📄 বিচক্ষণতা
যে ব্যক্তি বিচক্ষণতার সাথে ব্যয় করে সে অন্যের উপর নির্ভর করা থেকে বাঁচতে পারে। একজন আরব কবি বলেছেন-
اِজْمَعْ نُقُودَكَ إِنَّ الْعِزَّ فِي الْمَالِ * وَاسْتَغْنِ مَا شِئْتَ عَنْ عَمٍّ وَعَنْ خَالِ -
“তোমার ধন-সম্পদকে সঞ্চয় করে রাখ, কেননা সম্পদের মাঝে সম্মান আছে, তাহলেই যতক্ষণ ইচ্ছা চাচা ও মামা থেকে অমুখাপেক্ষী থাকতে পারবে।”
যে দর্শন অপব্যয় বাড়ায় তা ভিত্তিহীন বা ভুল এবং তা মানুষের কল্যাণের পক্ষে ক্ষতিকর। এমন ধারণার মূল ভারতে পাওয়া যায় বা এ ধারণার উৎপত্তি মূর্খ সূফীদের থেকে। আসলে ইসলাম সঙ্গতভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতি ও যথাযথভাবে সে অর্থ ব্যয় করার প্রতি উৎসাহ দেয়। এই দুই মূলনীতি মানুষকে তার সম্পদের মাধ্যমে সম্মানিত করে। নিচে বর্ণিত নবী করীম ﷺ-এর বাণীই এর প্রমাণ বা দলিল-
نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ فِي يَدِ الرَّجُلِ الصَّالِحِ -
অর্থাৎ, “সৎ মানুষের হাতে সৎ (সৎ ভাবে উপার্জিত) সম্পদ কতইনা ভাল!”
ধনীর বিপরীতে আছে অভাবী, ধনী ব্যক্তি সর্বদা এ দুশ্চিন্তা করে যে, তার সব সম্পদ তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে আর অভাবী লোকতো সর্বদা শুধুমাত্র বেঁচে থাকার উপকরণ পাওয়ার সন্ধানে লিপ্ত। নবী করীম ﷺ বলেছেন,
“হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কুফুরি ও অভাব থেকে আশ্রয় চাই।”
তিনি আরো বলেছেন-
“অভাব প্রায় কুফুরির মতো।”
পূর্বোক্ত হাদীস ও (নিম্নোক্ত) ইবনে মাজাহ শরীফের হাদীসের মাঝে কোন বিরোধ নেই-
“দুনিয়াতে অল্পে তুষ্ট হও, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন এবং অন্যের যা আছে তা পেতে চেও না, তাহলে মানুষেরাও তোমাকে ভালোবাসবে।”
নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে এ হাদীসে কিছুটা সমস্যা আছে; তবুও মনে করুন যে, এটি দুর্বল নয়। আর এ হাদীসের অর্থ হলো যে, প্রয়োজনীয় জিনিস থাকলেই আপনার তৃপ্ত থাকা উচিত এবং আপনার সে পরিমাণ সম্পদ থাকলেই পরিতৃপ্ত থাকা উচিত যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে ভিক্ষা করতে হয় না ও অন্যের সাহায্য চাইতে হয় না। একই সময়ে আপনার মহৎ ও স্ব-নির্ভর থাকা উচিত এবং নিজেকে অন্যের নিকট সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত রাখার মতো যথেষ্ট উপকরণ আপনার থাকা উচিত।
“আর যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী হতে চায় আল্লাহ্ তাঁকে অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দেন।”
একজন আরব কবি বলেছেন- “স্রষ্টা ছাড়া আমি কখনও অন্য কারো কাছে হাত বাড়াইনি, আর আমি কখনও এমন কারো কাছে একটি টাকাও চাইনি যে তার কৃপণতার কথা অন্যদেরকে মনে করিয়ে দেয়।”
একখানি সহীহ হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাও তবে তারা মানুষের নিকট হাত পাতবে। এর চেয়ে বরং তোমার জন্য এটা ভালো যে, তুমি তাদেরকে ধনী অবস্থায় রেখে যাও।”
আরেকটি সহীহ হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে ভালো।”
এ হাদীসের অর্থ হলো- দাতা গ্রহীতার চেয়ে ভালো।
“মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণে মূর্খরা তাদেরকে ধনী মনে করে।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২৭৩)
নিচের আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, অন্যের থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়ার জন্য কারো তোষামোদ করা কারো উচিত নয়, কেননা, আল্লাহ আমাদের রিযিকের নিশ্চয়তা দান করেছেন।
“তবে কি তারা তাদের নিকট ইজ্জত পেতে চায়? 'বস্তুত' নিশ্চয় সকল ইজ্জত আল্লাহরই।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১৩৯)
أَنَا لَا أَرْغَبُ تَقْبِيلَ يَدٍ * فَقَطَعَهَا أَحْسَنُ مِنْ تِلْكَ الْقَبْلِ
إِنْ جَرَّتْنِي مِنْ صَنِيعٍ كُنْتُ فِيْ * رِقِهَا أَوْلًا فَيَكْفِينِي الْخَجَلُ.
“অন্যের হাতে চুমু খাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নেই। আমার জন্য চুমু খাওয়ার চেয়ে না খাওয়াই ভালো। যখন কেহ আমাকে দয়া করে তখন সে আমাকে দাস বানায়। অথবা, যদি তা না হয়, তবে কমপক্ষে আমি লজ্জিত হই।”
📄 যা করলে শান্তি পাবেন
ইমাম ইবনুল কায়্যিম এমন কিছু বিষয় বর্ণনা করেছেন যা মনকে প্রশান্ত করে। নিম্নে তা বর্ণনা করা হলো-
১. তাওহীদ বা একত্ববাদ: অর্থাৎ আল্লাহর সাথে তাঁর ইবাদতে কোন শরিক না করে এবং তাঁর সকল গুণের সাথে অন্য কাউকে শরিক না করে একচেটিয়াভাবে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। কাফের ও মুশরিকরা যারা মহান আল্লাহর সাথে শরিক করে তারা আসলে মৃত, জীবিত নয়।
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
“আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার জন্য অবশ্যই কষ্টকর জীবন রয়েছে এবং আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় হাশর করাব।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-১২৪)
“আর আল্লাহ যাকে হিদায়াত করতে চান তার অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দেন।” (৬-সূরা আল আন্আ’ম : আয়াত-১২৫)
“আল্লাহ যার অন্তরকে ইসলামের জন্য খুলে দিয়েছেন ফলে সে তার প্রভুর পক্ষ থেকে পাওয়া নূরের উপর আছে– তবে কি সে ঐ কাফিরের মতো যে এমনটি নয়?” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-২২)
“আমি অচিরেই কাফেরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করব, কেননা তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছে– যে বিষয়ে তিনি কোন দলীল প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫১)
“অতএব তাদের জন্য ধ্বংস যাদের অন্তর এতটা কঠোর যে তাতে আল্লাহর কথা মনে পড়ে না।” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-২২)
“আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান তার অন্তরকে তিনি সংকুচিত ও সংকীর্ণ করে দেন, মনে হয় যেন সে আকাশে চড়ছে।” (৬-সূরা আল আন্আ’ম : আয়াত-১২৫)
২. উপকারী ইলম বা জ্ঞান : কেননা আলেমরাই (জ্ঞানীরাই) সর্বাপেক্ষা সুখী; স্বচ্ছল, নির্বিঘ্ন এবং পরিতুষ্ট। কেনেইবা আলেমেরা এমনটি হবেন না? তারা যে মুহাম্মাদ ﷺ-এর উত্তরাধিকারী।
“এবং তুমি যা জানতে না তিনি তোমাকে তা শিখিয়েছেন।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১১৩)
“সুতরাং তুমি জেনে রাখ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই।” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা ক্বতাল : আয়াত-১৯)
৩. আমলে সালেহ বা নেক আমল বা পুণ্যকর্ম বা সৎকার্য বা ভালো কাজ : একটি সওয়াবের কাজ বা নেক আমল অন্তরে ও চেহারায় উভয় স্থানেই আলো দেয় এবং রিযিকের প্রশস্ততা বয়ে আনে আর অন্যান্য লোকের অন্তরে নেক আমলকারীর জন্য ভালোবাসার সৃষ্টি করে। “আমি অবশ্যই তাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করব।” (৭১-সূরা আল জ্বীন: আয়াত-১৬)
৪. সাহসিকতা বা বীরত্ব : কেননা সাহসী মানুষ দৃঢ় ও শক্ত হয় এবং একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে। অভাব- অনটন ও সংকট তাকে বিচলিত করতে পারে না এবং তার অসুবিধাও করতে পারে না।
৫. পাপ না করা : পাপ মানুষের মনের শান্তি নষ্ট করে দেয় এবং পাপের ফলে মানুষ নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবে ও চারিদিকে অন্ধকার দেখে। একজন আরব কবি বলেন-
رأيت الذنوب تميت القلوب * وقد يورث الذل إدمانها
“আমি পাপকে দেখেছি যে উহা অন্তরকে মেরে ফেলে, আর পাপের আসক্তি আসক্তকে (পাপীকে) অপমানিত করে।”
৬. বৈধ কাজেও সংযমী হওয়া : কথা-বার্তায়, ঘুমে, মানুষের সাথে মেলামেশার ব্যাপারে এবং খাওয়া-দাওয়ায় সংযত হতে হবে।
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ.
“আর যারা অনর্থক ক্রিয়া-কলাপ থেকে বিরত থাকে।” (২৩-সূরা আল মু'মিনুন: আয়াত-৩)
“মানুষ যে কথাই বলে (তা লিখে নেয়ার জন্য) তৎপর এক প্রহরী তার পাশেই রয়েছে।” (৫০-সূরা কাফ : আয়াত-১৮)
“এবং পানাহার কর তবে অপচয় করিও না।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-৩১)
একজন আরব কবি বলেছেন- “হে কুপ্রকর্মকারী! তুমি তো অনেক ঘুমিয়েছ, তুমি কি জাননা যে, মৃত্যুর পর লম্বা ঘুম আছে?”
📄 স্বাধীনতার মজা
আর রশীদ ‘আলমাছাহান’ (المَسَارُ) নামক কিতাবে লিখেছেন–
“যার তিনশত ষাটখানা রুটি, একটিন তেল এবং একহাজার ছয়শত খেজুর (অর্থাৎ পূর্ণ এক বছরের খোরাক) আছে কেউ তাকে গোলাম বানাতে পারবে না।”
একদা আমাদের এক ধার্মিক পূর্বসূরী বলেছিলেন–
“যে ব্যক্তি শুকনো রুটি ও পানিতে তৃপ্ত থাকবে সে আল্লাহর গোলামী ছাড়া অন্য সকলের গোলামী থেকে মুক্ত থাকবে।”
“এবং তাঁর প্রতি কারো অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়।” (৯২-সূরা আল লাইল : আয়াত-১৯)
একজন কবি বলেন–
“আমার লোভ-লালসা আমাকে দাস বানিয়েছে, কেননা আমি ওগুলোর আনুগত্য করেছি। আর যদি আমি পরিতুষ্ট থাকতাম তবে আমি স্বাধীন থাকতাম।”
যারা সুখের উপায় হিসেবে সম্পদ ও পদমর্যাদা পেতে চায় অবশেষে তারা জানতে পারবে যে, তাদের চেষ্টা কতটা ব্যর্থ ও নিষ্ফল ছিল।
“এবং তোমরাতো অবশ্যই (সঙ্গী-সাথী ও সহায় সম্বলহীন অবস্থায়) একবারে একাকী আমার নিকট ঠিক সেরূপ অবস্থায় এসেছো যেরূপ আমি প্রথম বার তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম এবং আমি যা তোমাদেরকে দান করেছিলাম তা তোমরা পিছনে ফেলে এসেছ।” (৬-সূরা আল আন‘আম : আয়াত-৯৪)
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ, অথচ পরকাল উত্তম ও স্থায়ী।” (৮৭-সূরা আল আ'লা : আয়াত-১৬-১৭)
📄 গণকের কথা বিশ্বাস করবেন না
দুর্ভোগের ভবিষ্যৎবাণী (যা কদাচিত্ ঘটতে পারে) এবং পূর্বকুলক্ষণ (অধিকাংশ সময়েই মিথ্যা) বহু মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করে। “শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে (কুকাজ, অবৈধ যৌন ক্রিয়া-কলাপ ও পাপ ইত্যাদি) ফাহেশা কাজ করার জন্য আদেশ করে; অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও দানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময় মহাজ্ঞানী।” (২-সূরা আল বাকারা : আয়াত-২৬৮)
উদ্বিগ্নতা, অনিদ্রা ও ক্ষোভ হলো হতাশা ও দুশ্চিন্তার কুফল। একজন আরব কবি বলেছেন—
“আমাদেরকে শাস্তি দিবেন না। কারণ, আমরা তো আগেই শাস্তি পেয়েছি, দুশ্চিন্তার মাধ্যমে, যা আমাদেরকে গভীর রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখে।”