📄 জান্নাতের কথা স্মরণ করুন
এ পৃথিবীতে আপনি যদি ক্ষুধার্ত, দুঃখিত, রুগ্ণ ও অত্যাচারিত হন, তবে চিরস্থায়ী পরম স্বর্গসুখের কথা স্মরণ করুন। আপনি যদি এমনটি ভাবেন তবে আপনার লোকসান সত্যি সত্যিই লাভে পরিণত হবে ও আপনার দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন সত্যিই উপহারে পরিণত হবে।
পরকালের জন্য যারা আমল করে তারাই বিজ্ঞতম (সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী) ব্যক্তি। কেননা, পরকাল (আখেরাত) দুনিয়ার তুলনায় উত্তম ও চিরস্থায়ী। সবচেয়ে বোকা লোক তারাই যারা দুনিয়াকে প্রাধান্য দিবে তাদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল মনে করে। এতেই তাদের সব আশা-ভরসা। এরা যখন দুর্বিপাকে পড়ে তখন আপনি এদেরকে সবচেয়ে বেশি দুঃখিত দেখতে পাবেন। পার্থিব ক্ষতির কারণে তারা সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয় শুধু এ কারণে যে, তারা যে তুচ্ছ জীবনযাপন করে-এর বাইরে তারা কোন কিছুই দেখতে পায় না। তারা শুধু এই অস্থায়ী জীবনটাই দেখে ও শুধু এর কথাই ভাবে। তারা চায় না যে, কোন কিছু তাদের পরম সুখকে মাটি করে দিক। যদি তাদের চোখ থেকে মূর্খতার পর্দা সরানো হত তবে তারা চিরস্থায়ী আবাস, এর নেয়ামত, আনন্দ ও প্রাসাদসমূহের সাথে একাত্মবোধ করত ও কুরআন সুন্নাহের মাধ্যমে তাদের আখেরাত সম্বন্ধে অবহিত করা হলে তারা তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করত।
বাস্তবিকই, আমাদের উচিত আখেরাতের বাড়ির প্রতি মনোনিবেশ করা। ঐ বাড়ির মালিক হওয়ার জন্য চেষ্টা-তদবীর করা, যাতে আমরা এর সর্বোত্তমটি (জান্নাতুল ফেরদাউস) অর্জন করতে পারি। বেহেশতবাসীদের বর্ণনা সম্বন্ধে আমরা কি বিস্তারিতভাবে চিন্তাভাবনা করে দেখেছি? তারা অসুস্থ হবে না, দুঃখ তাদের কাছেও ঘেঁষবে না, তারা মরবে না, তারা চিরকুমার থাকবে এবং তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ থাকবে উত্তম, নিখুঁত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তারা সুন্দর গৃহে অবস্থান করবে। জান্নাতে এমন জিনিস পাওয়া যাবে, যা কোনো চক্ষু কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শুনেনি এবং মানব মন কখনো যার কল্পনাও করেনি। আরোহী ব্যক্তি একশত বছর একটি গাছের নিচে ভ্রমণ করেও এর শেষ সীমায় পৌঁছতে পারবে না। বেহেশতে একটি তাঁবুর দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। জান্নাতের নদীগুলো সদা প্রবাহিত, এর প্রাসাদগুলো বিশাল এবং এর ফলগুলো শুধুমাত্র হাতের নাগালের মধ্যেই নয়; অধিকন্তু, অতি সহজেই তোলা যাবে (মন চাওয়া মাত্রই হাতে চলে আসবে)।
“সেখানে (বেহেশতে) প্রবাহমান ঝর্ণা থাকবে। সুউচ্চ আসন থাকবে। আর থাকবে হাতের কাছে প্রস্তুত পান পাত্র, সারি সারি গদি ও বিছানো গালিচা।” (৮৮-সূরা আল গাশিয়াহ্: আয়াত-১২-১৬)
জান্নাতের সুখ হবে অসীম। তবে কেন আমরা বিষয়টিকে গভীরভাবে ভেবে দেখছি না? স্বর্গই যদি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয় আর আমরা যদি আল্লাহর নিকট বেহেশতই চেয়ে থাকি-তবে এ দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যতটা দুর্বহ মনে হয় তার চেয়ে অনেক কম ভারী মনে হওয়ার কথা। অতএব, (এমনটি ভেবে) দুর্দশাগ্রস্তদের আস্থা শান্তি পাক।
ওহে, আপনারা যারা এ দরিদ্র জীবন যাপন করছেন বা দুর্বিপাকে পতিত সৎকর্ম (নেক আমল) করুন, তাহলেই আপনারা আল্লাহর জান্নাতে বাস করতে পারবেন।
سَلٰمٌ عَلَیْکُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَی الدَّارِ .
“তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, কেননা, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে। চূড়ান্তগৃহ বাস্তবিক কতই না উত্তম!” (১৩-সূরা রা'আদ: আয়াত-২৪)
📄 জান্নাতের আনন্দসমূহের মধ্যে হাসিও থাকবে
“কিন্তু সে দিন (কেয়ামতের দিন) মুমিনগণ কাফিরদের প্রতি (বিদ্রূপের হাসি) হাসবে।” (সুরা-৮৩ আল মুতাফফিফীন : আয়াত-৩৪)
যে ব্যক্তি আরবদের মাঝে তার হাসির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল আরবরা তার সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ করত। তারা এ হাসিকে উদার ও মহান ব্যক্তিত্ব, মহৎ মানসিকতা ও পরিষ্কার মনের লক্ষণ বলে বিশ্বাস করত। সত্যকথা হলো যে, ইসলামের মূলনীতি মিতাচার ও সুপরিমিতির উপর প্রতিষ্ঠিত। তা ঈমান, ইবাদত, চাল-চলন বা আচার-ব্যবহারের বিষয় যা যাই হোক না কেন। ইসলাম ভ্রুকুঞ্চিত ও গোমরামুখ সহ্য করে না আবার সর্বদা লীলাপরারণ ইন্দ্রিয় বিলাসিতাও সহ্য করে না। বরং ইসলাম যা প্রবর্তন করে তা হলো, প্রয়োজনে গাম্ভীর্য এবং প্রয়োজনে যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় হাসি-খুশি।
“তারপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করল ও গোমরা মুখে তাকাল।” (৭৪-সুরা আল মুদ্দাচ্ছির : আয়াত-২২)
وَ لَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ.
নবী কারীম ﷺ বলেছেন : যতই সামান্য হোক না কেন কোন নেক আমলকে তুচ্ছ ভাববে না, এমনকি তা যদি তোমার ভাইয়ের সাথে প্রসন্ন মুখভাব নিয়ে (হাসিমুখে) সাক্ষাৎ করানো হয়।”
📄 দুঃখ করবেন না-আরেকটি জীবন আসবে
এমন একদিন আসবে যখন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির প্রথম ও শেষ অর্থাৎ সকল সৃষ্টিকে একত্রিত করবেন। শুধুমাত্র এ ঘটনার জ্ঞানই আল্লাহর বিচার সম্বন্ধে আপনাকে নিশ্চয়তা প্রদান করে। সুতরাং, কারো টাকা-পয়সা অন্যায়ভাবে বেদখল হয়ে থাকলে সে সেখানে (হাশরের মাঠে) তা পাবে; যাকে অত্যাচার করা হয়েছে সে সেখানে ন্যায় বিচার পাবে এবং যে অত্যাচার করেছে সে সেখানে শাস্তি পাবে।
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন– “এ জীবনের নাটক (এখানেই) শেষ নয়, এ নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্য হবে। কেননা, আমরা দেখছি যে, অত্যাচারী ও তার শিকার ন্যায্যবিচার না দেখেই নিবৃত্ত বা ক্ষান্ত হচ্ছে বা অত্যাচারিত তাঁর প্রতিশোধ নিতে পারছে না। অতএব, অবশ্যই অন্য জগৎ হবে, সেখানে ন্যায় বিচার করা হবে।”
শায়খ আলী তানতাভী এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন; “এ অমুসলিম দার্শনিকের এ বর্ণনা দ্বারা (এমন এক) পরকালের বা আখেরাতের অস্তিত্বের কথার স্বীকৃতিও পাওয়া যায়– যেখানে বিচার করা হবে।”
একজন আরব কবি বলেছেন– “যখন মন্ত্রী ও তার প্রতিনিধি স্বেচ্ছাচারী হয় এবং বিচারক তার বিচারে পক্ষপাতিত্ব করে বা অবিচার করে, তখন ধ্বংস, ধ্বংস; আকাশের বিচারকের পক্ষ থেকে জমিনের বিচারকের জন্য রয়েছে ধ্বংস।”
اَلْيَوْمَ تُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
“আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। আজ (কারো প্রতি) কোনো জুলুম করা হবে না; নিশ্চয় আল্লাহ ত্বরিত হিসাব গ্রহণকারী।” (৪০-সূরা আল মুমিন: আয়াত-১৭)
📄 জীবনের শেষ মুহূর্তে
আবু রায়হান বাইরুনী এমন এক উর্বর চিন্তাশীল ও লেখক ছিলেন যার কলম তার হাত ছাড়া হতো না বললেই চলে। তিনি আটাত্তর (৭৮) বছরের এক পরিপক্ক জীবন যাপন করেছিলেন এবং তার সারাজীবনে কখনো প্রয়োজনে লেখা-পড়া ও শিক্ষাদান থেকে অবসর গ্রহণ করেননি।
আবুল হাসান আলী ইবনে ঈছা বলেছেন-
“আবু রায়হান যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন তখন আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। প্রবেশকালেই আমি বুঝতে পারি যে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। তাঁর যখন এ অবস্থা তখন তিনি আমাকে বললেন যে, শেষের বার আমরা যখন সাক্ষাৎ করেছিলাম তখন আমরা মীরাস নিয়ে আলোচনা করেছিলাম এবং আমি কিছু বলেছিলাম তা ভুল ছিল এখন তিনি তা বুঝতে পারছেন। তাঁর জন্য আমার মায়া লাগল এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি যখন এতটা অসুস্থ তখন তাঁর সাথে এমন (জটিল) এক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ঠিক হবে কি-না।
তিনি উত্তর দিলেন, “আমি জানি যে, আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি, কিন্তু বিচার্য বিষয়ে অজ্ঞ থাকার চেয়ে সে বিষয়টাকে উপলব্ধি করা তুমি কি আমার জন্য ভালো মনে কর না। আমি তখন বিষয়টি পুনরায় বললাম আর তিনি তা আমার নিকট ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। আমাদের কথা-বার্তা শেষ হলে পরে আমি চলে গেলাম আর জানতে পারলাম যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। কেবলমাত্র তাঁর মতো বিশাল হৃদয়ের লোকেরাই ঠিক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত (মানসিকভাবে) শক্ত থাকেন।”
আতাউল্লাহ হুরিকাঘাতে উমর (রা)-এর যখন রক্তপাত হতে হতে মৃত্যুপ্ৰায় অবস্থা তখন তিনি তার সঙ্গী-সাথীদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি সালাত সমাপ্ত করেছিলেন কি-না।
ইব্রাহীম ইবনুল জাররাহ বলেছেন-
“(ইমাম) আবু ইউসুফ (রহ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তিনি একবার অজ্ঞান ও আরেকবার সজ্ঞান হতে ছিলেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি আমাকে ধর্মীয় কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। যখন আমি তার প্রশ্নকে বিষয়ের সাথে গ্রহণ করলাম তখন তিনি তা লক্ষ্য করে বললেন, “তাতে কিছু আসে না, আমরা এ বিষয়ে এজন্য গবেষণা করছি যে, এ বিষয়ের জ্ঞান বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে মুক্তি পেয়ে চিরদিনের জন্য বেঁচে থাকুক, এমন কি এটা কারো (জীবন) রক্ষার কারণ হোক।”
আমাদের ধার্মিক পূর্বসূরীগণ এমনই ছিলেন। যখনই তাদের মনে পড়ত, এমনকি মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থাতেও তখনই তারা ইসলামী জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতেন- হয়তো শিক্ষক হিসেবে নয়তো ছাত্র বেশে। তাদের অন্তরে জ্ঞান কতইনা মূল্যবান ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে তারা পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের কথা মনে করতেন না, তারা কেবল জ্ঞানের কথাই মনে করতেন। যে জ্ঞান তাদের জীবনের সাধনা ছিল। আল্লাহ্ তাদেরকে করুণা করুন।