📄 জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস থাকার মাঝেই মনের শান্তি
রিয়াদ শহরে পড়া-শোনা করার জন্য আমি তরুণ বয়সে আমার পরিবার ছেড়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার কোন এক চাচার সাথে অত্যন্ত কঠোর পরিবেশে ছিলাম। প্রতিদিন সকালে মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য আমাকে ত্রিশ মিনিট হাঁটতে হতো এবং বাসায় ফিরে আসা জন্য দুপুরে প্রথম ধাপে তিরিশ মিনিট হাঁটতে হতো। সকালে নাস্তা, দুপুরে খাবার এবং রাতের খাবার তৈরিতে আমি অংশ গ্রহণ করতাম। আমার কাজ ছিল দিনের দিন খরচ-খরচা পরিষ্কার করা, রান্না ঘর পরিষ্কার করা এবং ঘর-দোর সাজানো। তাছাড়া আমি পড়া-শুনার ব্যাপারে কঠিন পরিশ্রম করতাম এবং মাদ্রাসার ক্রিয়া-কলাপের অংশগ্রহণ করার জন্যও সময় দিতাম। আমি সব সময়ই ভাল মান (গ্রেড) অর্জন করতাম যা আমাকে আরো কঠিন পরিশ্রম করতে তাড়া করত। আমার একটাই মাত্র জামা ছিল যেটাকে সবসময় আমার নিজ হাতে পরিষ্কার করে ইস্ত্রি করতে হতো। আমি বাসায়, মাদ্রাসায় এবং বিশেষ অনুষ্ঠানেও এই একই জামা পরিধান করতাম। কেননা, মামুলি প্রয়োজনীয় জিনিসের যেমন খাবার টাকা, ডাক্তার টাকার জন্যই আমার অধিকাংশ টাকা (যে সামান্য টাকা আমি বৃত্তি হিসেবে পেতাম) তা শেষ হয়ে যেত (তাই আমি যখন নতুন পোশাক বানাতে বা কিনতে পারতাম না)। আমরা সব সময় একই অবস্থায় ছিলাম, অতএব আমরা আদৌ কোনো মাংস খেয়েছি কিনা তা ছিল বিরল এবং আমরা আদৌ কখনো ফল খেয়েছি কিনা তা ছিল (এমন কি) আরো বেশি বিরল।
আমরা সবাই পড়া-শুনার ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রম করতাম। কেননা মাসে মাত্র একবারই আমি বিশ্রাম করার সুযোগ পেতাম বা একটু মজা করতে বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আমাদের ধর্মীয় ও আরবী ভাষাতত্ত্ব ব্যবহারের মতো কঠিন বিষয়ের সাথে বীজগণিত, পাটিগণিত, ইংলিশ ও পদার্থ বিদ্যাসহ প্রায় সতেরোটি বিষয় আমরা মাদ্রাসায় পড়া-শুনো করতাম। আমি মাঝে মাঝে মাদ্রাসা থেকে আরবী কবিতার বই ধার করতাম এবং একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ বা মগ্ন হয়ে থাকতাম। এখন যখন আমার অতীতের সেসব দিনের কথা মনে পড়ে তখন আমার মনে পড়ে যায় যে, আমার সে সব কষ্ট সত্ত্বেও আমি সুখী ছিলাম এবং প্রতিরাতে শান্তিপূর্ণ ও শান্ত মনে ঘুমাতাম। পরবর্তীতে আমি আল্লাহর রহমতে একটি সুন্দর বাড়ি কিনলাম, আমি ভালো খেতাম, বিভিন্ন রকমের পোশাক পরতাম এবং সাধারণভাবে জীবন এক সুদৃঢ় অবস্থার দিকে মোড় নিল।
কিন্তু, এসব সত্ত্বেও আমি সেরূপ শান্তি অনুভব করিনি যেমনটি আমি তখন অনুভব করতাম। বর্তমানে জীবনের সাথে জটিল সমস্যা যুক্ত রয়েছে। সুতরাং একথা মনে করবেন না যে অল্প সম্পদ থাকাই আপনার দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কারণ, কেননা, একথা সত্য নয়। যেসব লোকের শুধুমাত্র জীবনের মামুলি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে তাদের অধিকাংশ ধনীদের তুলনায় অধিকতর সুখে এবং অধিকতর শান্তিপূর্ণ অস্তিত্বও আছে।
📄 আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং আপনার যথেষ্ট খাবার থাকে তবে আপনি ভালোই আছেন
১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ইয়েমেনের সীমান্তের নিকট ইসলাম প্রচারের জন্য আমি একটি প্রচারাভাবনার যোগ দিলাম। আমি একজন অধ্যাপকের সাথে আবহাওয়ার যাওয়া উদ্দেশ্যেমাত্র যা তারও চিন্তায় তা সামগ্রিকভাবে ছেড়ে বের হয়ে পড়লাম। ফেরার পথে আমি মানসিকতাতে বিচলিত ছিলাম, কারণ, তিনি তাঁর গাড়িকে অতি দ্রুত গতিতে চালাচ্ছিলেন। গতি কমানোর জন্য আমি তাঁকে সবিনয়ক অনুরোধ করলাম, কিন্তু মনে হলো এটা যেন তাঁকে আরো দ্রুত গতিতে চালাতে তাড়া দিল। সে রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল, তবুও তিনি অনবরত বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। পানিতে ভরে যাচ্ছিল এমন এক উপত্যকায় এসে আমরা পৌঁছালাম। প্রথম পানি আমাদের গাড়ির চাকার কিছুটা উপরে পৌঁছল। যখন আমরা উপত্যকার মাঝামাঝি পৌঁছালাম তখন অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল, কেননা আমাদের গাড়ির ভিতরে প্রবেশের জন্য পানি প্রবেশ করতে লাগল। আমরা গাড়ি ছেড়ে অতি কষ্টে উপত্যকার কিনারে যেতে পারলাম। আমরা সেখানে সারারাত খাদ্য-পানীয় এবং সবচেয়ে বড় কথা ক্ষুধা (কেননা আমরা ভিজে গিয়ে শীতে কাঁপছিলাম, তাই কম্বলের দরকার ছিল) আটকা পড়ে ছিলাম। তবুও আমরা সুস্থ ও কৃতজ্ঞ ছিলাম। কেননা, বন্যা যখন আমাদেরকে পরাভূত করে ফেলেছিল তখন আমরা মৃত্যুর আশংকা করেছিলাম তাই শুধু শুধুমাত্র সীমিত খাবার কারণেই আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম।
খুব সকালে এক লোক এসে আমাদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেল। এ ঘটনার দ্বারা আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত এক গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। একটি স্পেনিশ ফ্লাইটে আমেরিকান জাহাজকে আঘাত হানল তাই এটি ডুবে যেতে লাগল। ক্যাপ্টেন তিন দিন শুধুমাত্র রুটি ও পানি খেয়ে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তিনি তার এই অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “এ অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপকৃত হয়ে এর প্রধান ফল হলো যে যদি কোন লোক সুস্থ থাকে এবং তার খাদ্য ও পানীয় থাকে তবে গোটা দুনিয়াটাই তার।” সুস্থ শরীর, মনের শান্তি, খাদ্য ও পানীয় এবং পরিবেষের বস্ত্র ছাড়া দুনিয়াটা আর কি-ই-বা? আমরা কেন হিসেব করে দেখিনা যে, আমাদের কি আছে আর কি নেই? আমি মনে করি যে, (হিসেব করলে) আমরা দেখতে পাব যে, জীবনের শান্তিদায়ক জিনিসপত্রের শতকরা আশি ভাগেরও বেশি জিনিস আমাদের আছে। একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে নেই এমন ব্যতিক্রমধর্মী লোকের যন্ত্রণা আছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা সেরা সবকিছুর জন্য কাদি যা না থাকার কারণ হলো আমাদের যা হাসা (গোদামমুখী হয়ে থাকা) এবং খাবার যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ না হওয়া (অকৃতজ্ঞ হওয়া)। (অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের অসন্তুষ্টির মূল কারণ হলো আমাদের অকৃতজ্ঞতা ও আমাদের বিজোড়াভাব, অর্থাৎ আমাদের এ অশুভ প্রবৃত্তি নক, কুমির; যার কারণ হলো অকৃতজ্ঞতা ও গোদামমুখী হয়ে থাকা- অনুবাদক)। যখন আমরা বিপদগ্রস্ত থাকি তখন আমরা দুর্বলতার শক্তি পাই আর যখন সব কিছু ভালো থাকে তখন আমরা অকুতোভয় থাকি।
📄 জীবনে বিশৃঙ্খল হবেন না
একদিন আমি কুরআনের বারোটি তাফসীর গ্রন্থ জমা করলাম। আর তা ছিল : ১. তাবারী, ২. ইবনে কাছীর, ৩. বাগাবী, ৪. যামাখশারী, ৫. কুরতুবী, ৬. আয়িমাল, ৭. আবু সিনহুয়ি, ৮. আররাযী, ৯. ফাতহুল কাদীর, ১০. তাফসীরে খাযেন, ১১. আবু মাসউদ ও ১২. কাসেমি। (এ তালিকার মধ্যে কিছু আছে লেখকের নাম আর কিছু আছে প্রকৃত কিতাবের নামে)। আমি প্রতিদিন কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা (তাফসীর) এসব গ্রন্থ (কিতাব) থেকে পড়তে ইচ্ছা করেছিলাম। আমি প্রতিদিনকার আয়াতটি প্রথম কিতাব, দ্বিতীয় কিতাব এভাবে সব ক’টি কিতাব থেকে পড়ার পরিকল্পনা করলাম। এভাবে আমি কিছুকাল চেষ্টা করলাম, কিন্তু শীঘ্রই আমি ক্লান্ত ও বিরক্ত বোধ করলাম। একথা সত্য যে আমি উদ্যমী ছিলাম; কিন্তু, পরিকল্পনা করতে এবং পড়ানোর সঠিক পদ্ধতি বাছাই করতে আমি খুব বেশি তাড়াহুড়া করেছিলাম। ইসলামী বিজ্ঞানের ছাত্রদেরকে আমি এই উপদেশ দেই যে, অনেক কিতাব দিয়ে নিছক ভারাক্রান্ত হবেন না। উত্তমপন্থা হলো আপনি যা পড়েন, তাকে সতর্কতার সাথে বিন্যাস ও বাছাইই করা। সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো তা সুবিন্যস্ত হতে হবে, যদিও আপনি কেবলমাত্র সামান্য কিছু করেন। নবী করীম ﷺ-এর সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল যা নিয়মিত বা আমল করা যায়। আর যে কাজ ছোট কিছু ছিল।