📄 যা করলে শান্তি পাবেন
ইমাম ইবনুল কায়্যিম এমন কিছু বিষয় বর্ণনা করেছেন যা মনকে প্রশান্ত করে। নিম্নে তা বর্ণনা করা হলো-
১. তাওহীদ বা একত্ববাদ: অর্থাৎ আল্লাহর সাথে তাঁর ইবাদতে কোন শরিক না করে এবং তাঁর সকল গুণের সাথে অন্য কাউকে শরিক না করে একচেটিয়াভাবে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। কাফের ও মুশরিকরা যারা মহান আল্লাহর সাথে শরিক করে তারা আসলে মৃত, জীবিত নয়।
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
“আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার জন্য অবশ্যই কষ্টকর জীবন রয়েছে এবং আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় হাশর করাব।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-১২৪)
“আর আল্লাহ যাকে হিদায়াত করতে চান তার অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দেন।” (৬-সূরা আল আন্আ’ম : আয়াত-১২৫)
“আল্লাহ যার অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দিয়েছেন ফলে সে তার প্রভুর পক্ষ থেকে পাওয়া নূরের উপর আছে– তবে কি সে ঐ কাফিরের মতো যে এমনটি নয়?” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-২২)
“আমি অচিরেই কাফেরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করব, কেননা তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছে– যে বিষয়ে তিনি কোন দলীল প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫১)
“অতএব তাদের জন্য ধ্বংস যাদের অন্তর এতটা কঠোর যে তাতে আল্লাহর কথা মনে পড়ে না।” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-২২)
“আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান তার অন্তরকে তিনি সংকুচিত ও সংকীর্ণ করে দেন, মনে হয় যেন সে আকাশে চড়ছে।” (৬-সূরা আল আন্আ’ম : আয়াত-১২৫)
২. উপকারী ইলম বা জ্ঞান : কেননা আলেমরাই (জ্ঞানীরাই) সর্বাপেক্ষা সুখী; স্বচ্ছল, নির্বিঘ্ন এবং পরিতুষ্ট। কেনেইবা আলেমেরা এমনটি হবেন না? তারা যে মুহাম্মাদ ﷺ-এর উত্তরাধিকারী।
“এবং তুমি যা জানতে না তিনি তোমাকে তা শিখিয়েছেন।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১১৩)
“সুতরাং তুমি জেনে রাখ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা ক্বতাল : আয়াত-১৯)
৩. আমলে সালেহ বা নেক আমল বা পুণ্যকর্ম বা সৎকার্য বা ভালো কাজ : একটি সওয়াবের কাজ বা নেক আমল অন্তরে ও চেহারায় উভয় স্থানেই আলো দেয় এবং রিযিকের প্রশস্ততা বয়ে আনে আর অন্যান্য লোকের অন্তরে নেক আমলকারীর জন্য ভালোবাসার সৃষ্টি করে। “আমি অবশ্যই তাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করব।” (৭১-সূরা আল জ্বীন: আয়াত-১৬)
৪. সাহসিকতা বা বীরত্ব : কেননা সাহসী মানুষ দৃঢ় ও শক্ত হয় এবং একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে। অভাব- অনটন ও সংকট তাকে বিচলিত করতে পারে না এবং তার অসুবিধাও করতে পারে না।
৫. পাপ না করা : পাপ মানুষের মনের শান্তি নষ্ট করে দেয় এবং পাপের ফলে মানুষ নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবে ও চারিদিকে অন্ধকার দেখে। একজন আরব কবি বলেন-
رأيت الذنوب تميت القلوب * وقد يورث الذل إدمانها
“আমি পাপকে দেখেছি যে উহা অন্তরকে মেরে ফেলে, আর পাপের আসক্তি আসক্তকে (পাপীকে) অপমানিত করে।”
৬. বৈধ কাজেও সংযমী হওয়া : কথা-বার্তায়, ঘুমে, মানুষের সাথে মেলামেশার ব্যাপারে এবং খাওয়া-দাওয়ায় সংযত হতে হবে।
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ.
“আর যারা অনর্থক ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত থাকে।” (২৩-সূরা আল মু'মিনুন: আয়াত-৩)
“মানুষ যে কথাই বলে (তা লিখে নেয়ার জন্য) তৎপর এক প্রহরী তার পাশেই রয়েছে।” (৫০-সূরা কাফ : আয়াত-১৮)
“এবং পানাহার কর তবে অপচয় করিও না।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-৩১)
একজন আরব কবি বলেছেন- “হে কুপ্রকর্মকারী! তুমি তো অনেক ঘুমিয়েছ, তুমি কি জাননা যে, মৃত্যুর পর লম্বা ঘুম আছে?”
📄 স্বাধীনতার মজা
আর রশীদ ‘আলমাছাহান’ (المَسَارُ) নামক কিতাবে লিখেছেন–
“যার তিনশত ষাটখানা রুটি, একটিন তেল এবং একহাজার ছয়শত খেজুর (অর্থাৎ পূর্ণ এক বছরের খোরাক) আছে কেউ তাকে গোলাম বানাতে পারবে না।”
একদা আমাদের এক ধার্মিক পূর্বসূরী বলেছিলেন–
“যে ব্যক্তি শুকনো রুটি ও পানিতে তৃপ্ত থাকবে সে আল্লাহর গোলামী ছাড়া অন্য সকলের গোলামী থেকে মুক্ত থাকবে।”
“এবং তাঁর প্রতি কারো অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়।” (৯২-সূরা আল লাইল : আয়াত-১৯)
একজন কবি বলেন–
“আমার লোভ-লালসা আমাকে দাস বানিয়েছে, কেননা আমি ওগুলোর আনুগত্য করেছি। আর যদি আমি পরিতুষ্ট থাকতাম তবে আমি স্বাধীন থাকতাম।”
যারা সুখের উপায় হিসেবে সম্পদ ও পদমর্যাদা পেতে চায় অবশেষে তারা জানতে পারবে যে, তাদের চেষ্টা কতটা ব্যর্থ ও নিষ্ফল ছিল।
“এবং তোমরাতো অবশ্যই (সঙ্গী-সাথী ও সহায় সম্বলহীন অবস্থায়) একবারে একাকী আমার নিকট ঠিক সেরূপ অবস্থায় এসেছো যেরূপ আমি প্রথম বার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম এবং আমি যা তোমাদেরকে দান করেছিলাম তা তোমরা পিছনে ফেলে এসেছ।” (৬-সূরা আল আন‘আম : আয়াত-৯৪)
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ, অথচ পরকাল উত্তম ও স্থায়ী।” (৮৭-সূরা আল আ'লা : আয়াত-১৬-১৭)
📄 গণকের কথা বিশ্বাস করবেন না
দুর্ভোগের ভবিষ্যৎবাণী (যা কদাচিত্ ঘটতে পারে) এবং পূর্বকুলক্ষণ (অধিকাংশ সময়েই মিথ্যা) বহু মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করে। “শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে (কুকাজ, অবৈধ যৌন ক্রিয়া-কলাপ ও পাপ ইত্যাদি) ফাহেশা কাজ করার জন্য আদেশ করে; অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও দানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময় মহাজ্ঞানী।” (২-সূরা আল বাকারা : আয়াত-২৬৮)
উদ্বিগ্নতা, অনিদ্রা ও ক্ষোভ হলো হতাশা ও দুশ্চিন্তার কুফল। একজন আরব কবি বলেছেন—
“আমাদেরকে শাস্তি দিবেন না। কারণ, আমরা তো আগেই শাস্তি পেয়েছি, দুশ্চিন্তার মাধ্যমে, যা আমাদেরকে গভীর রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে।”
📄 এ বিশ্ব জগতের সৌন্দর্য উপভোগ করুন
আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গবেষণা করে ও এর মূল্যায়ন করে আপনি শান্তি পাবেন। মহান আল্লাহ বলেন-
“অতঃপর আমি তা দিয়ে সুশোভিত বাগান উৎপন্ন করি।” (২৭-সূরা আন নামল : আয়াত-৬০)
“বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তোমরা দেখ।” (১০-সূরা ইউনুস : আয়াত-১০১)
“আমাদের প্রভু হলেন তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুর আকৃতি দান করেছেন অতঃপর এটাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন।” (২০-সূরা ত্বাহা: আয়াত-৫০)
উজ্জ্বল সূর্য, ঝলমলে তারা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, গাছ-পালা ফলমূল, বায়ু ও পানি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
“অতএব, সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতইনা বরকতময়।” (২৩-সূরা আল মু'মিনুন : আয়াত-১৪)
একজন আরব কবি বলেছেন-
وَفِي كُلِّ شَيْءٍ لَهُ آيَةٌ * تَدُلُّ عَلَى أَنَّهُ الْوَاحِدُ.
“প্রত্যেক বস্তুর মাঝে তার নিদর্শন আছে, যা ইঙ্গিত করে যে, তিনি এক।”
প্রসিদ্ধ আরব কবি ইলিয়া আবু মাযী বলেছেন-
أَيُّهَا الشَّاكِي وَمَا بِكَ دَاءٌ * كَيْفَ تَغْدُو إِذَا غَدَوْتَ عَلِيلًا.
أَتَرَى الشَّوْكَ فِي الْوُرُودِ وَتَعْمَى * أَنْ تَرَى فَوْقَهَا النَّدَى إِكْلِيلاً.
وَالَّذِي نَفْسُهُ بِغَيْرِ جَمَالٍ * لَا يَرَى فِي الْوُجُودِ شَيْئًا جَمِيلاً.
১. “হে অভিযোগকারী, (তুমি অভিযোগ করছ) অথচ তোমার তো কোনো অসুবিধা (অভিযোগের কারণ) নেই, তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে কী করবে?! (অথচ তুমি সুস্থ অবস্থায় অভিযোগ করছ!)
২. তুমি কি গোলাপের কাঁটাই শুধু দেখতে পাচ্ছ? আর ফুলের উপরের মালার মত শিশির বিন্দু দেখতে পাচ্ছ না?!
৩. যে নিজেই অসুন্দর সে প্রকৃতিতে সুন্দর কোন কিছু দেখতে পায় না।”
“তারা কি উটের দিকে তাকিয়ে দেখে না যে কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে?” (৮৮-সূরা আল গাশিয়া: আয়াত-১৭)
আইনস্টাইন বলেছেন যে- যে ব্যক্তি বিশ্ব জগত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সে বুঝতে পারে যে, যে সত্তা একে সৃষ্টি করেছেন তিনি মহা জ্ঞানী এবং তিনি খুঁটি দিয়ে জুয়া-পাশা খেলছেন না।
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُۦۖ
“যিনি প্রতিটি জিনিসকেই উত্তমরূপে সৃষ্টি করেছেন।” (৩২-সূরা আস সাজদাহ : আয়াত-৭)
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ
“আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা খেলা-তামাশা করে সৃষ্টি করিনি।” (৪৪-সূরা আদ দোখান : আয়াত-৩৮) অর্থাৎ আমি এদেরকে পরীক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছি যে কে অনুগত আর কে অনুগত নয় আর তার পর অনুগতদেরকে পুরস্কার দিবো ও অবাধ্যদেরকে শাস্তি দিবো।
“তবে কি তোমরা মনে করেছিলে যে আমি তোমাদেরকে অহেতুক সৃষ্টি করেছি?” (২৩-সূরা আল মু’মিনুন : আয়াত-১১৮)
এসব আয়াতের অর্থ এই যে, ঐশী জ্ঞান অনুযায়ী সব কিছুই পরিকল্পিত ও পরিমিত। আর যে ব্যক্তিই সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে সেই বুঝতে পারে যে, একজন শক্তিমান আল্লাহ আছেন যিনি সবকিছুকে টিকিয়ে রাখেন ও সবকিছুর ব্যবস্থাপনা করেন এবং সবকিছু অবস্থার সাথে মিল রেখে হঠাৎ (যখন যেমন তখন তেমন) ঘটে এ কথা ভুল অর্থাৎ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী পূর্ব নির্ধারিত বিধিমতে ঘটে একথা সত্য।
“সূর্য ও চন্দ্র হিসাবমত চলে।” (৫৫-সূরা আর রাহমান : আয়াত-৫)
“সূর্যের সাধ্য নেই যে চন্দ্রের নাগাল পায় আর রাতও দিনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষ পথে পরিভ্রমণ করছে।” (৩৬-সূরা ইয়াসিন : আয়াত-৪০)