📄 এ গুপ্তভেদের মূল
নিশ্চয় মানুষের এক মহা উদ্দেশ্য হলো প্রশংসা অর্জন করা ও তার কর্মফলের স্বীকৃতি পাওয়া। সকল সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানুষের উন্নত বৈশিষ্ট্যের প্রধানতম গোপন রহস্য হলো তাকে পুরস্কৃত করা। আর এটিই মানুষের কৃতকর্মের জন্য মূল শক্তি। এটি মানুষকে একটি উন্নত চরিত্র ও সঞ্চালনশক্তি হিসেবে অনুরণিত করতে থাকে।
মানবসত্ত্বা অবশ্যই তার মালিকের প্রতি দয়াবান ও বিনয়ী। সুতরাং সে তার কর্মফলের স্বীকৃতি বা প্রশংসা বা প্রতিদানের মাধ্যমে নিজেকে অনেক উর্ধ্বে উন্নীত করতে সমর্থ হয়।
আবু মূসা আশয়ারী বলেন, এক ব্যক্তি রসূল -এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, এক ব্যক্তি যুদ্ধ করলেন গানিমত পাওয়ার উদ্দেশ্যে, অন্যজন যুদ্ধ করলেন বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে আর তৃতীয় ব্যক্তি যুদ্ধ করলেন আত্ম প্রকাশের জন্য তাদের কার যুদ্ধ আল্লাহর রাস্তায় হবে? রসূল বলেন, ঐ ব্যক্তির যুদ্ধ আল্লাহর রাস্তায় হবে যে আল্লাহর কালেমা সর্বাচ্চে আসীন করার জন্য যুদ্ধ করবে।
সুতরাং অনেক ব্যক্তি এমন যিনি তাদের নিজেদেরকে ভয়ংকর পরিস্থিতি যুদ্ধ ও মৃত্যুর ময়দানে আত্মদান করেন। তাঁরা এরূপ কেন করে? সে এজন্য করে যাতে তার সত্ত্বা একটা প্রশংসসীয় স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে। সে তার অবস্থান উর্ধ্বে আরোহন করার জন্য এটা করে।
বিচারের দিনে বান্দা তার প্রভুর সমীপে বলবেন আমি শহীদ হিসেবে মৃত্যু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপনার রাস্তায় যুদ্ধ করেছিলাম। আল্লাহ বলবেন; তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি এ জন্য যুদ্ধ করেছ যে, তোমাকে একজন মহাবীর বলা হবে। যা তোমাকে বলা হয়েছে। তখন তার মাথা নিচে দিয়ে পা ধরে টেনে হিচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
যেখানে মুসলিম জাতির পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সকলে ঈমানের বিনিময়ে তার জীবনের সকল কিছু ত্যাগ করে, ক্ষুধায় ধৈর্য ধারণ করে, নামাযে একান্ত অবনত হয়, মানসম্মান ত্যাগ করে, সেখানে তার পরিণতি ঐরূপ হোক নিশ্চয় কোনো মুসলিমের নিকট তা গ্রহণযোগ্য না।
আত্মত্যাগ করা ও মনোনিবেশ প্রদান মানবসত্বা এমন যে, তার দিকে একান্ত মনোনিবেশ করা হোক, এটাই গভীরভাবে সে আশা করে। যা কুরআনে কারীমে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ
অর্থ: নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমাদের জন্য উপদেশ আছে। যে কুরআনের মধ্যে তোমাদের উপদেশ অর্থাৎ তোমাদের সম্মান ও আত্মমর্যাদা।
ইতিহাস গ্রন্থে বলা হয়েছে আমরা ও আবদ মুনাফের পরিবার সম্মানের সাথে বক্তব্য পেশ করছি যে, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত দুইটি প্রতিযোগী ঘোড়া হব। যতক্ষণ আমাদের মাঝে একজন নবী হবেন যিনি আমাদেরকে পরামর্শ ও উপদেশ দিবেন।
টিকাঃ
৭. সহীহ বুখারী কিতাবুল জিহাদ হাদীস নং ২৬৭৭
৮. সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৩৬৩৫
৯. আম্বিয়া-১০
১০. তাফসীর ইবনে কাসীর
📄 সম্মাননা প্রদানের দিন
কোনো প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মচারীরা কাজ করেছেন। সে সকল কর্মচারীর জন্য হৃদয়স্পর্শী দিক হলো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে কর্মচারীদের সম্মান নিশ্চিত করার দিন। এমন হতে পারে যে, এখনও কর্মরত, কেহ কাজ সমাপ্ত করেছে, কেহ বা দূরে আছে সকলেই এ বিষয়ে একই মনোভাব পোষণ করেন। আর তাদের প্রতি সম্মান বলতে এটা নয় যে, তাদেরকে কোনো বড় উপহার প্রদান করা হোক; বরং তাদের প্রতি আস্থা বা কর্মের প্রশংসা বা কর্মফলের স্বীকৃতি প্রদান করা যথেষ্ট হতে পারে তা খুবই বড় বা ছোট আর অনেকে তা অতি অল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেনও কিন্তু যিনি কোনো কাজে বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে এ ভূমিকা রাখতে পারবেন তিনি অতি উচ্চ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
মহান নেতা নবী করীম তাঁর জীবনে নেতৃত্বের গভীর প্রেরণাময় অসম দৃষ্টান্ত ঐ প্রকার কাজের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। তিনি যথাযথ মূল্যায়ন ও একান্ত মনোনিবেশ করেছেন ঐ সকল ব্যক্তিগণের প্রতি যারা ইসলাম গ্রহণ করে তার অনুগত হয়েছেন তাই সে যদি এক মুহূর্তের পূর্বে ও মুসলিম হয়ে থাকে।
দুই নেতা ও প্রতিদ্বন্দ্বী
মক্কা যেথায় নবীর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, আবু সুফিয়ান এবং হারব তথাকার একজন প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশেষ ব্যক্তিত্ব একজন নেতা একজন সুবক্তা, একজন ব্যবসায়ী এবং মক্কায় একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। তিনি এমন ব্যক্তি ছিলেন যার মান সম্মান ও প্রতিপত্তিতে কেহ সমকক্ষ ছিল না। যার নেতৃত্ব ও অবস্থানে কারও সংগে তুলনা করা যেত না।
নতুন ডাক এল, নবী মানুষকে তাঁর অনুসরণ করতে ও দিক নির্দেশনা মত চলতে আহ্বান করলেন ও অনুপ্রাণিত করতে থাকলেন। আবু সুফিয়ান প্রথম হতেই এ দাওয়াতের পরিণতি অনুধাবন করেছিলেন যে কারণে তিনি নিজেই এ আহ্বানের বিপরীতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ালেন। এবং অবলীলাক্রমে এ দাওয়াতের প্রতিরোধ করতে থাকলেন। মক্কাতে তার অবস্থান পূর্ণভাবে ধরে রাখতে, সত্য ন্যায়ের বিপরীতে নিজ আধিপত্যের লাগাম দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সচেষ্ট থাকল।
মক্কাতে তার শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের কারণে নবী এর দিকে ঘৃণার মনোভাব ছিল ব্যক্ত। এ কারণে নবী মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীগণকে চরমভাবে ভোগ করতে হয়েছে তার বর্বরতা ও নৃশংসতার ভয়ানক পরিণতি, মানহানির মিথ্যা অপবাদ, মিথ্যা কলংক, সর্বশেষ সর্দারের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, উপহাস-ও অবজ্ঞা।
পরিশেষে তিনি মাতৃভূমি ত্যাগ করলেন। ভালবাসায় সিক্ত হলেন। ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় পূর্ণ এক বসতিতে উপনীত হলেন। মদিনা পরিচালনার দিকে আত্মনিমগ্ন করলেন। কিন্তু মক্কার প্রধান নেতা, মুহাম্মাদ কর্তৃক জাজিরাতুল আরবের আরব জনগোষ্ঠিকে সত্য পথ প্রদর্শনের বিপরীতে দাড়াতে তাঁর পিছু ছাড়লেন না। ৮ বৎসর যাবৎ মুহাম্মাদ -এর বিরুদ্ধে বদর প্রান্তর, উহুদ, খন্দক, এমনকি হুদায়বিয়াতে মক্কায় প্রবেশের বাধা দিয়ে প্রতিরোধ করতেই থাকলেন। তারপরও কি হলো?
📄 মহান বিজয়
পরিশেষে আবু সুফিয়ান ও মক্কার নেতারা গভীরভাবে অনুধাবন করেছিল যে, নতুন দাওয়াত তার নিজস্ব শক্তিতে ধাবমান যা অপ্রতিরোধ্য। মদিনাবাসী, নবী ও তাঁর সাহাবীগণসহ দিবালোকে মক্কায় রওয়ানা হলেন। মক্কার ক্ষমতাধর কোনো শক্তি তা প্রতিরোধ করতে পারল না। তবে তাঁদেরকে এক মহান আবেগ থমকে দিল তা ছিল মক্কায় পবিত্র কেবলা বাইতুল্লাহ।
📄 মক্কার নেতার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন
৮ম হিজরীর ১১ই রমাদান নবী মক্কার পানে অগ্রসর হলেন। যখন তিনি আল-আদওয়া নামক স্থানে পৌঁছেন তিনি আবু সুফিয়ান ও তার চাচাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়ার সাক্ষাৎ পেলেন।
নবী করীম তাদের থেকে তাঁর ওপর যে মিথ্যা অপবাদ ও বারংবার চরম আঘাত পেয়েছিলেন তাঁর কোনোরূপ বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করলেন না। আলী আবু সুফিয়ানকে বলেন: আল্লাহর রসূল -এর নিকট যাও আর সরাসরি তাকেই ঐ কথা বল, যে কথা ইউসুফ (আ)-এর সামনে তাঁর ভাইয়েরা বলেছিল। তারা বলেছিল-
قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَظَّلِمِينَ
অর্থ: তারা বলল, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাদের ওপর তোমাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, আর আমরাই ছিলাম অপরাধী।
আবু সুফিয়ান একেবারে তাই করলেন; তখন নবী করীম তাকে বললেন, যা ইউসুফ (আ) তার ভাইদের বলেছিলেন-
قَالَ لَا تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ
অর্থ: আজ তোমাদের প্রতি আমার পক্ষ হতে কোনো ভৎসনা বা অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, যারা ক্ষমা করেন তাদের প্রতি তিনি মহান দয়াবান।
টিকাঃ
১১. ইউসুফ-৯২
১২. আল বানী ফিকহছিরাহ পৃ:৩৭৬