📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 চারটি বিষয় হতে দূরে থাকুন

📄 চারটি বিষয় হতে দূরে থাকুন


নিম্নোক্ত চারটি বিষয় মনে দুঃখ-কষ্ট আনে; সুতরাং সেগুলিকে পরিহার করুন বা এড়িয়ে চলুন-

১. আল্লাহ যা বিধান দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না এবং তাতে রাগ করবেন না।
২. তওবাহবিহীন পাপ (যে পাপ করে পরে তওবা করা হয় না)।
“আপনি (তাদেরকে) বলে দিন! এ মুসিবত (তোমাদের পাপের কারণে) তোমাদের নিজেদের নিকট থেকেই এসেছে।” (৩-সুরা ইমরান: আয়াত-১৬৫)
“এটা তোমাদের নিজ হাতে কৃত পাপের কারণেই।” (৪২-সুরা আশ শুরা: আয়াত-৩০)

৩. আল্লাহ মানুষকে অনুগ্রহ দান করার কারণে তাদেরকে ঘৃণা করা।
“আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা দান করেছেন তা নিয়ে কি তারা মানুষদেরকে হিংসা করেন?” (৪-সুরা আন নিসা: আয়াত-৫৪)

৪. আল্লাহর যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
فإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا “নিশ্চয় তার জন্য রয়েছে এক সংকটময় জীবন।” (২০-সুরা ত্বাহা: আয়াত-১২৪)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ন্যায়পরায়ণ প্রভু

📄 ন্যায়পরায়ণ প্রভু


আপনার প্রভু ন্যায়পরায়ণ এ বিষয়ে আপনার দৃঢ় নিশ্চয়তাবোধ থাকা উচিত। মহান আল্লাহ একজন মহিলাকে একটি কুকুরের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন। আরেকজনকে একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছেন। প্রথম মহিলাটি বনী ইসরাঈলের একটি বেশ্যা ছিল। একদা সে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। (এ কারণে) আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেন। তার নেক আমলের প্রতি একনিষ্ঠতা ও তাঁর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার কারণে এটা ছিল ন্যায়সঙ্গত পুরস্কার। দ্বিতীয় মহিলাটি একটি বিড়ালকে একটি ঘরে রেখেছিল। সে এটাকে পানাহার করতে দিত না। সে এটাকে বন্দী করে মাঠে-ঘাটে পোকা-মাকড় খাওয়া থেকেও বিরত রেখেছিল; তাই আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছিলেন。

প্রথম মহিলাটির ঘটনা মনে শান্তি যোগায়। কেননা, এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ছোট-খাট নেক আমলের বদলে বিশাল বিশাল পুরস্কার দেন।

فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“অতএব, যে ব্যক্তি অণুপরিমাণ নেক আমল করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণুপরিমাণ বদ আমল করবে সে তা দেখতে পাবে।” (৯৯-সূরা যিলযাল: আয়াত-৬-৭)

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ.
“নিশ্চয় নেক আমলসমূহ বদআমলসমূহকে দূর করে দেয়।” (১১-সূরা হুদ: আয়াত-১১৪)

অতএব, দুঃখ পীড়িতদেরকে সাহায্য করুন, গরীবদেরকে দান করুন, অভাবীদেরকে সাহায্য করুন, রোগী দেখতে যান, মৃতের জানাযায় শরীক হোন, অন্ধকে পথ দেখান, দুর্দশাগ্রস্তদেরকে সান্ত্বনা দিন, পথভ্রষ্টদেরকে পথ-প্রদর্শন করুন এবং মেহমান ও প্রতিবেশী উভয়ের প্রতিই সদয় হোন। এসব কিছুই সদকাতুল্য। এগুলো এমন কাজ যেগুলোতে শুধুমাত্র সাহায্য গ্রহণকারীকেই সাহায্য করে না, অধিকন্তু আপনাকেও স্বস্তি ও শান্তি দিয়ে সাহায্য করে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 নিজের ইতিহাস লিখুন

📄 নিজের ইতিহাস লিখুন


একদিন আমি মক্কার হারাম শরীফে বসা ছিলাম। দিনটি ছিল গরম। রোজাদারদের ভিড় হয়ে আসছিল। এমন সময় আমি একজন বৃদ্ধ মানুষকে জমজমের পানি বিতরণ করতে দেখলাম। তিনি কয়েকটি পেয়ালা ভরে নিয়ে মানুষদেরকে দিতেন ও তারপর ফিরে এসে একই (ভাবে পেয়ালাগুলো ভরে মানুষের মাঝে পানি বিতরণের) কাজ করতেন। বেশ কিছু সময় যাবৎ তিনি এ কাজ করতে করতে ঘামে ভিজে গেলেন। এ বৃদ্ধ লোকটির বিশ্বস্ততা ও ধৈর্য দেখে এবং তাঁর সদয় কাজের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। যত লোক তাঁর সাথে পেরেছিল তিনি তত লোককেই একটি (মিষ্টি) হাসি ও এক পেয়ালা পানি দিয়েছিলেন। এতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, যদি আল্লাহ কাউকে আমলের তাওফীক দেন, তবে সে তা হাসি মুখে করে, যদিও তা কষ্টকর কাজ হয়।

আল্লাহর রাসূলকে রক্ষা করার জন্য আবু বকর (রা) মদীনার রাস্তায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। মেহমানকে খাওয়ানোর জন্য হাতেম তাই ক্ষুধা পেটে ঘুমাতেন। মুসলিমদেরকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য আবু উবাইদাহ (রা) রাত জেগে পাহারা দিতেন। রাতে যখন লোকজন ঘুমিয়ে থাকত তখন তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য উমর (রা) রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন। মহা আকালের বছর জনগণকে খাওয়ানোর জন্য তিনি নিজে না খেয়ে থাকতেন। যুদ্ধের সময় আবু তালহা (রা) নবী করীম ﷺ-কে তীর থেকে রক্ষা করার জন্য নিজের দেহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইবনে মোবারক (রহ) নিজে রোযা রেখে জনগণের মাঝে খাবার বিতরণ করতেন।

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا.
“তারা তাঁর (আল্লাহর) ভালোবাসায় মিসকীন ইয়াতীম ও বন্দীকে খানা খাওয়ায়।” (৭৬-সূরা আদ দাহর বা ইনসান: আয়াত-৮)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ভালো জীবন

📄 ভালো জীবন


একজন পশ্চিমা চিন্তাশীল ব্যক্তি বলেছেন, “জেলখানা থেকে আকাশের পানে তাকানো ও গোলাপের গন্ধ শোঁকা আপনার পক্ষে খুবই সহজ। সমৃদ্ধি ও আরাম-আয়েশে ভরপুর প্রাসাদ থেকে পরিবার ও সম্পদের বিষয়ে তুচ্ছ ও অসন্তুষ্ট থাকাও চরমভাবে সহজ।

অতএব, সময় ও স্থানভেদে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই সুখ নির্ধারিত। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষের অন্তরে বদ্ধমূল থাকে। এ বিষয়ে অন্তরের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহতায়ালা অন্তরের দিকে তাকান (অর্থাৎ তিনি অন্তর দেখেন)। অন্তরে বিশ্বাস থাকলে দেহ-মনে সুখ-শান্তি বিরাজ করবে।

イমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) একজন সম্মানিত ও মেধাবী হাদীস সংকলক ছিলেন। তিনি উৎপাদনশীল জীবন যাপন করতেন, তবুও ধনী ছিলেন না। তাঁর পোশাকে বিভিন্ন স্থানে তালি ছিল এবং যখন যখন এটা নতুন করে ছিঁড়ত তখনই তিনি হাতে এটাকে সেলাই করে নিতেন। তিনি মাটির তৈরি তিন-ঘরবিশিষ্ট একটি বাড়িতে থাকতেন। তিনি প্রায়ই শুধুমাত্র এক টুকরো রুটি খেতেন।

তাঁর জীবনী লেখকগণ উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দীর্ঘকাল একই জুতা পরতেন আর তাতে ফুটো দেখা গেলে তিনি নিজ হাতে তাতে প্রায়ই তালি লাগিয়ে নিতেন বা তা সেলাই করে নিতেন। মাসে মাত্র একবার তিনি গোসল করতেন এবং অধিকাংশ দিনই তিনি রোযা রাখতেন। হাদীসের সন্ধানে তিনি বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করতেন। তাঁকে এতসব কষ্ট পোহাতে হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন তৃপ্ত, তুষ্ট, স্বচ্ছল, সৌম্য, শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান, আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর পুরস্কার চাওয়া এবং আখেরাত ও জান্নাতের জন্য তাঁর চেষ্টার কারণেই এতসব গুণ সৃষ্টি হয়েছিল।

তাঁর সময়ের শাসকগণ যেমন- আল-মামুন, আল ওয়াসিক, আল মু'তাসিম ও আল মুতাওয়াক্কিল এরা সবাই প্রাসাদে বাস করত। তারা সোনা-রূপার ভাণ্ডারের মালিক ছিল; একটা গোটা সেনাবাহিনী তাদের অধীনে ছিল; তারা যা চাইত তা সবই পেত। তাদের সকল পার্থিব সম্পদ সত্ত্বেও তারা অশান্তিতে জীবন-যাপন করত। তারা তাদের জীবনকে উদ্বিগ্নতায় ও দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিদ্রোহ তাদের জীবনে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসের বর্ণনায় আমরা এও পাই যে, তাদের অনেকেই মৃত্যুশয্যায় তাদের অসংযম ও ত্রুটি-বিচ্যুতি বুঝতে পেরে পৃথিবীকে তিক্তভাবে (অশান্তির স্থান বলে) ঘোষণা দিত।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ হলেন আরেক উদাহরণ: তিনি এ পৃথিবীতে পরিবারহীন, গৃহহীন, সম্পদহীন ও পদমর্যাদাহীন জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর যা ছিল তা হলো কেন্দ্রীয় মসজিদে একটি কক্ষ, সারা দিন কাটানোর জন্য এক টুকরো রুটি ও দু'টি জামা, মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে ঘুমাতেন। কিন্তু, যেমনটি তিনি নিজেই নিজের অবস্থা সম্বন্ধে বলেছেন, তাঁর অন্তরে তাঁর জান্নাত ছিল, তাঁর কারাবন্দী ছিল শাস্তিপূর্ণ নির্জন বাস এবং স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়া ছিল পর্যটক হিসেবে ভ্রমণ। তাঁর অন্তরে কেবলমাত্র ঈমানের বৃক্ষের দৃঢ় শিকড় ধারণের কারণেই তাঁর এ ধরনের মানসিকতা জন্মিতে পেরেছিল। “এর থেকে যেন আলো ছড়ায়, যদিও এতে আগুন স্পর্শ করেনি। আলোর উপর আলো! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর নূরের (আলোর) দিকে পথ প্রদর্শন করেন।”

سَنُعَذِّبُهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ -
“তিনি তাদের থেকে তাদের পাপসমূহ মোচন করে দিবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা ভালো করে দিবেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ : আয়াত-২)

“আর যারা সৎপথ (হেদায়েত) গ্রহণ করে আল্লাহ তাদের সৎপথে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং তাদেরকে তাকওয়া (খোদাভীতি) দান করেন।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ : আয়াত-১৭)

“তুমি তাদের চেহারায় সুখের আভা দেখতে পাবে।” (৮৩-সূরা আল মুতাফফিফিন : আয়াত-২৪)

সাহাবী আবু যর গিফারী (রা) তাঁর সংযমী জীবনযাপন প্রণালীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি শহর ছেড়ে এক বিচ্ছিন্ন এলাকায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর অধিকাংশ দিন প্রধানত ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত ও গবেষণায় কেটেছে। অধিকাংশ দিন তিনি রোযা রাখতেন। তাঁর পার্থিব সম্পদ বলতে ছিল একটি তাঁবু, কিছু ভেড়া ও অন্যান্য কিছু তুচ্ছ জিনিসপত্র। একবার তাঁর কয়েকজন বন্ধু তাঁকে দেখতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “দুনিয়া কোথায় (অর্থাৎ দুনিয়ার আসবাবপত্র বা অন্যান্য মানুষের যা আছে তা কোথায়)?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এ পৃথিবীর যা কিছু আমার দরকার সব আমার ঘরে আছে এবং নবী করীম ﷺ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের সামনে (বিচারের দিনে) এক অতলনীয় বাধা আছে এবং কেউ সে বাধা অতিক্রম করতে পারবে না, তবে শুধুমাত্র সে পারবে যার বোঝা হালকা।”

নিদারুণ দারিদ্র্য জীবনযাপন সত্ত্বেও তিনি মনে করতেন যে এ পৃথিবীর যা কিছু তাঁর দরকার ছিল, তার সবকিছুই তাঁর ছিল। প্রয়োজনীয়তিরিক্ত সম্পদ সম্বন্ধে তিনি মনে করতেন যে, এগুলো তাঁকে তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করে দিবে এবং শুধুমাত্র তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px