📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 রিযিক তালাশ করুন কিন্তু লোভ করবেন না

📄 রিযিক তালাশ করুন কিন্তু লোভ করবেন না


সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক মাটির কীটেরও খাদ্য যোগান।

“ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী ও দু-ডানায় ভর করে উড়ন্ত প্রতিটি পাখি তোমাদের মতো এক একটি সম্প্রদায়।” (৬-সূরা আন‘আম : আয়াত-৩৮)

আল্লাহ আকাশের পাখি ও সাগরের মাছেরও খাবার যোগান-

وَمَا يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ
“আর তিনিই (সকলকে) খাওয়ান, অথচ তাকে খাওয়ানো হয় না!” (৬-সূরা আন‘আম : আয়াত-১৪)

কীট, পাখি বা মাছের চেয়ে আপনি মূল্যবান, সুতরাং রিযিক নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না।

আমি এমন কিছু লোককে চিনি যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সাথে তাদের দূরত্বের কারণে দারিদ্রপীড়িত হয়েছে। তাদের কিছু লোক ধনী ও স্বাস্থ্যবান ছিল; কিন্তু কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে তারা আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারা সালাত ছেড়ে দিয়েছিল এবং তারা বড় বড় গুনাহ করেছিল। আল্লাহ তাদের কাছ থেকে তাদের স্বাস্থ্য ও সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ও তার স্থলে তাদেরকে অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা দিয়েছিলেন। ফলে তখন তারা সংকটের উপর সংকট ও মসিবতের উপর মসিবত দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।

“আর যে ব্যক্তি আমার যিকির থেকে বিমুখ হবে তার জন্য নিশ্চয় এক সংকটময় জীবন রয়েছে।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-১২৪)

“এমনটা এ কারণে যে, আল্লাহ কোন জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন তা তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করবেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করবে।” (৮-সূরা আনফাল : আয়াত-৫৩)

“আর তোমাদের উপর যে বিপদাপদ আসে তা তোমরা যে পাপ কাজ কর তার ফলেই আসে; এবং তিনি অনেককেই ক্ষমা করে দেন।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-৩০)

“আর যদি তারা সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তবে আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে শস্যদান করে সমৃদ্ধ করতাম।” (৭২-সূরা আজ জ্বীন : আয়াত-১৬)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 হেদায়াতের রহস্য

📄 হেদায়াতের রহস্য


অল্পে তুষ্টি ও সুখ এমন নেয়ামত যা শুধুমাত্র তাদেরকে দান করা হয় যারা সরল-সোজা পথ অনুসরণ করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ পথের এক প্রান্তে রেখে গেছেন, এর অপর প্রান্তে রয়েছে জান্নাতসমূহ।

“এবং অবশ্যই আমি তাদেরকে এক সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেছি।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৬৯)

সুখ বলতে আমরা বুঝি, যখন কেউ সরল-সঠিক পথে পরিচালিত থাকে। যদিও পথে সে সঙ্কটাপন্ন হয় তবুও সে একটি সুখকর সমাপ্তির ও বেহেশতে ভবিষ্যৎ আবাসনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। ফলে সে এমন এক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করে-যিনি নিজের ইচ্ছায় কথা বলেননি, যিনি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ ছিলেন এবং যার কথা মানব জাতির জন্য দলিল। “প্রতিটি মানুষের জন্য একের পর এক বহু ফেরেশতা রয়েছে, তারা আল্লাহর আদেশে তাকে তার সামনের দিক থেকে ও তার পিছনের দিক থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করছে।” (১৩-সূরা রা’আদ : আয়াত-১১)

ধার্মিক লোকের আচরণ ও তার সরল-সঠিক পথে চলা দেখেই প্রত্যেকে তাঁর (ধার্মিক লোকের) আনন্দ উপলব্ধি করতে পারবেন। তিনি (ধার্মিক লোক) জানেন যে, তাঁর একজন প্রভু আছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে তাঁর (ধার্মিক লোকের) এক উত্তম আদর্শ আছে, তাঁর হাতে আল্লাহর কিতাব আছে, তাঁর অন্তরে নূর বা জ্যোতি আছে এবং ভালো কাজ করতে অনুপ্রেরণা দানকারী তাঁর একটি বিবেক আছে। সে কল্যাণের মহত্তর পর্যায়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং সর্বদা কল্যাণের জন্য চেষ্টা করছে।

ذٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِيْ بِهِ مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ
“এ হলো আল্লাহর হিদায়াত, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে এটা দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।” (৬-সূরা আল আন’আম : আয়াত-৮৮)

দু’টি পথ আছে : একটি রূপক অপরটি বাস্তব, প্রথমটি ঈমানের পথ যা এ পৃথিবীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে-যে পৃথিবী নাকি লোভে ও আশায় ভরপুর। দ্বিতীয় পথটি আখিরাতে জাহান্নামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। জান্নাতে যেতে হলে প্রত্যেককেই এর উপর দিয়ে যেতে হবে। যে এটা পার হতে পারবে না সে জাহান্নামে পড়ে ডুবে যাবে। এ পথ কাঁটায় ভরা। যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে ঈমানের পথে চালিত হবে সে পরকালের পথ নিরাপদে অতিক্রম করতে পারবে। তার ঈমানের তেজের অনুপাতে তাঁর পথ অতিক্রমের গতি হবে। আর জেনে রাখুন যে, যদি কেউ সরল-সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে ধন্য হয় তবে তার দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা অতি দ্রুত দূর হয়ে যাবে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মহৎ জীবনের জন্য মণি-মুক্তা (বা উপদেশাবলী)

📄 মহৎ জীবনের জন্য মণি-মুক্তা (বা উপদেশাবলী)


১. আল্লাহর নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়ার জন্য রাতের শেষ তৃতীয়ংশে জেগে উঠুন।
“এবং রাতের শেষ তৃতীয়ংশে ক্ষমা প্রার্থিগণ।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৭)

২. (সর্বদা সম্ভব না হলেও) কমপক্ষে মাঝে মাঝে ধ্যান করার জন্য নিজেকে মানুষজন থেকে নিঃসঙ্গ করে নিন।
“আর যারা আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৯১)

৩. ধার্মিকদের সাহচর্যে থাকুন।
“আর যারা তাদের প্রতিপালককে আহবান করে তুমি নিজেকে ধৈর্যসহকারে তাদের সাথে রাখ।” (১৮-সূরা আল কাহাফ : আয়াত-২৮)

৪. প্রায়ই আল্লাহর যিকির করুন।
“বেশি করে আল্লাহর যিকির কর।” (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-৪১)

৫. একনিষ্ঠতার সাথে ও ভক্তি করে দু'রাকাত সালাত আদায় করুন।
“যারা তাদের সালাতে ভীত-সন্ত্রস্ত, বিনয়-নম্র, ধীরস্থির ও একাগ্রচিত্ত।” (২৩-সূরা আল মু'মিনুন : আয়াত-২)

৬. বুঝে-শুনে ও গভীর ধ্যানের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করুন।
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে না?” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৮২)

৭. ভীষণ গরমের দিনে রোযা রাখুন।
“সে আমার জন্য তার খাদ্য, তার পানীয় ও তার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে।”

৮. গোপনে দান করুন।
“দান হাত কি ব্যয় করে তা এমনকি বাম হাতও জানে না।”

৯. দুর্দশাগ্রস্ত মুসলিমদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করুন ও তাদেরকে সাহায্য করুন।
“যে ব্যক্তি এ দুনিয়াতে কোন মুসলিমকে কোন মুসিবত থেকে উদ্ধার করবে আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাকে মুসিবত থেকে রক্ষা করবেন।”

১০. এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে যথাসম্ভব মিতাচারী ও সংযমী হয়ে থাকুন।

وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ.
“আখেরাত হলো উত্তম ও স্থায়ী।” (৮৭-সূরা আল আ'লা: আয়াত-১৭)

নূহ নবী (আ)-এর পুত্রের ভ্রান্তিসমূহের মাঝে তার এ কথাও ছিল-
سَاوِي إِلَىٰ جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ.
“আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নিব যা আমাকে বন্যার পানি থেকে রক্ষা করবে।” (১১-সূরা হূদ: আয়াত-৪৩)
সে যদি আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করত তবে ফল একেবারে অন্যরকম হত। নমরুদের দুর্দশার কারণ ছিল তার একথা! “আমি জীবন দান করি এবং আমি মৃত্যু ঘটাই।” সে এমন এক (বড়ত্বের) পোশাক পরতে চেষ্টা করেছিল যা তার নয় (বরং আল্লাহর) এবং সে এমন এক গুণ থাকার দাবি করেছিল যা প্রকৃতপক্ষে তার ছিল না (বরং তা আল্লাহর)-আর এভাবেই তার ধ্বংস সাধন হলো।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 বিচক্ষণতা

📄 বিচক্ষণতা


যে ব্যক্তি বিচক্ষণতার সাথে ব্যয় করে সে অন্যের উপর নির্ভর করা থেকে বাঁচতে পারে। একজন আরব কবি বলেছেন-
اِজْمَعْ نُقُودَكَ إِنَّ الْعِزَّ فِي الْمَالِ * وَاسْتَغْنِ مَا شِئْتَ عَنْ عَمٍّ وَعَنْ خَالِ -
“তোমার ধন-সম্পদকে সঞ্চয় করে রাখ, কেননা সম্পদের মাঝে সম্মান আছে, তাহলেই যতক্ষণ ইচ্ছা চাচা ও মামা থেকে অমুখাপেক্ষী থাকতে পারবে।”

যে দর্শন অপব্যয় বাড়ায় তা ভিত্তিহীন বা ভুল এবং তা মানুষের কল্যাণের পক্ষে ক্ষতিকর। এমন ধারণার মূল ভারতে পাওয়া যায় বা এ ধারণার উৎপত্তি মূর্খ সূফীদের থেকে। আসলে ইসলাম সঙ্গতভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতি ও যথাযথভাবে সে অর্থ ব্যয় করার প্রতি উৎসাহ দেয়। এই দুই মূলনীতি মানুষকে তার সম্পদের মাধ্যমে সম্মানিত করে। নিচে বর্ণিত নবী করীম ﷺ-এর বাণীই এর প্রমাণ বা দলিল-

نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ فِي يَدِ الرَّجُلِ الصَّالِحِ -
অর্থাৎ, “সৎ মানুষের হাতে সৎ (সৎ ভাবে উপার্জিত) সম্পদ কতইনা ভাল!”

ধনীর বিপরীতে আছে অভাবী, ধনী ব্যক্তি সর্বদা এ দুশ্চিন্তা করে যে, তার সব সম্পদ তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে আর অভাবী লোকতো সর্বদা শুধুমাত্র বেঁচে থাকার উপকরণ পাওয়ার সন্ধানে লিপ্ত। নবী করীম ﷺ বলেছেন,
“হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কুফুরি ও অভাব থেকে আশ্রয় চাই।”
তিনি আরো বলেছেন-
“অভাব প্রায় কুফুরির মতো।”

পূর্বোক্ত হাদীস ও (নিম্নোক্ত) ইবনে মাজাহ শরীফের হাদীসের মাঝে কোন বিরোধ নেই-
“দুনিয়াতে অল্পে তুষ্ট হও, তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন এবং অন্যের যা আছে তা পেতে চেও না, তাহলে মানুষেরাও তোমাকে ভালোবাসবে।”

নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে এ হাদীসে কিছুটা সমস্যা আছে; তবুও মনে করুন যে, এটি দুর্বল নয়। আর এ হাদীসের অর্থ হলো যে, প্রয়োজনীয় জিনিস থাকলেই আপনার তৃপ্ত থাকা উচিত এবং আপনার সে পরিমাণ সম্পদ থাকলেই পরিতৃপ্ত থাকা উচিত যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে ভিক্ষা করতে হয় না ও অন্যের সাহায্য চাইতে হয় না। একই সময়ে আপনার মহৎ ও স্ব-নির্ভর থাকা উচিত এবং নিজেকে অন্যের নিকট সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত রাখার মতো যথেষ্ট উপকরণ আপনার থাকা উচিত।

“আর যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী হতে চায় আল্লাহ্ তাঁকে অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দেন।”

একজন আরব কবি বলেছেন- “স্রষ্টা ছাড়া আমি কখনও অন্য কারো কাছে হাত বাড়াইনি, আর আমি কখনও এমন কারো কাছে একটি টাকাও চাইনি যে তার কৃপণতার কথা অন্যদেরকে মনে করিয়ে দেয়।”

একখানি সহীহ হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাও তবে তারা মানুষের নিকট হাত পাতবে। এর চেয়ে বরং তোমার জন্য এটা ভালো যে, তুমি তাদেরকে ধনী অবস্থায় রেখে যাও।”

আরেকটি সহীহ হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেছেন- “উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে ভালো।”
এ হাদীসের অর্থ হলো- দাতা গ্রহীতার চেয়ে ভালো।

“মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণে মূর্খরা তাদেরকে ধনী মনে করে।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২৭৩)

নিচের আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, অন্যের থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়ার জন্য কারো তোষামোদ করা কারো উচিত নয়, কেননা, আল্লাহ আমাদের রিযিকের নিশ্চয়তা দান করেছেন।

“তবে কি তারা তাদের নিকট ইজ্জত পেতে চায়? 'বস্তুত' নিশ্চয় সকল ইজ্জত আল্লাহরই।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১৩৯)

أَنَا لَا أَرْغَبُ تَقْبِيلَ يَدٍ * فَقَطَعَهَا أَحْسَنُ مِنْ تِلْكَ الْقَبْلِ
إِنْ جَرَّتْنِي مِنْ صَنِيعٍ كُنْتُ فِيْ * رِقِهَا أَوْلًا فَيَكْفِينِي الْخَجَلُ.
“অন্যের হাতে চুমু খাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নেই। আমার জন্য চুমু খাওয়ার চেয়ে না খাওয়াই ভালো। যখন কেহ আমাকে দয়া করে তখন সে আমাকে দাস বানায়। অথবা, যদি তা না হয়, তবে কমপক্ষে আমি লজ্জিত হই।”

ফন্ট সাইজ
15px
17px