📄 দুনিয়ার হাল-হাকিকত
যে যে পরিমাণ আল্লাহ্র যিকির করে ও তাঁর কিতাব কুরআন তিলাওয়াত করে সে সে পরিমাণ সুখী হবে। এ মূলনীতিকে দেখে শেখার পরই কেউ এ দুনিয়াতেও ও আখিরাতেও তার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে。
“যদি না (কুফুরিতে) মানুষদের একমত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকত তবে যারা পরম করুণাময়কে অস্বীকার করে তাদের ঘর-বাড়ির জন্য আমি রূপার ছাদ ও তার ওপরে চড়ে তারা ওপরে উঠে সেই সিঁড়ি বানিয়ে দিতাম। এবং তাদের বাড়ি-ঘরের জন্য দরজা ও যাতে তারা হেলান দেয় সেই পালঙ্ক বানিয়ে দিতাম। এবং বহু বর্ণ নির্মিত নানান সৌন্দর্যের উপকরণ ও অলংকারও বানিয়ে দিতাম। আর এসব কিছু তো দুনিয়ার ভোগের সামগ্রী মাত্র। অথচ আপনার প্রভুর নিকট রয়েছে মুত্তাকীদের জন্য আখিরাতের (অতি উত্তম) মহাপুরস্কার।” (৪৩-সূরা আয যুখরুফ : আয়াত-৩৩-৩৫)
এই আয়াত পরিষ্কারভাবে পার্থিব পদমর্যাদা ও সামাজিক মানের ক্ষণস্থায়ী (এবং সে কারণেই তুচ্ছ) মূল্যের ঘোষণা দেয়। যখন আমরা দেখি যে কাফেররা প্রায়ই সমৃদ্ধ জীবন যাপন করে পক্ষান্তরে মুমিনেরা প্রায়ই পার্থিব আমোদ-প্রমোদ বর্জিত জীবন যাপন করে, তবে আমাদের একথা বুঝা উচিত নয় যে, এ জীবনই সফলতার মাপকাঠি। পার্থিব আমোদ তো এমন লক্ষণ যা কেবলমাত্র এ পৃথিবীর তুচ্ছ মূল্যেরই ইঙ্গিত করে।
নবী করীম ﷺ-এর প্রসিদ্ধ সাহাবী উরওয়া ইবনে গাওয়ান (রা) এক দুঃসময়ে দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে নবী করীম ﷺ-এর সাথে অতীতের দিনগুলি কী অবস্থায় কেটেছে তার স্মৃতিচারণ করে উচ্চস্বরে বলছিলেন। তিনি বলছিলেন কীভাবে নবী করীম ﷺ-এর সাথে আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করতেন, কীভাবে নবী করীম ﷺ-এর সাথে ক্ষুধার তাড়নায় খাদ্যের অভাবে গাছের পাতা খেয়েছেন। তবুও এ সাহাবী (রা) সে সব দিনকে তার জীবনের সর্বাপেক্ষা সুখের দিন বলে ঘোষণা দিলেন। তারপর তিনি বর্ণনা দিলেন কীভাবে তিনি (রা) একটি অঞ্চলের শাসক হয়ে নবী করীম ﷺ-এর থেকে বিদায় নেন। এবং পার্থিব অবস্থার (মানের) উন্নতি সত্ত্বেও তিনি অনুভব করলেন যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তেকালের পর জীবনের সফলতার গুণ কতটা কমে গেছে!
সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) যখন কুফার গভর্নর ছিলেন তখন নবী করীম ﷺ-এর ইন্তেকালে তিনি পাগলপারা হয়ে গেলেন। তিনিও নবী করীম ﷺ-এর জীবনকালে (তাঁর সাথে খাদ্যের অভাবে) গাছের পাতা ও মৃত পশুর চামড়া খেয়েছেন। নবী করীম ﷺ-এর সাহচর্যে থাকাকালে তাঁর পুরাতন জীবনের স্বাদ উপভোগ করার পর তিনি তাঁর নতুন জীবনের প্রাসাদকে সহ্য করতে পারলেন না।
وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
“এবং নিশ্চয় আখিরাত তোমার জন্য দুনিয়ার তুলনায় শ্রেষ্ঠ।” (৯৩-সূরা আদ দোহা : আয়াত-৪)
অতএব, আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি গোপন রহস্য আছে – আর তাহলো এ পৃথিবীর তুচ্ছতা জানা। “তারা কি মনে করে যে আমি যে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়েছি তাতে তাদের কল্যাণের ব্যাপারে ত্বরান্বিত করছি? তা নয়, বরং তারা তা বুঝে না!” (২৩-সূরা আল মুমিনুন : আয়াত-৫৫-৫৬)
উমর (রা) যখন নবী করীম ﷺ-এর ঘরে প্রবেশ করলেন তখন তিনি নবী করীম ﷺ পার্শ্ব দেশে খেজুরের চাটাইয়ের দাগ দেখতে পেলেন, যা চাটাইয়ে শোয়ার ফলে সৃষ্ট হয়েছে। এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু দরদর করে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। সকলের আদর্শ ও নেতা আল্লাহ্র রাসূল ﷺ এমন অবস্থায়!
“আর তারা বলে এ রাসূলের কী হলো যে সে আমাদের মতো বা মানুষের মত খায়-দায় ও বাজারে চলা-ফেরা করে।” (২৫-সূরা ফুরকান : আয়াত-৭) উমর (রা) বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তো জানেন যে খসরু ও কায়সার কীভাবে জীবন যাপন করে!
নবী করীম ﷺ উত্তর দিলেন:-
أَفِي شَكٍّ أَنْتَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ: أَمَا تَرْضَىٰ أَن تَكُونَ لَنَا الْآخِرَةُ وَلَهُمُ الدُّنْيَا
“হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি সন্দেহে আছ? আমাদের জন্য আখিরাত আর তাদের জন্য দুনিয়া এতে কি তুমি সন্তুষ্ট নও?”
এটা হলো ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য ও সুন্দর বণ্টন। অতএব, যারা ভুরি ভুরি টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, দালান-কোঠা ও গাড়ি-ঘোড়ায় সুখ খুঁজে পায় তবে পাক। আল্লাহ্র কসম নিশ্চয় তারা কখনও সেসব জিনিসের মাঝে তা খুঁজে পাবে না।
“যারা দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য চায় আমি সেখানে তাদেরকে তাদের পুণ্যকর্মফল দিই আর সেখানে তাদেরকে কম দেওয়া হয় না। তাদের জন্যই পরকালে (আখিরাতে) দোযখ ছাড়া অন্য কিছু নেই এবং তারা যা এখানে (দুনিয়াতে) করত তা সেখানে বাতিল হয়ে যাবে।” (১১-সূরা হুদ : আয়াত-১৫-১৬)
📄 তারা যেভাবে জীবন যাপন করতেন
আসুন পিছনে গিয়ে দেখি একটি দরিদ্র দেশে নবী করীম ﷺ-এর একজন সাহাবী কীভাবে জীবন যাপন করতেন। আলী ইবনে আবু তালেব (রা) যিনি নবী করীম ﷺ-এর কন্যা ফাতেমা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন, একদিন ভোরে তিনি জেগে উঠলেন এবং খাবার তালাশ করলেন। কিন্তু তাদের ঘরে খাবার বা কোন কিছু পাওয়া গেল না। শীতকালের কোন এক কনকনে ঠাণ্ডা দিনে এ ঘটনা ঘটেছিল। তাই আলী (রা) কিছু গরম কাপড় পরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি নগরীর চারদিকে তালাশ করলেন কিন্তু কিছু পেলেন না এবং অবশেষে তাঁর এক ইহুদীর কথা মনে পড়ল, যার একটি বাগান ছিল।
আলী (রা) যখন বাগানে পৌঁছলেন তখন ইহুদী বলল, “হে আরবী লোক, এসে আমাকে খেজুর পেড়ে দাও, একটি বড় বালতি ভরিয়ে দিলে তোমাকে একটি খেজুর দিব।” তাই তিনি দীর্ঘ সময় যতক্ষণ না তার হাতে ও শরীরে ব্যথা হতে লাগল ততক্ষণ কঠোর পরিশ্রম করলেন। তিনি যে সামান্য কয়টি খেজুর উপার্জন করলেন তা নিয়ে তিনি নবী করীম ﷺ-এর সাথে সাথে খাওয়ার জন্য রাসূল ﷺ-এর নিকট চলে গেলেন। যে ক'টি অতিরিক্ত ছিল তিনি ও ফাতেমা (রা) সে ক'টিকে বাকি দিনের জন্য রেখে দিলেন।
এই ছিল তাদের জীবন। তবুও বস্তুবাদী মানসিকতা সম্পন্ন লোকের নিকট যা বিপরীত মনে হতে পারে তা হল- তাদের ঘর-বাড়ি আধ্যাত্মিক আলোতে ও সুখে ভরা ছিল। নবী করীম ﷺ-এর নিকট যে মহান মূলনীতি অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে তাদের অন্তর ভরপুর ছিল। তাদের অন্তরকে আধ্যাত্মিক আলোতে তারা সত্যকে উপলব্ধি করে তা গ্রহণ করেছেন এবং একই সাথে তারা মিথ্যাকে চিনে তা বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা সত্যের পথে কাজ করেছেন এবং মিথ্যার পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছেন। তারা বস্তুর যথার্থ মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন।
“(এটাতো) বৃষ্টির পরে উৎপন্ন ফসলের মত, যা কৃষককে মোহিত করে, পরে শুকিয়ে যায় তখন তুমি এটাকে হলুদ দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটা হয়ে যায়।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২০)
সত্যিকার সুখ ছিল বিলাল (রা)-এর, আম্মার (রা)-এর ও সালমান (রা)-এর। বিলাল (রা) ছিলেন সত্যের আহ্বায়ক, সালমান (রা) ছিলেন সত্যবাদী ও আম্মার (রা) ছিলেন দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্ত।
📄 সম্মানে ভূষিত হওয়াও পরীক্ষা
কেউ যদি ক্ষমতা, সম্মান, সামাজিক মান, পদমর্যাদা ও সম্পদ দ্বারা ভূষিত হয়, তবে তাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে সে পরীক্ষিত হচ্ছে। সুলাইমান (আ) যখন রাণী বিলকিসের সিংহাসনকে তাঁর সামনে হাজির দেখলেন তখন তিনি বললেন- هٰذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّيْ ؕ لِيَبْلُوَنِيْ ۤاَاَشْكُرُ اَمْ اَكْফُرُ “এটা তো আমার প্রতিপালকের দয়া বদৌলতে, আমাকে পরীক্ষা করার জন্য- আমি কি কৃতজ্ঞ হই নাকি অকৃতজ্ঞ হই।” (২৭-সূরা আন নামল: আয়াত-৪০)
আল্লাহ্ কাউকে কোন কল্যাণ দান করে দেখতে চান যে, কে এর জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে এটাকে হেফাজত করে এবং সৎ উপায়ে এর সুবিধা ভোগ করে এটাকে যথাযথভাবে গ্রহণ করে এবং এও দেখতে চান যে, কে অকৃতজ্ঞ হয়ে কুপথে অপচয় করে অথবা এমনকি প্রথমত এমনিও বলে থাকে যে এটা দান করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এটাকে ব্যবহার করে এটাকে (নেয়ামতকে) অস্বীকার করে।
অতএব, আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, নেয়ামতরাশি হলো আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অগ্নিপরীক্ষারূপ। কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কৃতজ্ঞদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয়, পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞরাও চিহ্নিত হয়ে যায়। আর আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্ আমাদেরকে সুসময়ে এবং দুঃসময়েও পরীক্ষা করেন। “আর মানুষতো এমন যে, যখন তার প্রতিপালক তাকে সম্মানিত করে ও তাকে অনুগ্রহ দান করে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রভু আমাকে সম্মানিত করেছেন।” কিন্তু যখন তিনি তার রিযককে সংকুচিত করে দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন তখন সে বলে, “আমার প্রতিপালক আমাকে অপমানিত করেছেন।” কখনও না....!” (৮৯-সূরা আল ফাজর: আয়াত-১৫-১৭)
📄 সতর্কতা অবলম্বন করুন
মানুষের জীবনের প্রতিটি পরতে, পটে ও ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং প্রতিটি কাজের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভেবে দেখা উচিত। সতর্ক হলে ভবিষ্যতে নিজেকে তিরস্কার করার কোন কারণ থাকবে না। যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল শুন্য হয় তবে অবশ্যই তার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) আদায় করা ও তাঁর প্রশংসা করা। আর যদি কারো প্রচেষ্টার ফলাফল ততটা ভালো না হয় তবে তার বলা উচিত, “আল্লাহ্ তাঁর বিধানকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি যা চান, তা-ই করেন।”