📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ক্ষণস্থায়ী মর্যাদা

📄 ক্ষণস্থায়ী মর্যাদা


সুখ যদি সত্যিকার হয় তবে এটা অবশ্যই (উপস্থিতির দিক থেকে) স্থায়ী এবং (আকারের) পূর্ণ। সদা বিরাজমান বলতে আমি বুঝাতে চাই যে, এটা কখনও দুশ্চিন্তা দ্বারা বিঘ্নিত হওয়া উচিত নয়। আর এটা দুনিয়া আখেরাত উভয়ের জন্য বিদ্যমান থাকা উচিত। যখন এটা সমস্যা ও দুশ্চিন্তা দ্বারা নষ্ট হয়ে না যায় বা কমে না যায় তখন এর পূর্ণতা বুঝা যায়।

ইরাকের এক সময়ের রাজা নু'মান ইবনুল মুনজির এক সময় মদপান করার জন্য একটি গাছের নিচে বসেছিল। তিনি আদী ইবনে যায়েদকে এসে তাকে উপদেশ দেয়ার জন্য ডাকলেন। আদী বলল, "হে বাদশা! আপনি কি জানেন এ গাছ কী বলে?" রাজা বলল, "না, এটা কী বলে?" আদী উত্তর দিলেন (এটা বলে)-

فَإِذَا رَكِبَ فَقَدْ أَخَذُوْا حَوْلَهُ * يَمْزُجُوْنَ الْخَمْرَ بِالْمَاءِ الزُّلَالِ * ثُمَّ سَارُوْا لِعَيْبِ الدَّهْرِ مِلْكِهِ * وَكَذَاكَ الدَّهْرُ لَا يَعْبَثُ بِمَالِ

ভাবার্থ : "আমার আশেপাশে কত লোকইনা আরাম তালাশ করল, বিশুদ্ধ পানির সাথে মদ মিশিয়ে পান করার জন্য। অতএব তাদের অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে গেল যে, যুগ তাদের সাথে খেলা করতে লাগল (তারা কালের চক্করে পড়ল)। আর যুগ তো এমনই যে, এটা সদা এই অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে যায়।"

রাজার নিকট যে পরিপক্ব কথা বর্ণনা হয়েছিল তা শুনে সে তিক্ত-বিরক্ত হয়ে গেল এবং সে মদপান ছেড়ে দিল ও মৃত্যু পর্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় ছিল।

ইরানের শাহ যখন পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ২৫০০ (দু'হাজার পাঁচশত) বছর উদযাপন করল, তখন সে তার রাজত্বের বাইরের অঞ্চলে তার ক্ষমতা বিস্তারের পরিকল্পনা করল। তখন অনতিবিলম্বেই সে ক্ষমতাচ্যুত হলো।

تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ
"যাকে ইচ্ছা আপনি রাজ্য দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা তার থেকে রাজ্য কেড়ে নেন।" (৩-সুরা আলে ইমরান: আয়াত-২৬)

তার প্রাসাদ ও তার দুনিয়া থেকে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সে বহু দূর দেশে নির্বাসিত ও নিঃস্ব অবস্থায় মারা যায়। কেউ তার জন্য চোখের পানিও ফেলেনি।

كَمْ تَرَكُوْا مِنْ جَنّٰتٍ وَّ عُيُوْنٍ * وَّ زُرُوْعٍ وَّ مَقَامٍ كَرِيْمٍ * وَّ نِعْمَةٍ كَانُوْا فِيْهَا فٰكِهِيْنَ
"কতইনা বাগ-বাগিচা, ঝর্ণাধারা, সবুজ-শ্যামল ফসলের মাঠ, সুন্দর-সুন্দর স্থান (সুমহান প্রাসাদসমূহ) ও ভোগ-বিলাস তারা ফেলে গেছে যেগুলোতে তারা আনন্দ-স্ফুর্তি করত।" (৪৪-সুরা আদ দুখান: আয়াত-২৫-২৭)

রুমানিয়ার প্রাক্তন রাজা চাউচেস্কুও একই ঘটনা। সে বাইশ বছর শাসন করেছিল এবং তার সভার হাজার হাজার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিল। কিন্তু অবশেষে তার নিজের লোকেরাই তার প্রাসাদকে ঘিরে ফেলে। তারা তার দেহ থেকে একটি একটি করে অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُوْنَهُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِيْنَ
"তখন আল্লাহর বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করার জন্য তার কোন দল ছিল না এবং সে নিজেও নিজেকে সাহায্য করার মতো ছিল না।" (১৮-সুরা আল কাহাফ: আয়াত-৪৩)

এভাবে সে মারা গেল কিন্তু তার সাথে কোন পার্থিব সম্পদ নিতে পারল না এবং আখেরাতের সাফল্যের কোন আশাও তার থাকল না।

আরেকটি উদাহরণ হলো ফিলিপাইনের প্রাক্তন নেতা মার্কোস। সে জনগণের উপর দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে নিজের জন্য সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জন করেছে। যখন তাকে তার দেশ, পরিবার ও ক্ষমতা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাকে একই রকম দুঃখ-কষ্টে ডুবিয়েছিলেন। আশ্রয়হীন অবস্থায় সে লজ্জাজনকভাবে মারা যায়; এমনকি তার নিজের লোকেরাও তাকে ফিলিপাইনে দাফন করতে দেয়নি।

أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِيْ تَضْلِيْلٍ
"তিনি কি তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দেননি?" (১০৫-সুরা আল ফীল: আয়াত-২)

"সুতরাং আল্লাহ তাকে তার প্রথম কথার ও শেষ কথার শাস্তি দিলেন।" (৭৯-সুরা আন না'জিয়া'ত: আয়াত-২৫)

তার শেষ কথা ছিল-
"আমি তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।" (৭৯-সুরা আন না'জিয়া'ত: আয়াত-২৪)

তার প্রথম কথা ছিল: "হে নেতৃবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য আছে বলে আমার জানা নেই।" (২৮-সুরা আল কাসাস: আয়াত-৩৮)

“অতএব, আমি তাদের প্রত্যেককেই তার পাপের কারণে পাকড়াও করেছিলাম (শাস্তি দিয়েছিলাম)।” (২৯-সুরা আল আনকাবুত: আয়াত-৪০)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 পুণ্যকর্মই সুখী জীবনের মুকুট

📄 পুণ্যকর্মই সুখী জীবনের মুকুট


সুখ-শান্তি অর্জন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে যারা ধর্মীয় ও চমৎকার চমৎকার কাজে ব্যস্ত থাকে। নবী করীম ﷺ বলেছেন - اِحْرِصْ عَلٰى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللهِ - “যা তোমার উপকার করবে তা করার জন্য আকাঙ্ক্ষা (চেষ্টা) কর এবং (তা করার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও)।”

একজন সাহাবী (রা) নবী করীম ﷺ-এর সঙ্গী হওয়ার জন্য আবেদন করলে নবী করীম ﷺ উত্তর দিয়েছিলেন- أَعِنِّى عَلٰى نَفْسِكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلّٰهِ سَجْدَةً إلا رَفَعَكَ بِهَا دَرَجَةً- ভাবার্থ : বেশি বেশি সেজদা করে আমাকে তোমার সাহায্য করতে সাহায্য কর। কেননা, প্রতিটি সেজদার বিনিময়ে আল্লাহ তোমার একটি করে মর্তবা বৃদ্ধি করে দিবেন।

আরেকজন সাহাবী (রা) নবী করীম ﷺ-কে আবদার করলেন, তাকে এমন এক আমল শিখিয়ে দিতে যা ব্যাপক কল্যাণকর। নবী করীম ﷺ তাকে বললেন- لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِّنْ ذِكْرِ اللّٰهِ - ভাবার্থ : “আল্লাহর জিকিরে যেন তোমার জিহ্বা সদা তরতাজা থাকে।”

তৃতীয় এমন আরেকজন কল্যাণ সন্ধানীর জবাবে নবী করীম ﷺ বলেছেন- لَا تَسْبِنَّ اَحَدًا، وَلَا تَضْرِبَنَّ بِيَدِكَ اَحَدًا وَإِنْ أَحْدَسَكَ بِمَا يَعْلَمُ فِيكَ فَلَا تَسْبُبْ بِهِ، وَلَا تَخْفِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَفْرَغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ الْمُسْتَسْقِى -
ভাবার্থ : “কাউকে গালি দিও না, তোমার হাত দ্বারা কাউকে মারবে না (আঘাতও করবে না)। কেউ যদি তোমার কোন ত্রুটি জানার কারণে তোমাকে গালি দেয়, তবে তুমি তার কোন ত্রুটি থাকলেও তাকে গালি দিবে না এবং কোন নেক আমলকে তুচ্ছ মনে করবে না (তা করতে অবহেলা করবে না) যদিও তা তোমার বালতি থেকে তৃষ্ণার্তের পাত্রে পানি ঢালার কাজ হয়।”

وَسَارِعُوْا إِلٰى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ - “এবং তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে তোমরা ত্বরায় ধাবিত হও।” (৩-সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৩৩) “নিশ্চয় তারা নেক কাজে প্রতিযোগিতা করত।” (২১-সূরা আল আম্বিয়া: আয়াত-৯০) وَالْسّٰبِقُوْনَ السَّابِقُوْনَ- “আর যারা (এ পৃথিবীতে নেক কাজে) অগ্রসর তারা (আখেরাতে জান্নাত প্রাপ্তিতে) অগ্রসর হবে।” (৫৬-সূরা আল ওয়াক্কায়াহ: আয়াত-১০) নেক আমল করার সময় (সুযোগ) হলে তা করতে (কখনও) দেরি করবে না।

উমর (রা) যখন আততায়ীর হাতে ছুরির আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং তাঁর রক্ত দরদর করে গড়িয়ে পড়ছিল, তখন তিনি একজন যুবককে তার লুঙ্গি মাটিতে হেঁচড়াতে দেখে বললেন, “হে ভাতিজা! তোমার কাপড় (লুঙ্গি) উপরে উঠাও। কেননা, এ কাজ অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও তোমার কাপড়ের জন্য অধিকতর পবিত্র।” মৃত্যু-যন্ত্রণাকালে তিনি অন্যদেরকে নেক আমল করার দাওয়াত দিলেন। “তোমাদের যে (নেক আমল করে) আগে বাড়তে চায় বা (বদ আমল বা পাপ করে) পিছনে পড়তে চায় তার জন্য।” (৭৪-সূরা আল মুদ্দাচ্ছির: আয়াত-৩৭)

বেশি বেশি ঘুমিয়ে, আরাম তালাশ করে বা আমলে সালেহ্ করতে অনীহ হয়ে অবশ্যই সুখ পাওয়া যায় না। “কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে অভিযানে পাঠানো পছন্দ করলেন না, তাই তিনি তাদেরকে পিছনে বসিয়ে বিরত রাখলেন এবং তাদেরকে বলা হল, “পিছনে যে সব (মহিলা) মানুষেরা বসে থাকে তাদের সাথে বসে থাক।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৪৬)

অবহেলিত ও অলসদের দশা হলো— “এবং তারা বলল, “গরমে অভিযানে বের হয়ো না।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৮১)

“(তাদের মতো হয়ো না) যারা তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলে, যখন তারা পৃথিবীতে সফর করে বা যুদ্ধ করে, “যদি তারা আমাদের সাথে থাকত তবে তারা মরত না এবং নিহতও হতো না।” (৩-সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৫৬) নেক আমলের সময় হলে আমাদের পিছনে বসে থাকা নিষেধ।

“তোমাদের কি হলো যখন তোমাদেরকে বলা হয় যে তোমরা আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়, তখন তোমরা মাটিতে নিতম্ব গেড়ে শক্ত করে বসে থাক।” (৯-সূরা তাওবা: আয়াত-৩৮) “নিশ্চয় তোমাদের মাঝে এমন লোক আছে, যে গণ্ডগোল করে।” “কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে থাকল।” (৭-সূরা আল আ’রাফ: আয়াত-১৭৬) “আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম না।” (৫-সূরা মায়িদা: আয়াত-৩১)

“তা এ জন্য যে তারা দুনিয়ার জিন্দেগীকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেয় বা অধিকতর ভালোবাসে।” (১৬-সূরা নাহল: আয়াত-১০৭) وَلَا تُنَازِعُوْا فَتَفْشَلُوْা وَتَذْهَبَ رِيْحُكُمْ - “আর তোমরা পরস্পর তর্ক করবে না, করলে তোমরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি চলে যাবে।” (৮-সূরা আনফাল: আয়াত-৪৬) “আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন তারা অলসভাবে দাঁড়ায়।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-১৪২)

اَللّٰهُمَّ إِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الْكَسَلِ - নবী করীম ﷺ বলেছেন - “হে আল্লাহ! আমি অলসতা থেকে আপনার নিকট পানাহ চাই।” اَلْكَيْسُ মَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنّٰى عَلَى اللّٰهِ الْأَمَانِيَ - জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করে এবং মৃত্যুর পরে যা ঘটবে তার জন্য আমল করে, আর অক্ষম, দুর্বল ও নির্বোধ ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে (যদিও সে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য কোন নেক আমল করে না) অথচ আল্লাহর ওপর বৃথা আশা রাখে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 দুনিয়ার হাল-হাকিকত

📄 দুনিয়ার হাল-হাকিকত


যে যে পরিমাণ আল্লাহ্র যিকির করে ও তাঁর কিতাব কুরআন তিলাওয়াত করে সে সে পরিমাণ সুখী হবে। এ মূলনীতিকে দেখে শেখার পরই কেউ এ দুনিয়াতেও ও আখিরাতেও তার মূল্য নির্ধারণ করতে পারে。

“যদি না (কুফুরিতে) মানুষদের একমত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকত তবে যারা পরম করুণাময়কে অস্বীকার করে তাদের ঘর-বাড়ির জন্য আমি রূপার ছাদ ও তার ওপরে চড়ে তারা ওপরে উঠে সেই সিঁড়ি বানিয়ে দিতাম। এবং তাদের বাড়ি-ঘরের জন্য দরজা ও যাতে তারা হেলান দেয় সেই পালঙ্ক বানিয়ে দিতাম। এবং বহু বর্ণ নির্মিত নানান সৌন্দর্যের উপকরণ ও অলংকারও বানিয়ে দিতাম। আর এসব কিছু তো দুনিয়ার ভোগের সামগ্রী মাত্র। অথচ আপনার প্রভুর নিকট রয়েছে মুত্তাকীদের জন্য আখিরাতের (অতি উত্তম) মহাপুরস্কার।” (৪৩-সূরা আয যুখরুফ : আয়াত-৩৩-৩৫)

এই আয়াত পরিষ্কারভাবে পার্থিব পদমর্যাদা ও সামাজিক মানের ক্ষণস্থায়ী (এবং সে কারণেই তুচ্ছ) মূল্যের ঘোষণা দেয়। যখন আমরা দেখি যে কাফেররা প্রায়ই সমৃদ্ধ জীবন যাপন করে পক্ষান্তরে মুমিনেরা প্রায়ই পার্থিব আমোদ-প্রমোদ বর্জিত জীবন যাপন করে, তবে আমাদের একথা বুঝা উচিত নয় যে, এ জীবনই সফলতার মাপকাঠি। পার্থিব আমোদ তো এমন লক্ষণ যা কেবলমাত্র এ পৃথিবীর তুচ্ছ মূল্যেরই ইঙ্গিত করে।

নবী করীম ﷺ-এর প্রসিদ্ধ সাহাবী উরওয়া ইবনে গাওয়ান (রা) এক দুঃসময়ে দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে নবী করীম ﷺ-এর সাথে অতীতের দিনগুলি কী অবস্থায় কেটেছে তার স্মৃতিচারণ করে উচ্চস্বরে বলছিলেন। তিনি বলছিলেন কীভাবে নবী করীম ﷺ-এর সাথে আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করতেন, কীভাবে নবী করীম ﷺ-এর সাথে ক্ষুধার তাড়নায় খাদ্যের অভাবে গাছের পাতা খেয়েছেন। তবুও এ সাহাবী (রা) সে সব দিনকে তার জীবনের সর্বাপেক্ষা সুখের দিন বলে ঘোষণা দিলেন। তারপর তিনি বর্ণনা দিলেন কীভাবে তিনি (রা) একটি অঞ্চলের শাসক হয়ে নবী করীম ﷺ-এর থেকে বিদায় নেন। এবং পার্থিব অবস্থার (মানের) উন্নতি সত্ত্বেও তিনি অনুভব করলেন যে, নবী করীম ﷺ-এর ইন্তেকালের পর জীবনের সফলতার গুণ কতটা কমে গেছে!

সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) যখন কুফার গভর্নর ছিলেন তখন নবী করীম ﷺ-এর ইন্তেকালে তিনি পাগলপারা হয়ে গেলেন। তিনিও নবী করীম ﷺ-এর জীবনকালে (তাঁর সাথে খাদ্যের অভাবে) গাছের পাতা ও মৃত পশুর চামড়া খেয়েছেন। নবী করীম ﷺ-এর সাহচর্যে থাকাকালে তাঁর পুরাতন জীবনের স্বাদ উপভোগ করার পর তিনি তাঁর নতুন জীবনের প্রাসাদকে সহ্য করতে পারলেন না।

وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
“এবং নিশ্চয় আখিরাত তোমার জন্য দুনিয়ার তুলনায় শ্রেষ্ঠ।” (৯৩-সূরা আদ দোহা : আয়াত-৪)

অতএব, আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি গোপন রহস্য আছে – আর তাহলো এ পৃথিবীর তুচ্ছতা জানা। “তারা কি মনে করে যে আমি যে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়েছি তাতে তাদের কল্যাণের ব্যাপারে ত্বরান্বিত করছি? তা নয়, বরং তারা তা বুঝে না!” (২৩-সূরা আল মুমিনুন : আয়াত-৫৫-৫৬)

উমর (রা) যখন নবী করীম ﷺ-এর ঘরে প্রবেশ করলেন তখন তিনি নবী করীম ﷺ পার্শ্ব দেশে খেজুরের চাটাইয়ের দাগ দেখতে পেলেন, যা চাটাইয়ে শোয়ার ফলে সৃষ্ট হয়েছে। এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু দরদর করে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। সকলের আদর্শ ও নেতা আল্লাহ্র রাসূল ﷺ এমন অবস্থায়!

“আর তারা বলে এ রাসূলের কী হলো যে সে আমাদের মতো বা মানুষের মত খায়-দায় ও বাজারে চলা-ফেরা করে।” (২৫-সূরা ফুরকান : আয়াত-৭) উমর (রা) বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি তো জানেন যে খসরু ও কায়সার কীভাবে জীবন যাপন করে!

নবী করীম ﷺ উত্তর দিলেন:-
أَفِي شَكٍّ أَنْتَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ: أَمَا تَرْضَىٰ أَن تَكُونَ لَنَا الْآخِرَةُ وَلَهُمُ الدُّنْيَا
“হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি সন্দেহে আছ? আমাদের জন্য আখিরাত আর তাদের জন্য দুনিয়া এতে কি তুমি সন্তুষ্ট নও?”

এটা হলো ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য ও সুন্দর বণ্টন। অতএব, যারা ভুরি ভুরি টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, দালান-কোঠা ও গাড়ি-ঘোড়ায় সুখ খুঁজে পায় তবে পাক। আল্লাহ্র কসম নিশ্চয় তারা কখনও সেসব জিনিসের মাঝে তা খুঁজে পাবে না।

“যারা দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য চায় আমি সেখানে তাদেরকে তাদের পুণ্যকর্মফল দিই আর সেখানে তাদেরকে কম দেওয়া হয় না। তাদের জন্যই পরকালে (আখিরাতে) দোযখ ছাড়া অন্য কিছু নেই এবং তারা যা এখানে (দুনিয়াতে) করত তা সেখানে বাতিল হয়ে যাবে।” (১১-সূরা হুদ : আয়াত-১৫-১৬)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 তারা যেভাবে জীবন যাপন করতেন

📄 তারা যেভাবে জীবন যাপন করতেন


আসুন পিছনে গিয়ে দেখি একটি দরিদ্র দেশে নবী করীম ﷺ-এর একজন সাহাবী কীভাবে জীবন যাপন করতেন। আলী ইবনে আবু তালেব (রা) যিনি নবী করীম ﷺ-এর কন্যা ফাতেমা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন, একদিন ভোরে তিনি জেগে উঠলেন এবং খাবার তালাশ করলেন। কিন্তু তাদের ঘরে খাবার বা কোন কিছু পাওয়া গেল না। শীতকালের কোন এক কনকনে ঠাণ্ডা দিনে এ ঘটনা ঘটেছিল। তাই আলী (রা) কিছু গরম কাপড় পরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি নগরীর চারদিকে তালাশ করলেন কিন্তু কিছু পেলেন না এবং অবশেষে তাঁর এক ইহুদীর কথা মনে পড়ল, যার একটি বাগান ছিল।

আলী (রা) যখন বাগানে পৌঁছলেন তখন ইহুদী বলল, “হে আরবী লোক, এসে আমাকে খেজুর পেড়ে দাও, একটি বড় বালতি ভরিয়ে দিলে তোমাকে একটি খেজুর দিব।” তাই তিনি দীর্ঘ সময় যতক্ষণ না তার হাতে ও শরীরে ব্যথা হতে লাগল ততক্ষণ কঠোর পরিশ্রম করলেন। তিনি যে সামান্য কয়টি খেজুর উপার্জন করলেন তা নিয়ে তিনি নবী করীম ﷺ-এর সাথে সাথে খাওয়ার জন্য রাসূল ﷺ-এর নিকট চলে গেলেন। যে ক'টি অতিরিক্ত ছিল তিনি ও ফাতেমা (রা) সে ক'টিকে বাকি দিনের জন্য রেখে দিলেন।

এই ছিল তাদের জীবন। তবুও বস্তুবাদী মানসিকতা সম্পন্ন লোকের নিকট যা বিপরীত মনে হতে পারে তা হল- তাদের ঘর-বাড়ি আধ্যাত্মিক আলোতে ও সুখে ভরা ছিল। নবী করীম ﷺ-এর নিকট যে মহান মূলনীতি অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে তাদের অন্তর ভরপুর ছিল। তাদের অন্তরকে আধ্যাত্মিক আলোতে তারা সত্যকে উপলব্ধি করে তা গ্রহণ করেছেন এবং একই সাথে তারা মিথ্যাকে চিনে তা বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা সত্যের পথে কাজ করেছেন এবং মিথ্যার পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছেন। তারা বস্তুর যথার্থ মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন।

“(এটাতো) বৃষ্টির পরে উৎপন্ন ফসলের মত, যা কৃষককে মোহিত করে, পরে শুকিয়ে যায় তখন তুমি এটাকে হলুদ দেখতে পাও, তারপর তা খড়কুটা হয়ে যায়।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২০)

সত্যিকার সুখ ছিল বিলাল (রা)-এর, আম্মার (রা)-এর ও সালমান (রা)-এর। বিলাল (রা) ছিলেন সত্যের আহ্বায়ক, সালমান (রা) ছিলেন সত্যবাদী ও আম্মার (রা) ছিলেন দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্ত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px