📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 শুধুমাত্র বুদ্ধিমান হওয়াই যথেষ্ট নয়- হেদায়াতও প্রয়োজন

📄 শুধুমাত্র বুদ্ধিমান হওয়াই যথেষ্ট নয়- হেদায়াতও প্রয়োজন


খবর শোনাকালীন আমি শুনতে পেলাম যে সাহিত্যে কোনো বিজয়ী নাট্যকার নাজিব মাহফুযকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যখন সংবাদ শুনছিলাম তখন আমার চিন্তা-ভাবনা তার লিখিত যে সব পুস্তক আমি পড়েছিলাম সে দিকে মোড় নিল এবং আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম। এই স্পষ্ট চতুরতা সত্ত্বেও সে সত্য সম্বন্ধে কতই না মূর্খ যে- মানবতার চেয়ে হিদায়াত উৎকৃষ্ট। চিরস্থায়ী জীবন ক্ষণস্থায়ী জীবনের চেয়ে উত্তম এবং ঐশী বিধান মানব রচিত বিধানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চতর (স্তরের)।

“যিনি সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করেন তিনি বেশি আনুগত্যের হকদার নাকি সে যাকে পথ প্রদর্শন করা না হলে, সে পথ পায় না?” (১০-সূরা ইউনুস : আয়াত-৩৫) তার বিস্ময়কর চিন্তা করার, উপস্থাপন করার ও অনুপ্রেরণা দান করার ক্ষমতাকে প্রয়োগ করে তিনি তার অনেক নাটক লিখেছিলেন। যা হোক শেষ পর্যন্ত তিনি শুধুমাত্র গল্পই রচনা করেছেন-সত্যের মাঝে যার কোন ভিত্তি নেই।

তার জীবনীর পর পর আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতিকে অনুধাবন করতে পেরে এটি বুঝেছি যে, কেউ নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়ে অন্যকে সুখী করতে পারে না। আপনি যখন নিজেই দুঃখী ও শোচনীয় অবস্থায়, তখন আপনি অন্যকে সুখী করবেন এটি সঠিক মনে করা যেতে পারে না এবং কখনও বাস্তববাদী মনে করবেন না। কিন্তু কিছু লেখক প্রতিভাবান লোকদের প্রশংসা করেছেন একারণে যে, তারা সুখ-শান্তিকে অনুধাবন করতে পেরেছেন বরং এ কারণে যে, তারা অন্যের নিকট আলো নিয়ে আসার জন্য নিজেদের অন্তরে আলো জ্বালতে পেরেছেন। যা হোক সত্যিকার প্রতিভাবান হলো সে ব্যক্তি, যার অন্তর হিদায়াতের আলোতে প্রথম আলোকিত হয় এবং পরে অন্যদেরকে পথ প্রদর্শন করে। সে সর্বপ্রথমেই নিজের জন্য হেদায়েতের ও কল্যাণের একটি ভিত্তি তৈরি করবে এবং পরে অন্যদের জন্য। আপনি নাজিব মাহফুযের লেখাগুলোয় পুরস্কার ও অদৃশ্য জগৎ সম্বন্ধে কোন ধারণা পাবেন না। যা আপনি পাবেন, যদিও তা কল্পনা, স্বপ্ন ও আবেগের দ্বারা তার রচনাবলি প্রলুব্ধকর ও মুগ্ধকর আর এ কারণে সেগুলো জনপ্রিয় ও সফল হয়েছিল। কিন্তু এ বিশাল রচনা সম্ভারে কোথায় কেউ উচ্চতর উদ্দেশ্য ও মহা সংবাদ খুঁজে পাবে? সত্য বলতে কি, তার বই-পুস্তকে এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে- এমনটি আপনি পাবেন না।

كُلًّا نَمُدُّ هَؤُلَاءِ وَهَؤُلَاءِ مِنْ عَطَاءِ رَبِّكَ ۚ وَمَا كَانَ عَطَاءُ رَبِّكَ مَحْظُورًا
“আমি তোমার প্রভুর দান থেকে এদেরকে ও তাদেরকে সাহায্য করি এবং তোমার প্রভুর দান নিষিদ্ধ নয়।” (১৭-সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত-২০)

আমি স্বীকার করি যে, নাজিব মাহফুজ যে কাজ করতে শুরু করেছিলেন তা তিনি বুঝেছিলেন, কিন্তু মানুষ সব সময় যা বুঝতে চেয়েছে তা বুঝার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। যা প্রয়োজন তা হলো আল্লাহ্ যা চান তা পূর্ণ করা।

“আল্লাহ চান তোমাদের নিকট (হালাল-হারামের বিধান) স্পষ্টরূপে বর্ণনা করতে। তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি তোমাদেরকে প্রদর্শন করতে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করতে। আর আল্লাহ হলেন মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ। আর আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান অথচ যারা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা চায় যে তোমরা ভীষণভাবে পথচ্যুত হয়ে যাও।” (৪-সুরা নিসা: আয়াত-২৬-২৭)

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে। তবে জান্নাত ও জাহান্নামবাসীদের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে লোকদেরকে চেনা যায়। লোকদেেক তাদের কথা ও কাজ দ্বারা বিচার-বিবেচনা করা যায়।

“কিন্তু তুমি অবশ্যই তাদের কথার ঢংয়ে তাদেরকে চিনতে পারবে।” (৪৭-সুরা মুহাম্মদ: আয়াত-৩০)

বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখলে পরিশেষে এই হয় যে, যখন কারো অন্তর থাকে বিপথগামী ও মিথ্যায় ভরপুর, তখন যদি সে রাজাও হয় তবে এতে তার কি লাভ হবে? মেধা ও সফলতা যদি কাউকে মুক্তির পথে পরিচালিত না করে তবে তারা কোন শুভ কাজের জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হবে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 অন্তরের সৌন্দর্যে বিশ্বজগতের সৌন্দর্য উপলব্ধি

📄 অন্তরের সৌন্দর্যে বিশ্বজগতের সৌন্দর্য উপলব্ধি


সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টিতে সুখী হতে হলে জীবনে সৌন্দর্য ও জাঁকজমক উপভোগ করা উচিত। এই আমোদ-প্রমোদ কেবলমাত্র ইসলাম প্রদত্ত (ইসলামের) সীমানা দ্বারাই সীমাবদ্ধ। আল্লাহ আমাদের জন্য সুন্দর সুন্দর জান্নাতও এজন্য সৃষ্টি করেছেন যে, তিনি নিজেই সুন্দর ও সুন্দরকে ভালবাসেন আর তাঁর নির্দেশনাগুলি নিয়ে যাতে আমরা গবেষণা করি এজন্য চমৎকার সৃষ্টির মাঝে তাঁর নির্দেশনাগুলি রয়েছে।

“পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সব কিছু তিনিই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-২৯)

সুতরাং, সুস্বাদু খাবার ও বিস্ময়কর দৃশ্য-এসব কিছু অন্তরে চপলতা, হাসি খুশিতা ও সুখ বয়ে আনে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنْ دُنْيَاكُمْ ثَلَاثٌ: الطِّيبُ وَالنِّসَاءُ، وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ.
ভাবার্থ: “তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার নিকট সুগন্ধি ও নারীদেরকে প্রিয় করে দেয়া হয়েছে আর সালাতে আমার চোখের শান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।”

চরম ও কঠোর আত্ম-সংযম কারো জীবনের চমৎকারিত্বকে নষ্ট ও বিরক্ত করে দেয়। তারা কষ্টের জীবন যাপন করে, তারা ইচ্ছা করেই চরম দরিদ্র জীবন-যাপন করে এবং তারা তাদের দেহকে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَقُومُ وَأَرْجُعُ وَأَتَزَوَّجُ النِّসَاءُ وَآكُلُ اللَّহْمَ. فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.
ভাবার্থ: “কিন্তু আমি কখনও রোযা রাখি আবার কখনও রোযা ভেঙে ফেলি, কখনও আমি রাত জেগে সালাত আদায় করি আবার কখনও বিশ্রাম করি, আমি নারীদেরকে বিবাহ করি এবং গোশতও খাই; অতএব, যে ব্যক্তি আমার রীতি-নীতিকে অপছন্দ করে (বা আমার তরীক্কা থেকে সরে যাবে) সে আমার দলভুক্ত নয়।”

কিন্তু কিছু সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এমন কিছু কাজ করে রেখেছে যা দেখতে অদ্ভুত ও বিতর্কিত; কেউ সুস্বাদু খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকবে; অন্যেরা হাসি ছেড়ে দিয়েছে এবং অন্যান্য এমনও লোকজন রয়েছে, যারা নিজেদেরকে টাটকা পানি পান করা থেকেও বিরত রেখেছে। তারা মনে করে যে এসব কাজ নিজেদেরকে শাসন করার জন্য। অথচ আসলে তারা নিজেদেরকে অত্যাচার করার ও নিজের আত্মার উজ্জ্বলতাকে নিভিয়ে ফেলার কাজ করছে।

আপনি বলে দিন, ‘আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে এবং হালাল ও পবিত্র খাদ্যকে কে হারাম করেছে?’ (৭-সুরা আল আ'রাফ: আয়াত-৩২)

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধু খেতেন অথচ তিনি সর্বাপেক্ষা ধার্মিক মানুষ ছিলেন। কারণ আল্লাহ্ মানুষকে খাওয়ার জন্য মধু সৃষ্টি করেছেন।

“তাদের (মৌমাছিদের) পেট থেকে নানা রঙ্গের (মধুর) পানীয় বের হয়, তাতে মানবজাতির জন্য আরোগ্য রয়েছে।” (১৬-সুরা আন নাহল: আয়াত-৬৯)

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন কুমারীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তিনি এমন নারীদেরকেও বিয়ে করেছিলেন, যারা বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা ছিল।

“অতএব তোমরা তোমাদের পছন্দসই নারীদের থেকে দুইটি, তিনটি অথবা চারটি (করে) বিয়ে কর।” (৪-সুরা আন নিসা: আয়াত-৩)

তিনি ধর্মীয় আনন্দসমূহে এবং অন্যান্য বিশেষ সময়ে উত্তম পোশাক পরিধান করতেন।

خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ
“প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর সুন্দর পোশাক পরিধান করো।” (৭-সুরা আল আ'রাফ: আয়াত-৩১)

যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য, যিনি সত্য ধর্মসহ প্রেরিত হয়েছেন, তিনি দেহ-মন উভয়কেই তৃপ্ত করেছেন।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 দুঃখ-কষ্টের পরেই আরাম-আয়েশ

📄 দুঃখ-কষ্টের পরেই আরাম-আয়েশ


দুঃখ-কষ্ট যতই কঠিন ও সুদূরপ্রসারী হোক না কেন তা কখনই চিরস্থায়ী হয় না, বরং কারো পরিস্থিতি যতই জটিল-কঠিন হয় তবে তা সহজসাধ্য হওয়া ও আরাম-আয়েশের নিকটবর্তী হয়। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য নেমে আসে। প্রতিটি অন্ধকার রাত্রির শেষ কি আলোকিত সকাল নয়?

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ভুল পদ্ধতি

📄 ভুল পদ্ধতি


আমি সম্প্রতি দুটি বই পড়েছি। দুটিই সে সহজতা ও সরলতা হতে বঞ্চিত যা শরীয়ত আমাদের জন্য চায়। প্রথমটি হলো ইমাম গাজ্জালীর 'এহইয়াউ উলুমিদ্দীন'। তিনি এমন কিছু হাদীস জমায়েত করেছেন, যার অধিকাংশই দুর্বল। তিনি সেসব হাদীসের উপর ভিত্তি করে এমন কিছু নিয়ম-নীতি তৈরি করেছেন যেগুলোকে তিনি মানুষকে তার প্রভুর নিকটতর করার শ্রেষ্ঠ উপায় মনে করেছেন। এ পুস্তকে 'বুখারী' ও 'মুসলিম'-এর সাথে তুলনা করে আমি স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করেছি। প্রথম পুস্তকে বাড়াবাড়ি, কঠোরতা ও কৃত্রিমতা আছে। পক্ষান্তরে বুখারী ও মুসলিমে সরলতা ও মধ্যমপন্থা আছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে, বুখারী ও মুসলিম আমাদের জন্য শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহ বর্ণনা করেন। এ সকল কিতাবের তুলনা করে আমি নিম্নোক্ত আয়াতের অধিকতর গভীর অর্থ পেয়েছি। “ (হে মুহাম্মাদ ﷺ) আমি আপনার জন্য সহজ পথ ও আমলকে আরো সহজ করে দিব।” (৮৭-সূরা আল আ'লা : আয়াত-৮) দ্বিতীয় বইটি হলো আবু তালিব মক্কীর 'কুতুল কুলুব'। এতে তিনি পাঠককে এ জীবন পরিত্যাগ করতে, কাজ ত্যাগ করতে, এমনকি হালাল আনন্দ থেকে বিরত থাকতে এবং কঠোর আত্ম-সংযম ও কৃচ্ছতা সাধন করার চেষ্টা করতে উৎসাহ দেন। আবু হামীদ গাজ্জালী এবং আবু তালিব মক্কী দু'জন লেখকেরই ভালো উদ্দেশ্য ছিল। তবুও সমস্যা এ ছিল যে তারা হাদীসের জ্ঞান অপর্যাপ্ত ও দুর্বল ছিল। এ কারণে তাদের চিন্তাধারায় ভুল ঢুকে গেছে। তাদের ভুল থেকে আমাদের এ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, পথ প্রদর্শককে অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। তার অবশ্যই এমন একটি নির্ভুল মানচিত্র থাকতে হবে, যা কারো গন্তব্যে পৌঁছার বিভিন্ন পথ প্রদর্শন করে। وَلَكِنْ كُونُوا رَبَّানِيِّينَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرُسُونَ - “বরং তোমরা রাব্বানী (ইলাহের সাধক) হয়ে যাও; যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দিচ্ছ এবং যেহেতু তোমরা (কিতাব) অধ্যয়ন করছ।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-৭৯) (রাব্বানী অর্থ হলো– ইলাহের সাধক বা রবের গুণে গুণান্বিত বা আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী অনুরাগী যে ব্যক্তি আমল করে এবং অন্যকে সে জ্ঞান শিক্ষা দেয়।)

ফন্ট সাইজ
15px
17px