📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মধু আহরণ কর কিন্তু মৌচাক ভেঙ্গ না

📄 মধু আহরণ কর কিন্তু মৌচাক ভেঙ্গ না


যাতে সৌম্যতা ও ভদ্রতা আছে তাই সুন্দর- আর যাতে তা নেই তাই খারাপ। কারো সাথে সাক্ষাৎকালে যখন আপনি সুন্দর হাসি দিবেন, একটি কোমল কথা বলবেন তখন আপনি একজন সত্যিকার সফল ব্যক্তির চরিত্র প্রদর্শন করবেন যে চরিত্র না কি একটি মৌমাছিও দেখায়।

যখন কোন মৌমাছি (ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে অর্থাৎ প্রয়োজনে) কোন ফুলে বসে তখন সে এটাকে ধ্বংস (নষ্ট) করে না, কেননা, আল্লাহ তা’আলা কোমলতার বদৌলতে যা দান করেন কঠোরতার বিনিময়ে তা দান করেন না। কিছু লোক আছেন যাদের ব্যক্তিত্ব চুম্বকের মতো আশেপাশের লোকেদেরকে আকর্ষণ করে, শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা তাদের কোমল ও ভদ্র কথা, তাদের ভালো ব্যবহার এবং তাদের মহৎ কাজের জন্য তারা (ঐ লোকেদের) ভালোবাসার পাত্র হন।

অন্যের বন্ধুত্বকে জয় করে নেওয়ার কৌশল মহান ও ধার্মিকগণ জানেন; সর্বদা একদল লোক তাদেরকে ঘিরে থাকে। কোন সমাবেশে শুধুমাত্র তাদের উপস্থিতিটাই আশীর্বাদ, তারা অনুপস্থিত থাকলে তাদের অভাববোধ করা হয় এবং তাদের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়।

এ ধন্য লোকদের একটি আচরণ সংহিতা আছে আর তা হল–

اِدْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّ وَلِيٌّ حَمِيمٌ.

"খারাপকে ভালো দিয়ে প্রতিহত কর, তাহলে তোমার আর যার মাঝে শত্রুতা আছে সে এমন হয়ে যাবে যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।" (৪১-সূরা হা-মীম-আস-সাজদাহ : আয়াত-৩৪)

(মন্দকে ভালো দ্বারা দূর করা বলতে বুঝায় যে, আল্লাহ তা'আলা বিশ্বস্ত ঈমানদারদেরকে ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ করতে এবং তাদের সাথে যারা মন্দ আচরণ করে তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে আদেশ করেছেন।)

তারা তাদের সততা, ক্ষমা ও ভদ্রতা দিয়ে অন্যের ভিতর থেকে হিংসাকে বের করে ফেলেন। তাদের সাথে যে মন্দ আচরণ করা হয়েছে তারা তা ভুলে যান আর যে দয়া তারা পেয়েছেন তারা শুধু তাই মনে রাখেন। তাদেরকে কটু ও রূক্ষ কথা বলা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তারা তা শুনেন না, বরং চিরতরে পিছনে না ফিরে তারা তাদের পথে অনবরত সামনে চলতে থাকেন। তারা শান্ত ও সৌম্য অবস্থায় থাকেন। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে মুসলমানগণ তাদের হাত থেকে নিরাপদ থাকেন। নবী কারীম ﷺ বলেছেন-

الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ.

"প্রকৃত মুসলিম সে যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকেন। আর প্রকৃত মু'মিন সে যাকে অন্য মানুষেরা তাদের রক্ত (জীবন) ও সম্পদের ব্যাপারে বিশ্বাস করে।"

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَصِلَ مَنْ قَطَعَنِي وَأَنْ أَعْفُوَ عَمَّنْ ظَلَمَنِي وَأَنْ أَعْطِيَ مَنْ حَرَمَنِي -

“যারা আমার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার জন্য, যারা আমার সাথে অন্যায় আচরণ করেছে বা আমাকে অত্যাচার করেছে তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে এবং যারা আমাকে বঞ্চিত করেছে তাদেরকে দান করতে আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন।”

“নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন- (বিশেষত তাদেরকে) যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৩৪)

এ ধরনের লোকেদেরকে এ পৃথিবীতে শান্তি ও প্রশান্তির এক আসন্ন পুরস্কারের ঘোষণা দিন। পরকালে জান্নাতে তাদের ক্ষমাশীল প্রভুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার এক মহা সুসংবাদও তাদেরকে দিন।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 জীবনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন

📄 জীবনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন


জীবনের আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং প্রায়ই তার পর দুঃখ নেমে আসে। জীবনের অর্থই হলো দায়িত্ব, সতত পরিবর্তনশীল যাত্রা ও দুঃখ-কষ্টের অবিরাম নির্মম প্রচণ্ড আক্রমণ।

আপনি এমন একজন পিতা, স্ত্রী বা বন্ধু পাবেন না যিনি সমস্যামুক্ত। আল্লাহ তা'আলা চেয়েছেন যে, এ পৃথিবীর দুটি করে বিপরীত জিনিস দিয়ে ভরপুর থাক। যেমন- ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য, সুখ-দুঃখ।

অতএব ভালোত্ব, সততা-সরলতা ও সুখ স্বর্গের (জান্নাতের) জন্য; মন্দকাজ, দুর্নীতি ও পাপকাজ এবং দুঃখ-দুর্দশা নরকের (জাহান্নামের) জন্য।

নবী করীম ﷺ বলেছেন- مَلْعُوْنَةٌ مَا فِيْهَا إِلَّا ذِكْرُ اللهِ وَمَا وَالاَهُ وَعَالِمًا وَمُتَعَلِّمًا.

“আল্লাহর যিকির ও যিকিরের ফলে যা আসে (যেমন ভালো কাজ, আল্লাহ যা ভালোবাসেন) তা এবং আলেম ও তালেবে এলম ছাড়া গোটা দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত।”

এক নিখুঁত, আদর্শ, দুশ্চিন্তা ও কষ্টহীন কল্পিত ইহজীবনের (কল্পিত ইহকালীন স্বর্গরাজ্যের) আশায় বৃথা ও কষ্ট কল্পনায় সর্বদা বিভোর না থেকে আপনার যা আছে তাই নিয়েই জীবন-যাপন করুন। জীবনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন এবং তদনুসারে সকল পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে (মানিয়ে) নিন। (সকল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার অর্থ সকল মতাদর্শ মেনে নেয়া ও তদনুসারে কাজ করা নয়; বরং, নিজে শান্তির ধর্ম মেনে চলা ও অন্যকে তদনুসারে চলতে বলা, যদি তারা না মানে তবে অহেতুক মর্মযাতনাবোধ না করা। -অনুবাদক) এ দুনিয়াতে আপনি নিষ্কলঙ্ক সঙ্গী ও নিখুঁত পরিস্থিতি বলে কোন জিনিস পাবেন না; কেননা, নিষ্কলঙ্কতা ও নিখুঁত অবস্থা এমন দুটি গুণের নাম যা এ জীবনে পরদেশী।

নিজেদেরকে সংশোধন করা, সহজতাকে গ্রহণ করা, কঠিনটাকে বর্জন করা এবং প্রায়ই অন্যের ভুল-ভ্রান্তিকে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য জরুরি।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি

📄 এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি


وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا "এরূপে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি।" (২-সূরা বাকারা : আয়াত-১৪৩)

আপনার বিবেক ও আপনার ধর্ম উভয়টিই দাবি করে যে, আপনি মধ্যপন্থী হন। তার মানে আপনার চরমপন্থী ও নরমপন্থী কোনোটাই হওয়া উচিত নয়। বাড়াবাড়ি করাও উচিত নয়, খুব কম করাও উচিত নয়। যে সুখ চায় তাকে মধ্যপন্থী বা ন্যায্যনুগ হতে হবে-সে রাগান্বিত, বিষণ্ণ বা আনন্দিত যে কোন অবস্থাতেই থাকুক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না (অর্থাৎ সর্বাবস্থায় তাকে ন্যায়পরায়ণ বা মধ্যপন্থী হতেই হবে। —অনুবাদক)।

অন্যের সাথে আমাদের আচরণে বাড়াবাড়ি গ্রহণযোগ্য নয়।

মধ্যপন্থাই সর্বোত্তমপন্থা। যে তার প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে, কোন বিশেষ অবস্থার গুরুত্বকে বড় করে দেখারই কথা; এভাবে অকারণে সে বহুকিছু করে। সে অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে। যেহেতু সে বাড়াবাড়ি ও কল্পনার জগতে বাস করে তাই সে অন্য সবাইকে তার বিরুদ্ধবাদী বলে মনে মনে জল্পনা-কল্পনা করে। এমনকি এতটা পরিমাণে যে, সে ভাবতে থাকে অন্যেরা তাকে ধ্বংস করার সর্বদা চক্রান্ত করছে। এ কারণে সে সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অন্ধকার মেঘের নিচে বসবাস করে।

লোকশ্রুতি ও কুসংস্কার অনুযায়ী জীবন যাপন করা আমাদের ধর্মে নিষিদ্ধ। يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ ؕ "তারা মনে করে প্রত্যেক শোরগোলই তাদের বিরুদ্ধে।" (৬৩-সূরা মুনাফিকুন : আয়াত-৪)

প্রায়ই এমন হয় যে, আপনি যা ঘটবে বলে আশঙ্কা করেন তা ঘটে না। এমন পরিস্থিতিতে আপনার কিছু একটা করা উচিত। আর তা হলো- যখন আপনি কোনো কিছুর ভয় করেন তখন কল্পনা করুন যে, সর্বাপেক্ষা অন্তত পরিণতি দেখা দিয়েছে এবং তারপর সে পরিণতিতে নিজেকে প্রস্তুত ও সন্তুষ্ট ভাবতে নিজেকে প্রশিক্ষণ দিন। যদি আপনি এ কাজ করেন তবে আপনি নিজেকে আতঙ্ক ও কুসংস্কার থেকে রক্ষা করতে পারবেন। অন্যথায় এই আতঙ্ক ও কুসংস্কার আপনার অনেক দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রতিটি বিষয়ের প্রতি তার গুরুত্ব অনুসারে মনোযোগ দিন। কোন (নির্দিষ্ট) অবস্থাতেই তিলকে তাল করবেন না। বরং নিরপেক্ষ বিচার ও দৃঢ়তার কথা মনে রাখুন। অহেতুক সন্দেহ ও বৃথা আশার প্রতারণায় মোহের অন্ধ অনুসরণ করবেন না বা আলেয়ার আলোর পিছে ছুটবেন না। বরং ভারসাম্যপূর্ণ হোন। নবী করীম ﷺ কর্তৃক বর্ণিত ভালোবাসা ও ঘৃণার মাপকাঠির কথা শুনুন-

“তোমরা প্রিয়জনকে পরিমিত পরিমাণে ভালোবাস, কেননা এমন দিন আসতে পারে, যখন তুমি তাকে ঘৃণা করবে এবং যাকে তুমি ঘৃণা কর তাকে সংযত পরিমাণে ঘৃণা কর, কারণ এমন দিন আসতে পারে যখন তুমি তাকে ভালোবাসবে।”

عَسَى اللَّهُ أَن يَجْعَلَ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ الَّذِينَ عَادَيْتُم مِّنْهُم مَّوَدَّةً ۚ وَاللَّهُ قَدِيرٌ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.

“সম্ভবত তোমাদের মাঝে ও যাদেরকে তোমরা শত্রু মনে কর তাদের মাঝে আল্লাহ বন্ধুত্ব স্থাপন করে দিবেন। আর আল্লাহ (সবকিছুর উপর) ক্ষমতাবান এবং আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (৬০-সূরা মুমতাহিনা : আয়াত-৭)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ব্যথার দান

📄 ব্যথার দান


দুঃখ-বেদনা সর্বদাই ঋণাত্মক শক্তি নয় এবং এমন কিছু নয় যাকে সর্বদা আপনার ঘৃণা করা উচিত। কখনো কখনো মানুষ ব্যথাবোধ করে উপকৃত হয়।

আপনি স্মরণ করতে পারেন যে, কখনও কখনও আপনি দুঃখবোধ করলে আল্লাহর নিকট আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেছেন ও তাঁকে স্মরণ করেছেন। ছাত্র থাকাকালে প্রায়ই বিরাট বোঝার বেদনা (আতঙ্ক) বোধ করে। মাঝে মাঝে সম্ভবত একঘেয়েমির বোঝার আতঙ্কে ভোগে, তবুও অবশেষে সে ছাত্র জীবনের এ স্তর শেষ করে। শুরুতে সে ব্যথা-ভারাক্রান্তবোধ করে। কিন্তু শেষে সে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

প্রচন্ড আবেগের ব্যথা-বেদনা, দারিদ্র্য; অন্যের অবজ্ঞা, ঘৃণা, অবিচার পেয়ে অত্যাচারিত হয়ে হতাশা ও ক্রোধ এসব কিছুই কবিকে সাবলীল ও বিমোহিতকারী কবিতার চরণ লিখতে বাধ্য করে। কারণ, সে তার হৃদয়ে, তার মজ্জাতে যাতনা বোধ করে, ফলে তার কাজের (কবিতার) মাধ্যমে সে একই আবেগ অন্যের অন্তরে সঞ্চারিত করতে সক্ষম হয়। উত্তম লেখকদের কতই না বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয়েছে- যে সব অভিজ্ঞতা চমৎকার কাজের (কবিতার, গল্পের, উপন্যাস ইত্যাদির) অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে-যেসব কাজ থেকে আজও উত্তর পুরুষেরা অনবরত আনন্দ ও উপকার লাভ করছে।

যে ছাত্র আরাম-আয়েশের জীবন কাটায় ও কষ্টভোগ করেনি বা যে ছাত্র কখনও দুর্দশাগ্রস্ত হয়নি সে অনুপযোগী, অলস ও নিকৃষ্ট হবে।

বাস্তবিক, যে কবি কোন দুঃখ-বেদনার কথা জানে না, কখনও আশা ভঙ্গের তীব্র অভিজ্ঞতার স্বাদ গ্রহণ করেনি, সে অতি অবশ্যই সাদা শব্দের গাদাগাদা স্তূপ রচনা করবে। এটা এ কারণে যে, তার শব্দাবলী তার মুখ থেকে বেরোয়- তার আবেগ-অনুভূতি থেকে নিঃসৃত হয় না এবং যা সে লিখেছে, যদিও সে তা বুঝে তবুও তার দেহ-মন জীবনে অভিজ্ঞতা লাভ করেনি।

প্রাথমিক যুগের মুমিনদের জীবন পূর্বোল্লিখিত উদাহরণসমূহের সাথে অধিকতর উপযুক্ত ও যুক্তিসঙ্গত। তারা কুরআন অবতীর্ণকালে জীবন যাপন করছিলেন এবং মানবজাতি চিরকালের দৃষ্ট সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে, পরবর্তীকালের তুলনায় তাদের অধিকতর বেশি ঈমান, মহত্তর আত্মা, অধিকতর সত্যবাদী জবান এবং গভীরতর জ্ঞান ছিল- তাঁদের এসব থাকার কারণ হলো- তাঁরা দুঃখ-কষ্ট ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিলেন। দুঃখ-কষ্ট ও ভোগান্তি এতদুভয়ই মহাবিপ্লবের প্রয়োজনীয় সহগামী। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান, গালি-গালাজ, বাড়ি-ঘর ও স্বদেশ থেকে বিতাড়ন, সকল আনন্দ বিসর্জন, আঘাত, অত্যাচার ও মৃত্যু যন্ত্রণা তাঁরা ভোগ করেছিলেন। সত্যিই তাঁরা বাছাইকৃত, মানবজাতির সর্বাধিক অভিজাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁরা বিশুদ্ধতা, মহত্ত্ব ও উৎসর্গের নমুনা ছিলেন।

ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَأٌ وَلَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدُوٍّ نَيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُم بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ .

‘‘কারণ আল্লাহর পথে তাদের তৃষ্ণা, ক্লান্তি, ক্ষুধায় কাতর হওয়া, কাফেরদের ক্রোধ উদ্রেক করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং শত্রুদের পক্ষ থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া তাদের আমলনামায় সৎকর্মরূপে লিখিত হয়। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের কর্মফল নষ্ট করেন না।’’ (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-১২০)

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা তাদের মহত্তম কর্ম (রচনা) দুঃখকষ্ট ও ভোগান্তির অভিজ্ঞতা লাভ করার কারণেই সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। আরবী বিখ্যাত কবি মুতানাব্বি যখন সাংঘাতিক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন তিনি তার কিছু উত্তম কাব্য রচনা করেছিলেন। নুমান ইবনে মুনযির যখন নাবিগাহকে মৃত্যু ভয় দেখিয়েছিলেন, তখনই নাবিগাহ তার কিছু সর্বোত্তম কাব্য রচনা করেছিলেন। যে প্রসিদ্ধ পংক্তিটি তিনি বলেছিলেন তা হলো-

فَإِنَّكَ شَمْسٌ وَالْمُلُوكُ كَوَاكِبٌ * إِذَا أَظْلَمَتْ لَمْ يَبْدُ مِنْهُنَّ كَوْكَبُ.

ভাবানুবাদ: আপনি হলেন সূর্য আর সব রাজারা তারকা, উদিত হলে সূর্য, দেখা যায় না একটিও তারকা।

বাস্তবিক, যাতনার অভিজ্ঞতা লাভ করার ফল যারা সাফল্যমন্ডিত হয়েছে ও কৃতিত্ব অর্জন করেছে তাদের অনেক উদাহরণ আছে।

সুতরাং, যখন আপনি যাতনার কথা ভাবেন, তখন অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে যাবেন না। এমনটা যুক্তিসঙ্গতভাবেই হতে পারে যে, দুঃখ-কষ্ট ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে আপনি আরো শক্তিশালী হবেন। তাছাড়া আপনার জন্য দমিত, জলন্ত ও আবেগপ্রবণ আস্থা নিয়ে বেঁচে থাকা শীতল আস্থা ও অদূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গীযুক্ত লোকের উদাসীন অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে অধিকতর পবিত্র ও মহৎ।

“কিন্তু আল্লাহ তাদের অভিযানে প্রেরিত হওয়াকে অপছন্দ করলেন। তাই তাদেরকে পিছনে বসিয়ে রাখলেন এবং তাদেরকে বলা হলো, ‘যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক’।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৪৬)

আবেগে ভরপুর ওয়াজ-নসিহতের শব্দাবলি সাধারণত এই কারণে অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে যেতে পারে যে, নসিহতকারী নিজেই দুঃখ-কষ্ট ও ভোগান্তির অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন।

“তিনি তাদের অন্তরে যা ছিল তা জেনেছেন এবং তাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন।” (৪৮-সূরা আল ফাতহ : আয়াত-১৮)

আমি বহু কাব্যগ্রন্থ পড়েছি এবং তাদের অধিকাংশই আবেগহীন, প্রাণহীন বা প্রেরণাহীন। এর কারণ হলো যে, এসব গ্রন্থের রচয়িতারা কখনও কষ্টভোগ করেননি এবং এ কারণে যে ঐ পুস্তকগুলো আরামদায়ক পরিবেশে সৃজন করা হয়েছে। এ কারণেই এ ধরনের লেখকদের লেখা বরফ খণ্ডের মতো ঠাণ্ডা।

ওয়াজ-নসিহতে ভরা এমন অনেক কিতাব আমি পড়েছি যেগুলো শ্রোতার শরীরের একটি পশমেও শিহরণ জাগাতে পারে না এবং সেগুলোর এক অণু পরিমাণ ওজনও নেই। বক্তা (যার ওয়াজ ছাপানো হয়েছে) আবেগ-অনুভূতি নিয়ে অন্য কথায় ব্যথা-বেদনাসহ কথা বলছেন না (তাই এমনটি হচ্ছে)।

يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْসَ فِي قُلُوبِهِمْ ۚ
“তাদের অন্তরে যা নেই তা তারা মুখে বলে।” (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৭)

আপনি যদি আপনার কথা, কাব্য অথবা কাজ দ্বারাও অন্যদেরকে প্রভাবিত করতে চান, তবে প্রথমে আপনার অন্তরের আবেগকে অনুভব করুন। অন্যকে আপনি যা জানাতে চাচ্ছেন, তা দিয়ে আপনার নিজেকে অবশ্যই শিহরিত হতে হবে। কেবলমাত্র তখনই আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনি অন্যদের উপর প্রভাব ফেলছেন।

“কিন্তু, যখন আমি এর উপর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম, তখন এটা নড়ে-চড়ে, ফুলে-ফেঁপে উদ্গত হলো।” (২২-সূরা আল হাজ্জ : আয়াত-৫)

ফন্ট সাইজ
15px
17px