📘 লিডারশীপ লেসন্স > 📄 এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্য

📄 এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্য


সীরাতে রাসূল থেকে এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্য সম্পর্কিত সবচেয়ে সুন্দর যে ঘটনাটি আমি মনে করতে পারি, সেটি ইসলামের প্রথম যুগে মাক্কায় ঘটেছিল। যখন তাঁর পক্ষে তেমন কোনো সহযোগিতা ছিল না। বলা যায় সেসময় তিনি একাই ইসলামের বাণী প্রচার করছিলেন।

বর্ণনাকারী বলেন, হাজ্জ সম্পন্ন করার পর আমি মিনার একটি পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সমতল অংশ হাজ্জ করতে আসা মুসাফিরদের তাঁবুতে ঢেকে গিয়েছিল। সেটা ছিল গ্রীষ্মের মধ্য দুপুর, তীব্র গরম এবং শুষ্ক। আমি দেখলাম, এই গরমের মধ্যে একজন ব্যক্তি তাঁবু থেকে তাঁবুতে গিয়ে মানুষকে কেবল আল্লাহর উপাসনা করতে আহ্বান জানাচ্ছেন এবং মূর্তিপূজার ব্যাপারে সতর্ক করছেন। কেউ তার কথা শুনে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কেউ ধমক দিচ্ছে। বাকিরা তো তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। কাউকে তার বাণী গ্রহণ করতে দেখিনি। সেই তীব্র গরমের মধ্যে আমি লোকটাকে দেখলাম নিজ তাঁবুর সামনে একটি পাথরের ওপর বিশ্রামের জন্য বসলেন। তাঁবু থেকে তার মেয়ে পানি হাতে বের হয়ে এসে বাবার মুখ ধুইয়ে দিলো এবং পানি খেতে দিলো। বাবার দুরবস্থা দেখে সে খুব কষ্ট পেল, বলল-ওরা আপনার এ কী অবস্থা করেছে বাবা!
মানুষটি উত্তর দিলেন, দুঃখ পেয়ো না প্রিয় কন্যা। এমন একদিন আসবে, যখন এই বাণী পৃথিবীর বুকে সকল কাঁচাপাকা ঘরে পৌঁছে যাবে।

রাসূলুল্লাহ-এর মিশন যে আসমানি, এর অন্য কোনো প্রমাণ না থাকলেও এই একটি ঘটনাই তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সম্পূর্ণ একটি মিশন চালিয়ে নেওয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এই রকম সাহস, সহিষ্ণুতা এবং ধৈর্য থাকবে, যেখানে এর সফলতার দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন নেই? আর কে একের পর এক ব্যর্থতা আর হতাশার পরও তার মিশনের সাফল্য সম্পর্কে এতটাই আস্থাশীল যে, তা এগিয়ে নেওয়ার শক্তি পায়? একজন নবি ছাড়া আর কে একের পর এক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা গ্রহণ করতে পারেন! যারা তাঁর কথা শুনতে মোটেও আগ্রহী নয়, তাদের কাছে তাঁর বার্তা নিয়ে বারবার যেতে বিন্দুমাত্র ক্লান্ত হন না।

রাসূল-এর বক্তব্যে যে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, তার প্রকৃতি বিস্ময়কর মনে হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, দুঃখ পেয়ো না মা আমার! এমন একদিন আসবে, যখন এই বার্তা পৃথিবীর বুকে সকল কাঁচাপাকা ঘরে পৌঁছে যাবে। এখানে যে মানুষটি বলছেন যে তাঁর বার্তা একদিন পৃথিবীর সকল ঘরে পৌঁছে যাবে, তিনি তখন পর্যন্ত নিজের ঘরের বাইরে কারও ঘরেই তাঁর বার্তা পৌঁছাতে পারেননি। এমন একজন মানুষ পৃথিবীর মানুষের মুক্তির কথা বলছেন, যিনি কিনা নিজের মুক্তির নিশ্চয়তাও দিতে পারেন না। যেই অপরিচিত মানুষগুলো বারবার তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, তাদের চিরন্তন কল্যাণের জন্যই কিনা ভাবছে মানুষটি!

অন্যদিকে, এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্যের বৈশিষ্ট্যই হলো এক্সট্রা অর্ডিনারি প্রচেষ্টা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা। ক্ষুদ্র আশায় মানুষ জেগে ওঠে না, বড় আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে জাগিয়ে তোলে। মাউন্ট এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অভিযাত্রীর মোটিভেশনাল লেকচারের দরকার হয় না। পাহাড়ই তাকে অনুপ্রাণিত করে। পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার যে আনন্দ হবে, তার ভাবনাই তাকে বেজ ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রতি মুহূর্তে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। পাহাড়ে চূড়ার প্রতিকূলতাই তাদের প্রেরণা। নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, আপনার বাসা থেকে এগারো কিলোমিটার হেঁটে যেতে আগ্রহ পান কিনা? পাহাড়ে চড়াও নিঃসন্দেহে পৃথিবীর বুকেই হাঁটা; কিন্তু দুর্গমতা এর রোমাঞ্চ বাড়িয়ে দেয়। একটি লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে যুক্ত তৃপ্তি ও রোমাঞ্চের পরিমাণ এর প্রতিকূলতার সমানুপাতিক।

বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়; বরং অনেক বেশি ধাতুগত এবং সহজাত বিশ্বাসের পরিবর্তন সম্পর্কে কথা বলার মতো কঠিন আর কী হতে পারে! এর চ্যালেঞ্জটা বোঝা খুবই জরুরি। কারণ, সব কাজই মূলত বিশ্বাসের ফলাফল। মানুষ তার নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে, সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনে। যেমন: মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস। ধর্মবিশ্বাসের কারণেই মানুষ অনেক রীতিনীতি পালন করে; আবার তারা তাদের নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো কাজকে লাভজনক মনে করে তাতে বিনিয়োগ করতে পারে। আবার মানুষ ঘুম থেকে উঠে কাজে যোগ দেয়, কারণ, অবচেতনভাবে সে বিশ্বাস করে যে, ওইদিন এবং পরের দিনগুলোতে সে বেঁচে থাকবে এবং পৃথিবীও ধ্বংস হবে না। সুতরাং বিশ্বাস আমাদের সকল চিন্তা ও কর্মের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে সেটাকে সম্পূর্ণ ভুল সাব্যস্ত করা এবং এর জন্য চিরন্তন শাস্তি পেতে হবে বলাটা সহজ কাজ নয়। তা সত্ত্বেও রাসূল তাঁর বার্তার সত্যতায় এত গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কোনো কিছুই তাঁকে অন্যের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে বিরত করতে পারেনি। বর্ণিত আছে, তিনি একসময় তাঁর চরম শত্রুদের অন্যতম আবু জাহলের বাড়িতে শতবারেরও বেশি গিয়েছেন এই আশায় যে, সে ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে। নবি ছাড়া আর কে এমন একজনকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করবে, যে কিনা তাঁর ক্ষতি করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে?

এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আরেকটি ব্যাপার হলো এখানে কর্মই প্রশিক্ষণ। আরব প্রবাদ বলে, যদি কোনো কিছু তোমার কোমর ভাঙতে না পারে, তবে তা তোমাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্যের জন্য কাজ করাও তেমনই, কেবল শক্তি বৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ এবং প্রথম যুগের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছে। সকল প্রকার বিরোধিতা, নির্যাতন এবং শাস্তি তাদের ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালীই করেছে। তাদেরকে আরও স্থিতিশীল করে তুলেছে। এক্সট্রা অর্ডিনারি লক্ষ্য জোর প্রচেষ্টা চালানোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। If it is worth doing, then it is worth the effort. সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা এবং জান্নাতে নেওয়ার চেষ্টার চেয়ে মূল্যবান প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ আর কী হতে পারে? আমরা যেটাকে ত্যাগ বলছি, রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিরা সেটাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছিলেন। এ কারণে তাদের পক্ষে কোনো দ্বিধা ছাড়াই এটা করা সম্ভব হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00