📄 জীবনকে যতটা সংক্ষিপ্ত মনে করেন, তার চেয়েও সংক্ষিপ্ত
ডেল কার্নেগী এক ক্ষতযুক্ত রোগীর গল্প বর্ণনা করেছিলেন, সে রোগীর ক্ষত বেড়ে গিয়ে মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল, চিকিৎসকগণ তাকে বলেছিল যে, তার জীবনের খুব অল্প সময়ই আছে (অর্থাৎ সে খুব কম সময় বাঁচবে)। তারা তাকে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দাফন-কাফনের প্রস্তুতি গ্রহণ করাই তার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
হঠাৎ করে রোগী হানী (রোগীর নাম-হানী) এক স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল : সে মনে মনে ভাবল যে, জীবনে যদি তার এত অল্পসময়ই অবশিষ্ট থেকে থাকে তবে কেন এটাকে সর্বোচ্চ উপভোগ করব না? সে ভাবল, কতবারইনা আমার মৃত্যুর পূর্বেই পৃথিবীকে ভ্রমণ করার ইচ্ছা করেছি। আমার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার এটাই নিশ্চিত সুযোগ।” সে তার টিকেট ক্রয় করে নিল।
চিকিৎসকগণ যখন তার পরিকল্পনার কথা জানতে পারল তখন তারা বিস্মিত হয়ে গেল এবং তারা তাকে বলল, “আমরা বিধিমতে আপনার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছি এবং আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি : যদি আপনি এই ভ্রমণে অগ্রসর হন তবে আপনি মহাসাগরের তলদেশে কবরস্থ হবেন।” তাদের যুক্তি তর্ক বৃথা হয়ে গেল এবং তিনি শুধু বলেছিলেন “না, এমন কিছুই ঘটবে না। আমার পরিবারের সদস্যদেরকে আমি প্রতিজ্ঞাপূর্ণ চিত্তে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে আমি পারিবারিক গোরস্থানে কবরস্থ হওয়ার জন্য ফিরে আসব।”
এভাবে সে তার পরমোৎসাহ ও আনন্দের যাত্রা শুরু করল। সে তার স্ত্রীকে একথা বলে চিঠি লিখল যে, "আমি ভ্রমণ-জাহাজের সর্বাপেক্ষা মনোরম খাবার খাই। আমি কাব্য পড়ি এবং এ যাবত আমি যে সুস্বাদু চর্বিযুক্ত খাবার খেতাম না তা এখন খাই। আমি আমার পূর্বের গোটা জীবনে যে আনন্দ করছি এখন আমি তার চেয়ে বেশি জীবনকে উপভোগ করছি।"
ডেল কার্নেগী দাবি করেন যে, লোকটি তার রোগ থেকে মুক্ত হয়েছিল এবং সে যে উদ্দীপক পন্থা গ্রহণ করেছিল তা রোগ-শোক ও ব্যথা-বেদনা দূর করতে সক্ষম।
উপদেশ : সুখ, আনন্দ-স্ফূর্তি এবং শান্ত ভাব ও সৌম্যতা প্রায়ই চিকিৎসকদের বড়ির চেয়েও বেশি উপকারী।
📄 দিন বদলের সাথে ভালো-মন্দ পালাক্রমে আসে
বর্ণিত আছে যে, ইমাম আহমদ (রহ) বাকী ইবনে মুখাল্লিদকে তাঁর অসুস্থের সময় দেখতে গেলেন এবং তাঁকে বললেন-
"হে বাকী! আল্লাহর পুরস্কারের শুভ সংবাদে খুশি হও! সুস্থ থাকাকালীন দিনগুলো অসুস্থতা থেকে মুক্ত আর অসুস্থ থাকাকালীন দিনগুলো সুস্থতা থেকে মুক্ত।"
অর্থাৎ সুস্থতার সময়ে কেউ অসুস্থতার কথা কল্পনাও করে না, কেননা, তখন যেমনটি আশা করে তেমনটিই পরিকল্পনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। যাহোক, সাংঘাতিক অসুস্থতার সময়ে মানুষ সুস্থতার সময়ের বিষয়াদি ভুলে যায়।
দুর্বল হতাশা অসুস্থ আত্মার ভিতরেই পরিবেষ্টিত থাকে এবং এভাবেই হতাশা প্রবল হয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন : "আর যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে রহমত আস্বাদন করাই, অতঃপর তার থেকে তা ছিনিয়ে নেই, তবে সে অবশ্যই হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়। আর যদি দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করার পর আমি তাকে সুখ-শান্তি আস্বাদন করাই তবে সে অবশ্যই বলবে যে, "আমার কাছ থেকে সব দুঃখ দূর হয়ে গেছে।" তখন সে নিশ্চয় উচ্ছৃঙ্খল ও অহংকারী হয়। তবে যারা ধৈর্য ধরে ও আমলে সালেহ করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"
এ আয়াত কয়টির ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর লিখেছেন– "আল্লাহ মানুষের মন্দ চরিত্র সম্বন্ধে বর্ণনা দিচ্ছেন; তবে যেসব মুমিন বান্দাগণের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন তারা এর ব্যতিক্রম। সাধারণত মানুষ যদি স্বচ্ছলতার পর অভাব-অনটনে পড়ে তবে সে ভবিষ্যতে আদৌ কল্যাণ দেখা থেকে হতাশ হয়ে যায়। সে অতীত সম্বন্ধে ঘৃণা প্রদর্শন করে- যেন সে কখনো সুদিন ভোগ করেনি- এবং সে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে হতাশ হয়ে যায় যেন সে কখনো উদ্ধার ও মুক্তির আশা করে না।"
যখন সে দুঃখ-কষ্ট অভাব-অনটনের পর স্বচ্ছলতার অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন তার অবস্থা নিম্নরূপই হয়–
ذَهَبَ السَّيئَاتُ عَنِّي
“আমার কাছ থেকে সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে গেছে। (১১-সূরা হুদ : আয়াত-১০) অন্যকথায়, এরপর আমার উপর মন্দ কোনো কিছুই আপতিত হবে না।”
“নিশ্চয় সে উচ্ছৃঙ্খল ও অহংকারী হয়।” (১১-সূরা হুদ : আয়াত-১০)
“তবে যারা ধৈর্য ধরে এবং আমলে সালেহ করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। (১১-সূরা হুদ : আয়াত-১১)
📄 রিযিক তালাশ করুন কিন্তু লোভ করবেন না
সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক মাটির কীটেরও খাদ্য যোগান।
“ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী ও দু-ডানায় ভর করে উড়ন্ত প্রতিটি পাখি তোমাদের মতো এক একটি সম্প্রদায়।” (৬-সূরা আন‘আম : আয়াত-৩৮)
আল্লাহ আকাশের পাখি ও সাগরের মাছেরও খাবার যোগান-
وَمَا يُطْعِمُ وَلَا يُطْعَمُ
“আর তিনিই (সকলকে) খাওয়ান, অথচ তাকে খাওয়ানো হয় না!” (৬-সূরা আন‘আম : আয়াত-১৪)
কীট, পাখি বা মাছের চেয়ে আপনি মূল্যবান, সুতরাং রিযিক নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না।
আমি এমন কিছু লোককে চিনি যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সাথে তাদের দূরত্বের কারণে দারিদ্রপীড়িত হয়েছে। তাদের কিছু লোক ধনী ও স্বাস্থ্যবান ছিল; কিন্তু কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে তারা আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারা সালাত ছেড়ে দিয়েছিল এবং তারা বড় বড় গুনাহ করেছিল। আল্লাহ তাদের কাছ থেকে তাদের স্বাস্থ্য ও সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ও তার স্থলে তাদেরকে অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা দিয়েছিলেন। ফলে তখন তারা সংকটের উপর সংকট ও মসিবতের উপর মসিবত দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
“আর যে ব্যক্তি আমার যিকির থেকে বিমুখ হবে তার জন্য নিশ্চয় এক সংকটময় জীবন রয়েছে।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-১২৪)
“এমনটা এ কারণে যে, আল্লাহ কোন জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন তা তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করবেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করবে।” (৮-সূরা আনফাল : আয়াত-৫৩)
“আর তোমাদের উপর যে বিপদাপদ আসে তা তোমরা যে পাপ কাজ কর তার ফলেই আসে; এবং তিনি অনেককেই ক্ষমা করে দেন।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-৩০)
“আর যদি তারা সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত তবে আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে শস্যদান করে সমৃদ্ধ করতাম।” (৭২-সূরা আজ জ্বীন : আয়াত-১৬)
📄 হেদায়াতের রহস্য
অল্পে তুষ্টি ও সুখ এমন নেয়ামত যা শুধুমাত্র তাদেরকে দান করা হয় যারা সরল-সোজা পথ অনুসরণ করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ পথের এক প্রান্তে রেখে গেছেন, এর অপর প্রান্তে রয়েছে জান্নাতসমূহ।
“এবং অবশ্যই আমি তাদেরকে এক সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেছি।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৬৯)
সুখ বলতে আমরা বুঝি, যখন কেউ সরল-সঠিক পথে পরিচালিত থাকে। যদিও পথে সে সঙ্কটাপন্ন হয় তবুও সে একটি সুখকর সমাপ্তির ও বেহেশতে ভবিষ্যৎ আবাসনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। ফলে সে এমন এক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করে-যিনি নিজের ইচ্ছায় কথা বলেননি, যিনি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ ছিলেন এবং যার কথা মানব জাতির জন্য দলিল। “প্রতিটি মানুষের জন্য একের পর এক বহু ফেরেশতা রয়েছে, তারা আল্লাহর আদেশে তাকে তার সামনের দিক থেকে ও তার পিছনের দিক থেকে রক্ষণাবেক্ষণ করছে।” (১৩-সূরা রা’আদ : আয়াত-১১)
ধার্মিক লোকের আচরণ ও তার সরল-সঠিক পথে চলা দেখেই প্রত্যেকে তাঁর (ধার্মিক লোকের) আনন্দ উপলব্ধি করতে পারবেন। তিনি (ধার্মিক লোক) জানেন যে, তাঁর একজন প্রভু আছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে তাঁর (ধার্মিক লোকের) এক উত্তম আদর্শ আছে, তাঁর হাতে আল্লাহর কিতাব আছে, তাঁর অন্তরে নূর বা জ্যোতি আছে এবং ভালো কাজ করতে অনুপ্রেরণা দানকারী তাঁর একটি বিবেক আছে। সে কল্যাণের মহত্তর পর্যায়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং সর্বদা কল্যাণের জন্য চেষ্টা করছে।
ذٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِيْ بِهِ مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖ
“এ হলো আল্লাহর হিদায়াত, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে এটা দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।” (৬-সূরা আল আন’আম : আয়াত-৮৮)
দু’টি পথ আছে : একটি রূপক অপরটি বাস্তব, প্রথমটি ঈমানের পথ যা এ পৃথিবীর উপর দিয়ে বয়ে গেছে-যে পৃথিবী নাকি লোভে ও আশায় ভরপুর। দ্বিতীয় পথটি আখিরাতে জাহান্নামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। জান্নাতে যেতে হলে প্রত্যেককেই এর উপর দিয়ে যেতে হবে। যে এটা পার হতে পারবে না সে জাহান্নামে পড়ে ডুবে যাবে। এ পথ কাঁটায় ভরা। যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে ঈমানের পথে চালিত হবে সে পরকালের পথ নিরাপদে অতিক্রম করতে পারবে। তার ঈমানের তেজের অনুপাতে তাঁর পথ অতিক্রমের গতি হবে। আর জেনে রাখুন যে, যদি কেউ সরল-সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে ধন্য হয় তবে তার দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতা অতি দ্রুত দূর হয়ে যাবে।