📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আর আমি যখন অসুস্থ হই তিনিই আমাকে সুস্থ করেন

📄 আর আমি যখন অসুস্থ হই তিনিই আমাকে সুস্থ করেন


وَاِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ
“এবং আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।” (২৬-সূরা আশ শোয়ারা: আয়াত-৮০)

এখানে বিভিন্ন বিষয়ে এমন কিছু উপদেশ দেওয়া হলো, যেগুলি জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিকট থেকে আমাদের নিকট এসেছে। আবক্বাবাতো বলেছেন, “কঠোর পরিশ্রম করে, অলসতা পরিহার করে, মদ্যাসক্তি ত্যাগ করে এবং অতিরিক্ত বা বেশি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থেকে দীর্ঘকাল সুস্থ থাকুন।”

কোন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, “যে সুস্থতা কামনা করে তার উচিত যথাযথভাবে ও উত্তমরূপে আহার করা। তার পরিমিত পানি পান করা উচিত। দুপুরের আহারের পর সামান্য সময় বিশ্রাম করা ও রাতের খাবারের পর কিছুক্ষন হাঁটা উচিত। পেট ভরে আহার করার ঠিক পরেই গোসল করা থেকে সাবধান থাকতে হবে।”

আল হারিবীতো বলেছেন, “যে ব্যক্তি সুস্থ থাকতে চায় তার উচিত দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার আড়ালে গ্রহণ করা (খাওয়া)।”

প্লেটো বলেছেন, “পাঁচটি জিনিস শরীরকে দুর্বল করে : এমনকি মাঝে মাঝে মারাত্মকও হয়ে যায়।
১. দরিদ্র হওয়া।
২. প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।
৩. টক পানীয় পান করা (অল্প পরিমাণ টক পানীয় অবশ্যই শরীরের পক্ষে ভালো আর বেশি পরিমাণে টক পানীয় পান করা ক্ষতিকর। -অনুবাদক)
৪. উপদেশ প্রত্যাখ্যান করা এবং
৫. শুধুমাত্র মূর্খ থাকাই নয় বরং জ্ঞানীদেরকে উপহাস করা।”

চারটি জিনিস শরীরকে দুর্বল করে
১. অতিরিক্ত কথা বলা,
২. অতিরিক্ত ঘুমানো,
৩. অতিরিক্ত খাওয়া এবং
৪. অতিরিক্ত যৌন ক্রিয়া করা।

অতিরিক্ত কথা মস্তিষ্কের শক্তি ও তীক্ষ্ণতাকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষকে দ্রুত বৃদ্ধ করে দেয়। অতিরিক্ত ঘুম অন্তরকে অন্ধ করে দেয় এবং মানুষকে অলস ও নির্লিপ্ত করে দেয়। ঘন ঘন যৌন ক্রিয়া মানুষের শক্তি কমিয়ে ফেলে এবং শরীরের ওপর ব্যাপক ক্ষতির প্রভাব ফেলে।

চারটি জিনিস শরীরকে ধ্বংস করে দেয়
১. উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা বা টেনশন,
২. দুঃখ,
৩. ক্ষুধা এবং
৪. অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতা।

চারটি জিনিস হৃদয়ে প্রশান্তি বয়ে আনে
১. শ্যামলিমতা বা সবুজ গাছ-পালার দিকে তাকানো,
২. প্রবাহিত পানির দিকে তাকানো,
৩. প্রিয়জনের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং
৪. ফলন্ত গাছের ফলের দিকে তাকানো।

চারটি বিষয় বা কাজ চোখের দৃষ্টি শক্তিকে দুর্বল করে দেয়
১. খালি পায়ে হাঁটা।
২. খুব ভোরে ও ঘুমোনোর আগে ভ্রুকুটি করে তাকানো,
৩. ঘন ঘন কাঁদা এবং
৪. ক্ষুদ্রাক্ষরে মুদ্রিত লেখা পাঠ করা।

চারটি জিনিস বা কাজ শরীরকে শক্তিশালী করে
১. কোমল পোশাক পরিধান করা,
২. পরিমিত তাপের পানিতে গোসল করা,
৩. মিষ্টি ও সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া (মিষ্টি খাবার এমনকি যে কোন ধরনের খাবারই অধিক পরিমাণে খাওয়া ক্ষতিকর। –অনুবাদক) এবং
৪. সুঘ্রাণ নেওয়া।

চারটি জিনিস চেহারার হাসি খুশিভাব ও উজ্জ্বলতা হরণ করে
১. মিথ্যা কথা,
২. অহংকার করা
৩. মূর্খের মতো অতিরিক্ত অবান্তর প্রশ্ন করা এবং
৪. ঘন ঘন পাপ কাজ করা।

চারটি জিনিস চেহারার উজ্জ্বলতা ও হাসি খুশিভাব এনে দেয়
১. আত্মসম্মান বোধ;
২. অঙ্গীকার পূরণ করা;
৩. উদারতা, মহানুভবতা ও বদান্যতা; এবং
৪. ধার্মিকতা বা তাকওয়া।

চারটি কারণে অন্যান্য আপনাকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করবে
১. মূর্খতা,
২. হিংসা,
৩. মিথ্যা কথা এবং
৪. অন্যের সম্বন্ধে মিথ্যা গুজব রটানো।

চারটি কারণে আপনার নিকট অবাধে রিযিক আসবে
১. রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত পড়া,
২. গভীর রাতে তওবা করা,
৩. অভ্যাসগতভাবে দান করা এবং
৪. দিনের শুরুতে ও শেষে সর্বশক্তিমান আল্লাহকে স্মরণ করা ও তাঁর যিকির করা।

চারটি জিনিস আপনার নিকট রিযিক আসতে বাধা দেয়
১. সকালে ঘুমানো,
২. ঘন ঘন প্রার্থনা না করা,
৩. আলস্য ও
৪. আমানতের খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা।

চারটি জিনিস মানুষের মন ও বুদ্ধিকে দুর্বল করে দেয়
১. সর্বদা টক খাদ্য ও ফল খাওয়া (অল্প পরিমাণে নিয়মিত টক খাদ্য ও ফল উপকারী। –অনুবাদক)
২. চিৎ হয়ে ঘুমানো
৩. দুশ্চিন্তা এবং
৪. উদ্বিগ্নতা বোধ (টেনশন ফিল) করা।

চারটি জিনিস মানুষের বুদ্ধিশক্তিকে বাড়াতে সাহায্য করে
১. হালকা মন,
২. অতিরিক্ত পানাহার না করা,
৩. খাদ্যে মিষ্ট ও সমৃদ্ধ খাবার যোগকরা এবং
৪. অতিরিক্ত শারীরিক মেদ থেকে মুক্ত হওয়া।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 বিনোদন ও বিশ্রাম

📄 বিনোদন ও বিশ্রাম


শরীরের দুটি প্রধান ও প্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্য হলো শিথিলতা ও সরলতা। এ দুটি গুণ মুসলমানকে তার ইবাদতে এবং কাজ-কর্মে-আচার-আচরণে সাহায্য করে।

وَ أَنَّهُ هُوَ أَضْحَكَ وَ أَبْكَى‌
“আর তিনিই (যাকে ইচ্ছে) হাসাওন আর (যাকে ইচ্ছে) কাঁদান!” (৫০-সূরা আন নাজম : আয়াত-৪৩)

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্য ও কৌতুক করে এই উভয় কাজই করতেন। কিন্তু সত্য ছাড়া অন্য কিছু (মিথ্যা কথা) বলতেন না। তিনি আয়েশা (রা)-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন এবং তিনি স্পষ্ট ভাষায় কৃত্রিমতা ও কঠোরতা নিষেধ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, কেউ যখন ধর্ম খুব বেশি কঠিন করে ধর্ম তখন তাকে অসহায় করে ফেলবে।

অন্য একটি হাদীসে আমাদেরকে অবগত হতে হয়েছে যে, ধর্ম দৃঢ়। অতএব ধীরে ধীরে আমাদেরকে গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আমাদেরকে এ কথাও জানানো হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষের জীবনী শক্তির জরুরি একটি স্তর আছে এবং যে ব্যক্তি অতি কঠোর সে অবশ্যই ও অবশেষে ভেঙে পড়বে। সে মটকে যাবে (মট করে ভেঙে যাবে) এ কারণে যে, সে শুধুমাত্র বর্তমান অবস্থাটা দেখে এবং সেসব অবস্থা সে দেখে না, যে অবস্থাতে সে ভবিষ্যতে থাকতে পারে। সে তার মনোযোগের দীর্ঘকালীন প্রভাব ও অতিরিক্ত কঠোরতার ফলে সৃষ্ট বিরক্তির কথা ভুলে যায়। অধিকতর জ্ঞানী তিনিই, যিনি সর্বদা অল্প পরিমাণ কাজ করে যান, পরিবেশ পরিস্থিতি যাই হোক না কেন (তিনি কাজ বাদ দেন না)। হঠাৎ যদি তিনি কোন নির্দিষ্ট দিনে বেশি উৎসাহী হয়ে যান, তবে তিনি অতিরিক্ত কাজ করেন। কিন্তু যদি তিনি দুর্বল হয়ে যান তবে কমপক্ষে তিনি তার দৈনিক রুটিনের অংশ বিশেষ হলেও সম্পাদন করেন (তবুও একেবারে কাজ দেন না)।

একজন সাহাবী (রা)-এর নিয়োগ কথার সম্ভবত এটাই অর্থ- “আত্মা এক সময়ে আগে বাড়ে, এক সময়ে পিছু হটে। যে সময় এটা আগে বাড়ে, তখন সুবিধা ভোগ কর আর যখন এটা পিছু হটে তখন এটাকে একা ছেড়ে দাও।”

আমি এমন অনেক লোক দেখেছি, যারা ভালো নিয়্যাতে অত্যধিক পরিমাণে নফল সালাত পড়েছে এবং তাদের ধর্ম-কর্মে চরম বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু যা হোক অবশেষে তারা তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা বোধ করার পূর্বে যে (স্বাভাবিক) অবস্থায় ছিল তার চেয়েও অধিকতর দুর্বল অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। অনেকে যে বিষয়টি উপেক্ষা করে তা হলো ধর্ম মূলত: মানুষের নিকট সুখ-সমৃদ্ধি বয়ে আনার জন্যই এসেছে।

مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى
(“হে মুহাম্মাদ ﷺ ) তোমার ওপর আমি কুরআন এজন্য নাযিল করিনি যাতে তুমি কষ্ট পাও।” (২০-সূরা ত্বাহা : আয়াত-২)

যারা নিজেদের উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপায়, আল্লাহ তাদেরেক তিরস্কার করেন। নিজেদেরকে বাস্তব জগৎ থেকে সরিয়ে নেয়ার কারণে তারা তাদের পূর্বকৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গিয়ে শেষ হয়ে যায়।

وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوْهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
“আর সন্ন্যাসবাদ বা বৈরাগ্যবাদ, তারা একে আবিষ্কার করেছিল, আমি তাদের ওপর এ বিধান দেইনি। তবে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এটা পালন করত। কিন্তু এটাকেও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি।” (১৭-সূরা হাশাদ : আয়াত-১৭)

ইসলাম দেহ-মনের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখার কারণে, ইহ-পরকালের পাথেয় যোগান দেয়ার কারণে এবং সকলের নিকট স্বাভাবিকতাকে গ্রহণযোগ্য বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত করার কারণে অন্যান্য ধর্ম থেকে ব্যতিক্রমধর্মী।
“সেটাই সঠিক ধর্ম” (১-সূরা তাওবা : আয়াত-৩৬)

আবু সাঈদ খুদরী (রা) নিয়োক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন-
“একজন মরু whackী আরব এসে আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! কোন লোক সর্বাপেক্ষা উত্তম?' তিনি ﷺ উত্তর দিলেন-
مُؤْمِنٌ مُجَاهِدٌ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ رَجُلٌ مُعْتَزِلٌ فِي شِعْبٍ مِنَ الشِّعَابِ يَعْبُدُ رَبَّهُ.
“যে মুমিন নিজের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তার জিহাদ করে সে-ই উত্তম। পরবর্তী স্তরের লোক হলো সে, যে তার প্রভুর ইবাদত করার জন্য কোন উপত্যকায় (বা গিরিপথে) থেকে একাকী বাস করে।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে, তিনি ﷺ বলেছেন-
يَتَّقِي اللَّهَ وَيَدَعُ النَّاسَ مِنْ شَرِّهِ.
“সে ব্যক্তি (উত্তম), যে নাকি আল্লাহকে ভয় করে এবং তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখার জন্য লোকদেরকে ছেড়ে চলে যায়।”

আবু সাঈদ (রা) নিয়োক্ত হাদীসটিও বর্ণনা করেছেন-
يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرُ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمٌ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنَ الْفِتَنِ.
ভাবার্থ : “অচিরেই মুসলমানের উত্তম সম্পদ হবে ভেড়া-ছাগল-বকরী। তা নিয়ে সে পাহাড়ের পাদদেশে চারণভূমিতে ও বৃষ্টিবহুল স্থানে ঘুরে বেড়াবে। সে ফেতনা-ফাসাদের ভয়ে তার ধর্ম (রক্ষাথে র্বা য়ে) নিয়ে পালিয়ে বেড়াবে।”

উমর (রা) বলেছেন-
خُذُوا حِظَّكُمْ مِنَ الْعُزْلَةِ
ভাবার্থ : “নিঃসঙ্গ জীবনের যে অংশ তোমার ভাগে আছে তা গ্রহণ কর।”

জুনাইদ (রহ) কত সুন্দরই বলেছেন-
مُكَابَدَةُ الْعُزْلَةِ أَيْسَرُ مِنْ مُدَارَاةِ الْخُلْطَةِ.
ভাবার্থ : “মানুষের তোষামোদের চেয়ে নিঃসঙ্গ জীবন ভোগ করা সহজ।”

খাত্তাবী বলেছেন-
“একাকী জীবন যাপনের অর্থ যদি গৌরব থেকে নিরাপদ থাকা হয় এবং সে সব মন্দ কাজ দূরে থাকা হয়, যার পরিবর্তন সাধন করা আপনার সাধ্যাতীত। তবে এটা খুব উপকারী কোন কিছু।”

হাকীম (র) তার 'মুস্তাদরাক' কিতাবে আবু যর (রা) থেকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যার সাথে শেখত খাত্তাবীর কথার খুব মিল আছে আর তাহলো-
الْوِحْدَةُ خَيْرٌ مِّنْ جَلِيسِ السُّوءِ
ভাবার্থ : “মন্দ সাথীর চেয়ে একাকিত্ব ভালো।” এ হাদীসের সনদ হাসান।

খাত্তাবী (রহ) বুঝাতে চান যে, আমাদের ধর্মের তথা ইসলাম ধর্মে সন্ন্যাসবাদ ও সামাজিকতার বিধান নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর। তত্ত্বীয় মাধ্যমে আমাদেরকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে- বিশেষ উদ্দেশ্যে মানুষের সাথে মিলে থাকতে, জ্ঞানী লোকদের অনুসরণ করতে এবং ধর্মীয় ব্যাপারে সমাজের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে। যে ব্যক্তি নিছক ধর্ম রক্ষায় এবং সম্পদ অর্জনে নিয়োজিত, তার জন্য একাকিত্বই উত্তম। তবে প্রয়োজনের সময় ও ভালো কাজে অন্যদের সাথে মেলা দরকার। তা সত্ত্বেও অনেক জরুরি কাজগুলো অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে; যেমন- জামায়াতে সালাত আদায়, সালামের উত্তর প্রদান, রোগী দেখতে যাওয়া, জানাযার সালাত হাজির হওয়া ইত্যাদি। যা দরকার তা হলো অতিমাত্রায় সামাজিক না হওয়া। কেননা, এমন অতি মাত্রায় সামাজিক হওয়ার ফলে সময় নষ্ট হবে এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করা হবে। দেহের জন্য পানাহারের প্রয়োজন যেমন, সমাজের অন্যদের সাথে মিলামিশা করা তেমন। উভয় ক্ষেত্রেই সেত্নুয়ু প্রয়োজন সেত্নুয়ু গ্রহণ উচিত। এটাই দেহ-মনের জন্য পবিত্রতর আর আল্লাহরই সবচেয়ে বেশি জানেন।

ক্বাতারী (রহ) 'একাকিত্ব' বিষয়ে তার গবেষণামূলক প্রবন্ধে বলেছেন, যে নিঃসঙ্গতা অন্বেষণ করে তার একথা মনে (ধারণা) করা উচিত যে, সে এ কাজ করছে তার ক্ষতি থেকে জনগণকে বাঁচানোর জন্য এবং এর বিপরীতটা নয় (অর্থাৎ, জনগণের ক্ষতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়)। এর কারণ এই যে, প্রথমজন নিজের সর্বস্ব বিনয়ী মনোভাব গোপন করে জনগণের নিজের চেয়ে ভাল মনে করছে- যা ধর্ম (দ্বীন) চায়। দ্বিতীয়জন জনগণের উপর নিজের বড়ত্ব আরোপ করছে (জনগণকে নিজের চেয়ে খারাপ মনে করছে)- যা মুমিনের চরিত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে জনগণকে (মানুষকে) তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। দুটি বিপরীত (পরস্পর বিরোধী) আর তৃতীয়টি সে দুটির মাঝামাঝি অবস্থানে আছে।

প্রথম শ্রেণীর লোকেরা নিজেদেরকে লোকজন থেকে এতটাই আলাদা করে রাখে যে, তারা জুম্মার সালাতেও হাজির হয় না। জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করে না এবং কল্যাণকর সমাবেশে যেমন ওয়াজ মাহফিল যোগ দেয় না। এ শ্রেণীর লোকেরা শয়তানে ভ্রান্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা এতটাই সামাজিক যে, তারা মন্দ সমাবেশে অংশগ্রহণ করে- যেখানে নাকি মিথ্যা তত্ত্বব ও সময়ের অপচয়ই বেশি। এরাও ভ্রান্ত ও পতিত। মধ্যপন্থী (তৃতীয় শ্রেণীর) লোকেরা যে, সব ইবাদত অবশ্যই জামায়াতে আদায় করতে হয় সেসব ইবাদতের ব্যাপারে অন্যদের সাথে একত্রত হয়। ধর্ম প্রচারে, পুরস্কার অর্জনে এবং আরো বেশি ব্যাপকতাকে বলতে গেলে বলতে হয়- আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে তারা অন্যদের সাথে অংশগ্রহণ করে। যে সব সমাবেশে শয়তানী, মিথ্যা ও অপচয় বেশি তারা সে সব সমাবেশকে এড়িয়ে চলে।
“এরূপে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছি।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-১৪৩)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস থাকার মাঝেই মনের শান্তি

📄 জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস থাকার মাঝেই মনের শান্তি


রিয়াদ শহরে পড়া-শোনা করার জন্য আমি তরুণ বয়সে আমার পরিবার ছেড়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার কোন এক চাচার সাথে অত্যন্ত কঠোর পরিবেশে ছিলাম। প্রতিদিন সকালে মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য আমাকে ত্রিশ মিনিট হাঁটতে হতো এবং বাসায় ফিরে আসা জন্য দুপুরে প্রথম ধাপে তিরিশ মিনিট হাঁটতে হতো। সকালে নাস্তা, দুপুরে খাবার এবং রাতের খাবার তৈরিতে আমি অংশ গ্রহণ করতাম। আমার কাজ ছিল দিনের দিন খরচ-খরচা পরিষ্কার করা, রান্না ঘর পরিষ্কার করা এবং ঘর-দোর সাজানো। তাছাড়া আমি পড়া-শুনার ব্যাপারে কঠিন পরিশ্রম করতাম এবং মাদ্রাসার ক্রিয়া-কলাপের অংশগ্রহণ করার জন্যও সময় দিতাম। আমি সব সময়ই ভাল মান (গ্রেড) অর্জন করতাম যা আমাকে আরো কঠিন পরিশ্রম করতে তাড়া করত। আমার একটাই মাত্র জামা ছিল যেটাকে সবসময় আমার নিজ হাতে পরিষ্কার করে ইস্ত্রি করতে হতো। আমি বাসায়, মাদ্রাসায় এবং বিশেষ অনুষ্ঠানেও এই একই জামা পরিধান করতাম। কেননা, মামুলি প্রয়োজনীয় জিনিসের যেমন খাবার টাকা, ডাক্তার টাকার জন্যই আমার অধিকাংশ টাকা (যে সামান্য টাকা আমি বৃত্তি হিসেবে পেতাম) তা শেষ হয়ে যেত (তাই আমি যখন নতুন পোশাক বানাতে বা কিনতে পারতাম না)। আমরা সব সময় একই অবস্থায় ছিলাম, অতএব আমরা আদৌ কোনো মাংস খেয়েছি কিনা তা ছিল বিরল এবং আমরা আদৌ কখনো ফল খেয়েছি কিনা তা ছিল (এমন কি) আরো বেশি বিরল।

আমরা সবাই পড়া-শুনার ব্যাপারে কঠোর পরিশ্রম করতাম। কেননা মাসে মাত্র একবারই আমি বিশ্রাম করার সুযোগ পেতাম বা একটু মজা করতে বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আমাদের ধর্মীয় ও আরবী ভাষাতত্ত্ব ব্যবহারের মতো কঠিন বিষয়ের সাথে বীজগণিত, পাটিগণিত, ইংলিশ ও পদার্থ বিদ্যাসহ প্রায় সতেরোটি বিষয় আমরা মাদ্রাসায় পড়া-শুনো করতাম। আমি মাঝে মাঝে মাদ্রাসা থেকে আরবী কবিতার বই ধার করতাম এবং একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা আবৃত্তি করে আনন্দ বা মগ্ন হয়ে থাকতাম। এখন যখন আমার অতীতের সেসব দিনের কথা মনে পড়ে তখন আমার মনে পড়ে যায় যে, আমার সে সব কষ্ট সত্ত্বেও আমি সুখী ছিলাম এবং প্রতিরাতে শান্তিপূর্ণ ও শান্ত মনে ঘুমাতাম। পরবর্তীতে আমি আল্লাহর রহমতে একটি সুন্দর বাড়ি কিনলাম, আমি ভালো খেতাম, বিভিন্ন রকমের পোশাক পরতাম এবং সাধারণভাবে জীবন এক সুদৃঢ় অবস্থার দিকে মোড় নিল।

কিন্তু, এসব সত্ত্বেও আমি সেরূপ শান্তি অনুভব করিনি যেমনটি আমি তখন অনুভব করতাম। বর্তমানে জীবনের সাথে জটিল সমস্যা যুক্ত রয়েছে। সুতরাং একথা মনে করবেন না যে অল্প সম্পদ থাকাই আপনার দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কারণ, কেননা, একথা সত্য নয়। যেসব লোকের শুধুমাত্র জীবনের মামুলি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে তাদের অধিকাংশ ধনীদের তুলনায় অধিকতর সুখে এবং অধিকতর শান্তিপূর্ণ অস্তিত্বও আছে।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং আপনার যথেষ্ট খাবার থাকে তবে আপনি ভালোই আছেন

📄 আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং আপনার যথেষ্ট খাবার থাকে তবে আপনি ভালোই আছেন


১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ইয়েমেনের সীমান্তের নিকট ইসলাম প্রচারের জন্য আমি একটি প্রচারাভাবনার যোগ দিলাম। আমি একজন অধ্যাপকের সাথে আবহাওয়ার যাওয়া উদ্দেশ্যেমাত্র যা তারও চিন্তায় তা সামগ্রিকভাবে ছেড়ে বের হয়ে পড়লাম। ফেরার পথে আমি মানসিকতাতে বিচলিত ছিলাম, কারণ, তিনি তাঁর গাড়িকে অতি দ্রুত গতিতে চালাচ্ছিলেন। গতি কমানোর জন্য আমি তাঁকে সবিনয়ক অনুরোধ করলাম, কিন্তু মনে হলো এটা যেন তাঁকে আরো দ্রুত গতিতে চালাতে তাড়া দিল। সে রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল, তবুও তিনি অনবরত বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। পানিতে ভরে যাচ্ছিল এমন এক উপত্যকায় এসে আমরা পৌঁছালাম। প্রথম পানি আমাদের গাড়ির চাকার কিছুটা উপরে পৌঁছল। যখন আমরা উপত্যকার মাঝামাঝি পৌঁছালাম তখন অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল, কেননা আমাদের গাড়ির ভিতরে প্রবেশের জন্য পানি প্রবেশ করতে লাগল। আমরা গাড়ি ছেড়ে অতি কষ্টে উপত্যকার কিনারে যেতে পারলাম। আমরা সেখানে সারারাত খাদ্য-পানীয় এবং সবচেয়ে বড় কথা ক্ষুধা (কেননা আমরা ভিজে গিয়ে শীতে কাঁপছিলাম, তাই কম্বলের দরকার ছিল) আটকা পড়ে ছিলাম। তবুও আমরা সুস্থ ও কৃতজ্ঞ ছিলাম। কেননা, বন্যা যখন আমাদেরকে পরাভূত করে ফেলেছিল তখন আমরা মৃত্যুর আশংকা করেছিলাম তাই শুধু শুধুমাত্র সীমিত খাবার কারণেই আমরা কৃতজ্ঞ ছিলাম।

খুব সকালে এক লোক এসে আমাদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেল। এ ঘটনার দ্বারা আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত এক গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। একটি স্পেনিশ ফ্লাইটে আমেরিকান জাহাজকে আঘাত হানল তাই এটি ডুবে যেতে লাগল। ক্যাপ্টেন তিন দিন শুধুমাত্র রুটি ও পানি খেয়ে অসহায় অবস্থায় ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তিনি তার এই অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “এ অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপকৃত হয়ে এর প্রধান ফল হলো যে যদি কোন লোক সুস্থ থাকে এবং তার খাদ্য ও পানীয় থাকে তবে গোটা দুনিয়াটাই তার।” সুস্থ শরীর, মনের শান্তি, খাদ্য ও পানীয় এবং পরিবেষের বস্ত্র ছাড়া দুনিয়াটা আর কি-ই-বা? আমরা কেন হিসেব করে দেখিনা যে, আমাদের কি আছে আর কি নেই? আমি মনে করি যে, (হিসেব করলে) আমরা দেখতে পাব যে, জীবনের শান্তিদায়ক জিনিসপত্রের শতকরা আশি ভাগেরও বেশি জিনিস আমাদের আছে। একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে নেই এমন ব্যতিক্রমধর্মী লোকের যন্ত্রণা আছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা সেরা সবকিছুর জন্য কাদি যা না থাকার কারণ হলো আমাদের যা হাসা (গোদামমুখী হয়ে থাকা) এবং খাবার যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ না হওয়া (অকৃতজ্ঞ হওয়া)। (অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের অসন্তুষ্টির মূল কারণ হলো আমাদের অকৃতজ্ঞতা ও আমাদের বিজোড়াভাব, অর্থাৎ আমাদের এ অশুভ প্রবৃত্তি নক, কুমির; যার কারণ হলো অকৃতজ্ঞতা ও গোদামমুখী হয়ে থাকা- অনুবাদক)। যখন আমরা বিপদগ্রস্ত থাকি তখন আমরা দুর্বলতার শক্তি পাই আর যখন সব কিছু ভালো থাকে তখন আমরা অকুতোভয় থাকি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px