📄 অনুসন্ধান করা এবং তার অনুসন্ধানের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা
মানুষেরা ঐ যুবকের দিকে তাকাচ্ছিল, নবীর কাছে তার অনুরোধ শুনছিল এবং তারা যুবককে গালাগাল করছিল এভাবে যে, এ মহান নেতার কাছে কি তোমার এ কুকর্মের জন্য অনুরোধ করা উচিত?
তুমি কি এ জঘন্য কাজ করার জন্য এ রকম ধরনের উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন লোকের অনুমতি চাবে? যখন অন্যান্যরা ঐ যুবককে গালাগালি করছিল তখন মহান শিক্ষক পথপ্রদর্শক (তার ওপর শান্তি এবং আল্লাহর দয়া বর্ষিত হোক) তাদেরকে প্রশমিত করেন। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং প্রশিক্ষককে শান্তি এবং দয়া বর্ষিত করুন। মহান নেতা এবং প্রশিক্ষক যুবকের বিরুদ্ধে তাদের নিন্দা এবং দোষের কথা শুনলেন। নবী করীম (সা) তাকে একপাশে ডাক দিলেন এবং যুবক সাহাবীদের কথা শুনে এবং সেখানে জমায়েত মানুষের রাগান্বিত চেহারার প্রকাশ দেখে নবী করীম (সা)-এর ডাকে সাড়া দিলেন। যুবক নবীর কাছে গিয়ে আসন গ্রহণ করলেন। দয়াশীল ব্যক্তি নবী যুবকের দিকে তাকালেন। নবী করিম (সা)-এর অভ্যাস ছিল শ্রোতার প্রতি পূর্ণ মনযোগ দেয়া।
ছোট ছোট বাক্যের মাধ্যমে নবী করিম ঐ যুবকের সাথে আলাপ শুরু করলেন। আলাপের অংশ ছিল উত্তর দেয়ার মতো মানানসই প্রশ্নাবলি। প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে ভাবনা-চিন্তার জন্য বিরতি ছিল। অনুসন্ধানকারী এবং অনুসন্ধানের ব্যাপারে মহান নেতা নবী-এর মূল্যায়ন ছিল খুবই শান্ত এবং দয়াশীল। তুমি যে ঘৃণ্য কাজ করতে চাচ্ছো সেটা হলো বিরাট অমঙ্গলের দরজা, যেটার পিছনে অবস্থান করছে আগুন এবং নিয়ন্ত্রনহীন কামনা-বাসনা। সুতরাং ঐ ঘৃণ্য কাজের দরজা বন্ধ করা এবং অন্য সব নির্গমনের পথ বন্ধ করে দেয়া ছাড়া তোমার কোনো গত্যন্তর নেই। তুমি যদি এ কাজটা করতে পার তাহলে তোমার আত্মা ঐ কুকর্ম করার প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পাবে।
📄 সুন্দর স্বাস্থ্য ও আরোগ্য লাভের উপায়
আরোগ্য লাভ এবং অটুট স্বাস্থ্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো বাসনাকে জলাঞ্জলী দিয়ে মনকে জাগ্রত করা এবং দুর্বলতাকে বিদায় দিয়ে দৃঢ় সংকল্পকে নিজের আয়ত্তে আনা।
আলাপ শুরু
আল্লাহর নবী ঐ যুবকের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ শুরু করেন। নবী করিম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি কাজটা তোমার মায়ের সাথে করতে পছন্দ কর?” তোমার মা যিনি তোমার হৃদয়ের সবচাইতে প্রিয় ব্যক্তি তার সাথে তুমি এ জঘন্য কাজটা করার জন্য অনুমতি চেয়েছ?
কেন এ কাজটা মায়ের সাথে করার প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলেন সচেতনতাকে উদ্দীপ্ত করার জন্য এবং বোধ শক্তিকে সর্বোচ্চ স্থরে পৌঁছে নেয়ার জন্য এ গর্হিত কাজটি মায়ের সাথে করা যায় কিনা সে প্রশ্ন করেছিলেন। শপথ নেওয়ার পর রসূল করিম-এর প্রশ্নের সে তাৎক্ষণিক এবং চূড়ান্ত উত্তর প্রদান করে যে, না। শপথটা এরকম, হে আল্লাহর রসূল, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি।' তার এ ধরণের উত্তর, ভালবাসার একটি ঘোষণার পর এসেছিল, যার মধ্যে লুক্কায়িত ছিল একটি সংকেত। আমি যাতে আপনার জন্য একটি ত্যাগ স্বীকার করতে পারি সে শক্তি যেন আল্লাহ আমাকে দান করেন।
যুবকটি যেনো এ কথাগুলো বলতে চেয়েছিল, “হে আমার প্রিয় রসূল, আমার সবচাইতে প্রিয় ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি এমন কথা বলবেন না যার মর্যাদা রক্ষার জন্য আমি জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত এবং তাঁর সম্মানের জন্য কিছু আত্মার মৃত্যু হতে পারে। যুবকের কথায় রসূল উত্তর দিলেন।
"হে যুবক! আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কি বলতে চাও। তোমার তাৎক্ষণিক এবং চূড়ান্ত উত্তরের মধ্য দিয়ে মায়ের প্রতি তোমার যে ঈর্ষা সেটা ফুটে উঠেছে। সে একই ধরণের ঈর্ষা দ্বারা সকল মানুষের হৃদয় পরিপূর্ণ।”
রসূল করিম বললেন, "মানুষ তাদের মায়ের জন্যও এ ব্যাপারটা (ব্যভিচার) পছন্দ করে না। নবীর উদ্দেশ্য ছিল ব্যভিচারের অন্তরালে যে বিপদ এবং অমঙ্গল লুক্কায়িত আছে সেটা থেকে যুবকের মনযোগকে সম্পূর্ণরূপে অন্যদিকে আকৃষ্ট করা।
এ ইস্যুটা শুধুমাত্র মাতার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। এ দয়াবান শিক্ষক নবী (সা)-এর উদ্দেশ্য ছিল অমঙ্গলের প্রভাব থেকে এ যুবকের হৃদয়কে পুরোপুরিভাবে মুক্ত করা।
যুবকের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া প্রত্যেক প্রিয় এবং কাছের মহিলা সদস্যদেরকে এ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিল কন্যা সন্তান, বোন, ফুফু এবং খালা। তুমি যদি তোমার নিকটতম আত্মীয়ের সাথে এ কাজটা করতে পছন্দ না কর, সে ক্ষেত্রে অন্যরাও তাদের সাথে এ কাজটা করতে চাইবে না।
একজন মহিলা তিনি যে দেশেরই হোন না কেন তিনি কারো মা। আরেকজনের কন্যা, তৃতীয় কোনো ব্যক্তির বোন, চতুর্থ কোনো ব্যক্তির ফুফু অথবা পঞ্চম কোনো ব্যক্তির খালা।
হে যুবক! যে ঈর্ষাটা তোমার হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে, সেটা সমানভাবে অন্যান্য এলাকার মানুষের হৃদয়কেও পরিপূর্ণ করে। এ ব্যাপারটা যদি তোমার হৃদয়কে ব্যথিত করে তাহলে এটা তাদেরকেও ব্যথিত করবে। যদি তুমি এমন কোনো মহিলার সন্ধান না পাও যিনি কারো কোনো নিকট আত্মীয় নন। সে ক্ষেত্রে তুমি কেন এ ধরণের অনুমতি চাও?
এ সময়ে এ প্রশ্নের উত্তরটা ঐ যুবক যাতে তার হৃদয়ঙ্গম করতে পারে এবং অনুধাবন করতে পারে সে জন্য পুনরাবৃত্তি করা হলো। সবকিছু তাকে পরিষ্কারভাবে বুঝানো হলো। তবে কুকর্ম বা নিষিদ্ধ কাজের প্রতি প্রত্যেক মানুষেরই ঝোঁক থাকে।
এরপর নবী করিম ঐ যুবকের শরীরের ওপর তাঁর হাত রাখলেন সম্ভবত তার মাথায়। বুকে অথবা কাঁধে। ঐ যুবকটার শরীর একটি সম্মানিত হাত মোলায়েম স্পর্শ পেলো যার সহগমনকারী ছিল মহান শিক্ষক নবী -এর দয়ায় পরিপূর্ণ একটি চাহনী। এসব কিছুই একটা সনির্বন্ধ আবেদন দ্বারা ভূষিত ছিল যেটা ঐ যুবকের হৃদয়কে সব ধরণের নিষিদ্ধ করবে। নবী করিম যুবকের জন্য আল্লাহর কাছে বললেন, "হে আল্লাহ, তার গুনাহ মাফ করে দাও, তার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ কর এবং তার যৌনাঙ্গকে রক্ষা কর।"
এরপর কি হতে পারে? তুমি কি মনে কর এসব কিছুর পরেও নিষিদ্ধ বাসনাগুলো তার হৃদয়ে থেকে যাবে অথবা এ কুচিন্তাগুলো তার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
তবে বাস্তবতা এবং ফলাফল হলো, "এ ঘটনার পর ঐ যুবক এ ধরণের কোনো কিছু করা থেকে নিজেকে বিরত রাখল!”
📄 কৃতকার্য নেতার চতুর্থ গোপন বিষয় শান্ত আলাপ-চারিতা এবং মনোযোগী শ্রবণ
কৃতকার্য নেতার চতুর্থ গোপন বিষয় শান্ত আলাপ-চারিতা এবং মনোযোগী শ্রবণ।
📄 এ গোপনীয়তার ভিত্তি
মানুষের যে আচরণটা তার ধীরস্থির আত্মসন্তুষ্টি থেকে উদ্ভূত হয় সেটা অবিরাম এবং স্থায়ী। সন্তুষ্টি, ভাল ব্যবহার এবং মূল্যবোধ কোনো ব্যক্তির মধ্যে রোপন করার কোনো অবকাশ নেই। দ্বিতীয়ত: শান্ত এবং ভদ্র কথপোকথনের মাধ্যম ব্যতীত কারো মধ্যে ভাল আচার-আচরণ খোদাই করে দেয়া সম্ভব নয়। অথবা শান্ত এবং ভদ্রোচিত কথোপকথন ছাড়া কোনো নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
নিশ্চিতভাবে কথোপকথনের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সর্বোত্তম পন্থা হলো অপরপক্ষের বক্তব্য আন্তরিক এবং মনোযোগ সহকারে শোনা, যাতে করে অপর পক্ষ তার মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং যে বক্তব্যটা অপর পক্ষ একটি শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে সেটা ব্যক্ত করতে পারে। যে বক্তব্যটি একটি হৃদয় লুকিয়ে রাখে সেটা যদি আশ্চর্যজনক অথবা বেমানান হয় সে ক্ষেত্রে বক্তব্যটির বেমানান ক্ষেত্রটি খুঁজে বের করার পন্থা হলো ঐ বক্তব্যটিকে পুরোপুরিভাবে ব্যক্ত করা।
এভাবে কথোপকথন সমস্যার কেন্দ্র বিন্দু এবং বিচ্যুতির শিকড়কে স্পর্শ করবে ফলে কথোপকথন পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা এবং স্থায়ী নিরাময় দ্বারা পরিপূর্ণ হবে যা বয়ে নিয়ে আসবে শান্তি। এ ধরণের বক্তব্যের বদৌলতে সুস্থ এবং প্রাণবন্ত মতামত খারাপ এবং বেমানান মতামতকে দূরীভূত করবে। আত্ম পরিতৃপ্ত হবে এবং মানুষের ব্যবহার সুস্থ এবং পরিপক্ক হবে।
স্বভাবের কারণে একজন ব্যক্তি অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। কথোপকথনের ফলশ্রুতিতে হয় ঐক্যমত, ঐক্যমতের পার্থক্য এবং অনৈক্য এর মধ্যে যে কোনো একটি হবে-
إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ
"তবে উহারা নহে, যাহাদিগকে তোমার প্রতিপালক দয়া করেন এবং তিনি উহাদিগকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন।"
আলাপ-আলোচনা বা কথোপকথন হলো বুদ্ধিজীবীদের জন্য যুক্তিবিদ্যা এবং জ্ঞানী লোকদের জন্য একটি ঐতিহ্য। এটা হলো আলাপ-আলোচনার পক্ষে মানুষের স্মরণীয় দান এবং শিক্ষা ও সচেতনতার জন্য নিয়ম বিজ্ঞানের সবচাইতে উঁচু স্তর।
আলাপ-আলোচনা হলো হৃদয়ে খচিত একটি উৎকর্ণ লিপির মতো। মানুষের স্বভাবের ওপর এটা একটি স্থায়ী সুফল আনয়ন করে। একজন ব্যক্তিকে ভাল শ্রোতাতে রূপান্তরিত করে। যে বৈশাদৃশ্য গ্রহণে সমর্থ হয়। এ বৈসাদৃশ্য অবশ্য মানব স্বভাব থেকেই উদ্ভূত। যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাই এবং সমসাময়িকদের দ্বারা সমর্থিত হয়ে কোনো ইস্যুর সম্মুখীন হয় তখন আলাপ আলোচনাই ঐ ইস্যুকে প্রত্যেক কোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যোগাবে এবং ঐ ব্যক্তিকে পূর্ণতা দান করবে।
মানব জাতির মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তি আছে কি? যে দাবি করতে পারে যে, অন্য কারোও মতামত তার দরকার নেই। মানব জাতির সেবা, আদম সন্তানদের মধ্যে সেবা, জ্ঞান এবং বুদ্ধির ক্ষেত্রে যিনি সব মানুষকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি তাঁকে যারা ভালবাসতেন তাদের বক্তব্য শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি বিভিন্ন মানুষের মধ্যে দুর্বল এবং যুবকদের মতের উত্তর দিতেন। বিশেষভাবে যদি তিনি এর মধ্যে উপকার দেখতে পেতেন তাহলে সে ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী এবং বয়োবৃদ্ধদের মতামত আগে শুনতেন।
টিকাঃ
২. হুদ (১১ : ১১৯)