📄 বেহেশতই আপনার পুরস্কার
একজন আরব কবি বলেন- نَفْسِيَ الَّتِي تَمْلِكُ الْأَশْيَاءَ دَامِيَةً * فَكَيْفَ أَبْكِي شَيْئًا إِذَا ذَهَبَا-
ভাবার্থ: “আমার যে আত্মা সম্পদের মালিক সে নিজেই চলে যাবে, তাহলে যখন কোন কিছু (আমাকে ছেড়ে) চলে যায়, তখন কেন আমি কাঁদব?”
সারা দুনিয়া, এর সব সোনা-রূপা, মান-মর্যাদা, দালান-কোঠা ও ঘর-বাড়ি এক ফোঁটা চোখের পানির সমানও নয়। তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ বলেছেন- الدُّنْيَا مَلْعُوْنَةٌ مَّا فِيْهَا إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ وَعَالِمًا ওَّمُتَعَلِّمًا-
ভাবার্থ: “আল্লাহর যিকির ও তার সমর্থক বস্তু (অন্যান্য নেক আমল), আলেম ও তালেবে এলেম {জ্ঞানী (শিক্ষক) ও শিক্ষার্থী} ছাড়া (পুরো) দুনিয়া ও এতে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত।”
একজন আরব দেশী কবি বলেছেন: وَمَا الْمَالُ وَالْأَهْلُوْنَ إِلَّا وَدِيْعَةٌ وَلَا بُدَّلَّنْ أَنْ تُرَدَّ الْوَدَائِعُ-
ভাবার্থ: “সম্পদ ও পরিবার-পরিজন শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী, আর একদিন অবশ্যই সকল আমানত (ঋণ) ফিরিয়ে নেয়া হবে।”
মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে পৃথিবীর সকল সম্পদও একে পিছিয়ে দিতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন- وَمَا هٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَّلَعِبٌ-
“আর এ পার্থিব জীবনতো শুধুমাত্র খেল-তামাশা।” (২৯-সুরা আনকাবুত: আয়াত-৬৪)
হাসান বসরী (রা) বলেছেন: “জান্নাত ছাড়া অন্য কোন পুরস্কার আশা করো না। বিশেষ করে এ কারণে যে, মুমিনের আত্মার মূল্য খুবই বেশি (এতই বেশি যে, জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা এর মূল্যায়ন হয় না।” – অনুবাদক)
তবুও কিছু লোক তাদের আত্মাকে তুচ্ছমূল্য দিয়ে দেয়। নিকৃষ্ট (নেতিবাচক) হওয়া, বাড়ি-গাড়ি ধ্বংস হওয়া নিয়ে যারা বিলাপ করে অথচ তাদের ঈমানের কমতি নিয়ে তাদের পাপের জন্য দুঃখ করে না। তারা পার্থিব জীবনের হাস্যকর দৃষ্টিকোণকে বুঝতে পারবে। আর সে বুঝ হবে দুঃখের ভয় এবং যে যতটা ভ্রান্তিতে পতিত ছিল তার দুঃখ তত বেশি হবে। এ বিষয়টি খুবই (গভীর) গুরুত্বপূর্ণ কেননা এটি একটি মূল্যবান, নৈতিকতাপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।
إِنَّ هٰؤُلَاءِ يُحِبُّوْنَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُوْনَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيْلًا-
“নিশ্চয় এসব (কাফির) লোকেরা এ পার্থিব জীবনকে ভালোবাসে এবং একটি গুরুতর, কঠিন কেয়ামতের ও বিচারের দিনকে উপেক্ষা করে!” (৭৬-সুরা দাহর বা ইনসান: আয়াত-২৭)
📄 মৃত্যুর পর স্মরণীয় হওয়া দ্বিতীয় জীবন-তুল্য
দ্বিতীয় জীবন পাওয়া এক মহাকল্যাণ। অনেকেই এ দ্বিতীয় জীবন সম্পদের বা পদমর্যাদার বিনিময়ে নয় বরং আমল দ্বারা ক্রয় করেছেন। নবী ইবরাহীম (আ) তাঁর প্রভুর নিকট দোয়া করেছেন যে, তিনি যেন মানুষের নিকট স্মরণীয় হন এবং মানুষেরা তাঁর গুণগান গায়। উমর (রা) হারিম ইবনে সিনানের সন্তানদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “জুহাইর তোমাদেরকে কী দিল আর তোমরা জুহাইরকে কী দিলে?” তারা উত্তর দিল, “সে আমাদের প্রশংসা করল আর আমরা তাকে সম্পদ দিলাম।” উমর (রা) বললেন, “আল্লাহ্র কসম, তোমরা তাকে যা দিয়েছ তা শেষ হয়ে গেছে আর সে তোমাদেরকে যা দিয়েছে তা (চিরস্থায়ী হয়ে) থেকে গেল।
নিচের দোয়া বা প্রার্থনা করুন:
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا تَحُولُ بِهِ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ جَنَّتَكَ وَمِنَ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا মَصَائِبَ الدُّنْيَا وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا وَلَا تَجْعَلْ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا بِذُنُوبِنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
ভাবার্থ: “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন ভয় দান করুন, যা আমাদের মাঝে এবং আপনার অবাধ্যতার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং এমন আনুগত্য (করার তৌফীক্ব) দান করুন, যার ওসিলায় আপনি আমাদেরকে আপনার জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং এমন এক্বীন (বিশ্বাস) দান করুন, যা দুনিয়ার বিপদাপদকে আমাদের নিকট তুচ্ছ করে দিবে এবং আপনি আমাদেরকে যত কাল জীবিত রাখবেন ততকাল আমাদেরকে আমাদের শ্রুতি, দৃষ্টি ও শক্তিকে ভোগ করতে (তাওফীক্ব) দিন এবং তাকে আমাদের উত্তরাধিকারী বানান এবং যারাই আমাদের উপর জুলুম করেছে তাদের উপর আমাদের প্রতিশোধ নেবার ব্যবস্থা করুন এবং যারাই আমাদের উপর অত্যাচার করেছে তাদের উপর (বিজয়ী হতে) আমাদেরকে সাহায্য করুন আর বিপদাপদ দ্বারা আমাদের দ্বীনের (ধর্মের) পরীক্ষা নিবেন না এবং দুনিয়াকে আমাদের শ্রেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও আমাদের বিদ্যার দৌড় বানিয়ে দিবেন না এবং আমাদের পাপের কারণে আমাদের উপর এমন শাসক চাপিয়ে দিবেন না যে আমাদেরকে দয়া করবে না।” (৩৮-সুরা ছোয়াদ : আয়াত-১৬)
📄 জান্নাত ও জাহান্নাম
মিত্রাদেশের শাসনামলে এক ফরাসী মন্ত্রীর আত্মহত্যার খবর বিশ্বব্যাপী সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। আত্মহত্যার পিছনে যে কারণ ছিল তা এই যে, ফরাসী সংবাদপত্রগুলো তার নাম ও সুনামকে কলঙ্কিত করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এক চরম যুদ্ধ চালিয়েছিল। কোন বিশ্বাস না পেয়ে বা কোন আশ্রয়স্থল না পেয়ে বা কোন সমর্থন না পেয়ে সে তার নিজের জীবনটাকেই ধ্বংস করে দিল। নিজের ধ্বংসের মাঝে আশ্রয়প্রহণকারী এ হতভাগা লোকটি নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত স্বকীয় সংস্কৃতির অনুসারে পথপ্রদর্শিত (হেদায়েতপ্রাপ্ত) হয়নি।
“এবং তারা যে ষড়যন্ত্র করে তাতে মনে কষ্ট নিবেন না।” (১৬-সূরা আন নাহল : আয়াত-১২৭)
لَنْ يَضُرُّوكُمْ إِلَّا أَذًى -
“সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া তারা কখনই তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”
وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا -
“আর তারা যা বলে তাতে ধৈর্য ধরুন এবং তাদেরকে সুন্দরভাবে এড়িয়ে চলুন।”
তার আত্মহত্যার কারণ এই ছিল যে, সে (সঠিক) পথ হারিয়ে ফেলেছিল ও সত্যের পথ থেকে বহুদূরে ছিল。
وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ -
“যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।”
অনেকে পরামর্শ দেন যে, নিপীড়িত ও দুর্ভাগাদের প্রাকৃতিক ভ্রমণে বের হওয়া, গান শোনা অথবা আমোদ-প্রমোদ করা উচিত।
কিন্তু ইসলামের অনুসারীগণ আরো কার্যকর ও আরোগ্যকর পন্থার দাবি করেন : আর তা হলো আযান ও জামায়াতের মাঝে আল্লাহকে স্মরণ (যিকির) করার জন্য, তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করার জন্য এবং তাঁর ধর্মীয় বিধানে সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য মসজিদে বসা। আর এর গুরুত্ব আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল (নির্ভর) করার সমান।
📄 চিরস্থায়ী জীবন ও জান্নাত সেখানে, এখানে নয়
আপনি কি যুবক, স্বাস্থ্যবান, ধনী ও অমর থাকতে চান? আপনি যদি এতগুলো চান তবে এগুলো আপনি এ পৃথিবীতে পাবেন না তবে যাই হোক, আপনি এগুলো পরকালে (আখেরাতও) পেতে পারেন। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীর জন্য দুঃখ কষ্ট ও ক্ষণস্থায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি এ দুনিয়াকে তুচ্ছ ও ধোঁকার উপকরণ বলেছেন。
বহুকাল পূর্বে একজন কবি ছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় চরম দরিদ্র জীবন যাপন করেছেন। তাঁর যৌবনের সিংহভাগে, তিনি টাকা-পয়সা ধন-সম্পদ চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি তা পাননি। তিনি স্ত্রীও চেয়ে ছিলেন কিন্তু তিনি সে চেষ্টাতেও ব্যর্থ হন। যখন তিনি বৃদ্ধ হলেন তাঁর চুল পেকে (সাদা) হয়ে গেল ও তার হাড় দুর্বল (ভঙ্গুর) হয়ে গেল, তখন তিনি ধনী হলেন। বহু নারীরা তাকে তখন বিয়ে করতে চাইল এবং তিনি (তখন) আরামে জীবন যাপন করলেন। তার ঘটনার নির্মম পরিহাস হলো এ যে, যখন তিনি সব আরাম উপভোগ করতে সক্ষম ছিলেন তখন তিনি গরীব ছিলেন আর যখন তিনি ধনী হলেন তখন তিনি (বার্ধক্যের কারণে) আর জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে পারলেন না। তিনি তার জীবনের শেষ দিকে কবিতার এ চরণগুলো রচনা করেন-
১. “বিশ বছরকালে যা চেয়েছিলাম আশি বছরকালে তা পেলাম।
২. এখন আমার চারিধারে রেশমী শাড়ী ও দামী দামী অলংকার পরা তুর্কী নারীরা গান করে।
৩. তারা বলে ‘আপনার সজাগতা আমাদেরকে সারা রাত জাগিয়ে রাখে। আপনার কী অসুবিধা? আমি বলি, “আশি বছর।”
“আমি তোমাদেরকে এতটা দীর্ঘ জীবন দিইনি। যাতে যে (ব্যক্তি) উপদেশ চায় সে (ব্যক্তি) যেন উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। এবং তোমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল।” (৬৭-সূরা ফাতির: আয়াত-৩৭)
“আর তারা ভেবেছিল যে তাদেরকে আমার নিকট ফিরে আসতে হবে না।” (২৯-সূরা আল কাহাফ: আয়াত-৩১)
“আর এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।” (২৯-সূরা আনকাবুত: আয়াত-৬৪)
إِنَّ مَثَلَ هٰذِهِ الدُّنْيَا كَمُسَافِرٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ ظِلِ الشَّجَرَةِ ثُمَّ ذَهَبَ وَتَرَكَهَا -
এ দুনিয়ায় উদাহরণ হলো সে মুসাফিরের মতো, যে নাকি গাছের ছায়ায় খানিক বিশ্রাম করতে বসে। পরে সেখান ছেড়ে চলে যায়।