📄 সত্যিকার ভালবাসা
প্রকৃত সুখ পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে। আল্লাহর ভালোবাসার অর্জন করা যার জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য বা ব্রত সেই সর্বাপেক্ষা সফল, উন্নত ও সমৃদ্ধ ব্যক্তি। নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ এ ভালোবাসার কথা বলেন- يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّوْنَهٗ- “তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে ভালোবাসেন এবং তারাও তাঁকে ভালোবাসবে এবং ভালোবাসবে।” (৫-সুরা মারিয়দা: আয়াত-৫৪)
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْনَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْনِيْ يُحْبিবْكُمُ اللّٰهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ-
“(হে মুহাম্মাদ! ) আপনি মানবজাতিকে বলে দিন: “যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে তোমরা আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (৩-সূরা আল্ ইমরান: আয়াত-৩১)
সকলে জানিয়ে দেয়ার জন্য নবী করীম (সা)-এর এমন একটি তপের কথা সকলের মাঝে ঘোষণা করে দেন যা তাঁর মাথার মুকুট হয়ে আছে; আর তা হলো: (নবী করীম (সা) সম্বন্ধে বলেন-) رَجُلٌ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ. ভাবার্থ : (আলী (রা)) এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন এবং তাঁকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন।
নবী করীম (সা)-এর একজন সাহাবী কুরআনের সুরা ইখলাসকে ভালোবাসতেন। (সুরার প্রথম আয়াতটি হলো) قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ “(হে মুহাম্মাদ !) আপনি (মানুষদেরকে) বলে দিন : তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।” (১১২-সূরা ইখলাস: আয়াত-১)
তিনি (ঐ সাহাবী (রা)) সালাতের প্রতি রাকাতে এ সুরা তেলাওয়াত করতেন এবং তিনি তার আত্মাকে শান্তি দেয়ার জন্য অন্য সময়েও তিনি সর্বদা এ সুরা পাঠ করতেন। এ কারণে নবী করীম (সা) তাঁকে বলেছেন- حُبُّكَ إِيَّاهَا أَدْخَلَكَ الْجَنَّةَ “এ সুরার প্রতি তোমার ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।”
আমি একজন মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তির (আলেমের) জীবনীতে নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুলো পড়েছি-
إِذَا كَانَ حُبُّ الْهَائِمِينَ مِنَ الْوَرَى ❁ بِلَيْلَى وَسَلْمَى يَسْلُبُ اللُّبَّ وَالْعَقْلَا
فَمَاذَا عَسَى أَنْ يَفْعَلَ الْهَائِمُ الَّذِي ❁ سَرَى قَلْبُهُ شَوْقًا إِلَى الْعَالَمِ الْأَعْلَى
লায়লা ও সালমার প্রতি (সৃষ্টি) জগতের দিশেহারা প্রেমিকদের ভালোবাসা যখন নাকি জান-রূহকে লোপ করে দেয়, তখন যে দিশেহারা প্রেমিকের আত্মা প্রেমের টানে ঊর্দ্ধ জগতে বিচরণ করে সে কি করতে পারে বলে আশা করা যায়?
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَىٰ نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ ۚ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ ۗ
“এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, “আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।” (হে মুহাম্মাদ !) আপনি (তাদেরকে) বলুন। “তাহলে তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে শাস্তি দিবেন কেন?” (৫-সূরা মায়িদা: আয়াত-১৮)
লায়লীর প্রেমে মজনু শেষ হয়ে গেছে, ধন-সম্পদের মোহে কারুন ধ্বংস হয়ে গেছে, মর্যাদা ও ক্ষমতার মোহে ফেরাউন ধ্বংস হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে, হামজা (রা), জাফর (রা) ও হানযালা (রা) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রেমে শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসাকারী দল ও দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাকারী দল -এ দু'দলের মাঝে কতইনা বিস্তর ফারাক!
📄 রূপের প্রেমে মুগ্ধ হওয়া থেকে সাবধান!
রূপের প্রেমে পড়া থেকে সাবধান! এ ধরনের প্রেম দুশ্চিন্তা ও চির দুর্দশার জন্ম দেয়। এটা একজন মুসলমানের জন্য আশীর্বাদ যে, গানে যে সব প্রচণ্ড ভালোবাসার খবর, জাতীয় অন্যান্য ভালোবাসার খবর অথবা কারো প্রেম বিচ্ছেদের কাহিনী পাওয়া যায় তা থেকে সে দূরে থাকে।
“তবে কি আপনি তাকে দেখেননি যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য প্রভু (ইলাহ) হিসেবে গ্রহণ করেছে আর (তাই) আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার শ্রবণশক্তির ওপর ও তার হৃদয়ের ওপর মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার দৃষ্টির আবরণ রেখে দিয়েছেন।” (৪৫-সূরা জাসিয়াহ্ : আয়াত-২৩)
নিজেকে তিরস্কার করে এক আরব কবি লিখেছিলেন-
أَنَا الَّذِي جَلَبَ الْمَنِيَّةَ طَرْقَهُ * فَمَنْ الْمُطَالِبُ وَالْقَتِيلُ الْقَاتِلُ.
“আমিইতো মৃত্যুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, সুতরাং নিহত ব্যক্তি নিজেই যখন নিজের হত্যাকারী তখন কে দোষী?”
অবশেষে সে (কবি) বুঝতে পারছে যে, সে আবেগতাড়িত প্রেমে পড়েছে এবং এর থেকে বের হতে পারছে না। আর তার দুঃখ-দুর্দশার জন্য সে নিজেই দোষী। তাই সে যে চির দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে তার জন্য সে নিজেকেই দোষোরাপ করবে।
وإمَّا يَنزغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزعٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ. “আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে তোমার মনে কুমন্ত্রণা আসে তবে তুমি আল্লাহ নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।”
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ- “মুতাক্বীদেদের (খোদাভীরুদের) মনে যখন শয়তানের পক্ষ থেকে কুমন্ত্রণা আসে তখন নিশ্চয় তারা আল্লাহকে স্মরণ করে আর তখনই তারা (সঠিক পথ) দেখতে পায়।”
ইবনুল কায়্যিম তাঁর “রোগ ও চিকিৎসা” (الداء والدواء) কিতাবে এ বিষয়ের উপর ব্যাখ্যামূলক আলোচনা করেছেন। যেসব কারণে মানুষ মরিয়া হয়ে অদম্য প্রেমে পড়ে তিনি তার কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। নিচে সে সবের কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-
১. এমন এক শূন্য হৃদয় যাতে আল্লাহকে ভালোবাসা নেই, তাঁর জিকির নেই ও তাঁর ভয় নেই।
২. যথেচ্ছা দৃষ্টিপাত করা। চক্ষু হলো অনুক্ষণকারী, যা অন্তরে দুঃখ-কষ্ট বয়ে আনতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন- قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ “মু’মিনদেরকে বলে দিন যে তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।” (২৪-সূরা নূর: আয়াত-৩৬) দৃষ্টি হলো শয়তানের একটি তীর।
একজন আরব কবি বলেছেন-
وَأَنْتَ مَتَى أَرْسَلْتَ طَرْفَكَ رَائِدًا * إِلَى كُلِّ عَيْنٍ أَتْعَبَتْكَ الْمَنَاظِرُ.
رَأَيْتَ الَّذِي لَا كُلُّهُ أَنْتَ قَادِرٌ * عَلَيْهِ وَلَا عَنْ بَعْضِهِ أَنْتَ صَابِرُ.
“যখন তুমি তোমার দৃষ্টিকে অনুক্ষণকারীর মতো সকল চোখের দিকে যথেচ্ছ তাকাতে দিবে, তখন তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে যাবে। তখন তুমি এমন অনেক কিছু দেখবে যার পুরোটা তুমি আয়ত্ত করতে সক্ষম নও এবং এবং আংশিক আয়ত্ত করার ধৈর্যও তোমার নেই।
৩. ইবাদতে অবহেলা করা। বিশেষ করে জিকির, দোয়া ও সালাতে। إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ. “নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (২৯-সূরা আনকাবুত: আয়াত-৪৫)
এখানে অশ্লীল (فَحْشَا') কাজ বলতে সকল প্রকার অবৈধ যৌন ক্রিয়া ও নির্লজ্জ ও বেহায়া ক্রিয়াকলাপকে বুঝায় এবং নিষিদ্ধ, অপছন্দনীয় ও মন্দ (مُنْكَرُ) কাজ বলতে কুফুরী, শেরেকী ও সকল প্রকার মন্দ কাজকে বুঝায়।
📄 প্রচণ্ড ও অদম্য প্রেমের কিছু ঔষধ
১. “আমি তাঁর থেকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা দূরে রাখার জন্য এরূপ নিদর্শন দেখিয়েছিলাম।” (১২-সূরা ইউসুফ: আয়াত-২৪)
২. অধিকতরও একনিষ্ঠ হয়ে আপনার ইবাদতকে উন্নত করার জন্য কঠোর সাধনা করুন।
৩. আপনার দৃষ্টিকে নত (বা নিচের দিকে) রাখুন। وَيَحفظُوا فُرُوجَهُمْ ... “আর যে সব নর-নারীরা নিজেদের যৌনাঙ্গকে (অবৈধ যৌনক্রিয়া থেকে) হেফাজত রাখে।” (২৩-সূরা নূর: আয়াত-৩০-৩১) আপনার প্রেমাস্পদকে দূরে কোথাও চলুন।
৪. আমলে সালেহ, নেক আমল, পুণ্যকর্ম, সৎকাজ বা ভালো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আমাকে আশা ও ভয়ের সাথে ডাকত এবং তারা আমার তরে বিনীত ছিল।” (২১-সূরা আম্বিয়া: আয়াত-৯০)
৫. বৈধ আমোদ-আহলাদ করুন। অর্থাৎ শরীয়তসম্মত আনন্দ-ফূর্তি করুন।
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ. “তাহলে তোমাদের পছন্দনীয় নারীকে বিবাহ কর।” (৪-সূরা নিসা: আয়াত ৩)
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا. “এবং তাঁর নিদর্শনাবলির একটি এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও।” (৩০-সূরা আর রুম: আয়াত-২১)
নবী করীম ﷺ বলেছেন- يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ. “হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে।”
📄 ভ্রাতৃত্বের অধিকার
আপনার মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতকালে তার প্রিয় নামে তাকে ডাকুন এবং হাসিমুখে তাকে সালাম দিন।
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ. “আপনার ভাইয়ের সামনে আপনার হাসিমুখ সদকাতুল্য।”
আপনার সাথে কথা বলতে তাকে উৎসাহ দিন অর্থাৎ তার সম্বন্ধে ও তার জীবন সম্বন্ধে কথা বলতে তাকে সুযোগ দিন। তাকে তার অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করুন, তবে শুধুমাত্র সেসব বিষয় সম্বন্ধেই জিজ্ঞাসা করুন যেগুলো তাকে অপ্রস্তুত ও অপ্রতীত করবে না。
مَّن لَّমْ يَهْتَمَّ بِأَمْرِ الْمُسْلِمِينَ فَلَيْسَ مِنْهُمْ. “যে ব্যক্তি মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেনা বা খোঁজ-খবর নেয় না সে তাদের দলভুক্ত নয়।” (মুসলমান নয়)
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ. “মু'মিন নর-নারীরা একে অপরের বন্ধু, সাহায্যকারী, রক্ষাকারী ও অভিভাবক।”
তাকে তিরস্কার বা গালি দিবেন না বা অতীত ভুলের খোঁটা দিবেন না এবং তাকে নিয়ে তামাসা করে কষ্ট দিবেন না।
لَا تُمَارِ أَخَاكَ وَلَا تُمَازِحْهُ وَلَا تَعِدْهُ مَوْعِدًا فَتُخْلِفَهُ. “আপনার ভাইয়ের সাথে তর্ক করবেন না, তাকে নিয়ে তামাসা করবেন না এবং ওয়াদা দিয়ে তা ভঙ্গ করবেন না।”