📄 নিজের ইতিহাস লিখুন
একদিন আমি মক্কার হারাম শরীফে বসা ছিলাম। দিনটি ছিল গরম। রোজাদারদের ভিড় হয়ে আসছিল। এমন সময় আমি একজন বৃদ্ধ মানুষকে জমজমের পানি বিতরণ করতে দেখলাম। তিনি কয়েকটি পেয়ালা ভরে নিয়ে মানুষদেরকে দিতেন ও তারপর ফিরে এসে একই (ভাবে পেয়ালাগুলো ভরে মানুষের মাঝে পানি বিতরণের) কাজ করতেন। বেশ কিছু সময় যাবৎ তিনি এ কাজ করতে করতে ঘামে ভিজে গেলেন। এ বৃদ্ধ লোকটির বিশ্বস্ততা ও ধৈর্য দেখে এবং তাঁর সদয় কাজের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। যত লোক তাঁর সাথে পেরেছিল তিনি তত লোককেই একটি (মিষ্টি) হাসি ও এক পেয়ালা পানি দিয়েছিলেন। এতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যদি আল্লাহ কাউকে আমলের তাওফীক দেন, তবে সে তা হাসি মুখে করে, যদিও তা কষ্টকর কাজ হয়।
আল্লাহর রাসূলকে রক্ষা করার জন্য আবু বকর (রা) মদীনার রাস্তায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। মেহমানকে খাওয়ানোর জন্য হাতেম তাই ক্ষুধা পেটে ঘুমাতেন। মুসলিমদেরকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য আবু উবাইদাহ (রা) রাত জেগে পাহারা দিতেন। রাতে যখন লোকজন ঘুমিয়ে থাকত তখন তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য উমর (রা) রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন। মহা আকালের বছর জনগণকে খাওয়ানোর জন্য তিনি নিজে না খেয়ে থাকতেন। যুদ্ধের সময় আবু তালহা (রা) নবী করীম ﷺ-কে তীর থেকে রক্ষা করার জন্য নিজের দেহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইবনে মোবারক (রহ) নিজে রোযা রেখে জনগণের মাঝে খাবার বিতরণ করতেন।
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا.
“তারা তাঁর (আল্লাহর) ভালোবাসায় মিসকীন ইয়াতীম ও বন্দীকে খানা খাওয়ায়।” (৭৬-সূরা আদ দাহর বা ইনসান: আয়াত-৮)
📄 ভালো জীবন
একজন পশ্চিমা চিন্তাশীল ব্যক্তি বলেছেন, “জেলখানা থেকে আকাশের পানে তাকানো ও গোলাপের গন্ধ শোঁকা আপনার পক্ষে খুবই সহজ। সমৃদ্ধি ও আরাম-আয়েশে ভরপুর প্রাসাদ থেকে পরিবার ও সম্পদের বিষয়ে তুচ্ছ ও অসন্তুষ্ট থাকাও চরমভাবে সহজ।
অতএব, সময় ও স্থানভেদে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই সুখ নির্ধারিত। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষের অন্তরে বদ্ধমূল থাকে। এ বিষয়ে অন্তরের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহতায়ালা অন্তরের দিকে তাকান (অর্থাৎ তিনি অন্তর দেখেন)। অন্তরে বিশ্বাস থাকলে দেহ-মনে সুখ-শান্তি বিরাজ করবে।
イমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) একজন সম্মানিত ও মেধাবী হাদীস সংকলক ছিলেন। তিনি উৎপাদনশীল জীবন যাপন করতেন, তবুও ধনী ছিলেন না। তাঁর পোশাকে বিভিন্ন স্থানে তালি ছিল এবং যখন যখন এটা নতুন করে ছিঁড়ত তখনই তিনি হাতে এটাকে সেলাই করে নিতেন। তিনি মাটির তৈরি তিন-ঘরবিশিষ্ট একটি বাড়িতে থাকতেন। তিনি প্রায়ই শুধুমাত্র এক টুকরো রুটি খেতেন।
তাঁর জীবনী লেখকগণ উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দীর্ঘকাল একই জুতা পরতেন আর তাতে ফুটো দেখা গেলে তিনি নিজ হাতে তাতে প্রায়ই তালি লাগিয়ে নিতেন বা তা সেলাই করে নিতেন। মাসে মাত্র একবার তিনি গোসল করতেন এবং অধিকাংশ দিনই তিনি রোযা রাখতেন। হাদীসের সন্ধানে তিনি বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করতেন। তাঁকে এতসব কষ্ট পোহাতে হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন তৃপ্ত, তুষ্ট, স্বচ্ছল, সৌম্য, শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান, আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর পুরস্কার চাওয়া এবং আখেরাত ও জান্নাতের জন্য তাঁর চেষ্টার কারণেই এতসব গুণ সৃষ্টি হয়েছিল।
তাঁর সময়ের শাসকগণ যেমন- আল-মামুন, আল ওয়াসিক, আল মু'তাসিম ও আল মুতাওয়াক্কিল এরা সবাই প্রাসাদে বাস করত। তারা সোনা-রূপার ভাণ্ডারের মালিক ছিল; একটা গোটা সেনাবাহিনী তাদের অধীনে ছিল; তারা যা চাইত তা সবই পেত। তাদের সকল পার্থিব সম্পদ সত্ত্বেও তারা অশান্তিতে জীবন-যাপন করত। তারা তাদের জীবনকে উদ্বিগ্নতায় ও দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিদ্রোহ তাদের জীবনে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের বর্ণনায় আমরা এও পাই যে, তাদের অনেকেই মৃত্যুশয্যায় তাদের অসংযম ও ত্রুটি-বিচ্যুতি বুঝতে পেরে পৃথিবীকে তিক্তভাবে (অশান্তির স্থান বলে) ঘোষণা দিত।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ হলেন আরেক উদাহরণ: তিনি এ পৃথিবীতে পরিবারহীন, গৃহহীন, সম্পদহীন ও পদমর্যাদাহীন জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর যা ছিল তা হলো কেন্দ্রীয় মসজিদে একটি কক্ষ, সারা দিন কাটানোর জন্য এক টুকরো রুটি ও দু'টি জামা, মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে ঘুমাতেন। কিন্তু, যেমনটি তিনি নিজেই নিজের অবস্থা সম্বন্ধে বলেছেন, তাঁর অন্তরে তাঁর জান্নাত ছিল, তাঁর কারাবন্দী ছিল শাস্তিপূর্ণ নির্জন বাস এবং স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়া ছিল পর্যটক হিসেবে ভ্রমণ। তাঁর অন্তরে কেবলমাত্র ঈমানের বৃক্ষের দৃঢ় শিকড় ধারণের কারণেই তাঁর এ ধরনের মানসিকতা জন্মিতে পেরেছিল। “এর থেকে যেন আলো ছড়ায়, যদিও এতে আগুন স্পর্শ করেনি। আলোর উপর আলো! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর নূরের (আলোর) দিকে পথ প্রদর্শন করেন।”
سَنُعَذِّبُهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ -
“তিনি তাদের থেকে তাদের পাপসমূহ মোচন করে দিবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা ভালো করে দিবেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ : আয়াত-২)
“আর যারা সৎপথ (হেদায়েত) গ্রহণ করে আল্লাহ তাদের সৎপথে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাকওয়া (খোদাভীতি) দান করেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ : আয়াত-১৭)
“তুমি তাদের চেহারায় সুখের আভা দেখতে পাবে।” (৮৩-সূরা আল মুতাফফিফিন : আয়াত-২৪)
সাহাবী আবু যর গিফারী (রা) তাঁর সংযমী জীবনযাপন প্রণালীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি শহর ছেড়ে এক বিচ্ছিন্ন এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর অধিকাংশ দিন প্রধানত ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত ও গবেষণায় কেটেছে। অধিকাংশ দিন তিনি রোযা রাখতেন। তাঁর পার্থিব সম্পদ বলতে ছিল একটি তাঁবু, কিছু ভেড়া ও অন্যান্য কিছু তুচ্ছ জিনিসপত্র। একবার তাঁর কয়েকজন বন্ধু তাঁকে দেখতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “দুনিয়া কোথায় (অর্থাৎ দুনিয়ার আসবাবপত্র বা অন্যান্য মানুষের যা আছে তা কোথায়)?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এ পৃথিবীর যা কিছু আমার দরকার সব আমার ঘরে আছে এবং নবী করীম ﷺ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের সামনে (বিচারের দিনে) এক অতলনীয় বাধা আছে এবং কেউ সে বাধা অতিক্রম করতে পারবে না, তবে শুধুমাত্র সে পারবে যার বোঝা হালকা।”
নিদারুণ দারিদ্র্য জীবনযাপন সত্ত্বেও তিনি মনে করতেন যে এ পৃথিবীর যা কিছু তাঁর দরকার ছিল, তার সবকিছুই তাঁর ছিল। প্রয়োজনীয়তিরিক্ত সম্পদ সম্বন্ধে তিনি মনে করতেন যে, এগুলো তাঁকে তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দিবে এবং শুধুমাত্র তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হবে।
📄 ভালো কথা তাঁর নিকটই উত্থিত হয়
আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবীদেরকে এমন কিছু সুন্দর সুন্দর দোয়া (প্রার্থনা ও মুনাজাত) শিক্ষা দিয়েছেন, যা আকারে ছোট, কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ সুদূরপ্রসারী।
আবু বকর (রা) তাঁকে একটি দোয়া শিখিয়ে দেওয়ার জন্য নবী করীম ﷺ-এর নিকট আবেদন করলেন এবং নবী করীম ﷺ বললেন-
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
“হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আমি আমার প্রতি অনেক জুলুম করেছি, আর আপনি ছাড়া কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না; সুতরাং আমাকে আপনার পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দিন এবং আপনি আমাকে দয়া করুন; কেননা নিশ্চয় আপনি অতি ক্ষমাশীল পরম করুণাময়।”
নবী করীম ﷺ আব্বাস (রা)-কে বললেন-
اِسْأَلِ اللَّهَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ.
“আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও সুস্থতা প্রার্থনা করুন।”
রাসূলাল্লাহ ﷺ আলী (রা)-কে বলেছেন- "বলুন,
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَسَدِّدْنِي.
“হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।”
রাসূলাল্লাহ ﷺ উবাইদ ইবন হুরাইজ (রা)-কে বলেছেন- "বল,
اللَّهُمَّ الْهِمْنِي رُشْدِي وَقِنِي شَرَّ نَفْسِي.
“হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথের দিকে চালিত করুন এবং আমাকে আমার নিজের (আত্মার) ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।”
তিনি ﷺ শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা)-কে বলতে বলেছেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الثَّبَاتَ فِي الأَمْرِ وَالْعَزِيمَةَ عَلَى الرُّشْدِ وَشُكْرَ نِعْمَتِكَ وَحُسْنَ عِبَادَتِكَ وَأَسْأَلُكَ قَلْبًا سَلِيمًا وَلِسَانًا صَادِقًا وَأَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ مَا تَعْلَمُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَعْلَمُ وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا تَعْلَمُ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ.
ভাবার্থ : “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট (দ্বীনি) কাজে একনিষ্ঠতা চাই। সঠিক পথে থাকার স্থির সংকল্প, দৃঢ়তা ও অটলতা চাই। আপনার নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করার তওফীক ও আপনার ইবাদত উত্তমরূপে করার তওফীক চাই। আপনার নিকট প্রশান্ত চিত্ত ও সত্য কথা বলার জিহ্বা চাই। আপনার অবগত সকল ভালো বিষয় আপনার নিকট চাই। আপনার জানা সকল মন্দ বিষয় হতে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। আপনার জানা আমার সকল পাপ থেকে আপনার নিকট ক্ষমা চাই। কেননা, আপনি অবশ্যই সকল অজানা (গায়েবি) বিষয় অবগত আছেন।”
উপরোক্ত দোয়াতে যেসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধারণার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে তা হলো- পরকালের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও করুণা আল্লাহর নিকট আমাদের চাওয়া উচিত। আল্লাহ্র ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্র নিকট আমাদের আন্তরিক চাওয়া উচিত এবং তাঁর ইবাদত ও তাঁর শোকরিয়া আদায় করার জন্য তাঁর নিকট আমাদের তাওফীক চাওয়া উচিত। এসব ধারণার একটি সর্বসম্মত বা সাধারণ কারণ আছে। তা হলো- আল্লাহ্র নিকট যা আছে তা আমাদের চাওয়া উচিত আর এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত অর্থাৎ স্বভাবতই বিলীয়মান পার্থিব জিনিসপত্রের প্রতি আমাদের লোভ করা উচিত নয়।
📄 তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠর এমনই
وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَىٰ وَهِيَ ظَالِمَةٌ ۚ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ.
“যে সব শহরের অধিবাসীগণ জালিম আল্লাহ্ যখন সে সব শহরকে পাকড়াও করেন তখন তোমার প্রভুর পাকড়াও এমনই হয়।” (১১-সূরা হুদ: আয়াত-১০২)
বিভিন্ন কারণ মানুষ হতাশ ও হতভাগ্য হতে পারে; নিম্নে তার কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো- অন্যের সাথে অন্যায় আচরণ করা, অন্যের অধিকারকে জবর দখল করা এবং মানব জাতির নরম প্রকৃতির লোকদেরকে আঘাত দেয়া। কোন একজন বিজ্ঞ লোক বললেন- “(তোমরা অত্যাচারীর) বিরুদ্ধে আল্লাহ ছাড়া যার কোন সাহায্যকারী নেই তাকে ভয় কর।”
অত্যাচারীদের প্রচুর ভীতিকর উদাহরণসহ সম্মিলিত ইতিহাস আমাদের নিকট আছে। ইবনে তোফায়েল নবী করীম ﷺ-কে অপমান করার ষড়যন্ত্র করেছিল তাই নবী করীম ﷺ তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। ফলে আমের গ্রন্ত্রি রোগে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে এক ঘণ্টা পরে মারা যায়। আরবাব ইবনে কাসেরের একই রকম চক্রান্ত করার দুর্ভাগ্য হয়েছিল। আর নবী করীম ﷺ তার বিরুদ্ধে বদ দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ্ বজ্রপাত ঘটিয়ে তাকে ও তার বাহন উটকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন。
হাজ্জাজ সাঈদ ইবনে জুবাইরকে (রা)-কে হত্যা করার কিছু আগে সাঈদ ইবনে জুবাইর প্রার্থনা করে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ! আমার পরে তাকে আর কারো (সাথে অত্যাচার করার) ক্ষমতা দিওনা।” হাজ্জাজের এক হাতে একটি ফোড়া হয়েছিল, পরে তা দ্রুত তার সারা গায়ে ছড়িয়ে গেল। তার এত ব্যথা হলো যে সে কুকুরের মতো ডাকতে লাগল। অবশেষে করুণা উদ্রেককর অবস্থায় মারা গেল।
আবু জা'ফর মনসুরের সময় সুফিয়ান সাওরী (রহ) কিছুকাল আত্ম গোপন করেন। আবু জা'ফর মক্কায় কা'বার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় সুফিয়ান (রা) কাবার চত্বরে ছিলেন এবং তিনি আল্লাহ্র নিকট মরিয়া হয়ে আকুল আবেদন করেছিলেন যাতে আল্লাহ্র ঘরে আল্লাহ্ আবু জা'ফরকে প্রবেশ করতে না দেন। মক্কার বর্হিসীমায় পৌঁছার আগেই আবু জা'ফর মারা যায়।
ক্বাজী আহমদ ইবনে আবু দাউদ মু'আফফীরী ইমাম আহমদ (র)-কে কষ্ট দিয়েছিল। ইমাম আহমদ (র) তার বিরুদ্ধে বদদোয়া করলেন, তাই আল্লাহ ইবনে আবু দাউদের অর্ধাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিলেন। তাকে বলতে শুনা গেছে “আমার শরীরের পক্ষাঘাতগ্রস্ত অংশে যদি একটি মাছি উড়ে এসে বসে তবে আমার মনে হয় কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। আর বাকি পক্ষাঘাতগ্রস্ত অংশকে কাঁচি দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হলেও আমি কোন কিছু অনুভব করতে পারব না।”
আলী ইবনে ইয়াহইয়াও ইমাম আহমদ ইবনে হান্বল (র)-কে অত্যাচার করেছে। তাই ইমাম আহমদ (র) তাকেও বদদোয়া (অভিশাপ) দিলেন। কিছু সময় যেতে না যেতেই সে অত্যাচারী মারা যায়।
জামাল আল নাসিরের শাসনামলে বহু মুসলমানকে জেলে রেখে অত্যাচার করা হয়। এক কর্মকর্তা চিৎকার দিয়ে বলত, "কোথায় তোমাদের খোদা? পেলে আমি তাকেও জেলখানায় ভরতাম!" অত্যাচারীর এ কথা থেকে আল্লাহ তাআলা বহু দূরে। একদা সে কায়রো থেকে আলেকজেন্দ্রিয়াতে যাওয়ার সময় একটি লোহা (রড)বাহী ট্রাক তার জীপকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়। আর একটি রড তার মাথায় ঢুকে নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত চলে যায়। উদ্ধারকর্মীরা তাকে টুকরো টুকরো করে তার গাড়ি থেকে বের করতে বাধ্য হয়।
وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ.
“সে ও তার সেনাবাহিনী অন্যায়ভাবে জমিনের বুকে অহংকার করত এবং তারা ভেবেছিল যে, তাদেরকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে আনা হবে না।” (২৮-সূরা আল কাহাফ: আয়াত-৩৯)
“এবং তারা বলত, আমাদের থেকে কে বেশি শক্তিশালী আছে? তারা কি দেখেনি যে, তাদেরকে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী?” (৪১-সূরা হা-মীম-আস-সাজদাহ: আয়াত-১৫)
জমিনে কুফুর ও অত্যাচারের জন্য প্রসিদ্ধ আবুল নাসিরের সেনাপতি সালাহ্ নসরের ঘটনাও একই রকম। সে দশটি বেদনাদায়ক ও চিরস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হয়। সে বহু বৎসর দূর্দশায় বেঁচেছিল কিন্তু ডাক্তাররা তাকে আরোগ্য করতে পারেনি। অবশেষে সে সে সব দেবতাদের কাছে মাথা নত করত তাদের জেলখানাতে বন্দী হয়েই সে অপমানিত হয়ে মারা যায়।
“যারা দেশে দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল। সেখানে তারা অনেক ফেতনা-ফাসাদ (বিশৃঙ্খলতা-গন্ডগোল) করেছিল। অতএব, তোমার প্রভু তাদের উপর শাস্তির কষাঘাত হানলেন।” (৮৯-সূরা আল ফাজর: আয়াত-১০-১৩)
নবী করীম ﷺ বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ.
“নিশ্চয় আল্লাহ জালেমকে কিছু সময় দেন। অবশেষে যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন, তখন তিনি তাকে পালাতে দেন না।”
রাসূলাল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন-
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ.
“অত্যাচারিতের দোয়াকে ভয় কর। কেননা, এ দোয়ার মাঝে ও আল্লাহ্র মাঝে কোন পর্দা নেই।”