📄 তারা যেভাবে জীবন যাপন করতেন
আসুন পিছনে গিয়ে দেখি একটি দরিদ্র দেশে নবী করীম ﷺ-এর একজন সাহাবী কীভাবে জীবন যাপন করতেন। আলী ইবনে আবু তালেব (রা) যিনি নবী করীম ﷺ-এর কন্যা ফাতেমা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন, একদিন ভোরে তিনি জেগে উঠলেন এবং খাবার তালাশ করলেন। কিন্তু তাদের ঘরে খাবার বা কোন কিছু পাওয়া গেল না। শীতকালের কোন এক কনকনে ঠাণ্ডা দিনে এ ঘটনা ঘটেছিল। তাই আলী (রা) কিছু গরম কাপড় পরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি নগরীর চারদিকে তালাশ করলেন কিন্তু কিছু পেলেন না এবং অবশেষে তাঁর এক ইহুদীর কথা মনে পড়ল, যার একটি বাগান ছিল।
আলী (রা) যখন বাগানে পৌঁছলেন তখন ইহুদী বলল, “হে আরবী লোক, এসে আমাকে খেজুর পেড়ে দাও, একটি বড় বালতি ভরিয়ে দিলে তোমাকে একটি খেজুর দিব।” তাই তিনি দীর্ঘ সময় যতক্ষণ না তার হাতে ও শরীরে ব্যথা হতে লাগল ততক্ষণ কঠোর পরিশ্রম করলেন। তিনি যে সামান্য কয়টি খেজুর উপার্জন করলেন তা নিয়ে তিনি নবী করীম ﷺ-এর সাথে সাথে খাওয়ার জন্য রাসূল ﷺ-এর নিকট চলে গেলেন। যে ক'টি অতিরিক্ত ছিল তিনি ও ফাতেমা (রা) সে ক'টিকে বাকি দিনের জন্য রেখে দিলেন।
এই ছিল তাদের জীবন। তবুও বস্তুবাদী মানসিকতা সম্পন্ন লোকের নিকট যা বিপরীত মনে হতে পারে তা হল- তাদের ঘর-বাড়ি আধ্যাত্মিক আলোতে ও সুখে ভরা ছিল। নবী করীম ﷺ-এর নিকট যে মহান মূলনীতি অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে তাদের অন্তর ভরপুর ছিল। তাদের অন্তরকে আধ্যাত্মিক আলোতে তারা সত্যকে উপলব্ধি করে তা গ্রহণ করেছেন এবং একই সাথে তারা মিথ্যাকে চিনে তা বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা সত্যের পথে কাজ করেছেন এবং মিথ্যার পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছেন। তারা বস্তুর যথার্থ মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন।
“(এটাতো) বৃষ্টির পরে উৎপন্ন ফসলের মত, যা কৃষককে মোহিত করে, পরে শুকিয়ে যায় তখন তুমি এটাকে হলুদ দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটা হয়ে যায়।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২০)
সত্যিকার সুখ ছিল বিলাল (রা)-এর, আম্মার (রা)-এর ও সালমান (রা)-এর। বিলাল (রা) ছিলেন সত্যের আহ্বায়ক, সালমান (রা) ছিলেন সত্যবাদী ও আম্মার (রা) ছিলেন দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্ত।
📄 সম্মানে ভূষিত হওয়াও পরীক্ষা
কেউ যদি ক্ষমতা, সম্মান, সামাজিক মান, পদমর্যাদা ও সম্পদ দ্বারা ভূষিত হয়, তবে তাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে সে পরীক্ষিত হচ্ছে। সুলাইমান (আ) যখন রাণী বিলকিসের সিংহাসনকে তাঁর সামনে হাজির দেখলেন তখন তিনি বললেন- هٰذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّيْ ؕ لِيَبْلُوَنِيْ ۤاَاَشْكُرُ اَمْ اَكْফُرُ “এটা তো আমার প্রতিপালকের দয়া বদৌলতে, আমাকে পরীক্ষা করার জন্য- আমি কি কৃতজ্ঞ হই নাকি অকৃতজ্ঞ হই।” (২৭-সূরা আন নামল: আয়াত-৪০)
আল্লাহ্ কাউকে কোন কল্যাণ দান করে দেখতে চান যে, কে এর জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে এটাকে হেফাজত করে এবং সৎ উপায়ে এর সুবিধা ভোগ করে এটাকে যথাযথভাবে গ্রহণ করে এবং এও দেখতে চান যে, কে অকৃতজ্ঞ হয়ে কুপথে অপচয় করে অথবা এমনকি প্রথমত এমনিও বলে থাকে যে এটা দান করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এটাকে ব্যবহার করে এটাকে (নেয়ামতকে) অস্বীকার করে।
অতএব, আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, নেয়ামতরাশি হলো আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অগ্নিপরীক্ষারূপ। কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কৃতজ্ঞদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয়, পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞরাও চিহ্নিত হয়ে যায়। আর আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্ আমাদেরকে সুসময়ে এবং দুঃসময়েও পরীক্ষা করেন। “আর মানুষতো এমন যে, যখন তার প্রতিপালক তাকে সম্মানিত করে ও তাকে অনুগ্রহ দান করে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত করেছেন।” কিন্তু যখন তিনি তার রিযককে সংকুচিত করে দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রতিপালক আমাকে অপমানিত করেছেন।” কখনও না....!” (৮৯-সূরা আল ফাজর: আয়াত-১৫-১৭)
📄 সতর্কতা অবলম্বন করুন
মানুষের জীবনের প্রতিটি পরতে, পটে ও ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং প্রতিটি কাজের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভেবে দেখা উচিত। সতর্ক হলে ভবিষ্যতে নিজেকে তিরস্কার করার কোন কারণ থাকবে না। যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল শুন্য হয় তবে অবশ্যই তার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করা ও তাঁর প্রশংসা করা। আর যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল ততটা ভালো না হয় তবে তার বলা উচিত, “আল্লাহ্ তাঁর বিধানকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি যা চান, তা-ই করেন।”
📄 এ পার্থিব জীবন
মানুষের পরকালীণ কল্যাণ নির্ভর করে কিভাবে সে এ জীবনে নিজের সাথে আচরণ করে তার উপর। এ জীবন ও পরবর্তী জীবনের মাঝে যে সম্পর্ক তা মনে রাখা প্রত্যেক মানুষের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। কেননা, কেউ কেউ ভেবেছে যে, একমাত্র এ পৃথিবীতে সব (পরকাল বলতে কিছু নেই)। তারা সম্পদ জমা করে এবং এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের সময় অতিবাহিত করে। তারপর তারা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে তাদের বুকের ভিতর অপূর্ণ রাখে এবং তা নিয়ে মারা যায়।
মাঝে মাঝে আমি এ পৃথিবীতে আমাদের দীর্ঘকালীন আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং এমন জীবনের জন্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাতে বিস্ময়বোধ করি যে জীবনে মানুষ যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারে।
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا . وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ . “কেউ জানে না সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে আর কেউ জানে না সে কোথায় মরবে।” (১০-সূরা লুকমান : আয়াত-৩৪)
নিজেকে এ প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করুন:
১. আপনি কি সত্যি সত্যি মনে করেন যে, আপনার প্রভুর প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে বা তার তকদীর বা বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে এবং আপনার রিযিক ও মেধা নিয়ে অসন্তুষ্ট থেকে আপনি শান্তি ও প্রশান্তি খুঁজে পাবেন?
২. আপনি কি আপনার প্রভুর কল্যাণ ও অনুগ্রহের জন্য যথাযথভাবে ধন্যবাদ দিয়েছেন, যাতে আপনি অন্যান্য চাওয়ার যোগ্য হতে পারেন? যে ব্যক্তি অল্প কাজ পরিচালনা করতে অক্ষম, তার তো অধিক কাজ পরিচালনা করতে আরো বেশি অক্ষম হওয়ার কথা।
৩. আল্লাহ্ আমাদেরকে যে মেধা দান করেছেন তাকে যখন আমরা উন্নত ও সংস্কার করতে ব্যর্থ হই, তখন কেন আমরা তিনি যেটুকু মেধা দিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হবো? যদি সে মেধাকে কাজে লাগাতাম তবে আমরা অন্যকে কিছু দিতে পারতাম এবং সমাজে অবদান রাখতে পারতাম।
কাঙ্ক্ষিত গুণাবলি ও মেধা প্রায়ই আমাদের ভিতরে লুকায়িত থাকে। তবুও আমাদের অনেকের মধ্যে মেধা মূল্যবান খনিজ পদার্থের মতো ভূ-গর্ভে লুকায়িত থাকে। এসব খনিজ পদার্থকে একমাত্র অভিজ্ঞ ব্যক্তিই খুঁজে বের করতে পারে এবং ধুয়ে-মুছে চকচক করে তুলতে পারে। সুতরাং আমাদের কাজ হলো আমাদের মেধাকে খুঁজে বের করা ও তারপর একে উন্নত করা।