📄 সতর্কতা অবলম্বন করুন
মানুষের জীবনের প্রতিটি পরতে, পটে ও ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং প্রতিটি কাজের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভেবে দেখা উচিত। সতর্ক হলে ভবিষ্যতে নিজেকে তিরস্কার করার কোন কারণ থাকবে না। যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল শুন্য হয় তবে অবশ্যই তার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করা ও তাঁর প্রশংসা করা। আর যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল ততটা ভালো না হয় তবে তার বলা উচিত, “আল্লাহ্ তাঁর বিধানকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি যা চান, তা-ই করেন।”
📄 এ পার্থিব জীবন
মানুষের পরকালীণ কল্যাণ নির্ভর করে কিভাবে সে এ জীবনে নিজের সাথে আচরণ করে তার উপর। এ জীবন ও পরবর্তী জীবনের মাঝে যে সম্পর্ক তা মনে রাখা প্রত্যেক মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। কেননা, কেউ কেউ ভেবেছে যে, একমাত্র এ পৃথিবীতে সব (পরকাল বলতে কিছু নেই)। তারা সম্পদ জমা করে এবং এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের সময় অতিবাহিত করে। তারপর তারা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে তাদের বুকের ভিতর অপূর্ণ রাখে এবং তা নিয়ে মারা যায়।
মাঝে মাঝে আমি এ পৃথিবীতে আমাদের দীর্ঘকালীন আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং এমন জীবনের জন্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাতে বিস্ময়বোধ করি যে জীবনে মানুষ যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারে।
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا . وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ . “কেউ জানে না সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে আর কেউ জানে না সে কোথায় মরবে।” (১০-সূরা লুকমান : আয়াত-৩৪)
নিজেকে এ প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করুন:
১. আপনি কি সত্যি সত্যি মনে করেন যে, আপনার প্রভুর প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে বা তার তকদীর বা বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে এবং আপনার রিযিক ও মেধা নিয়ে অসন্তুষ্ট থেকে আপনি শান্তি ও প্রশান্তি খুঁজে পাবেন?
২. আপনি কি আপনার প্রভুর কল্যাণ ও অনুগ্রহের জন্য যথাযথভাবে ধন্যবাদ দিয়েছেন, যাতে আপনি অন্যান্য চাওয়ার যোগ্য হতে পারেন? যে ব্যক্তি অল্প কাজ পরিচালনা করতে অক্ষম, তার তো অধিক কাজ পরিচালনা করতে আরো বেশি অক্ষম হওয়ার কথা।
৩. আল্লাহ্ আমাদেরকে যে মেধা দান করেছেন তাকে যখন আমরা উন্নত ও সংস্কার করতে ব্যর্থ হই, তখন কেন আমরা তিনি যেটুকু মেধা দিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হবো? যদি সে মেধাকে কাজে লাগাতাম তবে আমরা অন্যকে কিছু দিতে পারতাম এবং সমাজে অবদান রাখতে পারতাম।
কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি ও মেধা প্রায়ই আমাদের ভিতরে লুকায়িত থাকে। তবুও আমাদের অনেকের মধ্যে মেধা মূল্যবান খনিজ পদার্থের মতো ভূ-গর্ভে লুকায়িত থাকে। এসব খনিজ পদার্থকে একমাত্র অভিজ্ঞ ব্যক্তিই খুঁজে বের করতে পারে এবং ধুয়ে-মুছে চকচক করে তুলতে পারে। সুতরাং আমাদের কাজ হলো আমাদের মেধাকে খুঁজে বের করা ও তারপর একে উন্নত করা।
📄 ক্ষতি থেকে পলায়ন ক্ষণস্থায়ী সমাধান
আব্দুল গণি আল আইদির লিখিত ‘আলমুতাওয়াফুন’ বা ‘পলাতক’ নামক পুস্তকখানি আমি পড়েছি। এটি একটি মজাদার পুস্তক। এতে তাদের কাহিনী বর্ণিত আছে যারা তৎকালীন নির্মম, উৎপীড়ক, সার্বভৌম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট বন্দী হয়ে আসার ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
আবু উমর ইবনুল উলা তাঁর কষ্টের কথা বলেছেন, “আমাকে যখন হাজ্জাজ হুমকি দিল তখন আমি ইয়েমেনে পালিয়ে গিয়ে সানআতে এক গৃহে ছিলাম। রাতে আমি ছাদে বসে থাকতাম আর দিনে ঘরে লুকিয়ে থাকতাম।” এক রাতে ছাদে থাকাকালে তিনি এক লোককে আবৃত্তি করতে শুনলেন– مَا تَجَرَّعَ النَّفْسُ مِنْ الْأَمْرِ * لَهُ فَرَجَةٌ كَخُلْ الْعَقَالِ। জওয়াবঃ “আত্মা হয়তো এমন বিষয়ের ভয়ে ভীত, রশি খোলার মতো যার সমাধান রয়েছে।”
আবু উমর আরো বলেছেন, লোকটি যখন বলল, ‘সমাধান’ তখন আমি আমার আশার সঞ্চার অনুভব করলাম ও নিজেকে সুখী বোধ করলাম। আর আমি শুনলাম যে আরেক লোক ঘোষণা দিচ্ছে, হাজ্জাজ মারা গেছে। এতে বাকি কথার ব্যাখ্যা হয়ে গেল। আল্লাহর কসম, আমি জানি না যে, ‘সমাধান’ ও ‘হাজ্জাজ মারা গেছে’ এ দুইটি কথার কোনটি আমাকে আনন্দিত করেছে।
একমাত্র একটি সিদ্ধান্ত বা ফয়সালা আছে আর তা অবশ্যম্ভাবী ও অবশ্যই তা বাস্তবায়িত হবে। আর সে সিদ্ধান্তের ফয়সালা হল তাঁর সিদ্ধান্ত বা ফয়সালা যাঁর হাতে আসমান-জমিনের নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্ব ও শাসন। “সর্বদা তিনি কাজে রত।” (৫৫-সূরা আর রহমান: আয়াত-২৯) (অর্থাৎ, কাউকে সম্মান দান, কাউকে অপমানিত করা, কাউকে জন্মের মাধ্যমে জীবন দান, কাউকে মৃত্যু দান করা ইত্যাদি কাজে আল্লাহ সর্বদা ব্যস্ত থাকেন।)
হাসান বসরী (র)-কেও হাজ্জাজ বিন ইউসুফ থেকে পালাতে হয়েছিল। হাজ্জাজের মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে হাসান বসরী (র) সেজদা করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। “তাদের জন্য আসমান-জমিন কেউ কাঁদেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেওয়া হয়নি।” (৪৪-সূরা আদ দোখান: আয়াত-২৯)
ইবরাহীম আন-নাখয়ীও হাজ্জাজের কারণে লুকিয়ে ছিলেন। হাজ্জাজের মৃত্যু সংবাদ যখন তাঁর নিকট পৌঁছল তখন তিনি আনন্দে কেঁদে ফেলে বললেন– طَفْحَ السُّرُوْরُ عَلَى حَتَّى رَامَنِيْ * مَنْ عِظَمٍ مَّا قَدْ سُرَّنِيْ أَبْكَانِيْ ভাবার্থ: আনন্দ আমাকে এতোটাই পরাভূত করেছে যে, আমি আনন্দে কেঁদে ফেলেছি।” “আর আমি তোমাদেরকে কতককে কতকের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ করে দিয়েছি। তোমরা ধৈর্য ধরবে কি? আর তোমার প্রতিপালক তো সর্বদ্রষ্টা।” (২৫-সূরা আল ফুরকান: আয়াত-২০)
একবার একটি লাল বর্ণের কবুতর নবী করীম ﷺ-এর মাথার উপর দিয়ে উড়ছিল। এটা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিল। নবী করীম ﷺ বললেন– মَنْ فَجَعَ بِفَرْخَيْهَا رُدُّوا عَلَيْهَا أَفْرَاখَهَا “কে এটার ছানাকে ছিনিয়ে নিয়ে এটাকে কষ্ট দিয়েছ? এটাকে এর ছানা ফিরিয়ে দাও।” এ বিষয়ে মন্তব্য করে একজন বলেছেন– جَاءَتْ إِلَيْكَ حَمَامَةٌ مُسْتَغَاثَةٌ * تَشْكُو إِلَيْكَ بِقَلْبِ صَبٍّ وَاجِفِ. مِنَ أَخْيَرِ الْوَرْقَاِءِ إِنْ مَكَانَكُمُ * حَرَمٌ وَأَنَّكَ مَلْجَأٌ لِلْخَائِفِ. ভাবার্থ: “এক কবুতর আশা করে আপনার নিকট এসে অস্থির প্রেমিকের আত্মা নিয়ে আপনার নিকট অভিযোগ করল। সে কি জানত যে, আপনি নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং ভীত-সন্ত্রস্তদের জন্য অভয় আশ্রয়স্থল!”
সাঈদ ইবনে যুবাইর (রা) বলেছেন, “আল্লাহর কসম, আমি কিছুকাল সর্বদা হাজ্জাজ থেকে পালিয়ে বেড়ালাম। অবশেষে আমি লজ্জিত বোধ করলাম!” একথা বলার অল্পকাল পরেই তাকে হাজ্জাজের সামনে হাজির করা হলো। যখন তরবারি কোষমুক্ত করে তাঁর মাথার উপর তুলে ধরা হলো, তখন তিনি হাসলেন। হাজ্জাজ বলল, “আপনি কেন হাসলেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি যখন গভীরভাবে চিন্তা করলাম, তখন আমার মনে একটি ধারণা হলো আর তাহলো, আল্লাহর প্রতি তোমার ধৃষ্টতা এবং তোমার প্রতি আল্লাহর করুণা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম।” ঐ পরিস্থিতিতে বিষয়াদিকে ঐ আলোকে দেখা অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ সহিষ্ণুতা ও আল্লাহর অঙ্গীকারের প্রতি ঈমান (বিশ্বাস) ও নির্ভরতা প্রদর্শন করেছে।
📄 মধ্যম পন্থা ধ্বংস থেকে রক্ষা করে
দু'টি বিষয় মানুষকে সুখী জীবন পরিচালনা করতে সাহায্য করে- ১. রাগে আত্মসংযম। ২. আশা পূরণে আত্মসংযম। প্রত্যেককে তার আশা পূরণে আত্মসংযমী হতে হবে। অন্যথায় তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কামনা-বাসনা এতটা বেড়ে যাবে যে, সে সর্বদা পরিতৃপ্ত হতে চাইবে। ফলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। রাগ সম্বন্ধেও একই কথা বলা যেতে পারে। কেননা এটাও ধ্বংস করে দিতে পারে।
সকল কাজে যা প্রয়োজন তা হলো মধ্যম পন্থা। অতিরিক্ত শক্তি উগ্রতা, হিংস্রতা ও হত্যাকে সহজ করে তোলে। পক্ষান্তরে, যদি শক্তির ঘাটতি থাকে তবে কেউ অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু যখন কেউ শক্তিকে পরিমিতভাবে ব্যবহার করে তখন সে ধৈর্য, বীরত্ব ও প্রজ্ঞা ইত্যাদি গুণাবলীকে যথাস্থানে ও যথাসময়ে প্রদর্শন করতে পারে। একই কথা আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্যও খাটে। যদি অতিরিক্ত কামনা-বাসনা থাকে তবে শয়তানি ও লালসাপরায়ণতা প্রাধান্য পাবে। আর যদি খুব কম আশা-ভরসা থাকে তবে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়বে। যা হোক, আশা-আকাঙ্ক্ষা যদি পরিমিত পরিমাণে থাকে তবে চারিত্রিক পবিত্রতা ও পরিতৃপ্তি উভয়ই অর্জন করা যাবে। হাদীস শরীফে আছে- عَلَيْكُمْ مِدْيَا فَأَمَرُ “তোমাদেরকে মধ্যপন্থী হেদায়েত অনুসরণ করতে হবে।”
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا.
“আর এরূপে আমি তোমাদেরকে ন্যায়পন্থী জাতি বানিয়েছি।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-১৪৩)