📄 রোগ ও প্রতিষেধক
আমি এ মুহূর্তে একজন চিকিৎসক। আমার কাজ হচ্ছে রোগ নির্ণয় করে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়া। ধরুন, রোগ হলো ম্যালেরিয়া এবং এর প্রতিষেধক হলো কুইনাইন। এখন যদি ফার্মেসির লোকেরা কুইনাইন লুকিয়ে রাখে বা দাম বাড়িয়ে দেয় কিংবা তাদের ফার্মেসি বন্ধ করে রাখে, তাহলে ডাক্তারের দোষ কোথায়?
হ্যাঁ, ফার্মাসিস্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে। এটা কেবল একটা উদাহরণ। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ফার্মেসি বা প্রশাসনের নাম মেনশন করে আমি কথা বলছি না।
আমার সাথে আপনারা অবশ্যই ঐকমত্য পোষণ করবেন যে, রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো বৈবাহিক সমস্যা নিরসনকল্পে বিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা। তাদের কাজ হবে বিয়ের সহজায়নের পথ নির্ণয় করা। কমিটি গঠনের নির্দেশনামূলক একটা প্রবন্ধ অবশ্য আমি লিখেছিলাম। শরিয়তসম্মত বিধিও প্রণয়ন করেছিলাম। হয়তো কাগজের পাতায় এখনও বেঁচে আছে এবং থাকবে।
রাষ্ট্র কর্তৃক কমিটি গঠন বিষয়ক প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, মানুষকে বৈবাহিক জীবনের প্রতি উৎসাহদান, সামাজিক প্রথা ও কুসংস্কার রোধ, অনুষ্ঠান-আয়োজন ও দেনমোহর সাধ্যের ভেতরে নির্ধারণ, ষষ্ঠ শ্রেণি ও তদুপরি কর্মচারীদের বিবাহ বাধ্যতামূলক করা, সামর্থ্য থাকার পরও যারা বিয়েতে অনাগ্রহী, তাদের ওপর করারোপের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থায় স্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের নারীশিক্ষার উপযোগী শিক্ষাধারা চালু করা ইত্যাদি। আশা করি, সরকারিভাবে এসব উদ্যোগ নেয়া হলে যৌন অপরাধ তো কমবেই, সময়ের ব্যবধানে অন্য অপরাধও শূন্যের কোটায় চলে আসবে।
আমি মনে করি, এ বিষয়ে প্রতিটি সেক্টরে নিয়োজিতদের কলম ধরা উচিৎ। যেমন- ফতোয়া বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনী, অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বিভাগ, পরামর্শ বিভাগ, বিচার বিভাগ, লেখক ফোরাম, কবি-সাহিত্যিক সংগঠন এবং আঞ্চলিক ও এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন কমিটি এতে অংশগ্রহণ করে তাদের কর্ম নির্ধারণ করতে পারে।
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়রোধে আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বলেছি, তা শুধুমাত্র কথার কথা নয়। বিষয়গুলো নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ভেবেছি। এ সমস্যা সমাধানে আমি অনেক গবেষণাও করেছি। শুধু গবেষণা করেই ক্ষান্ত হইনি। আমি বিষয়গুলো নিয়ে বহু চিন্তাবিদ ও গবেষকের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তারা সবাই আমার সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। আর এ কারণেই আমি জোর দিয়ে বলতে পারি যে, আমার প্রেসক্রিপশন সবই ভুল হবে কিংবা সবই বৃথা যাবে- এমন হওয়া সম্ভব নয়। তাই এই ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত নির্দেশনা হলো বিবাহের পথ সহজ করা। এ ব্যাপারটি যত সহজ করা যাবে, ততই সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়মুক্ত সমাজ গঠন সহজ হবে।
একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। তাহলো, আপনি হয়তো কাউকে দেখলেন যে, সে খুব ক্ষুধার্ত। আপনার চোখের সামনেই লোকটি ক্ষুধার জ্বালায় কাতরতা দেখাচ্ছে। তার এই অবস্থা দেখে আপনার মনে দয়ার উদ্রেক হলো। আপনি এও দেখলেন যে, লোকটির সামনেই রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন আইটেমের খাবার সাজানো আছে। কিন্তু তার সেগুলো কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। এখন আপনি কী করবেন?
আপনি তো আর সেখান থেকে কোনো খাবার চুরি করে নিবেন না! তাহলে আপনাকে কী করতে হবে? হ্যাঁ, তাহলে আপনাকে অবশ্যই কোনো বিনিময় দিতে হবে এবং খাবার কিনে ক্ষুধার্তকে খাওয়াতে হবে। আপনি যদি তার জন্য খাবারের ব্যবস্থা না করে শুধু ওয়াজ-নসিহত করেন, তাহলে কি কোনো ফায়েদা হবে? না! নিশ্চয় হবে না।
মনে রাখবেন নিশ্চয় বিশ্বজাহানের অধিপতি মহান স্রষ্টা যেখানেই কোনো দরজার কোনো পার্ট বন্ধ করেছেন, সেখানেই তিনি সাথে সাথে আরেকটি পার্ট মেলে ধরেছেন। তিনি যা কিছুই হারাম করেছেন, তার বিপরীতে অন্য একটি জিনিস হালাল করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা সুদ-জুয়া অবৈধ বলেছেন; পক্ষান্তরে ব্যবসায়-বাণিজ্য বৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি যেনা নিষিদ্ধ করেছেন পক্ষান্তরে বিয়ের পথ খুলে রেখেছেন। এখন সমাজ যদি হালাল ও বৈধ পন্থার সাথে বয়টক করে, তাহলে যুবক-যুবতিরা হারাম পথে সন্ধির হাত না বাড়িয়ে কী করবে?
সমাজবিধ্বংসী যৌনরোগ প্রতিরোধের অন্যতম ধাপ হলো দেহাবয়বে শক্তি সঞ্চার এবং রোগের পুনরাবৃত্তির পথে বাঁধ নির্মাণ করা। এর জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য। তাহলো, আল্লাহর ভয়, উত্তম নৈতিকতা এবং উন্নত মানবিক ধারা অনুশীলন।
📄 সব দায় অভিভাবকদের কাঁধে
এই অপরিহার্য তিনটি বিষয় রপ্ত করার জন্য নিয়মিত কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা জরুরি নয়। বরং এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা তথা দীনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে যে, যার মাঝে থাকবে দীনের প্রতি পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস, যার হৃদয়ের অণুগুলো আল্লাহর স্মরণে থাকবে প্রকম্পিত এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের ক্ষেত্রে যে হবে অকুতোভয় তিনিই হন আদর্শ শিক্ষক। কারণ, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করেন কিন্তু নিজেই এর বরখেলাফ করেন অথবা কথা আর কাজে কোনো সমতা রাখেন না কিংবা তিনি মানুষকে আখেরাতের প্রতি আহ্বান জানান বটে অথচ তিনি নিজেই দুনিয়ামুখী, তাহলে এমন শিক্ষকই হলেন মন্দের উৎসভূমি।
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আজ আমাদের সামাজিক জীবনের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ একটি সমস্যা আলোচনা করব। তাহলো, ঘরে ঘরে সেয়ানা যুবতি-কন্যারা বিয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। অন্যদিকে অবিবাহিত যুবকরা চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে। তারা বিয়ের পথ খুঁজছে। অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই দু'দলের মাঝে বিশাল অন্তরায় সৃষ্টি হয়ে আছে। যে অন্তরায় তাদেরকে হালাল মিলনের পথে বাধা দিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অভিভাবকরা ছেলে-মেয়ের মনের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাটা বুঝতে চেষ্টা করেন না। কিংবা বুঝলেও না বোঝার ভান করেন। ছেলে বা মেয়ে কেমন পাত্র বা পাত্রী পছন্দ করে তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তারা 'নিজের ভাষায় গরুর রচনা' তৈরি করার মতো নয়-ছয় মিলোতে বেহুদা চেষ্টা করেন। এর দ্বারা ছেলেমেয়ের ইচ্ছারও প্রতিফলন হয় না আবার নিজেদেরও খায়েশ মিটে না। বরং এর কারণে বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের সাথে ছেলেমেয়ের সুসম্পর্কের অবনতি ঘটে। অন্যদিকে অভিভাবকের প্র্যাস্টিজ মতে পাত্র-পাত্রী না মিলায় কিংবা ছেলেমেয়ের ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটায় তাদের তাদের সামনে রঙিন অবয়বে ধরা দেয় যেনা আর ব্যভিচারের ময়লা পথ। অথচ কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না, নিঃসন্দেহে এ হচ্ছে একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ। [বনি ইসরাঈল : ৩২
আমি বলি যে, এই যুবক-যুবতিদের তারুণ্যদীপ্ত জীবনকে বৈধ পথ বিসর্জন দিয়ে অবৈধ পন্থায় কাজে লাগাবার পেছনে অনেকাংশে আমাদের অভিভাবক দায়ী। আর এ কারনেই যুবক-যুবতিরা জৈবিক চাহিদা মিটাতে নানা পন্থা অবলম্বন করে থাকে। কারণ সেখানে কোনো বাধা-বিপত্তির ধার তাদের ধারতে হয় না।
যুবক-যুবতিদের উচ্ছন্নে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছেন সম্মানিত বাবারা। ক্ষমা করবেন! আমি সব বাবাকে উদ্দেশ্য করছি না; বরং যারা এখনও উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, জগতে বর্তমানে ধ্বংসকারী প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া বয়ে চলছে। যে বাতাস চরিত্র, নীতি-নৈতিকতা, ইজ্জত-আবরু সবকিছু ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে। এর কোনো প্রতিষেধক নেই। মুক্তির কোনো উপায়ও নেই। একটিমাত্র পথ খোলা। সেটি হচ্ছে বিয়ের দরজা।
মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি বিয়ে-শাদিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অথবা এ পথে শর্তারোপের মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি করে কিংবা সহজভাবে কার্যসম্পাদন করতে পেরেও সহজায়ন করে না; তিনি এই মহাসঙ্কটের অন্যতম নায়ক। তিনি জটিলতা সৃষ্টির অন্যতম ভূমিকা পালনকারী।
অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে, পাত্র-পাত্রী উভয়পক্ষে অসুবিধা থাকলেও মেয়ের দিকে অসুবিধার মাত্রাটা একটু বেশি। কারণ, যুবক অপরাধ করে খালাস হয়ে যায়। কিন্তু যুবতি অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করে। তাছাড়া আমাদের সমাজব্যবস্থাও যুবকদের ক্ষমা করে দেয়। তাদের ক্ষেত্রে বলে, আরে! একটা যুবক মানুষ। কিছু একটা দোষ না হয় করেছে। তওবাও তো করেছে! কিন্তু মেয়ের বেলায় ক্ষমার এই দৃষ্টিটা দেয়া হয় না। তাকে চিরঅপরাধী হিসেবেই দেখা হয়। তাকে মনে করা হয় অলুক্ষণে। তাকে ভাবা হয় নষ্টা-পাপীষ্ঠা!
হ্যাঁ, মেয়ের বাবা যদি বিচক্ষণ হন, তাহলে কন্যার বিয়ের ব্যাপারে জলদি কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এই অর্থে নয় যে, মেয়েকে বাজারে উপস্থাপন কিংবা প্রথমবার যে প্রস্তাব দেয়, তার হাতেই সোপর্দ করেন। বরং তার জন্যে শরিয়তসম্মত পথের অনুসন্ধানে মগ্ন থাকেন। ছেলের দীনদারি, চরিত্র ও নীতির সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন।
দীনদারি ও নীতি-নৈতিকতা পছন্দ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছেলের পরিবার তাদের আচার-আচরণ এবং চিন্তাচেতনায় দৃষ্টি দেন। যদি ছেলে ও তার পরিবারের উপযোগী হয়, অর্থসম্পদে এবং বংশগত দিক থেকে কাছাকাছি হয়, সেই সাথে মেয়ে বাবার ঘরে যেভাবে লালিত হয়েছে স্বামীর বাড়িতেও সেভাবে জীবনযাপন করতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় তাহলে বাবা এবার কবুল করে নেন।
বিবাহের অপরিহার্য অংশ হলো দেনমোহর। তবে হ্যাঁ, তা অবশ্যই মধ্যম পর্যায়ের হওয়া চাই। যেন প্রস্তাবিত দেনমোহর ছেলের ওপর বোঝা না হয়, আবার মেয়ের হকও নষ্ট না হয়। যদি ছেলে সৎ হয় আর হাতে টাকা-পয়সা তেমন না থাকে (অধিকাংশ যুবকের অবস্থাই এমন) তাহলে মোহর বাকিতে পরিশোধ হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দিলে দেনমোহরের পরিমাণ বেশি হলেও কিছুটা অবকাশে আদায় করা হলে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না।
বিবাহের ক্ষেত্রে যে সব বিষয় আবশ্যিক নয়, প্রত্যাশিতও নয় বরং বিবাহবন্ধনে সমস্যা সৃষ্টি করে, সেগুলো হচ্ছে প্রচলিত অনুষ্ঠান-আয়োজন। এসবের জন্যে অভিভাবককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। অভিভাবকের অবহেলার কারণে যদি ছেলেমেয়েকে সঠিক সময়ে বিবাহ দেওয়া না হয়, তাহলে এই ছেলেমেয়ে তাদের যৌন উত্তেজনা নিবারণের জন্যে যত প্রকার অন্যায় কাজ করবে তার ইহকালীন ও পরকালীন পাপের একাংশ অবশ্য সেই অভিভাবককে ভোগ করতে হবে।
📄 দেরিতে বিয়ের ফলে মানসিক ক্ষতিসমূহ
দেরিতে বিবাহের দ্বারা ছেলেমেয়ের সামাজিক যেমন বিবিধ ক্ষতি রয়েছে, তেমনি তারা মানসিকভাবেও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকে। সমাজে এখনও একজন নারীর শেষ গন্তব্য ও সাফল্য বিবেচনা করা হয় বিয়ে ও সংসারকেই। আর তাই একটি নির্দিষ্ট বয়সের মাঝে বিয়ে না হলে বেশিরভাগ নারীই কিছু মানসিক সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। এমনকি যারা ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী, তাদের মাঝেও দেখা যায় কিছু কিছু ব্যাপার। কখনও কাজ করে ঈর্ষা, কখনও সামাজিক চাপ, কখনও একাকিত্ব। সব মিলিয়ে অনেকেই নিজের মাঝে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
এ পর্যায়ে এমন কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরব, যেগুলো তৈরি হয় বিয়ে দেরিতে হলে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা গেলে সেটা থেকে বের হয়ে আসাও সহজ।
১. বিষণ্ণতা হতাশা শূন্যতা: সমবয়সি সকল বোন বা বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে, আর স্বভাবতই বিয়ের পর সকলেই নিজের পৃথিবী নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এক্ষেত্রে যার বিয়ে হয়নি, তিনি হয়ে পড়েন একলা। প্রিয় বোন বা বান্ধবীদের খুব একটা কাছে পান না, কাটানো হয় না ভালো সময়। সবমিলিয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, আর সেই বিষণ্ণতা থেকেই মনের মাঝে জন্ম নেয় হতাশা ও শূন্যতা। আর এই বোধ থেকে বের হয়ে আসার সেরা উপায় হচ্ছে নতুন বন্ধু-বান্ধব তৈরি করা, যার কাছে আপনার জন্যে পর্যাপ্ত সময় আছে।
২. নিজেকে অযোগ্য মনে করা: সমবয়সি সকলে নিজের জীবনসঙ্গী পেয়ে গেছেন, আপনি হয়ত বারবার চেষ্টা করেও পারছেন না। হয়ত প্রেম সফল হয়নি কিংবা পরিবার থেকে চেষ্টা করেও ফল হচ্ছে না। বিশেষ করে আমাদের দেশে পাত্রী দেখাবার প্রক্রিয়াটা খুব অপমানজনক। এক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত হবার পর নিজেকে অনেকেই অযোগ্য মনে করতে শুরু করেন। এত অযোগ্য যে, কোনো ছেলেরই তাকে পছন্দ হচ্ছে না। এমনটা ভাবা মানে অকারণেই নিজেকে ছোট করা। মনে রাখবেন, কোনো পুরুষের আপনাকে পছন্দ হয়নি মানেই আপনি অযোগ্য নন। এটা নিয়ে কষ্ট পাবার কিছু নেই। সম্ভব হলে ঘটা করে পাত্রী দেখার আয়োজনটা এড়িয়ে যান। অনেকটাই স্বস্তি পাবেন।
৩. ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা বৃদ্ধি পাওয়া: এটাও খুব সাধারণ একটা আবেগ। আমরা মানুষ, এমনটা হতেই পারে আমাদের সাথে। খুব কাছের বোন বা বান্ধবীটি হয়ত এখন আর আপনাকে সেভাবে সময় দিতে পারেন না। নিজের সংসার নিয়েই তিনি ব্যস্ত ও সুখী। এমন অবস্থায় ঈর্ষা কিংবা প্রতিহিংসার একটা বোধ খোঁচা দিতেই পারে আপনাকে। এক্ষেত্রে নিজেকে বিষয়টা বোঝান। প্রথমত এটা ভাবুন যে, তার জীবনে মোটেও আপনার গুরুত্ব কমেনি। আর দ্বিতীয়ত একদিন আপনারও এমন চমৎকার একজন জীবনসঙ্গী হবে। তাই মন খারাপের কিছুই নেই।
৪. নিজেকে হাস্যকর বানানো: বিয়ে করার জন্য তাড়াহুড়া করতে গিয়ে নিজেকে হাস্যকর করে ফেলার মতো জঘন্য কাজটি অনেক নারীই করে ফেলেন নিজের অজান্তেই। আর তা হলো, একটি বিয়ে করার জন্যে 'ডেস্পারেট' হয়ে যান। ক্রমাগত সামাজিক ও পারিবারিক চাপ থেকে এটা হয়। মনের মাঝে ক্রমাগত ঘুরতে থাকে যে 'বয়স পার হয়ে যাচ্ছে!' আর এই পার হয়ে যাওয়া বয়সকে টেক্কা দিতে একজন জীবনসঙ্গীর জন্য আকুল হয়ে ওঠেন অনেকেই। বারবার ঘটকের কাছে যাওয়া, অফিসে বা পরিচিত মহলে নিজেকে পাত্রী হিসাবে উপস্থাপন ইত্যাদি করতে গিয়ে নিজেকে হাসি ও করুণার পাত্রে পরিণত করে ফেলেন তারা। আপনিও কি এমন করছেন? তাহলে জেনে রাখুন, এসব করে কেবল সামাজিক মর্যাদাতেই খাটো হচ্ছেন আপনি। এসবে তেমন কোনো ফল নেই।
৫. চাপের মুখে ভুল মানুষকে বেছে নেওয়া: ক্রমাগত পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারীই ভুল মানুষটিকে বেছে নেন বিয়ের জন্যে। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, যাকে সামনে পেলাম, তাকেই বিয়ে করে ফেললাম। কিংবা যে রাজি হলো, তাকে পছন্দ না হলেও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া। অনেকেই এই ব্যাপারটিকে ভালোবাসা ভেবে নিজেকে সান্তনাও দিতে চান। আবার অনেকে পরিবারকে খুশি করার জন্য নিজেকে রীতিমত চাপ দিয়ে বিয়েতে রাজি করায়। এই ভুলটি কখনও করবেন না। একটাই জীবন এবং এই জীবনে একটি ভুল বিয়ে আপনার অশান্তি কমাবে না; বরং বাড়বে।
৬. কারও ভালো সহ্য করতে না পারা: এটাও একটি সাধারণ সমস্যা, যা অনেকের মাঝেই দেখা যায়। যখন বিয়ে না হবার কারণে একজন মানুষ ক্রমাগত হয়রানির শিকার হতে থাকেন। তখন স্বভাবতই তার মাঝে জন্ম নেয় ক্ষোভ ও ক্রোধ। আর এই ক্ষোভ ও ক্রোধের কারণেই বিবাহিত সকলকে মনে হতে থাকে শত্রু। নিজের অজান্তেই একজন খিটখিটে মানুষে পরিণত হয়ে যাই আমরা, যার কাছে পৃথিবীর কারও ভালোটা ভালো লাগে না। কারও সাফল্য বা সুখ সহ্য হয় না। এই ব্যাপারটা দূর করার জন্যে কাউন্সিলিং ভালো কাজ দিতে পারে।
৭. আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা: সমাজে একজন মেয়ের সফলতা বা বিফলতা নির্ভর করে তার স্বামী ও সংসারের স্ট্যাটাসের ওপরে। সঠিক সময়ে বিয়ে না হলে মেয়েটি হয়ে ওঠে সকলের চক্ষুশূল। এ কারণে বিয়ে দেরি হলে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। যখন ক্রমাগত নিজের কাছের মানুষেরাই বলতে থাকে যে 'তুমি এত অযোগ্য যে পাত্র জোটে না', তখন অনেক নারীই নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন আর ক্রমশ গুটিয়ে নিতে থাকেন জীবন থেকে। ভুলেও এই কাজটি করবেন না। জীবন আপনার। আর আপনার জীবনে মাথা উঁচু করে আপনাকেই বাঁচতে হবে। একবার ঘাড় নুইয়ে ফেললেই পরাজিত আপনি। ভালো থাকুন নারীরা। নিজেকে বিয়ের বা সংসারের মাপকাঠিতে মাপবেন না। আপনি মানুষ, নিজেকে মাপুন কেবল নিজের যোগ্যতার মাপকাঠিতে।
📄 যথাসময়ে বিয়ে করার আবশ্যকতা
যে ব্যক্তির ঘরে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে, তাকে বলি, যখন কোনো উপযুক্ত ছেলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে, তাকে ফিরিয়ে দেবেন না এবং তার ওপর অনেক চাওয়া-পাওয়ার বোঝা চাপিয়ে দেবেন না। হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যখন তোমাদের কাছে এমন কোনো পাত্র বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আগমন করবে যার দীন, চরিত্র ও আমানতদারির ওপর তোমরা সন্তুষ্ট হও, তাহলে তার সাথে তোমাদের কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দাও। অন্যথায় দুনিয়াতে ফিতনা ও ব্যাপক ফাসাদ সৃষ্টি হবে। [সুনানে তিরমিযি, সুনানু ইবনে মাজাহ ও মুস্তাদরাকে হাকিম। আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলে সাব্যস্ত করেছেন। সহিহ সুনানু তিরমিযী: ১/৩১৫]
তাই বলি যে, হে যুবকেরা! তোমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে করে ফেল। কারণ, ফরজ আদায় ও হারাম থেকে বাঁচার পর বিয়ের চেয়ে আর কোনো নেক আমল দ্বারা তোমরা আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারবে না। এর দ্বারা তোমরা তোমাদের চরিত্র ও দীনকে হেফাজত করতে পারবে।
হযরত ওসমান ইবনে আফফান রা. থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুব-সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য থেকে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে ফেলে। কেননা, বিয়ে চক্ষুকে অধিক অবনতিকারী ও লজ্জস্থানকে বেশি হেফাজতকারী। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, তার ওপর রোজা রাখা অপরিহার্য। কেননা, রোজা তার কাম-লালসাকে ভেঙ্গে দেবে।
হে দেশের জ্ঞানীকুল, হে সংস্কারপন্থীগণ, হে কলমের অধিপতিরা, হে মিম্বারের খতিবগণ, বিয়েকে আপনাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হিসাবে সাব্যস্ত করুন। আল্লাহই আপনাদের তাওফীক দান করুন এবং অশেষ পুণ্য দিয়ে উত্তম বদলা দান করুন। [সূত্র মাআ'ন নাস, পৃ. ৮৭ [সহিহ বুখারী: ৩/৪৪২]