📄 চরমপন্থা পরিহার করা
মুতাররাফ ইবনে আব্দুল্লাহ বলেছেন— “সবচেয়ে খারাপ ভ্রমণ হল মুঝাব্বাহ্।” এমন ভ্রমণকে বলে যাতে ভ্রমণকারী বেগে চলতে থাকে ফলে সে নিজে ও তার বাহন উভয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একথানি হাদীসে আছে, নবীজী (সা) বলেছেন যে, সবচেয়ে খারাপ নেতা সে, যে নাকি তার অধীনস্থদের প্রতি খুবই কঠোর আচরণ করে। মনে রাখুন যে, উদারতা হল অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি আর সাহস হল কাপুরুষতা ও বেপরোয়াভাবের মাঝামাঝি। মুচকি হাসি হলো ভ্রূকুটি ও অট্টহাসির মাঝামাঝি। ধৈর্য হলো কঠোরতা ও খুঁতখুঁতে ভাবের মাঝামাঝি। অপচয় ও বাড়াবাড়ির একটি ওষুধ আছে; তা হলো আবেগের রাশ টেনে ধরা। আর অবহেলার চিকিৎসা হলো দৃঢ় ইচ্ছা শক্তিকে উন্নয়নের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে গঠন করা।
“আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন- তাদের পথ যাদের উপর আপনি করুণা করেছেন- যারা অভিশপ্ত নয় আর পথভ্রষ্টও নয়” (১-সূরা ফাতিহা: আয়াত-৬-৭)
📄 নাখলাহ্ উপত্যকা থেকে গায়েবী আওয়াজ
নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও জন্মভূমির স্থান মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাসূল ﷺ তায়েফে আশ্রয় চেয়েছিলেন- সেখানে তাঁর সাথে অবজ্ঞার সাথে আচরণ করা হয়েছিল; বদরা তাকে গালি-গালাজ করেছিল আর ছোটরা তাকে ভেংচি কেটেছিল ও তাঁকে পাথর মেরেছিল, দুঃখের অশ্রু তাঁর গাল বেয়ে পড়েছিল ও তাঁর পা দিয়ে রক্ত ঝরেছিল। কোথায় তাঁর ফেরার জায়গা ছিল? কোথায় তাঁর আশ্রয় নেওয়ার স্থান ছিল? একমাত্র যার নিকট কেউ আশ্রয় চাইতে পারে তিনি হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্। মুহাম্মাদ ﷺ কা'বার দিকে মুখ ফিরালেন, আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করলেন, তাঁর প্রশংসা করলেন এবং তাঁর দুঃখ-কষ্টের সময় তাঁকে সাহায্য করার জন্য তাঁর নিকট আকুল আবেদন করলেন। তায়েফের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তাঁর প্রভুর নিকট তাঁর নিম্নোক্ত প্রার্থনাটি পড়লেন–
اللهم إني أشكو إليك ضعف قوتي وقلة حيلتي وهواني على الناس، أنت أرحم الراحمين رب المستضعفين وأنت ربي، إلى من تكلني؟ إلى قريب يتجهمني؛ أو إلى عدو ملكته أمري؛ إن لم يكن بك علي غضب فلا أبالي، غير أن عافيتك هي أوسع لي، أعوذ بنور وجهك الذي أشرقت له الظلمات وصلح عليه أمر الدنيا والآخرة أن ينزل بي غضবক أو يحل بي سخطك، لك العتبى حتى ترضي، لاحول ولا قوة إلا بك।
ভাষার্থ : “হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট আমার দুর্বলতা, আমার কৌশলের অভাব ও মানুষের নিকট আমার অবমাননার অভিযোগ করছি। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাময় এবং দুর্বল, নিপীড়িত, অসহায়, নিঃস্ব ও দরিদ্রদের প্রভু; আর আপনি আমারও প্রতিপালক। কার নিকট আপনি আমাকে সোপর্দ করছেন? এমন আত্মীয়ের নিকট কি আমাকে সোপর্দ করছেন যে আমাকে ভ্রুকুটি করে অথবা কোন শত্রুকে আমার ব্যাপারে কর্তৃত্ব দিয়েছেন? আমার উপর যদি আপনার কোন রাগ না থাকে তবে আমি এতে কিছু মনে করি না; তা ছাড়া আপনার নিরাপত্তা ও ক্ষমা আমার জন্য সহজতর ও প্রশস্ত। আমার উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হওয়া থেকে আমি আপনার সত্তার সে নূরের ওসীলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি যার কারণে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলো বিকশিত হয়েছে আর দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যাপার (বিধান) ঠিক হয়ে গেছে। আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার সন্তুষ্টি চাইব বা আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব। আর আপনার সাহায্য ছাড়া (পাপ কাজ থেকে বাঁচার ও নেক আমল করার) কারো কোন সাধ্য নেই।” (জামে’ ছগীর, হাদীস নং-১৮৯০)
📄 প্রথম মুসলিম জাতি
“আল্লাহ্ অবশ্যই মুসলমানদের উপর তখন সুখী হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার নিকট আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিল। (এ বাইয়াতের) ফলে তাদের অন্তরে যা ছিল তা আল্লাহ্ (প্রমাণসহ) জেনে নিলেন। তাই তিনি তাদের উপর শান্তি অবতীর্ণ করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (৪৮-সূরা আল ফাতহ : আয়াত-১৮)
এ আয়াত মুমিনদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের কথা বুঝায়। সর্বপেক্ষা মূল্যবান যে জিনিস আপনাকে অর্জন করতে হবে তাহলো আপনার প্রতি আল্লাহ্র সন্তুষ্ট হওয়া। প্রথম মুসলিম জাতির প্রতি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির কথা এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য আয়াতে তিনি (আল্লাহ্) তাদের প্রতি ক্ষমার কথা উল্লেখ করেন–
“যাতে আল্লাহ্ তোমার আগে-পিছের সব পাপ ক্ষমা করে দেন।” (৪৮-সূরা আশ শুরা : আয়াত-২)
“আল্লাহ্ অবশ্যই নবী করীম ﷺ-কে, মুহাজিরদেরকে এবং আনসারদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-১১৯)
মক্কা থেকে হিজরত করে প্রথম মুসলমান মদীনায় মুহাজির হন এবং মদীনার যে সব মুসলমান তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন তাদেরকে আনসার বলা হয়।
“আল্লাহ্ আপনাকে (হে মুহাম্মাদ ﷺ)! ক্ষমা করুন। আপনি কেন তাদেরকে অব্যাহতি দিলেন?” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৪৩)
আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তারা গাছের নিচে তাদের জীবন উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কেন? তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে দ্বীন বেঁচে উঠেছিল ও চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহ্ জানতেন যে, তাদের অন্তরে উচ্চস্তরের ঈমান ছিল। তারা প্রচেষ্টা করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন এবং অত্যাচারিত হয়েছেন কিন্তু তারা যা গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন তা হলো আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। তারা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, তাদের সম্পদ ত্যাগ করে ও তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে মরু ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েিন দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু তারা শুধুমাত্র আল্লাহ্ এবং তাদের প্রতি আল্লাহ্র সন্তুষ্ট হওয়াকে পেতে চেয়েছিলেন বা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন চেয়েছিলেন। ইসলাম এবং রব্বুল আলামীনের পুরস্কার কি উট, ছাগল বা টাকা-পয়সা ছিল? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অন্তরে শান্তি করার ক্ষমতা এসব জিনিসের ছিল? কখনও নয়। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি, তাঁর ক্ষমা ও তাঁর চিরকালীন পুরস্কারই তাদের আত্মার শান্তি দিয়েছিল।
“আর তারা যে ধৈর্য ধরেছিলেন এজন্য তাদের পুরস্কার হবে জান্নাত ও রেশমী পোশাক। সেখানে তারা সুউচ্চ সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে; তথায় তারা সূর্যের অতি উষ্ণতা ও (চন্দ্রের) অতিশয় শীতলতা দেখবে না (যেহেতু জান্নাতে চন্দ্র-সূর্য থাকবে না)। (সেখানে বৃক্ষের) ছায়া তাদের নিকটেই থাকবে এবং ফলমূল সম্পূর্ণরূপে (তাদের) আয়ত্তাধীন করা হবে। আর তাদেরকে (পানীয়) পরিবেশন করা হবে রূপার পানপাত্রে এবং ঝকঝকে কাঁচের পেয়ালায় করে। রূপার মতো ঝকঝকে কাঁচের পাত্রগুলোতে তারা (পরিবেশন কারীরা) যথাযথভাবে (পানীয় দ্বারা) পরিপূর্ণ করবে।” (৭৬-সূরা দাহর বা ইনসান : আয়াত-১২-১৬)
📄 প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহচ্ছন্ন করে রেখেছে
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ "প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহান্ধ করে রেখেছে।" (১০২-সূরা আত তাকাসুর: আয়াত-১)
একবার মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়ার পর, যতদূর সম্ভব সব কিতাবের এক কপি করে ক্রয় করার আশায় বইয়ের দোকানে (লাইব্রেরি) ছুটলাম, মুহূর্তের উদ্দীপনা আমাকে পরাভূত করে ফেলেছিল। বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই দিয়ে আমি আমার ঘরের দেয়ালের তাকগুলো ভরে ফেললাম। ইসলামী আইনশাস্ত্র, সমাজ বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক বই-পুস্তক ছিল। আমি পড়া শুরু করতে চাইলাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না যে কোথা থেকে শুরু করব। আমি দেখলাম যে একই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন পুস্তক একে অপরকে ছাপিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পুস্তকগুলোর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কতিপয় বিখ্যাত আলেমের সাথে আমি পরামর্শ করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কীভাবে আমার পড়ালেখা করা উচিত। তারা আমাকে এমন পথ বাতলিয়ে দিলেন যা সফল প্রমাণিত হয়েছে। তারা আমাকে পরামর্শ দিলেন যাতে আমি ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার প্রধান প্রধান কিতাবগুলোই গভীরতার সাথে অধ্যয়ন করি। তারা বললেন, অন্যান্য কিতাবগুলোকে আলাদাভাবে রেখে দিতে। তবে যখন কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণার জন্য অনেক কিতাবের দরকার হয় তখন সেগুলো পড়তে হবে। এর ফলাফল দেখে আমি ভারি খুশি হয়ে গেলাম। আমি তাদের সরল অথচ যুক্তিযুক্ত উপদেশ অনুসরণ করে অধিকতর গোছালো ও স্বস্তি অনুভব করলাম।
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ ० حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ "প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহান্ধ করে রেখেছে, এমনকি তোমরা (এ অবস্থায়) কবর পরিদর্শন করছ।" (১০২-সূরা আত তাকাসুর: আয়াত-১-২)
(অর্থাৎ তোমরা আমৃত্যু বা মরণ পর্যন্ত পার্থিব সম্পদের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আছ ও পরকাল থেকে বিমুখ হয়ে আছ বা পরকালকে ভুলে আছ।)
কিছু ছাত্র আছে যারা বিরল পাণ্ডুলিপির জন্য ভীষণ খোঁজা-খুঁজি করে, তারা সর্বদাই বিরল পুস্তকাদি সংগ্রহ করে, তবুও আপনি তাদের অধিকাংশকেই দেখতে পাবেন যে, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বইসমূহও তারা পুরাপুরিভাবে পড়েননি। আমি এক লোককে চিনি যিনি মুকাতিল ইবন সুলাইমানের তফসির সংগ্রহ করতে পারেননি বিধায় অসন্তুষ্ট, অথচ তিনি ইবনে কাইয়িমের তফসির পুরাপুরি পড়েননি।
“আর তাদের মাঝে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে কিতাব সম্বন্ধে যাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু মিথ্যা আশা করে ও ধারণা করে।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-৭৮)
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন প্রথমে বিবেচনা করা উচিত তখন কখনও ছোটখাট বিষয়ের পিছনে লাগবেন না। যে ব্যক্তি তার উদ্দেশ্য জানে না তাকে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সফর করতে হবে-যা কোথাও শেষ হবে না।