📄 উত্তম জীবন
সুখ সম্বন্ধে আমরা পূর্বে অধ্যায়গুলোতে যা কিছু আলোচনা করেছি তা এক কথায় প্রকাশ করা যায়। আর তা হলো :
সবকিছুর প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা। এ পর্যন্ত অন্য যা কিছু আমরা আলোচনা করেছি তা সবই বৃথা যদি আপনার আল্লাহর প্রতি ঈমান না থাকে। আল্লাহকে প্রভু হিসেবে, মুহাম্মাদ ﷺ-কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা এবং ইসলামকে জীবন-বিধান হিসেবে গ্রহণ করা অবশ্যই ভিত্তি (প্রধান কাজ) হতে হবে。
“(তাওহীদ বা ইসলামী একত্ববাদে বিশ্বাসী) যে কোন ঈমানদার নর-নারী নেক আমল করবে আমি অবশ্যই তাকে (এ পৃথিবীতে সম্মান, পরিতৃপ্তি ও হালাল রিযিক সম্বলিত) উত্তম জীবন দান করব এবং আমি অবশ্যই তাদেরকে তাদের নেক আমল অনুযায়ী (পরকালে জান্নাত) পুরস্কার দিব।” (১৬-সূরা আন নাহল : আয়াত-৯৭)
উত্তম জীবনের জন্য দু’টি শর্ত আছে। আর তা হলো–
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা,
২. আমলে সালেহ করা।
“নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও আমলে সালেহ্ করে পরম করুণাময় (আল্লাহ্ মুমিনদের অন্তরে) তাদের জন্য অচিরেই ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন।” (১৯-সূরা মারইয়াম : আয়াত-৯৬)
যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে ও নেক আমল করে সে দু'টি উপকার পায়–
১. ইহকালে ও পরকালে এক সুখী-সমৃদ্ধ উত্তম জীবন।
২. মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল পুরস্কার।
“দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে শুভ সংবাদ।” (১০-সূরা ইউনুস : আয়াত-৬৪)
📄 আপনার ভিতরের ও বাহিরের যত্ন নিন
যার আত্মা পবিত্র সে পরিষ্কার পোশাকাদি পরিধান করে। কোন কোন জ্ঞানী লোক এমনকি একথাও বলেছেন যে-
“যখন কারো পোশাক ময়লা হয়ে যায় তখন তার আত্মাও পোশাককে অনুসরণ করে (অর্থাৎ পোশাকের মতো ময়লা হয়ে যায়)।”
অনেক লোকের বিরক্তির মূল কারণ হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকা, অগোছালো থাকা ও নিয়মনিষ্ঠ না থাকা; আর অন্যদের বিরক্তির কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ময়লা পোশাকাদি ও নোংরা সুরৎ।
এ বিশ্ব জগৎ নিয়মভিত্তিক পরিচালিত। আসলে আমাদের ধর্মের গভীরতা ও প্রজ্ঞা সত্যিকারভাবে বুঝতে হলে আমাদের এ কথা বুঝা উচিত যে, ছোট বড় উভয় বিষয়েই আমাদের জীবনকে নিয়মিতান্ত্রিক করার জন্য এ ধর্ম এসেছে। আল্লাহ্র সব কিছুই (অর্থাৎ সকল বিধানই) একটি মাত্রা অনুপাতে আছে।
তিরমিযী শরীফে নিয়মিত হাদীসে আছে-
إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ.
“নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।”
ইমাম বুখারী তার সহীহ কিতাবে নিম্নোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন-
“সপ্তাহে একদিন গোসল করা, মাথা ও শরীর ধোয়া মুসলমানের উপর বাধ্যতামূলক।”
সর্বাপেক্ষা কম যতটা আশা করা যায় এটা (সপ্তাহে একদিন গোসল করা) হলো তা। আমাদের কিছু কিছু ধার্মিক পূর্বসূরী প্রতিদিন একবার গোসল করতেন, যেমনটা উসমান ইবনে আফ্ফান (রা) সম্বন্ধে আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে।
“এবং গোসলের সুশীতল পানি ও (প্রাণবন্তকারী) পানীয়।” (৩৮-সুরা ছোয়াদ্ : আয়াত-৪২)
দাড়ি রাখা, মোছ ছাঁটা, নখ কাটা, দাঁত মাজা, মাথা আঁচড়ানো, কাপড় ধোয়া ও সাধারণ বাহ্যিক আকৃতির যত্ন পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক কাজ। এসব স্বাস্থ্যকর কাজ করলে আমরাও ভালো বোধ করা যায়। সাদা পোশাক পরার পরামর্শও দেয়া হয়েছে। কেননা নবী করীম ﷺবলেছেন-
“সাদা পোশাক পরিধান কর ও মৃতের কাফন হিসেবে সাদা কাপড় ব্যবহার কর।”
আপনার উচিত ছোট একখানা নোটবুকে আপনার কাজ-কর্মকে পড়ার, ইবাদত করার, ব্যায়াম করার ও ইত্যাদির সময় নির্ধারণ করে সুবিন্যস্ত করে রাখা।
“প্রত্যেক বিষয়ের নির্দিষ্ট সময় (আল্লাহ্র নিকট) লিখিত আছে।” (১৩-সুরা রা’আদ : আয়াত-৩৮)
“আমার নিকট প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার আছে এবং আমি তা নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়া নাযিল করি না।” (১৫-সুরা হিজর : আয়াত-২১)
কসমেসের লাইব্রেরীতে এক বিশাল বিজ্ঞাপন ঝুলছে ও তাতে লিখা আছে-
“এ বিশ্বব্রহ্ম নিয়মিতভাবে পরিচালিত।” একথা সত্য। কেননা, ধর্ম সকল কাজ কর্মে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ভারসাম্যতার দাবি করে।
আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ বিশ্বজগতের কাজকর্ম খেল-তামাশার উপর ভিত্তি করে পরিচালিত নয় বরং পূর্ব নির্ধারিত বিধান, পরিমাণ ও শৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে পরিচালিত।
“চন্দ্র-সূর্য হিসাব করে চলে।” (৫৫-সুরা আর রাহমান : আয়াত-৫)
“সূর্যের সাধ্য নেই চন্দ্রের নাগাল পায়, আর রাতও দিনকে অতিক্রম করতে পারবে না। আর প্রত্যেকেই (যার যার নির্দিষ্ট) কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে।” (৩৬-সুরা ইয়াসীন : আয়াত-৪০)
“আর চন্দ্রের জন্য আমি বহু ঘাঁটি নির্ধারণ করে দিয়েছি (এগুলো অতিক্রম করতে করতে) অবশেষে তা শুষ্ক, বক্র, পুরাতন খেজুর ডালের মতো হয়ে যায়।” (৩৬-সুরা ইয়াসীন : আয়াত-৩৯)
“এবং আমি রাতও দিনকে দুটি নিদর্শন বানিয়েছি। পরে আমি রাতের চিহ্নকে অন্ধকারময় করেছি এবং দিনের চিহ্নকে উজ্জ্বল করেছি। যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ তালাশ করতে পার ও বছরের সংখ্যা ও হিসাব জেনে নিতে পার। আর আমি প্রতিটি বিষয়কে বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।” (১৭-সুরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-১২)
“হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এমন কিছু অযথা সৃষ্টি করোনি; সকল মহিমা, গৌরব, প্রশংসা ও ধন্যবাদ তোমারই প্রাপ্য।” (৩-সুরা আলে ইমরান : আয়াত-১৯১)
আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা আমি খেল-তামাশা করে সৃষ্টি করিনি। যদি আমি খেল-তামাশা গ্রহণ করতাম তাহলে তা আমি আমার পক্ষ থেকেই গ্রহণ করতাম, কিন্তু আমি তা করিনি। (২১-সুরা আল আম্বিয়া : আয়াত-১৬, ১৭)
“এবং (হে মুহাম্মাদ!) আপনি বলে দিন : তোমরা ভালো কাজ কর।” (৯-সুরা তাওবা : আয়াত-১০৫)
যখন কোন মানসিকভাবে অসুস্থ রোগী গ্রীষ্মের হাকিমের নিকট চিকিৎসার জন্য আনা হতো তখন তারা এ রোগীকে খামার ও বাগান করতে বাধ্য করত। অল্প কিছু সময় কাটতেই এ রোগী সুস্থ হয়ে যেত। হস্তশিল্প ব্যবসায়ীরা অভ্যন্তর তুলনার স্বল্প ব্যয়। শরীর ও শান্তি। আপনি যদি শ্রমিকদেরকে লক্ষ্য করেন তবে আপনি তাদের শরীর ও শান্তি ও মনের শান্তি দেখতে পাবেন। এই দুর্বসুই সহচিল আসে। আর সন্তুষ্টি আসে নড়াছাড়া ব্যায়াম ও কাজের মাধ্যমে।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ.
“হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অক্ষমতা ও অলসতা থেকে মুক্তি চাই।”
📄 ভ্রমণ করুন
নানা জায়গায় ভ্রমণ করা ও বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করা মনে সুখ বয়ে আনে—একথা আমি এ পুস্তকের প্রথম দিকেও কোন এক অধ্যায়ে বলেছি। মহান আল্লাহ বলেছেন-
قُلِ انْظُرُوْا مَاذَا فِى السَّمٰوَاتِ وَالْاَرْضِ
“ (হে মুহাম্মাদ!) আপনি বলে দিন, “আসমানসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তোমরা তা দেখ।” (১০-সুরা ইউনুস: আয়াত-১০১)
فَسِيْرُوْا فِى الْاَرْضِ فَانْظُرُوْا
“(হে মুহাম্মাদ!) আপনি বলে দিন, “তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর ও দেখ।”
যে ব্যক্তি ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়বে সে আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য জেনে বিষয়াবিভুত হয়ে যাবে যদিও উক্ত পুস্তকে কিছু বাড়াবাড়ি আছে। ভ্রমণ ও সৃষ্টির খোলা পুস্তক পাঠের মাধ্যমে উন্নয়নস্বরূপ রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন-
فَسِيْحُوْا فِى الْأَرْضِ
“অতএব তোমরা স্বাধীনভাবে পৃথিবীতে ভ্রমণ কর।” (৯-সুরা তাওবা: আয়াত-২)
حَتّٰى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ-
“এমনকি যখন তিনি সূর্যাস্তগমনের স্থানে পৌঁছে গেলেন।” (১৮-সুরা আল কাহাফ: আয়াত-৮৬)
لَا أَبْرَحُ حَتّٰى أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا-
“যতক্ষণ পর্যন্ত না দু'সাগরের সঙ্গমস্থলে আমি পৌঁছব ততক্ষণ আমি (ভ্রমণ) ছাড়ব না অথবা (উদ্দিষ্ট স্থানে না পৌঁছতে পারলে) আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।” (১৮-সুরা আল কাহাফ: আয়াত-৬০)
📄 দরিদ্র হওয়াতে দুঃখ করবেন না; কারণ,
আলী (রা) বলেছেন, “মানুষ যে ভালো কাজ করে তা অনুপাতেই তার (প্রকৃত) মূল্য নির্ধারণ করা হয়।”
অতএব, এক জ্ঞানী, বিজ্ঞ, পণ্ডিত ও আলেম ব্যক্তির মূল্য তার জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, তার জ্ঞান কি বিশাল এবং যে সে কি পরিমাণে তার জ্ঞানকে প্রসারিত করে তার উপর ভিত্তি করে তার মূল্য নির্ধারিত হয়। অনুরূপভাবে কবির মূল্যয়ন হয় তার কবিতার মানের উপর এবং একুশটি প্রবন্ধ প্রতিটি পেশাদার প্রতিটি লোকের জন্যই প্রযোজ্য। যে যে কাজ করে তার সৌন্দর্যের হারাই জনগণের নিকট তার মূল্য নিরূপিত হয়। পেশা অনুসারে নয় বরং ধর্ম অনুসারে এবং সাধারণ জীবন অনুসারে প্রত্যেকেরই উচিত, ভালো কাজ করে, তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্তর বৃদ্ধি করে, তাদের মনকে সংস্কৃতিসম্পন্ন ও সভাবত্তা করে এবং তাদের ব্যক্তিত্বের মহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে উন্নত করে তাদের মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা করা।