📄 শরীয়ত সহজ
শরীয়ত বা ইসলামী জীবনের বিধানের দু'টি গুণ হলো, তা সহজ ও সুবিধাজনক যা মু'মিন ব্যক্তিকে শান্তি দেয়।
مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى
“(হে মুহাম্মাদ !) আমি আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আপনার উপর কুরআন অবতীর্ণ করিনি।” (২০-সূরা ত্বাহা: আয়াত-২)
وَتَيَسَّرَكَ بِالْيُسْرَى
“আর আমি সহজ পথকে (ইসলামকে) আপনার জন্য (আরো) সহজ করে দিব।” (৮৭-সূরা আ'লা: আয়াত-৮)
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোন ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২৮৬)
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ
“আর তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করে দেননি।” (২২-সূরা মু’মিনুন : আয়াত-৭৮)
“এবং তিনি (মুহাম্মাদ) তাদের থেকে তাদের বোঝা ও তাদের উপর যে শৃঙ্খল ছিল তা দূর করবেন।” (৭-সূরা আল্ আরাফ : আয়াত-১৫৭)
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا - إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
“অতএব নিশ্চয় কঠোরতার পরে স্বস্তি আছে। নিশ্চয় কঠোরতার পরে স্বস্তি আছে।” (৯৪-সূরা ইনশিরাহ : আয়াত-৫-৬)
অর্থাৎ, একটি কঠোরতার সাথে দু'টি স্বস্তি আছে; সুতরাং একটি কঠোরতা দু'টি স্বস্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। কঠোরতা শব্দটি اَلْ যোগে আছে আর স্বস্তি শব্দটি اَلْ ছাড়া (يُسْرَى) আছে, সুতরাং আরবী ব্যাকরণ অনুসারে اَلْ যোগে কোন একটি শব্দ ব্যবহার করা হলেও নির্দিষ্ট একটিই বুঝায় আর اَل্ ছাড়া শব্দ একাধিকবার উল্লেখ হলে প্রতিবার একটি একটি করে বুঝায়; এভাবে اَلْ ছাড়া يُসْرَى উল্লেখ হওয়াতে দু'টি স্বস্তি (يُসْرَى) বুঝা যায়; পক্ষান্তরে اَلْ সহ الْعُسْرِ দু'বার উল্লেখিত হওয়া সত্ত্বেও দু'টি কঠোরতা (الْعُسْرُ) বুঝা যায় না। —অনুবাদক
“হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আপনি আমাদেরকে (শাস্তি দেয়ার জন্য) পাকড়াও করবেন না। “হে আমাদের প্রভু! আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেরূপ বোঝা চাপিয়েছিলেন আমাদের উপর সেরূপ বোঝা চাপাবেন না। হে আমাদের প্রভু! আর আমাদের উপর এমন বোঝা চাপাবেন না যা বহন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আর আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর আমাদেরকে দয়া করুন। আপনিই আমাদের মাওলা (অভিভাবক), অতএব কাফের সম্প্রদায়ের উপর আপনি আমাদেরকে বিজয়ী করুন।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২৮৬)
নবী করীম ﷺ বলেছেন-
رُفِعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأُ وَالنِّسْيَانُ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
“ভুল, বিস্মরণ ও জোর-জবরদস্তির কারণে কৃত পাপ আমার উম্মত থেকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।”
নবী করীম ﷺ বলেছেন-
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلَّا غَلَبَهُ.
“নিশ্চয় এ দ্বীন সহজ, যখন কেউ এ দ্বীনকে অতি কঠিন করে তখন সে নিজেই ব্যর্থ হয় (অর্থাৎ সে এ দ্বীনকে অতি কঠিন বানাতে পারে না)।”
📄 কল্যাণে ভরপুর এক ধর্ম
ইসলাম ধর্ম মুমিন বান্দাকে বিশাল পরিসরের কল্যাণ ও পুরস্কারের প্রতিশ্রতি দেয়। এটি এমন সব কল্যাণের প্রতিশ্ৰুতি দেয়, যা তাকে সর্বদা সত্যপথে থাকতে উৎসাহ দেয় এবং এমন সব পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, যা আখিরাতের জন্য তার আশাকে বাড়িয়ে তোলে। যেসব আমল গুনাহ মুছে ফেলে (যেমন সালাত) ইসলামে এমন সব আমল আছে।
যেমন একটি আমল সালেহ বা নেক আমল দশ গুণ, সাতশত গুণ, এমনকি আরো অনেক অনেক গুণ বেশি বাড়ানো হয়। আরেকটি উদাহরণ হলো দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন ও যে কোন সংকট, যখনই কোন মুমিন বান্দা কোন সংকটে পড়ে তখনই তার কিছু পাপ মাফ করে দেয়া হয়। মুসিবতের সময় মুমিন বান্দা অন্যান্য মুমিন বান্দাদের দোয়ার দ্বারাও উপকৃত হয়।
وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا ۗ
“আর যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে গণনা কর তবে তোমরা তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।” (১৪-সুরা নাহল: আয়াত-১৮)
“আর তিনি তোমাদের উপর তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয় নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করেছেন।” (৩১-সুরা লোকমান: আয়াত-২০)
{প্রকাশ্য নেয়ামত বলতে বুঝায় ইসলামী তাওহীদ (একত্ববাদ) ও স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি এবং পৃথিবীর বৈধ আমোদ-প্রমোদ। অপ্রকাশ্য নেয়ামত বলতে বুঝায় আল্লাহর প্রতি ঈমান, ইলম (জ্ঞান), হিকমত (প্রজ্ঞা), আমলে সালেহ করার জন্য পথ-নির্দেশন বা হেদায়েত এবং আখিরাতে জান্নাতের আমোদ-প্রমোদ।}
📄 চারটি বিষয় হতে দূরে থাকুন
নিম্নোক্ত চারটি বিষয় মনে দুঃখ-কষ্ট আনে; সুতরাং সেগুলিকে পরিহার করুন বা এড়িয়ে চলুন-
১. আল্লাহ যা বিধান দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না এবং তাতে রাগ করবেন না।
২. তওবাহবিহীন পাপ (যে পাপ করে পরে তওবা করা হয় না)।
“আপনি (তাদেরকে) বলে দিন! এ মুসিবত (তোমাদের পাপের কারণে) তোমাদের নিজেদের নিকট থেকেই এসেছে।” (৩-সুরা ইমরান: আয়াত-১৬৫)
“এটা তোমাদের নিজ হাতে কৃত পাপের কারণেই।” (৪২-সুরা আশ শুরা: আয়াত-৩০)
৩. আল্লাহ মানুষকে অনুগ্রহ দান করার কারণে তাদেরকে ঘৃণা করা।
“আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা দান করেছেন তা নিয়ে কি তারা মানুষদেরকে হিংসা করেন?” (৪-সুরা আন নিসা: আয়াত-৫৪)
৪. আল্লাহর যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
فإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا “নিশ্চয় তার জন্য রয়েছে এক সংকটময় জীবন।” (২০-সুরা ত্বাহা: আয়াত-১২৪)
📄 ন্যায়পরায়ণ প্রভু
আপনার প্রভু ন্যায়পরায়ণ এ বিষয়ে আপনার দৃঢ় নিশ্চয়তাবোধ থাকা উচিত। মহান আল্লাহ একজন মহিলাকে একটি কুকুরের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন। আরেকজনকে একটি বিড়ালের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছেন। প্রথম মহিলাটি বনী ইসরাঈলের একটি বেশ্যা ছিল। একদা সে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। (এ কারণে) আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেন। তার নেক আমলের প্রতি একনিষ্ঠতা ও তাঁর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার কারণে এটা ছিল ন্যায়সঙ্গত পুরস্কার। দ্বিতীয় মহিলাটি একটি বিড়ালকে একটি ঘরে রেখেছিল। সে এটাকে পানাহার করতে দিত না। সে এটাকে বন্দী করে মাঠে-ঘাটে পোকা-মাকড় খাওয়া থেকেও বিরত রেখেছিল; তাই আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছিলেন。
প্রথম মহিলাটির ঘটনা মনে শান্তি যোগায়। কেননা, এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ছোট-খাট নেক আমলের বদলে বিশাল বিশাল পুরস্কার দেন।
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“অতএব, যে ব্যক্তি অণুপরিমাণ নেক আমল করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণুপরিমাণ বদ আমল করবে সে তা দেখতে পাবে।” (৯৯-সূরা যিলযাল: আয়াত-৬-৭)
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ.
“নিশ্চয় নেক আমলসমূহ বদআমলসমূহকে দূর করে দেয়।” (১১-সূরা হুদ: আয়াত-১১৪)
অতএব, দুঃখ পীড়িতদেরকে সাহায্য করুন, গরীবদেরকে দান করুন, অভাবীদেরকে সাহায্য করুন, রোগী দেখতে যান, মৃতের জানাযায় শরীক হোন, অন্ধকে পথ দেখান, দুর্দশাগ্রস্তদেরকে সান্ত্বনা দিন, পথভ্রষ্টদেরকে পথ-প্রদর্শন করুন এবং মেহমান ও প্রতিবেশী উভয়ের প্রতিই সদয় হোন। এসব কিছুই সদকাতুল্য। এগুলো এমন কাজ যেগুলোতে শুধুমাত্র সাহায্য গ্রহণকারীকেই সাহায্য করে না, অধিকন্তু আপনাকেও স্বস্তি ও শান্তি দিয়ে সাহায্য করে।