📄 হিদায়াত হলো ঈমানের স্বাভাবিক ফল
এখানে তাকদীর সম্পর্কে কয়েকটি গল্প লেখা হলো। রুডলী অনেক পুস্তক লিখেছেন (কমপক্ষে ১৬টি হবে) তার মধ্যে আছে প্রেরিত পুরুষ (The Messenger)। ১৯৪৪ সালে তিনি উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার যাযাবর রাখাল জাতীয় মরুবাসীদের মাঝে বসতি স্থাপন করেন। এসব মুসলমানগণ সাধারণত পড়তেন, রোযা রাখতেন ও আল্লাহ্র যিকির করতেন। তিনি (রুডলী) পরবর্তীতে তাদের সম্বন্ধে তার কিছু অভিজ্ঞতা কথা লিখেন। এভাবেই তিনি এক বিশেষ গল্প শুরু করেন-
“একদিন এক ভীষণ ঝড় শুরু হলো। প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহ অনেক ধ্বংস সাধন করল। আমার মনে হয়েছিল যেন পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমার নিকট আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তবুও আরবরা আদৌ কোন অভিযোগ করল না। তারা আত্মসমর্পণের সাথে কাঁধ ঝেড়ে দিয়ে বলল যে, এটা তাদের তাকদীরের লেখা ছিল। তখনই তারা তাদের দৈনন্দিন কাজে লেগে গেল। দলপতি বললেন, আমরা যদি মনে করি, আমাদের সব কিছু হারানোর কথা ছিল তবুও আমরা সুস্থ আছি। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহ্রই প্রাপ্য। আমাদের এখনও চল্লিশ পঞ্চাশটি উট আছে আর আমরা নতুনভাবে জীবন যাত্রা শুরু করতে পারি।”
আরেকটি ঘটনা: “আমরা যখন গাড়িতে করে মরুভূমির মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছিলাম তখন আমাদের গাড়ির একটি চাকা ফেটে গেল। আরো ভীষণ বিপদের কথা হলো যে, ড্রাইভার অতিরিক্ত চাকা সাথে নিতে ভুলে গিয়েছিল। আমার রাগও হলো আবার দুশ্চিন্তাও হলো। আমি আমার আরব সঙ্গীদেরকে জিজ্ঞেস করলাম যে আমরা কী করতে যাচ্ছি? তারা শান্তভাবে আমাকে মনে করিয়ে দিল যে, রাগ করে কোন লাভ হবে না বরং অবস্থা আরো খারাপ হবে। আমরা তিনটি ভালো চাকা ও একটি ফাটা চাকার উপর ভর করে অত্যন্ত বিরক্তকর ধীরগতিতে অগ্রসর হতে লাগলাম। ক্রমেই আমরা একেবারে থেমে গেলাম। চাকার অবস্থা এত খারাপ ছিল না, বরং আমাদের গাড়ি জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা যখন ঘটল এমনকি তখনও আমার সঙ্গীগণ শান্ত থাকলেন। অধিকন্তু তারা হাসি মুখে সুরের তালে তালে গান গাইতে গাইতে পদযাত্রা শুরু করলেন। এই আরব্য যাযাবরদের সাথে সময় কাটানোর পর আমার পুরাপুরি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, ইউরোপ ও আমেরিকার পাগলামি বা মানসিক রোগ ও হতাশা হলো ব্যস্ততম শহরের জীবনের ফল।”
তিনি আরো বলেছেন— “মরুভূমিতে বসবাসকালীন আমি কখনও টেনশন অনুভব করিনি। আমার মনে হয়েছিল আমি যেন আল্লাহ্র জান্নাতে অবস্থান করছি। আমি বুঝতে পেয়েছিলাম যে আমি প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি খুঁজে পেয়েছি। অনেক লোক আরবদের বিশ্বাসকে উপহাস করে। কিন্তু কে জানে? হয়তোবা অবশেষে আরবদের নিকট সত্য আছে; কারণ, অতীত সম্বন্ধে আমার যেমনটি মনে পড়ে এতে আমার নিকট এটা স্পষ্ট যে, আমার জীবনটা কিছু বিক্ষিপ্ত সময় নিয়ে গঠিত যা এমন কতকগুলো ঘটনার ফল যা আমার পছন্দ ছাড়াই ঘটেছিল। আরবরা এসব ঘটনাকে আল্লাহ্র তকদীর (পূর্বনির্ধারিত বিধান বা অদৃষ্ট বা ভাগ্যলিপি) বলে। সংক্ষেপে বলছি, আমি মরুভূমি ছেড়ে এসেছি সতেরো বছর হয়ে গেল, এখনও আমি আল্লাহ্র তকদীর সম্পর্কে আরবদের উন্নততর মনোভাব সূচক দৃষ্টিভঙ্গিকে আঁকড়িয়ে ধরে আছি। যে ঘটনা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে সে সব ঘটনাকে আমি শান্তভাব, ধৈর্য্য বা আত্মসংবরণের সাথে গ্রহণ করি। এই যে গুণ যা আমি আরবদের কাছ থেকে শিখেছি তা আমার স্নায়ুকে শান্ত করতে ও আমার টেনশনের মাত্রাকে কমাতে যা করেছে তা ঘুমের বড়ির হাজারো প্রেসক্রিপশন যা করতে পারে তার চেয়েও বেশি।”
তকদীর কথার উপর মন্তব্য করার জন্য আমি প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই যে, আরবদের বিশ্বাসের উৎস ছিলেন আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)। তাঁর বাণীর মূলকথা ছিল মানুষদেরকে হতাশ বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা— তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আনা ও তাদেরকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়া। রাসূল (সা) তাঁর বাণীতে শান্তি ও মুক্তির রহস্য ছিল: অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা সব কিছু পূর্বেই নির্ধারিত করে রেখেছেন একথা বুঝা। অপরপক্ষে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য প্রত্যেককে অবশ্যই কাজ করতে হবে এবং তাদের সার্থেক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিশ্বজগতে আপনার স্থান দেখানোর জন্য ইসলামের মহান বাণী এসেছে, যাতে করে আপনি এমন আদর্শ ব্যক্তি হতে পারেন যে নাকি মানব জীবনের রহস্য ও উদ্দেশ্য জানে।
📄 মধ্যমপন্থা
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَসَطًا
‘এরূপে আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী জাতি বানিয়েছি।’ (সূরা-২ বাকারা: আয়াত-১৪৩)
দু'টি চরম অবস্থার মাঝে সুখ পাওয়া যায় না: বাড়াবাড়ি ও অবহেলা। মধ্যমপন্থা হলো স্বর্গীয় নির্দেশিত পথ যা আমাদের দুই চরম পন্থার স্পষ্ট মিথ্যা থেকে রক্ষা করে। আর তা হলো ইহুদীদের চরম বাড়াবাড়ি ও খ্রিস্টানদের চরম অবহেলা। ইহুদীদের জ্ঞান ছিল কিন্তু তারা আমল করত না; খ্রিস্টানরা আমল করত কিন্তু তারা তাদের নিকটবর্তী স্বর্গীয় কিতাবের জ্ঞানকে পরিত্যাগ করেছিল। জ্ঞান ও আমল উভয়টি নিয়ে ইসলাম এসেছে; এ ধর্ম দেহ-মন উভয়ের জন্যই যত্নবান; এ ধর্ম দেহ ও মন উভয়কেই অনুধাবন করেছে এবং প্রত্যেককেই তার ন্যায্য স্থান দিয়েছে।
আপনি ইবাদতের ব্যাপারে যখন মধ্যমপন্থী থাকেন তখন আপনি মধ্যম পথের অনুসরণ করেন। এর অর্থ হলো আপনার এর বেশি নফল ইবাদত করা উচিত নয় যাতে আপনি আপনার শরীরের ক্ষতি করে ফেলেন ও শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলেন এবং নফল ইবাদতকে ছেড়ে দেওয়াও আপনার উচিত নয়। ব্যায়ামের ব্যাপারেও প্রচুর পরিমাণে সম্পদ ব্যয় করে অপচয়কারী হওয়া আপনার উচিত নয় এবং কৃপণ হওয়াও আপনার উচিত নয়। চরিত্রের মধ্যমপন্থা বলতে বুঝায় কঠোর ও অতিরিক্ত কোমল হওয়ার মাঝামাঝি অবস্থা অবলম্বন করা, সর্বদা ভ্রূকুটি করা ও সর্বদা হাসার মাঝামাঝি অবস্থা অবলম্বন করা এবং নিঃসঙ্গ একাকীত্ব ও অতিরিক্ত সামাজিকতার মাঝামাঝি অবস্থা অবলম্বন করা। ইসলাম সকল ব্যাপারে মধ্যম (পন্থী) ও ন্যায় সঙ্গত পদ্ধতির আশ্রয় নেয়।
📄 চরমপন্থা পরিহার করা
মুতাররাফ ইবনে আব্দুল্লাহ বলেছেন— “সবচেয়ে খারাপ ভ্রমণ হল মুঝাব্বাহ্।” এমন ভ্রমণকে বলে যাতে ভ্রমণকারী বেগে চলতে থাকে ফলে সে নিজে ও তার বাহন উভয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একথানি হাদীসে আছে, নবীজী (সা) বলেছেন যে, সবচেয়ে খারাপ নেতা সে, যে নাকি তার অধীনস্থদের প্রতি খুবই কঠোর আচরণ করে। মনে রাখুন যে, উদারতা হল অপচয় ও কৃপণতার মাঝামাঝি আর সাহস হল কাপুরুষতা ও বেপরোয়াভাবের মাঝামাঝি। মুচকি হাসি হলো ভ্রূকুটি ও অট্টহাসির মাঝামাঝি। ধৈর্য হলো কঠোরতা ও খুঁতখুঁতে ভাবের মাঝামাঝি। অপচয় ও বাড়াবাড়ির একটি ওষুধ আছে; তা হলো আবেগের রাশ টেনে ধরা। আর অবহেলার চিকিৎসা হলো দৃঢ় ইচ্ছা শক্তিকে উন্নয়নের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে গঠন করা।
“আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন- তাদের পথ যাদের উপর আপনি করুণা করেছেন- যারা অভিশপ্ত নয় আর পথভ্রষ্টও নয়” (১-সূরা ফাতিহা: আয়াত-৬-৭)
📄 নাখলাহ্ উপত্যকা থেকে গায়েবী আওয়াজ
নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও জন্মভূমির স্থান মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাসূল ﷺ তায়েফে আশ্রয় চেয়েছিলেন- সেখানে তাঁর সাথে অবজ্ঞার সাথে আচরণ করা হয়েছিল; বদরা তাকে গালি-গালাজ করেছিল আর ছোটরা তাকে ভেংচি কেটেছিল ও তাঁকে পাথর মেরেছিল, দুঃখের অশ্রু তাঁর গাল বেয়ে পড়েছিল ও তাঁর পা দিয়ে রক্ত ঝরেছিল। কোথায় তাঁর ফেরার জায়গা ছিল? কোথায় তাঁর আশ্রয় নেওয়ার স্থান ছিল? একমাত্র যার নিকট কেউ আশ্রয় চাইতে পারে তিনি হলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্। মুহাম্মাদ ﷺ কা'বার দিকে মুখ ফিরালেন, আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করলেন, তাঁর প্রশংসা করলেন এবং তাঁর দুঃখ-কষ্টের সময় তাঁকে সাহায্য করার জন্য তাঁর নিকট আকুল আবেদন করলেন। তায়েফের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তাঁর প্রভুর নিকট তাঁর নিম্নোক্ত প্রার্থনাটি পড়লেন–
اللهم إني أشكو إليك ضعف قوتي وقلة حيلتي وهواني على الناس، أنت أرحم الراحمين رب المستضعفين وأنت ربي، إلى من تكلني؟ إلى قريب يتجهمني؛ أو إلى عدو ملكته أمري؛ إن لم يكن بك علي غضب فلا أبالي، غير أن عافيتك هي أوسع لي، أعوذ بنور وجهك الذي أشرقت له الظلمات وصلح عليه أمر الدنيا والآخرة أن ينزل بي غضবক أو يحل بي سخطك، لك العتبى حتى ترضي، لاحول ولا قوة إلا بك।
ভাষার্থ : “হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট আমার দুর্বলতা, আমার কৌশলের অভাব ও মানুষের নিকট আমার অবমাননার অভিযোগ করছি। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাময় এবং দুর্বল, নিপীড়িত, অসহায়, নিঃস্ব ও দরিদ্রদের প্রভু; আর আপনি আমারও প্রতিপালক। কার নিকট আপনি আমাকে সোপর্দ করছেন? এমন আত্মীয়ের নিকট কি আমাকে সোপর্দ করছেন যে আমাকে ভ্রুকুটি করে অথবা কোন শত্রুকে আমার ব্যাপারে কর্তৃত্ব দিয়েছেন? আমার উপর যদি আপনার কোন রাগ না থাকে তবে আমি এতে কিছু মনে করি না; তা ছাড়া আপনার নিরাপত্তা ও ক্ষমা আমার জন্য সহজতর ও প্রশস্ত। আমার উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হওয়া থেকে আমি আপনার সত্তার সে নূরের ওসীলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি যার কারণে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলো বিকশিত হয়েছে আর দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যাপার (বিধান) ঠিক হয়ে গেছে। আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার সন্তুষ্টি চাইব বা আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব। আর আপনার সাহায্য ছাড়া (পাপ কাজ থেকে বাঁচার ও নেক আমল করার) কারো কোন সাধ্য নেই।” (জামে’ ছগীর, হাদীস নং-১৮৯০)