📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মৃত্যু

📄 মৃত্যু


শাইখ আলী আত-তানতাভী বর্ণনা করেছেন যে, এক লোক সিরিয়াতে ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন যাত্রীকে পার করে দেওয়ার জন্য ট্রাকে তুলে নিলেন। যাত্রীটি পিছনে বসলেন যেখানে ছিল না কোন ছাদ আর না ছিল কোন ঢাকনা। সেখানে মৃত্যুকে বহনের জন্য প্রস্তুতকৃত একটি খাঁটিয়া ছিল। তখন বৃষ্টি হতে শুরু করল আর লোকটি লক্ষ্য করে দেখল যে খাঁটিয়াটি বেশ বড়সড় তাই সে এটার ভিতরে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আরেকটি যাত্রীও ট্রাকের পিছনের খোলা জায়গায় উঠল। তখনও বৃষ্টি চলছিল। তাই সেও খাঁটিয়ার ভিতরে বসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। দ্বিতীয় যাত্রী ভেবেছিল সে ট্রাকে একাই। কিন্তু, বৃষ্টি কমেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য প্রথম ব্যক্তিটি কোন রূপ সতর্কসংকেত ছাড়াই (দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বিস্মিত করে দিয়ে) খাঁটিয়া থেকে তার একটি হাত বের করল। এটা দেখে দ্বিতীয় যাত্রী একথা ভেবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল যে, মৃত ব্যক্তিটি জীবিত হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে চরম আতঙ্কে লোকটি হোঁচট খেয়ে ট্রাক থেকে পিছন দিকে রাস্তায় পড়ে গেল এবং তার মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে সাথে সাথে মারা গেল। এ অপ্রত্যাশিত মৃত্যু সেভাবেই ঘটল যেভাবে আল্লাহ্ ঐ লোকটির জন্য লিখে রেখেছিলেন।

একজন কবি বলেন- كُلُّ شَيْءٍ بِقَضَاءٍ وَقَدَرٍ ۚ وَالْمَنَايَا عِبَرٌ
ভাবার্থ: “তাক্বদীরের ফায়সালা অনুসারে সব কিছু ঘটে, আর অন্যদের মৃত্যুর মাঝে রয়েছে শিক্ষা।” (ইংরেজি পুস্তক অনুসারে অনুবাদ করা হলো।)

আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, মৃত্যু আমাদের মাথার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনে-রাতে যে কোন সময় মৃত্যু আসতে পারে। আলী (রা) অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মৃত্যুর বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন-

إِنَّ الْآخِرَةَ قَدِ ارْتَحَلَتْ مُقْبِلَةً، وَإِنَّ الدُّنْيَا قَدِ ارْتَحَلَتْ مُدْبِرَةً، فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ، وَلَا تَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ، وَغَدًا حِسَابٌ وَلَا عَمَلَ

ভাবার্থ: “আখিরাত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে আর দুনিয়া আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তাই আখিরাতমুখী হও এবং দুনিয়ামুখী হয়ো না। কেননা, দুনিয়া আমলের জায়গা, হিসাব বা বিচারের জায়গা নয়, আর আখিরাত হিসাব বা বিচারের জায়গা, আমলের জায়গা নয়।”

এ বাণী থেকে বুঝতে পারি যে, নিজেদের উন্নত করা, নতুনভাবে তওবা করা এবং পরম করুণাময় ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে আমরা লেন-দেন করছি তা বুঝা কতটা বাধ্যতামূলক। মৃত্যু আসার পূর্বে কারো অনুমতি চায় না আর এটা যে পথে আসছে এ বিষয়ে কাউকে কোনো সতর্ক সংকেত দেয় না।

وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ
“কেউ জানেনা যে, সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে আর কেউ জানেনা যে, সে কোন ভূমিতে মরবে।” (৩১-সূরা লুক্বমান : আয়াত-৩৪)

لِكُلِّ مَبِعَادٍ يَوْমٌ لَّا يَسْتَخِرُونَ عَنْهُ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“তোমাদের জন্য রয়েছে এক নির্ধারিত দিনের সাক্ষাৎকার- যেটাকে তোমরা না পারবে এক মুহূর্ত বিলম্বিত করতে আর না পারবে এক মুহূর্তে ত্বরান্বিত করতে।” (৩৪-সূরা সাবা : আয়াত-৩০)

আত-তানতাভী আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যা সমভাবে মৃত্যুর অপ্রত্যাশিততাকে ব্যাখ্যা করে থাকে। একটি যাযাবরদের বাস চলছিল; এমন সময় ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক করল। কী সমস্যা হয়েছিল যাত্রীরা তা ওকে জিজ্ঞেস করল। সে উত্তর দিল, “এই যে বৃদ্ধ লোকটি বাসে ওঠার জন্য হাত নাড়াচ্ছেন তার জন্য আমি বাস থামাচ্ছি। তারা সবাই বিস্মিত হয়ে বলল “আমরা তো কাউকে দেখছি না। সে বলল, ঐ যে ওখানে তার দিকে তাকান।” আবারও তারা বললেন যে, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “এখন দেখুন, সে বাসে ওঠার জন্য আসছে।” তখন তো অবস্থা বিস্ময়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে, আর তারা বিস্ময়ে চিৎকার করে বলল, “আল্লাহর কসম, আমরা কাউকে দেখছি না।” তারপর, এক মুহূর্তের মধ্যেই, ড্রাইভার তার আসনে মারা গেল। এভাবে মৃত্যু তার নিকট সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত আকারে আসল।

“যখন তাদের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসবে তখন তারা না পারবে এটাকে এক মুহূর্ত পিছু হটাতে আর না পারবে এক মুহূর্ত আগাতে।” (৭-সূরা আরাফ : আয়াত-৩৪)

বিপদের সম্মুখীন হলে মানুষ ভীরু হয়ে যায়; যখন মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় বা বুক ধড়ফড় করতে থাকে এবং কোনরূপ পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই এক নিরাপদ মুহূর্তে সে মারা যায়।

“তারাই ঘরে বসে ছিল, অথচ (পরে) তাদের মৃত ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল- “যদি তারা আমাদের কথা শুনতো তবে তারা মারা যেত না।” (হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তোমরা তোমাদের নিজেদের থেকে মৃত্যুকে কাটিয়ে দাও।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৮৬)

আশ্চর্যের বিষয় মানুষের মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া এবং কীভাবে সে মৃত্যু সম্বন্ধে বেপরোয়া হয়ে থাকে অথচ দিন-রাত তার উপর মৃত্যুর বিভীষিকা ঝুলে আছে! মানুষ নিজেকে ধোঁকা দিয়ে এ চিন্তা করে যে, সে এ পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px