📄 চিরস্থায়ী জীবন ও জান্নাত সেখানে, এখানে নয়
আপনি কি যুবক, স্বাস্থ্যবান, ধনী ও অমর থাকতে চান? আপনি যদি এতগুলো চান তবে এগুলো আপনি এ পৃথিবীতে পাবেন না তবে যাই হোক, আপনি এগুলো পরকালে (আখেরাতও) পেতে পারেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীর জন্য দুঃখ কষ্ট ও ক্ষণস্থায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি এ দুনিয়াকে তুচ্ছ ও ধোঁকার উপকরণ বলেছেন。
বহুকাল পূর্বে একজন কবি ছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় চরম দরিদ্র জীবন যাপন করেছেন। তাঁর যৌবনের সিংহভাগে, তিনি টাকা-পয়সা ধন-সম্পদ চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি তা পাননি। তিনি স্ত্রীও চেয়ে ছিলেন কিন্তু তিনি সে চেষ্টাতেও ব্যর্থ হন। যখন তিনি বৃদ্ধ হলেন তাঁর চুল পেকে (সাদা) হয়ে গেল ও তার হাড় দুর্বল (ভঙ্গুর) হয়ে গেল, তখন তিনি ধনী হলেন। বহু নারীরা তাকে তখন বিয়ে করতে চাইল এবং তিনি (তখন) আরামে জীবন যাপন করলেন। তার ঘটনার নির্মম পরিহাস হলো এ যে, যখন তিনি সব আরাম উপভোগ করতে সক্ষম ছিলেন তখন তিনি গরীব ছিলেন আর যখন তিনি ধনী হলেন তখন তিনি (বার্ধক্যের কারণে) আর জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে পারলেন না। তিনি তার জীবনের শেষ দিকে কবিতার এ চরণগুলো রচনা করেন-
১. “বিশ বছরকালে যা চেয়েছিলাম আশি বছরকালে তা পেলাম।
২. এখন আমার চারিধারে রেশমী শাড়ী ও দামী দামী অলংকার পরা তুর্কী নারীরা গান করে।
৩. তারা বলে ‘আপনার সজাগতা আমাদেরকে সারা রাত জাগিয়ে রাখে। আপনার কী অসুবিধা? আমি বলি, “আশি বছর।”
“আমি তোমাদেরকে এতটা দীর্ঘ জীবন দিইনি। যাতে যে (ব্যক্তি) উপদেশ চায় সে (ব্যক্তি) যেন উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। এবং তোমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল।” (৬৭-সূরা ফাতির: আয়াত-৩৭)
“আর তারা ভেবেছিল যে তাদেরকে আমার নিকট ফিরে আসতে হবে না।” (২৯-সূরা আল কাহাফ: আয়াত-৩১)
“আর এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।” (২৯-সূরা আনকাবুত: আয়াত-৬৪)
إِنَّ مَثَلَ هٰذِهِ الدُّنْيَا كَمُسَافِرٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ ظِلِ الشَّجَرَةِ ثُمَّ ذَهَبَ وَتَرَكَهَا -
এ দুনিয়ায় উদাহরণ হলো সে মুসাফিরের মতো, যে নাকি গাছের ছায়ায় খানিক বিশ্রাম করতে বসে। পরে সেখান ছেড়ে চলে যায়।
📄 চিরস্থায়ী ধন-ভাণ্ডার
মানুষ পরকালের জন্য যা সাথে করে নিয়ে যায় তাই প্রকৃত ধন-ভাণ্ডার। ইসলাম, ঈমান, আমলে সালেহ, জিহাদ ও তাকওয়া-এসব হলো এমন চিরস্থায়ী ধন-ভাণ্ডারের উদাহরণ।
“তোমাদের মুখমণ্ডলসমূহকে পূর্বদিকে ও পশ্চিম দিকে ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই, বরং পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ্র প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, (সমস্ত) কিতাবের প্রতি ও নবীদের প্রতি ঈমান আনলে এবং সম্পদের প্রতি মহব্বত থাকা সত্ত্বেও। আল্লাহ্র মহব্বতে আত্মীয়-স্বজনকে, ইয়াতিমদেরকে, অভাবগ্রস্তদেরকে, পর্যটকদেরকে, সাহায্যপ্রার্থীদেরকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ-সম্পদ দান করলে এবং সালাত কায়েম করলে, যাকাত আদায় করলে, ওয়াদা দিয়ে যা পূর্ণ করলে এবং অর্থ সংকটের সময়ে, দুঃখ-কষ্টের সময়ে ও যুদ্ধের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করলে। (আর যারা এসব আমলে সালেহ করে) তারাই ন্যায়পরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকী।” (২-সূরা বাকারা: আয়াত-১৭৭)
📄 মৃত্যু
শাইখ আলী আত-তানতাভী বর্ণনা করেছেন যে, এক লোক সিরিয়াতে ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন যাত্রীকে পার করে দেওয়ার জন্য ট্রাকে তুলে নিলেন। যাত্রীটি পিছনে বসলেন যেখানে ছিল না কোন ছাদ আর না ছিল কোন ঢাকনা। সেখানে মৃত্যুকে বহনের জন্য প্রস্তুতকৃত একটি খাঁটিয়া ছিল। তখন বৃষ্টি হতে শুরু করল আর লোকটি লক্ষ্য করে দেখল যে খাঁটিয়াটি বেশ বড়সড় তাই সে এটার ভিতরে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আরেকটি যাত্রীও ট্রাকের পিছনের খোলা জায়গায় উঠল। তখনও বৃষ্টি চলছিল। তাই সেও খাঁটিয়ার ভিতরে বসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। দ্বিতীয় যাত্রী ভেবেছিল সে ট্রাকে একাই। কিন্তু, বৃষ্টি কমেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য প্রথম ব্যক্তিটি কোন রূপ সতর্কসংকেত ছাড়াই (দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বিস্মিত করে দিয়ে) খাঁটিয়া থেকে তার একটি হাত বের করল। এটা দেখে দ্বিতীয় যাত্রী একথা ভেবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল যে, মৃত ব্যক্তিটি জীবিত হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে চরম আতঙ্কে লোকটি হোঁচট খেয়ে ট্রাক থেকে পিছন দিকে রাস্তায় পড়ে গেল এবং তার মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। সে সাথে সাথে মারা গেল। এ অপ্রত্যাশিত মৃত্যু সেভাবেই ঘটল যেভাবে আল্লাহ্ ঐ লোকটির জন্য লিখে রেখেছিলেন।
একজন কবি বলেন- كُلُّ شَيْءٍ بِقَضَاءٍ وَقَدَرٍ ۚ وَالْمَنَايَا عِبَرٌ
ভাবার্থ: “তাক্বদীরের ফায়সালা অনুসারে সব কিছু ঘটে, আর অন্যদের মৃত্যুর মাঝে রয়েছে শিক্ষা।” (ইংরেজি পুস্তক অনুসারে অনুবাদ করা হলো।)
আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, মৃত্যু আমাদের মাথার উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনে-রাতে যে কোন সময় মৃত্যু আসতে পারে। আলী (রা) অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মৃত্যুর বাস্তবতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন-
إِنَّ الْآخِرَةَ قَدِ ارْتَحَلَتْ مُقْبِلَةً، وَإِنَّ الدُّنْيَا قَدِ ارْتَحَلَتْ مُدْبِرَةً، فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ، وَلَا تَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ، وَغَدًا حِسَابٌ وَلَا عَمَلَ
ভাবার্থ: “আখিরাত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে আর দুনিয়া আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তাই আখিরাতমুখী হও এবং দুনিয়ামুখী হয়ো না। কেননা, দুনিয়া আমলের জায়গা, হিসাব বা বিচারের জায়গা নয়, আর আখিরাত হিসাব বা বিচারের জায়গা, আমলের জায়গা নয়।”
এ বাণী থেকে বুঝতে পারি যে, নিজেদের উন্নত করা, নতুনভাবে তওবা করা এবং পরম করুণাময় ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে আমরা লেন-দেন করছি তা বুঝা কতটা বাধ্যতামূলক। মৃত্যু আসার পূর্বে কারো অনুমতি চায় না আর এটা যে পথে আসছে এ বিষয়ে কাউকে কোনো সতর্ক সংকেত দেয় না।
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ
“কেউ জানেনা যে, সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে আর কেউ জানেনা যে, সে কোন ভূমিতে মরবে।” (৩১-সূরা লুক্বমান : আয়াত-৩৪)
لِكُلِّ مَبِعَادٍ يَوْমٌ لَّا يَسْتَخِرُونَ عَنْهُ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“তোমাদের জন্য রয়েছে এক নির্ধারিত দিনের সাক্ষাৎকার- যেটাকে তোমরা না পারবে এক মুহূর্ত বিলম্বিত করতে আর না পারবে এক মুহূর্তে ত্বরান্বিত করতে।” (৩৪-সূরা সাবা : আয়াত-৩০)
আত-তানতাভী আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যা সমভাবে মৃত্যুর অপ্রত্যাশিততাকে ব্যাখ্যা করে থাকে। একটি যাযাবরদের বাস চলছিল; এমন সময় ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক করল। কী সমস্যা হয়েছিল যাত্রীরা তা ওকে জিজ্ঞেস করল। সে উত্তর দিল, “এই যে বৃদ্ধ লোকটি বাসে ওঠার জন্য হাত নাড়াচ্ছেন তার জন্য আমি বাস থামাচ্ছি। তারা সবাই বিস্মিত হয়ে বলল “আমরা তো কাউকে দেখছি না। সে বলল, ঐ যে ওখানে তার দিকে তাকান।” আবারও তারা বললেন যে, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “এখন দেখুন, সে বাসে ওঠার জন্য আসছে।” তখন তো অবস্থা বিস্ময়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে, আর তারা বিস্ময়ে চিৎকার করে বলল, “আল্লাহর কসম, আমরা কাউকে দেখছি না।” তারপর, এক মুহূর্তের মধ্যেই, ড্রাইভার তার আসনে মারা গেল। এভাবে মৃত্যু তার নিকট সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত আকারে আসল।
“যখন তাদের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসবে তখন তারা না পারবে এটাকে এক মুহূর্ত পিছু হটাতে আর না পারবে এক মুহূর্ত আগাতে।” (৭-সূরা আরাফ : আয়াত-৩৪)
বিপদের সম্মুখীন হলে মানুষ ভীরু হয়ে যায়; যখন মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় বা বুক ধড়ফড় করতে থাকে এবং কোনরূপ পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই এক নিরাপদ মুহূর্তে সে মারা যায়।
“তারাই ঘরে বসে ছিল, অথচ (পরে) তাদের মৃত ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল- “যদি তারা আমাদের কথা শুনতো তবে তারা মারা যেত না।” (হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তোমরা তোমাদের নিজেদের থেকে মৃত্যুকে কাটিয়ে দাও।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৮৬)
আশ্চর্যের বিষয় মানুষের মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া এবং কীভাবে সে মৃত্যু সম্বন্ধে বেপরোয়া হয়ে থাকে অথচ দিন-রাত তার উপর মৃত্যুর বিভীষিকা ঝুলে আছে! মানুষ নিজেকে ধোঁকা দিয়ে এ চিন্তা করে যে, সে এ পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থাকবে।