যঃ একটি মহান শিশু

📄 একজন সফল নেতার নেতৃত্বের পিছনে ৮ম গুপ্ত রহস্যঃ একটি মহান শিশু


আজ মুসলমানদের একান্ত প্রয়োজন বাড়ন্ত শিশুদের প্রতি তাদের আচরণ এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি তাদের মনোযোগের ব্যাপারে বিস্তারিত চিন্তা করা। নবী , তার কথা এবং কাজের মাধ্যমে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করার দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবসত, আমরা আমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে দেখতে পাই যারা শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন সব রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন যা জন-এডওয়ার্ড-জেমস-স্মীথদের দ্বারা পরিকল্পিত। তারা সর্বোচ্চ মর্যাদাবান নবী এবং সর্বপ্রধান নির্দেশক নবী (সা)-এর জীবনী পড়ে দেখেন নি, তাঁর শেখানো পদ্ধতির ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন নি, এমনকি নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে তাঁর দিক নির্দেশনা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলি বিবেচনা করে দেখেন নি। এর চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আর কি হতে পারে?
একটা শিশু কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই তার প্রকৃতিগত আচরণই প্রকাশ করে এবং তার নিজের একান্ত ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। সে হাসতে হাসতে তাঁর বাবার কোলে প্রস্রাব করে দেয়, অথবা হাসতে হাসতে মানুষজনকে আঘাত করে। তারা তাদের বাবার অন্তরের প্রশান্তি এবং মায়ের অলংকার। তাদের কারণেই জীবন লাবণ্যময় হয়ে ওঠে, বেঁচে থাকাটা সুন্দর মনে হয়। তাদের আরামের জন্য পিতামাতা নির্ঘুম রাত কাটান, তাদের নিরাপত্তা দিতে দিন ব্যয় করে দেন।
একজন বাবা তার জীবনের স্বর্ণযুগে কঠোর পরিশ্রম করে, সংগ্রাম করে, নদী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, কখনো আকাশে উড়ে, পূর্ব-পশ্চিম অতিক্রম করে সন্তানের জন্য ভাল খাদ্য, সুন্দর জামা কাপড় এবং ভাল একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি এগুলো করেন, তারপরও তার হৃদয় প্রশান্তিতে পূর্ণ থাকে। যদিও তাকে ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, শয়তানের কু-প্ররোচনার বিরুদ্ধে সাহসী মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। তিনি সকালে ওঠেন, রাত্রে ঘুমাতে যান, কিন্তু দিন রাতের প্রত্যেকটা সময় তার মূল চিন্তা থাকে পৃথিবীতে হেটে বেড়ানো এই মনিমুক্তোগুলির দিকে।
বাচ্চারা বাড়ির যেদিকে যে প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়, একজন মাও বাচ্চার সাথে সাথে সেই প্রান্তে ঘুরে বেড়ান এবং ক্লান্তিকর দিনের শেষে, সারারাত নির্ঘুম নয়নে একবার এপাশ আবার ওপাশ এভাবে সারা রাত কাটিয়ে দেন; প্রত্যেক ছোট্ট শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়; বাচ্চাটা যখন নড়ে ওঠে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন, বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়ে তিনিও ঘুমাতে চেষ্টা করেন।
বাচ্চার যন্ত্রনায় তিনি কাতর হন, বাচ্চার চিৎকারে তার চোখ অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। তারা যখন সুখে থাকে, হাসতে থাকে, পৃথিবী আনন্দে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তারা যখন ব্যথা পায়, অসুস্থ হয়, তা যত অল্পই হোক না কেন, মায়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে।
আর একারণেই সন্তান থেকে সদ্ব্যবহার পাবার অধিকারের প্রথম তিন-চতুর্থাংশ অধিকার তারই। বাকি এক-চতুর্থাংশ তার স্বামীর সম্মানে, যিনি সার্বক্ষণিক পাশে থেকে সন্তান বড় করতে তাকে সাহায্য করেছেন।
আজ যে শিশু, কাল সে পূর্ণ মানুষ।
একটা ছোট্ট শিশু ছোট থাকে কতদিন? আর কতদিনই বা তার পিতামাতা সামর্থবান এবং বড় থাকে?
অর্থঃ “আল্লাহ তিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।”
আজকের শিশু আগামী দিনের পরিপূর্ণ মানুষ এবং তারাই ভবিষ্যত। এই ছোট্ট দুর্বল আর নিষ্পাপ শিশুরাই নিকট ভবিষ্যতে, সমাজের নেতৃত্ব দেবে, মানুষের মাথা হবে, মানুষের তত্ত্বাবধান করবে।
উর্বর জমি
তাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন, তাদের প্রকৃতি স্নিগ্ধ এবং তাদের আত্মা ধার্মিক। "প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের (ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে, তারপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদী হিসেবে গড়ে তোলে অথবা খৃস্টান হিসেবে গড়ে তোলে অথবা অগ্নি উপাসক হিসেবে গড়ে তোলে।" তাদের মন-মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব আবাদি জমির মতন। আজ আমরা যদি তাদের মধ্যে উচ্চ নৈতিকতা, ভাল চরিত্র, সঠিক মূল্যবোধ এবং সম্মান শ্রদ্ধার বীজ বপন করতে পারি কাল তারা সে অনুযায়ী সঠিক বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষ, আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, রাজনীতিবিদ, জাজ, নেতা এবং চিন্তাবিদ আমাদের উপহার দেবে।
নতুন প্রজন্মের জন্ম নেয়া সফলতার রাস্তা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা। কোনো জাতি কেবল তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার শিশুরা ধ্বংস হয়ে যায়। আর শিশু-কিশোররা কোনোদিন পাপের পথে পরিচালিত হয় না যতক্ষণ না তারা অবহেলা, অযত্নের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সম্মানিত নেতা এবং নির্দেশক তার অন্তদৃষ্টি দিয়ে শিশু কিশোর এবং তরুণদের অবস্থান অনুধাবন করেছিলেন। তাদেরকে সেই দিনের জন্য প্রস্তুত করা যেদিন তারা দায়িত্ব কাধে তুলে নেবে এবং সমাজের নেতৃত্ব দেবে সেদিনের জন্য দিক নির্দেশনা দেয়া এবং বড় করার সকল পদক্ষেপ নিতেন।
মহানতম নেতা এবং সম্মানিত শিক্ষক রসুলুল্লাহ-এর জীবনকে বিশ্লেষণ করে, আমি পর্যবেক্ষণ করলাম তিনি এই ব্যাপারে যেসব দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন সেগুলোকে চারটি প্রধান দিকে ভাগ করা যায়।
প্রথম দিক : প্রাপ্ত বয়স্কদের সমাবেশে তাদের উপস্থিতি
নবী-এর নবুয়তের গুরুদায়িত্ব এবং তার সুউচ্চ মর্যাদা সত্ত্বেও শিশু কিশোররা অবাধে তার সাথে যোগাযোগ রাখতে পারত। আর তাই, পদমর্যাদা বা সম্মান যতই হোক না কেন, মানুষের উচিত নয় শিশু কিশোর ও তার মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, এই ভেবে যে, তা তার সম্মান রক্ষা করে এবং গাম্ভীর্য তৈরী করে।
রসুল -এর চেয়ে বেশি মর্যাদাশীল কেউ নেই এবং রেসালাতের দায়িত্বের চেয়ে বড় কোনো দায়িত্ব নেই। নবী তাঁর এবং তাঁর নাতি-নাতনিদের মাঝে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন নি, তার কোনো সাহাবীও তা করেন নি। বরঞ্চ, তিনি তাঁর কথা এবং মর্যাদা দ্বারা সাহাবীদের ব্যাখ্যা করতেন তাদের এরকম চিন্তা নিতান্তই ভ্রান্ত যে শিশুদের খেলাধুলা লাফালাফি তাকে ব্যাথা দেয়, বিঘ্ন ঘটায় বা বিরক্ত করে।
বিপরীতে, তিনি ছোট-বড় উভয়কেই শৃঙ্খলা, নীতিবোধ এবং উত্তম নৈতিকতা শেখানোর সকল সুযোগ গ্রহণ করতেন। শিশুদেরকে বড়দের থেকে আলাদা করা শিক্ষা দিক্ষার ভাল কোনো উপায় হতে পারে না। কত সুন্দর সেই দৃশ্য যখন মানুষরা তার ছোট সন্তানদেরকে মেহমানদের আপ্যায়নের সাথে সম্পৃক্ত করে, যখন বন্ধু বান্ধবদের সাথে থাকে, তাদেরকেও সাথে নেয়। যদি একটা শিশু তার ছোট্ট পরিসরেই আবদ্ধ থাকে তাহলে কিভাবে সে বড় হবে এবং তার চরিত্র উন্নত হবে?
সিজদার সময়ের বীরপুরুষ...
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "আমরা নবী-এর রাতের নামাজ পড়া দেখছিলাম। যখন তিনি সেজদায় যাচ্ছিলেন হাসান এবং হুসাইন লাফিয়ে তাঁর ঘাড়ের ওপর উঠছিল। যখন তিনি তাঁর মাথা উঠাচ্ছিলেন, তিনি তাদেরকে আস্তে করে পাশে সরিয়ে দিচ্ছিলেন। তারপর আবার যখন তিনি সিজদায় যাচ্ছিলেন, তারা আবার একই কাজ করছিল। তাঁর নামাজ যখন শেষ হলো তখন তিনি তাদের একজনকে এখানে এবং অন্যজনকে ওখানে বসালেন। আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম "ইয়া রসূলাল্লাহ! তাদেরকে তাদের মায়ের নিকট দিয়ে আসব?" তিনি বললেন, “না” তারপর যখন বিদ্যুৎ চমকালো, তিনি বললেন, "যাও, তোমাদের মায়ের সাথে দেখা কর" তারা উভয়েই বিদ্যুতের আলোয় পথ খুঁজতে খুঁজতে বাসায় গেলেন"
মসজিদের শিশু
আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত। আমি নবী এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং পূর্ণাঙ্গ সালাত আর কোনো ইমামের পিছনে কখনো পড়িনি। আর তা এ জন্য যে, তিনি শিশুর কান্না শুনতে পেতেন এবং তার মায়ের ফিত্নায় পড়ার আশংকা করতেন।
অন্য বর্ণনায়, আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা) নামাযরত অবস্থায় মায়ের সাথে আসা শিশুর কান্না শুনতে পেলে ছোটখাট সুরা দিয়ে নামায শেষ করে দিতেন।
জুময়ার নামাজের বীরপুরুষ
বুরাইদা আল আসলামী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) জুময়ার খুতবা দিচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় হাসান এবং হুসাইন লাল রঙের পোশাক পরে হাটছিলেন এবং গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন। রসূলুল্লাহ মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদেরকে কোলে তুললেন। তিনি তার সামনে তাদেরকে রেখে বললেন, “আল্লাহ সত্য বলেন; তোমাদের ধন-সম্পদ এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষা বই কিছুই নয়। আমি এ বাচ্চা দুটিকে দেখলাম তারা হাটাহাটি করছে এবং গড়াগড়ি খাচ্ছে, আমার মন মানছিল না। তাই আমি তাদেরকে তুলে আনবার জন্য খুতবা বন্ধ করেছি।”
হুসাইন প্রস্রাব করলেন
লুবাবা বিনতে হারিস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুসাইন ইবন আলী (রা) নবী -এর কোলে প্রস্রাব করেন। তখন আমি বললাম- ইয়া রসূলুল্লাহ। আপনার কাপড়খানি আমাকে দিন এবং অপর একখানি কাপড় পরিধান করুন। তখন তিনি বললেন: শিশু বালকের পেশাবের ওপর পানি ছিটালেই হবে এবং কন্যা শিশুর পেশাব ধুয়ে ফেলতে হবে।
তাহলে কি হলো? ব্যাপারটা শেষ হলো এভাবে... ব্যাপারটি একটি সুন্দর উক্তি এবং ফতোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল।
দ্বিতীয় দিক: শিশুর স্বাতন্ত্রে বিশ্বাস রাখা
খেলাধুলা হচ্ছে শিশুর ব্যক্তিত্ব এবং মানসিকতা বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তার ব্যক্তিগত মতামত, রসিকতা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। বড় মানুষ মনে করে জীবন হচ্ছে সংকীর্ণ, কিন্তু একটা শিশুর কাছে এটা কখনোই সংকীর্ণ নয়। মানুষের বেশভূষা দেখে মনে হয় জীবন মানেই সমস্যা সেখানে শিশুদের বেশভূষা থেকেই বোঝা যায় সেখানে সমস্যার কোনো স্থান নেই। শুধু খেলাধুলা আর মজা করা। সে রেগে যায় আবার পরক্ষণেই তা ভুলে যায়, সে ঝগড়া করে আবার সেই মূহূর্তে মীমাংসা করে, সে দুঃখ পায় আবার মুহূর্তের মধ্যেই সুখী হয়ে ওঠে। তার চোখে জীবন একটা বড় খেলার মাঠ। দিকনির্দেশক এবং দয়াশীল নবী (সা) কোনো অভিব্যক্তিকে কঠিন মনে করতেন না। তাদের প্রতি আস্থা রাখতেন।
শিশুর পা এবং নবীর বুক
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এই দুই কান দিয়ে শুনেছি এবং এই দুই চোখ দিয়ে দেখেছি নবী হাসান এবং হুসাইন-কে তার দুই পায়ের পাতার ওপর ধরে রেখেছিলেন এবং বলছিলেন, "হুজুক্কাহ! হুজুক্কাহ! ও আইনু বাক্কাহ!” তা শুনে ছোট্ট বালক চড়তে থাকল এমনকি সে রসূলুল্লাহ -এর বুকে তার পা রাখল। নবী তাকে বললেন, "খোল” তারপর তিনি তাকে চুমু খেলেন এবং বললেন, "ইয়া আল্লাহ! আমি তাকে ভালবাসি, আপনিও তাকে ভালবাসুন"
লাভের দিক
আবু আব্দুল্লাহ আল হাকীম বলেন, আমি হাদীসের সংকলককে এই হাদীসের অর্থের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন, হুজুক্কাহ হচ্ছে এমন কেউ যে চলার সময় বড় বড় পদক্ষেপ ফেলে না এবং আইনু মানে চোখ, বাক্কাহ নির্দেশ করে এমন ছারপোকা যা উড়তে পারে। আর ছারপোকার চোখ (আইনু বাক্কাহ) খুবই ক্ষুদ্র। অবশ্য, আল্লাহই সম্যক আবগত।
তিন জনের দৌড়
আব্দুল্লাহ ইবনে হারিস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী আব্বাস এর তিনপুত্র আব্দুল্লাহ, ওবাইদুল্লাহ এবং কুছায়েরকে এক লাইনে দাড় করাতেন। তারপর তিনি বলতেন, যে আমার কাছে আগে পৌছাবে তাকে এইটা দেব... সেইটা দেব...। তারা নিজেদের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর নিকট আসত এবং তাঁর বুকের ওপর, ঘাড়ের ওপর এসে পড়ত। তারপর তিনি তাদের চুমু খেতেন এবং তাদের নিয়ে মত্ত থাকতেন।
সর্বোত্তম পর্বত
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী আসলেন, তাঁর কাধে ছিলেন হাসান ইবন আলী। নবী-এর সাথে একজন দেখা করলেন এবং বললেন, "ও ছোট্ট ছেলে! আরোহন করার জন্য তুমি সবচেয়ে ভাল পর্বতটি পেয়েছ" নবী বললেন, "আর এটার ওপরে আরোহনের জন্য সে সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত”
জুয়াইনাব
আনাস হতে বর্ণিত। যিনি বলেন, নবী উম্মে সালামার কন্যা জুয়াইনাবের সাথে খেলা করতেন। এ সময়ে তিনি বার বার বলতেন, "ও জুয়াইনাব! ও জুয়াইনাব!”
লাল জিহ্বা
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী হুসাইন এর দিকে জিহ্বা সুচালো করতেন। আর ছোট্ট ছেলেটি (হুসাইন) জিহবার লাল রঙ দেখে এর দিকে ছুটত।
লা ইলাহা ইল্লাহ! আজ, কিছু মানুষ এটাই বুঝতে পারেন না যে খেলাধুলা এবং শিশুদের সাথে মজা করার মর্ম কি! তারা ভাবেন, এটাই তাদের মর্যাদা এবং গাম্ভীর্য। মূলত তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সম্পূর্ণ ধূলিস্মাৎ করেন এবং সঠিক পথটি উপেক্ষা করেন।
আরও একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করে আমি আপনার বিস্ময়কে বাড়িয়ে দিতে চাই, যেটি প্রথমটির মতই চমকপ্রদ। মহানবী -এর জীবন এ রকম অসংখ্য সুন্দর এবং বিস্ময়কর জিনিসে পরিপূর্ণ- পানি ছিটানো।
শিশুদের মনে অত্যন্ত ভালবাসার একটা খেলা হলো পানি ছিটানো। এটা সহজ, বিপদজনকও নয়। আল্লাহর কসম, আমি পড়েছি, শুনেছি এবং দেখেছি কিন্তু এরকম কিছু আমি পড়িনি শুনিনি দেখিওনি ...
মাহমূদ ইবনুর-রাবী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মনে আছে, নবী একবার বালতি থেকে পানি নিয়ে মুখে করে আমার মুখমন্ডলে কুলি করেছিলেন, তখন আমি ছিলাম পাঁচ বছরের বালক। এ হাদীস দিয়ে এটা বোঝানো হচ্ছে যে, নবী তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে পানি মেরে শুধুমাত্র একটু রশিকতা, একটু স্নেহ, একটু মমতা করতে চেয়েছেন। যেটা সাহাবীদের বাচ্চাদের প্রতি এরূপ করা তাঁর অভ্যাস ছিল।
তৃতীয় দিক: শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
নবী শিশুর শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগ, তার বেড়ে ওঠার ব্যাপারে আলোচনা করে শিশুর অতি প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন যেসব জিনিস তাকে ক্ষতি করতে পারে সেসব থেকে তাকে সুরক্ষা এবং তার দেখাশুনার ব্যাপারগুলিও এড়িয়ে যান নি; বরং মহান নেতা এবং হিতৈষী বাবা তার সন্তানের নিরাপত্তা এবং প্রশান্তি চেয়েছিলেন। কেননা, সে তার হৃদয়ের অলংকার, তার চোখের আলো এবং তার আত্মার প্রশান্তি।
একটা শিশু তার চারপাশের ভাল মন্দ কিছু না বুঝেই পৃথিবীতে আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে সব জিনিসের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে না। আর সে কারণে পিতামাতাকে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয় এবং তার সুস্বাস্থের দিকে দৃষ্টি রাখতে হয়। সে কারনেই সম্মানিত নবী এবং মহান নেতা নবী নিজেই একটা বাচ্চার সুরক্ষা সবচেয়ে দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন।
সুরক্ষিত দুর্গ
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী হাসান এবং হুসাইন-এর জন্য নিম্নোক্ত দুয়া পড়ে পানাহ চাইতেন আর বলতেন, তোমাদের পিতা (ইবরাহীম (আঃ)) ইসমাইল ও ইসহাক (আঃ)-এর জন্য এ দুআ পড়ে পানাহ চাইতেন। (দোয়াটি হলো) আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাত দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।
অন্য সকল কিছু তিনি পরিত্যাগ করেন
আবু সাঈদ হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ জ্বিন এবং মানুষের কু-দৃষ্টি হতে আশ্রয় চাইতেন। তারপর সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হলে তিনি এ সূরা দুটি গ্রহণ করেন এবং বাকিগুলো পরিত্যাগ করেন।
তোমার সন্তানকে দেখে রাখ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ বলেছেন- যখন সন্ধ্যা হয়, তখন তোমাদের সন্তানদের ঘরে আটকিয়ে রাখবে। কেননা, এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাতের কিছু সময় অতিক্রম হলে তখন তাদের ছেড়ে দিতে পার। আর ঘরের দরজা বন্ধ করবে। কেননা, শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। আর তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে (বিসমিল্লাহ বলে) তোমাদের মশকের মুখ বন্ধ করে দেবে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে তোমাদের পাত্রগুলোকে ঢেকে রাখবে। কমপক্ষে পাত্রগুলোর ওপর কোনো জিনিস আড়াআড়িভাবে রেখে হলেও। আর (শয়নকালে) তোমরা তোমাদের চেরাগগুলো নিভিয়ে দেবে।
মহান নেতা এবং স্নেহশীল পিতা নবী তার সন্তানদের ততদিন পর্যন্ত দেখাশুনা করেছেন যতদিন পর্যন্ত না তারা বয়ঃপ্রাপ্ত শক্তসমর্থ নারী পুরুষে পরিণত হয়।
ছোট বালক বেড়ে ওঠে
আনহা আলী থেকে বর্ণিত যে। একদা ফাতিমা যাঁতা ব্যবহারে তাঁর হাতে যে কষ্ট পেতেন তার অভিযোগ নিয়ে নবী -এর কাছে আসলেন। তাঁর কাছে নবী -এর নিকট দাস আসার খবর পৌঁছেছিল। কিন্তু তিনি নবী কে পেলেন না। তখন তিনি তাঁর অভিযোগ আয়েশার কাছে বললেন। নবী ঘরে আসলে আয়েশা আনহা তাঁকে জানালেন। আলী বলেন- রাতে আমরা যখন শুয়ে পড়েছিলাম, তখন তিনি আমাদের কাছে আসলেন। আমরা উঠতে চাইলাম, কিন্তু তিনি বললেন, তোমরা উভয়ে নিজ স্থানে থাক। তিনি এসে আমার ও ফাতিমার মাঝখানে বসলেন। এমনকি আমি আমার পেটে তাঁর পায়ের শীতলতা অনুভব করেছিলাম। তারপর তিনি বললেন- 'তোমরা যা চেয়েছ তার চেয়ে কল্যাণকর বিষয় সম্মন্ধে তোমাদের অবহিত করব না? তোমরা যখন তোমাদের বিছানায় যাবে, তখন তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আল্ হাম্দুলিল্লাহ্ এবং চৌত্রিশবার আল্লাহ্ আকবার পাঠ করবে। খাদেম অপেক্ষা ইহা তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর।
চতুর্থ দিক: শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়া
শিশু তার নিজের প্রতি নির্ভরতা এবং আত্মবিশ্বাস সেভাবেই গড়ে ওঠে যেমন তার চারপাশের মানুষ থেকে সে পায়। পড়াশুনা করে যদি মানসিকতাটা উদ্বিগ্ন থেকে যায়, সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, অন্তঃমুখী হয় অথবা লজ্জাহীন হয়, দৃঢ় সংকল্প না হতে পারে, তার সাহস যদি একটা মুরগির বাচ্চার সমান হয় তাহলে সেই পড়াশুনা করে ডিগ্রী অর্জন ছাড়া অন্য কোনো লাভ আছে কি? তাই, নতুন প্রজন্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে দেয়া সুস্থ পড়াশুনার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
দয়ালু প্রশিক্ষক নবী শিশুর মনের মধ্যে বিশ্বাস জন্মানো বলতে প্রাসংগিক বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এই প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি মহান নেতা নবী-এর জীবনীতে এবং শিশুদের আচরণের ব্যাপারে তার নির্দেশনার মধ্যে পাওয়া যায় সেগুলো নিম্নরূপঃ
সুন্দর নাম রাখা
আনাস ইবনে মালিক বর্ণনা করেন যে, নবী তাকে একটি উপাধি দিলেন, সে সময় তিনি ছিলেন কিশোর।
তার মর্যাদা রক্ষা এবং ব্যক্তিত্বকে সম্মান করা
সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ-এর নিকট একটি পানির পেয়ালা আনা হলো। তিনি তা থেকে পান করলেন। তাঁর ডানদিকে এক বালক ছিল, সে ছিল লোকদের মধ্যে সবচাইতে কম বয়স্ক এবং বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেরা তাঁর বাঁদিকে ছিল। নবী বললেন, হে বালক! তুমি কি আমাকে তোমার জ্যেষ্ঠদের এটি দিতে অনুমতি দিবে? সে বলল, ইয়া রসূলাল্লাহ! আমি আপনার উচ্ছিষ্টের ব্যাপারে নিজের ওপর কাউকে প্রাধান্য দিতে চাই না। এরপর তিনি তাকেই সেটি দিলেন।
আনাস বর্ণনা করেন। নবী কিছু কিশোরদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, এসময় তিনি তাদের সালাম করেন।
তাদের ওপর আস্থা রাখা
আনাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ আমার কাছে আসলেন। আমি তখন ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করছিলাম। আনাস (রা) বলেন, তিনি আমাদের সালাম করলেন। তিনি কোনো এক প্রয়োজনে আমাকে পাঠালেন। আমি রাত করে মায়ের কাছে ফিরে আসলাম। আমি যখন আসলাম তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ফিরতে দেরি হলো কেন? আমি বললাম, রসূলুল্লাহ আমাকে বিশেষ একটি প্রয়োজনে পাঠিয়েছিলেন। মা বললেন, তাঁর সে প্রয়োজনটা কি? আমি বললাম, সেটা গোপনীয় ব্যাপার। মা বললেন, রসূলুল্লাহ-এর গোপনীয় বিষয় কাউকে বল না। আনাস বলেন, আল্লাহর শপথ! হে সাবিত, আমি যদি এ সম্পর্কে কাউকে বলতাম তাহলে তোমাকেই বলতাম।
তার ওপর দায়িত্ব অর্পন করা
ইবন আব্বাস বর্ণনা করেন। ছোটবেলায় একদিন আমি অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলাধুলা করছিলাম। আমি পিছন ফিরে তাকালাম এবং দেখলাম নবী আসছেন। আমি বললাম, “নবী নিশ্চয় আমার নিকটেই আসছেন।” আমি দৌড়ে কোনো এক দরজার পিছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম। ইবন আব্বাস বলেন, “আমি কিছুই বুঝতে পারি নি যতক্ষণ না তিনি ঘাড়ের পিছন দিক হতে আমাকে ধরে ফেললেন। তিনি আস্তে একটা চাপড় দিলেন (তিনি তার হাত দিয়ে রসিকতা করে মৃদু আঘাত করলেন)।” তারপর তিনি বললেন, “যাও! মুয়াবিয়াকে ডেকে নিয়ে আস” আর তিনি ছিলেন তাঁর লেখক। আমি মুয়াবিয়া এর নিকট গেলাম এবং তাকে বললাম, “আল্লাহর নবী-এর ডাকে সাড়া দিন, তাঁর আপনাকে প্রয়োজন”

টিকাঃ
৫৩. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৪৫১০
৫৪. মুসতাদরাক আল-হাকীম হাদীস নং ৪৭৪৫
৫৫. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৬৮৭
৫৬. সহীহ আল-মুসলিম, কিতাবুস সলাত হাদীস নং ৭৫৯
৫৭. আত্তাগাবুন ৬৪: ১৫
৫৮. আস সহীহ লিল হীব্বান হাদীস নং ৬১৩৮
৫৯. সুনান ইবনে মাজাহ-হাদীস নং ৫২৬
৬০. আল-মুজাম আল-কাবির লিত্তাবারানী-হাদীস নং ২৫৮৫
৬১. আল-হাকিম নং ১৭৯
৬২. মুসনাদে ইমাম আহমাদ হাদীস নং ১৭৭১
৬৩. মুসতাদরাক আল-হাকিম হাদীস নং ৪৭৫৭
৬৪. আল-জামে আস সহীহ লিল বুখারী হাদীস নং ৫০২৫
৬৫. সহীহ ইবনে হিব্বান, ও আখলাকুন্নাবী লিল আসবাহানী নং ১৭৮ ও সিলসিলাতুস সহীহাহ লিল- আল-বানী-হাদীস নং ৭০
৬৬. সহীহ আল-বুখারী- হাদীস নং ৭৭
৬৭. ফাতহুল বারী লিইবনে হাজার- (১/২২৮)
৬৮. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৩२১২
৬৯. সুনানে তিরমিযী হাদীস- ২০৬১
৭০. সহীহ আল-বুখারী- হাদীস নং ৫৩২০
৭১. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ৫০৬৪
৭২. আল-তাবাকাত আল-কুবরা লিইবনে সা'দ হাদীস নং ৮১২৩
৭৩. সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ২২৪৭
৭৪. সহীহ আল-মুসলিম হাদীস নং ৪১৪৪
৭৫. সহীহ আল-মুসলিম হাদীস নং ৪৬৫৬
৭৬. মুসনাদ আহমাদ হাদীস নং ২৩৮৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00