📄 বিবাহের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
অধিকাংশ গবেষকের মতে, বিবাহ হলো নারী-পুরুষ একে অপর থেকে উপকৃত হওয়া এবং আদর্শ পরিবার ও নিরাপদ সমাজ গড়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এ সংজ্ঞা থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, বিবাহের উদ্দেশ্য কেবল ভোগ নয়; বরং এর সঙ্গে আদর্শ পরিবার ও আলোকিত সমাজ গড়ার অভিপ্রায়ও জড়িত।
বিবাহ একটি বৈধ ও প্রশংসনীয় কাজ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিয়ে করা নবি-রাসুলগণের সুন্নত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً
অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসুলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। [সূরা রা'দ: ৩৮]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিবাহ করেছেন এবং এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলেছেন-
أَتَزَوْجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
'আমি নারীকে বিবাহ করেছি। (তাই বিবাহ আমার সুন্নত) অতএব যে আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। (মুসনাদে আহমদ: ১২৬৩৪।
এ জন্যেই আলিমগণ বলেছেন, সাগ্রহে বিবাহ করা নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। কারণ, এর মধ্য দিয়ে অনেক মহৎ গুণের বিকাশ ঘটে এবং অবর্ণনীয় কল্যাণ প্রকাশ পায়।
কারও কারও ক্ষেত্রে বিবাহ করা ওয়াজিব। যেমন: যদি কেউ বিবাহ না করলে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করে। তখন নিজেকে পবিত্র রাখতে এবং হারাম কাজ থেকে বাঁচতে তার জন্যে বিয়ে করা ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزُوجُ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصُّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاء.
হে যুব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিয়ে করে। কেননা তা চক্ষুকে অবনত করে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যে এর সামর্থ্য রাখে না, তার কর্তব্য রোজা রাখা। কেননা তা যৌন উত্তেজনার প্রশমণ ঘটায়। [বায়হাকি; সুনানু কুবরা : ১৪২১১, ইবনু মাজাহ: ১৯১৮]
📄 বিবাহের প্রয়োজনীয়তা
মানুষের মধ্যে যে যৌন ক্ষমতা রয়েছে এর সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন নয়; বরং মানব বংশের বৃদ্ধিই এর লক্ষ্য। আর সে জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে নারীর। ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নারীকে গর্ভধারণের, সন্তান প্রসবের। আর মানুষ যেহেতু পশু নয়, তাই উচ্ছৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র যৌনক্ষুধা নিবারণের অনুমতি দেওয়া হয়নি তাকে। বরং নিয়ম-নীতির আলোকে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে সম্মানজনক পন্থায় কাম-চাহিদা পূরণ ও তা ফলপ্রদ করার পুণ্যময় রীতি প্রণয়ন করেছে শরিয়ত। আর তারই নাম বিবাহ-শাদি। যার অবর্তমানে যেভাবে মানুষ আর পশুতে ভেদাভেদ থাকে না, বিয়ের লক্ষ্য সাধিত না হলেও থাকে না মানব বংশের অস্তিত্ব। সুতরাং মানবজীবনের কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার জন্যে বিয়ে এক গভীর তাৎপর্যময় সত্য।
মানুষ যে খাবার গ্রহণ করে তা থেকে উৎপাদিত শক্তির নির্যাস হলো যৌনক্ষমতা। বিবাহের মাধ্যমে যা যথার্থ প্রবাহিত হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহ করার, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করার ক্ষমতা না রাখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রোজা রেখে শক্তি নিয়ন্ত্রিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। মোটকথা, খানাপিনা যেভাবে মানবজীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন, আহার নিবাসের প্রয়োজনীয়তা যেভাবে যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে, একজন যৌবনদীপ্ত মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রয়োজনীয়তাও তেমনই। আর এ কারণেই কুরআন ও হাদিসে নির্দেশসূচক শব্দে উৎকীর্ণ করা হয়েছে বিবাহের আহ্বানকে।
📄 বিবাহের উপকারিতায় গবেষণা প্রতিবেদন
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, বিবাহের দ্বারা নিম্নোক্ত উপকারিতা পাওয়া যায়।
১. আনন্দঘন দাম্পত্য জীবন দৈনন্দিন পেরেশানি এবং দুশ্চিন্তার মাঝে ঢালের মতো ভূমিকা রাখে।
২. বিবাহিত লোকদের স্বাস্থ্য স্বাভাবিকভাবে অবিবাহিত লোকদের চেয়ে বেশি সুস্থ থাকে।
৩. বিবাহ মানুষকে অনেক খারাপ কাজ যেমন- মদপান, অবৈধ সম্পর্ক এবং সিগারেট পান থেকেও রক্ষা করে।
অনুসন্ধানে এও দেখা গেছে যে, অবিবাহিতদের মধ্যে হার্টের রোগের কারণে মৃত্যুহার বিবাহিতদের চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া অবিবাহিত লোকেরা ক্যান্সার, আত্মহত্যা এবং আরো অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে বিবাহিত লোকদের তুলনায় অধিক আক্রান্ত হয়ে থাকে।
📄 ‘সেক্স কালচার’ প্রামাণ্য গ্রন্থের রিপোর্ট
বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজ ইউনিভাসির্টির ডক্টর আইডিমিয়াম পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের এবং পুরাতন গোত্রসমূহের লোকদের জীবনী অধ্যয়ন করেছেন। এ অধ্যয়নের পর তিনি সভ্য সমাজের লোকদের জীবনীও পাঠ করেছেন। তারপর তিনি এ বিষয়ক প্রামাণ্য গবেষণা রিপোর্ট স্বীয় বই 'সেক্স কালচার'-এ খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বইটির ভূমিকায় লিখেন-
"আমি বিভিন্ন পদ্ধতিতে অনুসন্ধানের পর যে ফলাফল লাভ করেছি তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো, প্রতিটি জাতি দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করে। একটি হলো তাদের সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা, অপরটি হলো এমন আইনশৃঙ্খলা। যা তারা যৌন চাহিদার ওপর আরোপ করে। তিনি আরও লিখেন যে, যদি আপনি কোনো জাতির ইতিহাসে দেখেন যে, কোনো সময় তাদের সভ্যতা উন্নত হয়েছে অথবা নিচে নেমে গিয়েছে তাহলে আপনি খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন যে, তারা যৌন বিষয়ক আইনে রদবদল করেছে। যার ফলাফল সভ্যতার উন্নতি অথবা অবনতির আকৃতিতে প্রকাশ পেয়েছে।
ডক্টর আডিমিয়াম ৮০টি গোত্রের সভ্যতা সংস্কৃতির অধ্যয়ন করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন তা হলো-
১. যে সকল গোত্রে বিবাহের পূর্বে যৌন চাহিদা মিটানোর অবাধ স্বাধীনতা ছিল, তারা সভ্যতার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছিল।
২. যে সকল গোত্রে বিবাহের পূর্বে যৌন চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে মোটামুটি আইনানুগ ব্যবস্থা ছিল, তারা সভ্যতার মধ্যস্তরে ছিল।
৩. সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে সে জাতিই অরোহণ করেছে, যারা বিবাহের পূর্বে যৌনাচার থেকে পুতঃপবিত্র ছিল। যারা বিবাহের পূর্বে যৌনাচারকে অবৈধ ও অপরাধ মনে করত তারাই শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছে।
ডক্টর আইডিমিয়াম তার 'সেক্স কালচার' গ্রন্থে আরও মন্তব্য করেন যে, মনোবিজ্ঞানের অনুসন্ধানে জানা যায় যে, যৌনাচারের ওপর আইন আরোপ করা হলে তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল দাঁড়াবে এই যে, জাতির কর্ম ও চিন্তা-চেতনার শক্তি ও যোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যে জাতি নারী-পুরুষকে অবাধ যৌনতার সুযোগ দেয়, তাদের কর্মক্ষমতা, চিন্তাশক্তি এবং যোগ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। রোমীয়দের অবস্থাও তাই হয়েছিল। রোমীয়রা আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে অবাধে পশুর ন্যায় যৌনতায় লিপ্ত হতো। ফলে তারা শারীরিক দিকে থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং কোনো কাজ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।