📄 জীবনের শেষ মুহূর্তে
আবু রায়হান বাইরুনী এমন এক উর্বর চিন্তাশীল ও লেখক ছিলেন যার কলম তার হাত ছাড়া হতো না বললেই চলে। তিনি আটাত্তর (৭৮) বছরের এক পরিপক্ক জীবন যাপন করেছিলেন এবং তার সারাজীবনে কখনো প্রয়োজনে লেখা-পড়া ও শিক্ষাদান থেকে অবসর গ্রহণ করেননি।
আবুল হাসান আলী ইবনে ঈছা বলেছেন-
“আবু রায়হান যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন তখন আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। প্রবেশকালেই আমি বুঝতে পারি যে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। তাঁর যখন এ অবস্থা তখন তিনি আমাকে বললেন যে, শেষের বার আমরা যখন সাক্ষাৎ করেছিলাম তখন আমরা মীরাস নিয়ে আলোচনা করেছিলাম এবং আমি কিছু বলেছিলাম তা ভুল ছিল এখন তিনি তা বুঝতে পারছেন। তাঁর জন্য আমার মায়া লাগল এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি যখন এতটা অসুস্থ তখন তাঁর সাথে এমন (জটিল) এক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হবে কি-না।
তিনি উত্তর দিলেন, “আমি জানি যে, আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কিন্তু বিচার্য বিষয়ে অজ্ঞ থাকার চেয়ে সে বিষয়টাকে উপলব্ধি করা তুমি কি আমার জন্য ভালো মনে কর না। আমি তখন বিষয়টি পুনরায় বললাম আর তিনি তা আমার নিকট ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। আমাদের কথা-বার্তা শেষ হলে পরে আমি চলে গেলাম আর জানতে পারলাম যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। কেবলমাত্র তাঁর মতো বিশাল হৃদয়ের লোকেরাই ঠিক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত (মানসিকভাবে) শক্ত থাকেন।”
আতাউল্লাহ হুরিকাঘাতে উমর (রা)-এর যখন রক্তপাত হতে হতে মৃত্যুপ্ৰায় অবস্থা তখন তিনি তার সঙ্গী-সাথীদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি সালাত সমাপ্ত করেছিলেন কি-না।
ইব্রাহীম ইবনুল জাররাহ বলেছেন-
“(ইমাম) আবু ইউসুফ (রহ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তিনি একবার অজ্ঞান ও আরেকবার সজ্ঞান হতে ছিলেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি আমাকে ধর্মীয় কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। যখন আমি তার প্রশ্নকে বিষয়ের সাথে গ্রহণ করলাম তখন তিনি তা লক্ষ্য করে বললেন, “তাতে কিছু আসে না, আমরা এ বিষয়ে এজন্য গবেষণা করছি যে, এ বিষয়ের জ্ঞান বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে মুক্তি পেয়ে চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকুক, এমন কি এটা কারো (জীবন) রক্ষার কারণ হোক।”
আমাদের ধার্মিক পূর্বসূরীগণ এমনই ছিলেন। যখনই তাদের মনে পড়ত, এমনকি মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তখনই তারা ইসলামী জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতেন- হয়তো শিক্ষক হিসেবে নয়তো ছাত্র বেশে। তাদের অন্তরে জ্ঞান কতইনা মূল্যবান ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে তারা পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের কথা মনে করতেন না, তারা কেবল জ্ঞানের কথাই মনে করতেন। যে জ্ঞান তাদের জীবনের সাধনা ছিল। আল্লাহ্ তাদেরকে করুণা করুন।
📄 নির্দিষ্ট সময়ের আগে আপনি মৃত্যুবরণ করবেন না
"যখন তাদের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসবে তারা এটাকে এক মুহূর্তও আগ পিছ করতে পারবে না।" (৭-সূরা আল আ'রাফ: আয়াত-৩৪)
যে কাপুরুষেরা তাদের প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বে বারবার মারা যায় তাদের জন্য এ আয়াতে একটি সান্ত্বনা রয়েছে। এ আয়াত আমাদেরকে বলে যে প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময় আছে; একে আগ-পিছু করা যায় না, এমনকি সকল সৃষ্টি মিলে চেষ্টা করলেও পারবে না।
"এবং মৃত্যু-যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে।" (৫০-সূরা ক্বাফ : আয়াত-১৯)
আর জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আশা করাই দুঃখ-দুর্দশার কারণ।
"ফলে আল্লাহর বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করার মতো তার এমন কোন দল ছিল না এবং যারা নিজেদেরকে সাহায্য করত সে তাদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না (অর্থাৎ সে নিজেকেও সাহায্য করার মতো ছিল না)।"
ইমাম যাহাবী রচিত "সিয়ারু আ'লামিন নুব্বালা" পুস্তক – ২০ খণ্ড। এ পুস্তকে আলেম-উলামা-জ্ঞানী-গুণী, রাজা-বাদশা, মন্ত্রী-মিনিস্টার, শাসকবর্গ ও কবিদের জীবনী আছে। তাদের কতিপয় লোকের জীবনী পড়ার সময় আমার দু'টি কথা বা বিষয় মনে পড়ে—
১. যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে আশা বা বিশ্বাস করে তবে আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেন এবং
২. সে জিনিসকে তার ধ্বংসের কারণ বানিয়ে দেন।
"এবং নিশ্চয় শয়তানরাই মানুষদেরকে সৎপথ হতে বিরত রাখে, অথচ মানুষেরা মনে করে যে, তারা সৎপথে পরিচালিত।" (৪৩-সূরা আয যুখরুফ : আয়াত-৩৭)
📄 বেহেশতই আপনার পুরস্কার
একজন আরব কবি বলেন- نَفْسِيَ الَّتِي تَمْلِكُ الْأَশْيَاءَ دَامِيَةً * فَكَيْفَ أَبْكِي شَيْئًا إِذَا ذَهَبَا-
ভাবার্থ: “আমার যে আত্মা সম্পদের মালিক সে নিজেই চলে যাবে, তাহলে যখন কোন কিছু (আমাকে ছেড়ে) চলে যায়, তখন কেন আমি কাঁদব?”
সারা দুনিয়া, এর সব সোনা-রূপা, মান-মর্যাদা, দালান-কোঠা ও ঘর-বাড়ি এক ফোঁটা চোখের পানির সমানও নয়। তিরমিযী শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ﷺ বলেছেন- الدُّنْيَا مَلْعُوْنَةٌ مَّا فِيْهَا إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ وَعَالِمًا ওَّمُتَعَلِّمًا-
ভাবার্থ: “আল্লাহর যিকির ও তার সমর্থক বস্তু (অন্যান্য নেক আমল), আলেম ও তালেবে এলেম {জ্ঞানী (শিক্ষক) ও শিক্ষার্থী} ছাড়া (পুরো) দুনিয়া ও এতে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত।”
একজন আরব দেশী কবি বলেছেন: وَمَا الْمَالُ وَالْأَهْلُوْنَ إِلَّا وَدِيْعَةٌ وَلَا بُدَّلَّنْ أَنْ تُرَدَّ الْوَدَائِعُ-
ভাবার্থ: “সম্পদ ও পরিবার-পরিজন শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী, আর একদিন অবশ্যই সকল আমানত (ঋণ) ফিরিয়ে নেয়া হবে।”
মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে পৃথিবীর সকল সম্পদও একে পিছিয়ে দিতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন- وَمَا هٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَّلَعِبٌ-
“আর এ পার্থিব জীবনতো শুধুমাত্র খেল-তামাশা।” (২৯-সুরা আনকাবুত: আয়াত-৬৪)
হাসান বসরী (রা) বলেছেন: “জান্নাত ছাড়া অন্য কোন পুরস্কার আশা করো না। বিশেষ করে এ কারণে যে, মুমিনের আত্মার মূল্য খুবই বেশি (এতই বেশি যে, জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা এর মূল্যায়ন হয় না।” – অনুবাদক)
তবুও কিছু লোক তাদের আত্মাকে তুচ্ছমূল্য দিয়ে দেয়। নিকৃষ্ট (নেতিবাচক) হওয়া, বাড়ি-গাড়ি ধ্বংস হওয়া নিয়ে যারা বিলাপ করে অথচ তাদের ঈমানের কমতি নিয়ে তাদের পাপের জন্য দুঃখ করে না। তারা পার্থিব জীবনের হাস্যকর দৃষ্টিকোণকে বুঝতে পারবে। আর সে বুঝ হবে দুঃখের ভয় এবং যে যতটা ভ্রান্তিতে পতিত ছিল তার দুঃখ তত বেশি হবে। এ বিষয়টি খুবই (গভীর) গুরুত্বপূর্ণ কেননা এটি একটি মূল্যবান, নৈতিকতাপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।
إِنَّ هٰؤُلَاءِ يُحِبُّوْنَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُوْনَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيْلًا-
“নিশ্চয় এসব (কাফির) লোকেরা এ পার্থিব জীবনকে ভালোবাসে এবং একটি গুরুতর, কঠিন কেয়ামতের ও বিচারের দিনকে উপেক্ষা করে!” (৭৬-সুরা দাহর বা ইনসান: আয়াত-২৭)
📄 মৃত্যুর পর স্মরণীয় হওয়া দ্বিতীয় জীবন-তুল্য
দ্বিতীয় জীবন পাওয়া এক মহাকল্যাণ। অনেকেই এ দ্বিতীয় জীবন সম্পদের বা পদমর্যাদার বিনিময়ে নয় বরং আমল দ্বারা ক্রয় করেছেন। নবী ইবরাহীম (আ) তাঁর প্রভুর নিকট দোয়া করেছেন যে, তিনি যেন মানুষের নিকট স্মরণীয় হন এবং মানুষেরা তাঁর গুণগান গায়। উমর (রা) হারিম ইবনে সিনানের সন্তানদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “জুহাইর তোমাদেরকে কী দিল আর তোমরা জুহাইরকে কী দিলে?” তারা উত্তর দিল, “সে আমাদের প্রশংসা করল আর আমরা তাকে সম্পদ দিলাম।” উমর (রা) বললেন, “আল্লাহ্র কসম, তোমরা তাকে যা দিয়েছ তা শেষ হয়ে গেছে আর সে তোমাদেরকে যা দিয়েছে তা (চিরস্থায়ী হয়ে) থেকে গেল।
নিচের দোয়া বা প্রার্থনা করুন:
اللَّهُمَّ اقْسِمْ لَنَا مِنْ خَشْيَتِكَ مَا تَحُولُ بِهِ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ وَمِنْ طَاعَتِكَ مَا تُبَلِّغُنَا بِهِ جَنَّتَكَ وَمِنَ الْيَقِينِ مَا تُهَوِّنُ بِهِ عَلَيْنَا মَصَائِبَ الدُّنْيَا وَمَتِّعْنَا بِأَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُوَّتِنَا مَا أَحْيَيْتَنَا وَاجْعَلْهُ الْوَارِثَ مِنَّا وَاجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ عَادَانَا وَلَا تَجْعَلْ مُصِيبَتَنَا فِي دِينِنَا وَلَا تَجْعَلْ الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا وَلَا تُسَلِّطْ عَلَيْنَا بِذُنُوبِنَا مَنْ لَا يَرْحَمُنَا
ভাবার্থ: “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এমন ভয় দান করুন, যা আমাদের মাঝে এবং আপনার অবাধ্যতার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং এমন আনুগত্য (করার তৌফীক্ব) দান করুন, যার ওসিলায় আপনি আমাদেরকে আপনার জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং এমন এক্বীন (বিশ্বাস) দান করুন, যা দুনিয়ার বিপদাপদকে আমাদের নিকট তুচ্ছ করে দিবে এবং আপনি আমাদেরকে যত কাল জীবিত রাখবেন ততকাল আমাদেরকে আমাদের শ্রুতি, দৃষ্টি ও শক্তিকে ভোগ করতে (তাওফীক্ব) দিন এবং তাকে আমাদের উত্তরাধিকারী বানান এবং যারাই আমাদের উপর জুলুম করেছে তাদের উপর আমাদের প্রতিশোধ নেবার ব্যবস্থা করুন এবং যারাই আমাদের উপর অত্যাচার করেছে তাদের উপর (বিজয়ী হতে) আমাদেরকে সাহায্য করুন আর বিপদাপদ দ্বারা আমাদের দ্বীনের (ধর্মের) পরীক্ষা নিবেন না এবং দুনিয়াকে আমাদের শ্রেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও আমাদের বিদ্যার দৌড় বানিয়ে দিবেন না এবং আমাদের পাপের কারণে আমাদের উপর এমন শাসক চাপিয়ে দিবেন না যে আমাদেরকে দয়া করবে না।” (৩৮-সুরা ছোয়াদ : আয়াত-১৬)