📄 কৃতকার্য নেতার চতুর্থ গোপন বিষয় শান্ত আলাপ-চারিতা এবং মনোযোগী শ্রবণ
কৃতকার্য নেতার চতুর্থ গোপন বিষয় শান্ত আলাপ-চারিতা এবং মনোযোগী শ্রবণ।
📄 এ গোপনীয়তার ভিত্তি
মানুষের যে আচরণটা তার ধীরস্থির আত্মসন্তুষ্টি থেকে উদ্ভূত হয় সেটা অবিরাম এবং স্থায়ী। সন্তুষ্টি, ভাল ব্যবহার এবং মূল্যবোধ কোনো ব্যক্তির মধ্যে রোপন করার কোনো অবকাশ নেই। দ্বিতীয়ত: শান্ত এবং ভদ্র কথপোকথনের মাধ্যম ব্যতীত কারো মধ্যে ভাল আচার-আচরণ খোদাই করে দেয়া সম্ভব নয়। অথবা শান্ত এবং ভদ্রোচিত কথোপকথন ছাড়া কোনো নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
নিশ্চিতভাবে কথোপকথনের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সর্বোত্তম পন্থা হলো অপরপক্ষের বক্তব্য আন্তরিক এবং মনোযোগ সহকারে শোনা, যাতে করে অপর পক্ষ তার মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং যে বক্তব্যটা অপর পক্ষ একটি শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে সেটা ব্যক্ত করতে পারে। যে বক্তব্যটি একটি হৃদয় লুকিয়ে রাখে সেটা যদি আশ্চর্যজনক অথবা বেমানান হয় সে ক্ষেত্রে বক্তব্যটির বেমানান ক্ষেত্রটি খুঁজে বের করার পন্থা হলো ঐ বক্তব্যটিকে পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা।
এভাবে কথোপকথন সমস্যার কেন্দ্র বিন্দু এবং বিচ্যুতির শিকড়কে স্পর্শ করবে ফলে কথোপকথন পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা এবং স্থায়ী নিরাময় দ্বারা পরিপূর্ণ হবে যা বয়ে নিয়ে আসবে শান্তি। এ ধরণের বক্তব্যের বদৌলতে সুস্থ এবং প্রাণবন্ত মতামত খারাপ এবং বেমানান মতামতকে দূরীভূত করবে। আত্ম পরিতৃপ্ত হবে এবং মানুষের ব্যবহার সুস্থ এবং পরিপক্ক হবে।
স্বভাবের কারণে একজন ব্যক্তি অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। কথোপকথনের ফলশ্রুতিতে হয় ঐক্যমত, ঐক্যমতের পার্থক্য এবং অনৈক্য এর মধ্যে যে কোনো একটি হবে-
إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
"তবে উহারা নহে, যাহাদিগকে তোমার প্রতিপালক দয়া করেন এবং তিনি উহাদিগকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন।"
আলাপ-আলোচনা বা কথোপকথন হলো বুদ্ধিজীবীদের জন্য যুক্তিবিদ্যা এবং জ্ঞানী লোকদের জন্য একটি ঐতিহ্য। এটা হলো আলাপ-আলোচনার পক্ষে মানুষের স্মরণীয় দান এবং শিক্ষা ও সচেতনতার জন্য নিয়ম বিজ্ঞানের সবচাইতে উঁচু স্তর।
আলাপ-আলোচনা হলো হৃদয়ে খচিত একটি উৎকর্ণ লিপির মতো। মানুষের স্বভাবের ওপর এটা একটি স্থায়ী সুফল আনয়ন করে। একজন ব্যক্তিকে ভাল শ্রোতাতে রূপান্তরিত করে। যে বৈশাদৃশ্য গ্রহণে সমর্থ হয়। এ বৈসাদৃশ্য অবশ্য মানব স্বভাব থেকেই উদ্ভূত। যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাই এবং সমসাময়িকদের দ্বারা সমর্থিত হয়ে কোনো ইস্যুর সম্মুখীন হয় তখন আলাপ আলোচনাই ঐ ইস্যুকে প্রত্যেক কোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যোগাবে এবং ঐ ব্যক্তিকে পূর্ণতা দান করবে।
মানব জাতির মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তি আছে কি? যে দাবি করতে পারে যে, অন্য কারোও মতামত তার দরকার নেই। মানব জাতির সেবা, আদম সন্তানদের মধ্যে সেবা, জ্ঞান এবং বুদ্ধির ক্ষেত্রে যিনি সব মানুষকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি তাঁকে যারা ভালবাসতেন তাদের বক্তব্য শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি বিভিন্ন মানুষের মধ্যে দুর্বল এবং যুবকদের মতের উত্তর দিতেন। বিশেষভাবে যদি তিনি এর মধ্যে উপকার দেখতে পেতেন তাহলে সে ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী এবং বয়োবৃদ্ধদের মতামত আগে শুনতেন।
টিকাঃ
২. হুদ (১১ : ১১৯)
📄 পিছের উদাহরণকে নিয়ে ধ্যান ধারণা
এ উদাহরণটা এমন সংকেত বহন করে যেটা কথোপকথন এবং শিষ্টাচারের সাথে সম্পর্কিত...
দয়াশীল নেতা নবী উতবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। উতবা একটি দীর্ঘ সূচনার অবতারণা করেছিলেন। তবে এটা তাঁর প্রধান বক্তব্য হবে বলেই আশা করা হয়েছিল। এ দীর্ঘ সূচনার পর উতবা বললেন, "আমি আপনার কাছে কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করব। "নেতা নবী (সা) উতবার কথার শান্তভাবে এবং দয়ার সাথে শুনলেন। উতবা যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন তখন নবী করিম তাঁর বক্তব্য দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া করলেন না; বরং তিনি উতবাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন কিনা।
যখন রসূল করীম নিশ্চিত হলেন যে উতবা তাঁর কথা শেষ করেছেন তখন তিনি উতবার প্রস্তাবের উত্তরে কুরআন তেলাওয়াত শুরু করলেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াতটা পছন্দ করলেন। কারণ এর বাণী হলো সবচাইতে অলঙ্কারপূর্ণ, সুন্দর এবং আনন্দ উপভোগ করার মতো। রসূল তাঁর চমৎকার কণ্ঠে তেলাওয়াত চালিয়ে যেতে থাকলেন যার ফলশ্রুতিতে হৃদয় সমর্পণ করে এবং আত্মা শান্তি পায়। তিনি শুধুমাত্র কুরআন তেলাওয়াত করলেন এবং এর সাথে একটি অক্ষরও যোগ করলেন না। এরপর নবী করিম উতবাকে বললেন, "হে আবু আল-ওয়ালীদ! আমি কি বলেছি সেটা কি তুমি শুনেছ?” উতবা উত্তরে বললেন, "হ্যাঁ শুনেছি।" অতঃপর মহানবী উতবাকে বললেন, “এখন এ ধর্মকে গ্রহণ করা অথবা প্রত্যাখ্যান করার পূর্ণ স্বাধীনতা তোমার আছে। তুমি বলেছ আমি শুনেছি।
আমি বলেছি, যেহেতু শুনেছ এখন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ভার তোমার ওপর। সবকিছু তোমার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।”
কথোপকথনের এ উন্নত ধরণ উতবাকে একজন ভাল শ্রোতায় রূপান্তরিত করেছিল। সুতরাং এটা কোনো অবাক হওয়ার ব্যাপার নয় যখন উতবা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফেরত গিয়েছিলেন তখন তারা বলেছিলেন, “হে আবুল ওয়ালীদ তিনি (নবী) তোমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন."
📄 নেতার জীবনীতে একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য
নবী-এর জীবনী পড়ার সময় তুমি দেখতে পাবে যে, তিনি খুব ভাল শ্রোতা ছিলেন। যিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্যে বিশেষ ব্যক্তিদের কথা যেভাবে শুনতেন ঠিক একইভাবে তিনি সাধারণ স্তরের জনগণের কথাও শুনতেন। তিনি তাঁর চরম শত্রুদের কথা যেভাবে শুনতেন একইভাবে তাঁর পত্নীদের মধ্যে সবচাইতে প্রিয় পত্নীর কথাও শুনতেন। এ দয়ালু শিক্ষক নবী-এর জীবনী পড়ার সময় তোমরা কখনই দেখতে পাবে না যে, কোনো ব্যক্তি সে অজ্ঞ, শত্রু অথবা এমন কোনো ব্যক্তি হোন না কেন যিনি ইসলামকে বিদ্রুপ করেন তার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নবী (সা) তাকে তার বক্তব্য প্রদানে বাধা দিয়েছেন。