📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 নির্জনতা ও নির্জন বাসের উপকারিতা

📄 নির্জনতা ও নির্জন বাসের উপকারিতা


সঠিকভাবে বুঝে কাজে লাগাতে পারলে নি:সঙ্গতা খুবই উপকারী। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেন-

“ইবাদত, সালাত, দোয়া, জিকির, কুরআন তেলাওয়াত এবং নিজেকে এবং নিজের আমলের মূল্যায়ন করার জন্য ইবাদতগুজার বান্দার মাঝে মাঝে নি:সঙ্গ হওয়া বা নির্জনবাস করা উচিত। প্রার্থনা করতে, গুনাহ মাফ চাইতে, পাপ কাজ হতে দূরে থাকতে ও ইত্যাদি নেক আমল করতেও একাকীত্ব বান্দাকে সাহায্য করে।”

ইমাম ইবনুল জাওজী তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘সাইদুল খাতির’-এর তিনটি অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন : “আমি এমন কিছু দেখিনি বা এমন কোন কিছুর কথা শুনিনি যা নির্জনতার সমান শান্তি, সম্মান ও মর্যাদা এনে দিতে পারে। এটা বান্দাকে পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে, এটা তাঁর সম্মান রক্ষা করে, এবং এটা সময় বাঁচায়। নির্জনতা আপনাকে হিংসুকদের থেকে দূরে রাখবে এবং যারা আপনার বিপদে খুশি হয় তাদের থেকেও আপনাকে দূরে রাখবে। এটা আখেরাতের স্মরণকে বর্ধিত করে এবং এটা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের কথা ভাবায়। নির্জনবাসের সময় বান্দার চিন্তা যা উপকারী এবং যাতে হেকমত বা প্রজ্ঞা আছে তাতে ঘুরে বেড়াতে পারে।”

নির্জনতার পুরো উপকারিতা একমাত্র আল্লাহই জানেন; কেননা, নির্জন বাসে বান্দার মন উন্নত হয়, দৃষ্টভঙ্গি পরিপক্ব হয়, আত্মা শান্তি পায় এবং বান্দা নিজেকে ইবাদতের আদর্শ পরিবেশে দেখতে পায়। মাঝে মাঝে একাকী থেকে বান্দা নিজেকে ফেতনা-ফাসাদ থেকে, যে লোক প্রশংসার যোগ্য নয় তার তোষামোদ করা থেকে এবং হিংসুকের চোখ বা নজর থেকে দূরে রাখতে পারে। এভাবে সে অহংকারীদের উদ্ধত ও বোকাদের পাপ কাজসমূহ থেকে দূরে থাকতে পারে। নি:সঙ্গতায় ভুল-ভ্রান্তি, কাজ-কারবার এবং কথা-বার্তা সব কিছুই একটি পর্দার আড়ালে নি:সঙ্গ হয়ে থাকে।

নি:সঙ্গ সময় যাপনকালে ধ্যান-ধারণা ও মতবাদের সাগরের গভীরে ডুব দেওয়া যায়। এমন সময়ে মন তার মতামত গ্রহণের মতো মুক্ত ও স্বাধীন থাকে। অন্যদের সাহচর্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মা পরমানন্দ লাভ করতে এবং উদ্দীপক চিন্তা-ভাবনা তালাশ করতে মুক্তি পায়। একাকী থাকাকালে মানুষ কোন কিছুই দেখানোর জন্য বা জাঁক দেখানোর জন্য অথবা বড়াই করার জন্য করে না; কেননা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে দেখে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তাঁর কথা শুনতে পায় না।

প্রতিভাবান, বড় মাথা ওয়ালা (অর্থাৎ মেধাবী) অথবা মানব জাতির প্রতিভার মহান স্বাক্ষর আছে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই নির্জনতার কূপের (পানি) দ্বারা তাঁর মহত্বের বীজকে সিক্ত করেছিল। তারপর সে বীজ থেকে চারা গাছ, অবশেষে সে চারা বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

কাজী জুরয়ানি (রা) বলেছেন-
“গৃহ ও পুস্তকের সঙ্গী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি। জ্ঞানের চেয়ে বেশি সম্মানজনক আর কিছুই নেই, তাই আমি অন্য কিছুতে সঙ্গী খুঁজি না, আসলে জনগণের সাথে মাখামাখি করলেই মানহানি ঘটে। অতএব তাদেরকে ত্যাগ কর এবং মহত্বভাবে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবন যাপন কর।”

আরেকজন বলেন-
“আমি নি:সঙ্গতার মাঝে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছি এবং পরম আগ্রহের সাথে আমার গৃহেই অবস্থান করেছি। তাই আমার সুখ স্থায়ী হয় এবং আমার সুখ বৃদ্ধি পায়। আমি মানবসত্ত্ব ত্যাগ করেছি এবং আমি ভ্রুক্ষেপ করিনি যে, সেনাবাহিনী আগে বেড়ে গেল না-কি বাদশাহ আমাদেরকে পরিদর্শন করতে এসেছেন।”

আহমদ ইবনে খলীল হাঞ্চলী বলেছেন “যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আশা থেকে মর্যাদা ও শান্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, সে যেন মানুষ থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং অল্পে তুষ্ট থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষতিকর জীবন-যাপন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত, প্রতারকদের মাঝে থেকে প্রতারিত হয়ে, আত্মম্ভরী বা অহংকারীদেরকে তোষামোদ করে, হিংসুকের হিংসার আগুন সহ্য করে, এবং কৃপণ ও বদমেজাজীদেরকে সহ্য করে কীভাবে সে জীবনে আনন্দ পেতে পারে? মানুষ, তাদের নানান পথ ও তাদের বোঝামির সাথে পরিচিত হওয়া ধ্বংসের শামিল!”

ইবনে ফারিস বলেছেন “তারা জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কেমন আছি সে কথা, আর আমি বলেছিলাম, ভালো আছি, তোমাদেরকে ধন্যবাদ; একটি অভাব পূর্ণ হয়েছে আরেকটি অবহেলিত হয়ে আছে, যাতনা যখন এমনই তখন আমার আত্মা সংকুচিত হয়ে যায়, আমি বলি একদিন হয়তো কোনো সাহায্য আসবে। আমার সঙ্গী হলো আমার বিড়াল এবং আমার আত্মার সঙ্গী হলো আমার কিতাবাদি। আর আমার ভালোবাসার বন্ধু হলো আমার যামিনী-দীপ (বা রাতের বাতি)।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মৌলিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি থাকা পর্যন্ত হতাশ হবেন না

📄 মৌলিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি থাকা পর্যন্ত হতাশ হবেন না


“যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে তা তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি নয়; কিন্তু যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও আমলে সালেহ করে তাদের জন্য তাদের আমলের বিনিময়ে রয়েছে বহু গুণ পুরস্কার এবং তারা (জান্নাতে বহুতল) ভবনে নিরাপদে থাকবে।” (৩৪-সূরা আস সাবা : আয়াত-৩৭)

ডেল কার্নেগী বলেছেন-
"পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকাতে উদ্বিগ্নতা ও মানসিক চাপই এক নম্বর হত্যাকারী। গত বিশ্বযুদ্ধে আমাদের সেনাদের এক মিলিয়নের এক-তৃতীয়াংশ নিহত হয়েছে। একই সময়ে হৃদ-রোগে মারা যায় দুই মিলিয়ন। দ্বিতীয় দলে দুশ্চিন্তা উদ্বিগ্নতা ও মানসিক চাপই এক মিলিয়ন লোকের রোগের মূল কারণ।"

এলেক্সিস কার্লাইল বলতে চান।
"যে সব কাজের লোক মানসিক চাপ দমন করতে জানে না তারা অকালে মারা যায়।"

যে যুক্তির কারণে কার্লাইল একথা বলতে চান তা সঠিক এবং আমাদেরকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে।
“আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ও নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কোনো লোকেরই মৃত্যুবরণ করার সাধ্য নাই।” (৩-সুরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৫)

কৃষ্ণ আমেরিকানরা ও চীনারা খুব কমই হৃদ-রোগের শিকার হয়। তারা সৌম্যতার সাথে ও শান্ত ভাবের সাথে জীবন যাপন করে। পক্ষান্তরে, আপনি দেখতে পাবেন যে, যেসব চিকিৎসকেরা হৃদ-রোগে মারা যায় তাদের সংখ্যা হৃদরোগে মারা যাওয়া কৃষকের সংখ্যার তুলনায় বিশগুণ বেশি। চিকিৎসকেরা এক কঠিন ও চাপ যুক্ত জীবন যাপন করেন- যার কারণে তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হয়।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আপনার যদি একটি অঙ্গহানি হয়ে থাকে তবুও...

📄 আপনার যদি একটি অঙ্গহানি হয়ে থাকে তবুও...


আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন– “আল্লাহ যদি আমার চোখের জ্যোতি দূর করে দেন, তবুও আমার জিহ্বা ও কানে আলো আছে। আমার হৃদয় বুদ্ধিদৃপ্ত আর আমার মন বক্র নয়, আর আমার জিহ্বা বীরযোদ্ধার তরবারীর মতো ধারালো।”

আপনার যদি কোনো ক্ষতি হয় তবে সম্ভবতঃ এরপরের্ই আপনার কোনো লাভ আছে- আর তা এমন লাভ যা আপনি বুঝতে পারেন না।

وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
“এমনও হতে পারে যে তোমরা যা অপছন্দ কর তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২১৬)

বাশার ইবনে বুরদ বলেছেন– “আমার শত্রুরা আমাকে অসম্মান করে অথচ দোষ তাদের মাঝেই। আর এটা এমন কোনো অপমান নয় যাকে দোষণীয় বলা যায়। কোনো লোক যদি সাহস ও সত্যকে দেখতে পায় তবে চোখের অন্ধত্ব প্রতিবন্ধক হবে না। অকস্মাৎ মাঝে আমি পুরস্কার, সঞ্চয় ও রক্ষা দেখতে পাই, আর এ তিনটি জিনিস আমার খুবই দরকার।"

যা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন অথবা যা বাশার বলেছেন তার মাঝে এবং যা সালেহ ইবনে আব্দুল কুদ্দুস অন্ধ হওয়ার পরে বলেছেন তার মাঝে তুলনা করে দেখুন-
"বিদায় পৃথিবী! যে বৃদ্ধ অন্ধ, এ জীবনে তার কোনো অংশই নেই। সে মরে অথচ মানুষ তাকে জীবিত মনে করে। তত্ত্ব থেকেই মিথ্যা আশা তাকে প্রতারিত করেছে।"

সকল স্বর্গীয় বিধানই ঘটবে- যে এটা স্বীকার করে তারও ঘটবে আর যে এসব অস্বীকার করে তারও ঘটবে। পার্থক্য হলো এই যে, যে এটা স্বীকার করে সে পুরস্কার পাবে আর যে এটা অস্বীকার করে সে পাপী হবে ও কষ্ট পাবে। উমার ইবনে আব্দুল আজীজ (রহ) মাইমুন ইবনে মেহরানের নিকট লিখেছেন :
"আব্দুল মালেককে হারানোর কারণে আপনি আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য লিখেছেন। এমন একটা ঘটনার জন্যই আমি অপেক্ষা করতে ছিলাম এবং যখন এমনটা সত্যিই ঘটে গেল তখন আমার আর কোনো সন্দেহেই রইল না।"

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আল্লাহ্র প্রশস্ত জমিনে ভ্রমণ করুন

📄 আল্লাহ্র প্রশস্ত জমিনে ভ্রমণ করুন


একথা সঠিকভাবে বলা হয়েছে যে, ভ্রমণ উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তা বিতাড়িত করে। রামাহরমুষি তার "The Noble Scholar of Hadeeth (الْمُحَدِّثُ الْفَاضِلُ)" নামক কিতাবে ইল্ম তলবের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের উপকারিতার কথা ধারাবাহিক বর্ণনা করেছেন। পৃথিবী ভ্রমণ করে কোনো বোধগম্য উপকারিতা নেই- একথা যারা বলে তিনি তাদের যুক্তি-তর্ক খণ্ডন করতেছিলেন।

তিনি বলেছেন-
"নতুন নতুন ভূমি ও ঘর-বাড়ি দেখে, সুন্দর সুন্দর বাগ-বাগিচা, মাঠ-ঘাট দেখে, ভিন্ন ভিন্ন মুখ দেখে এবং বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের সান্নিধ্যে এসে এবং বিভিন্ন দেশের নানান আশ্চর্য জিনিস প্রত্যক্ষ করে অনেক উপকারিতা লাভ করা যায়। বৃহৎ বৃক্ষের ছায়ায় বসে যে শান্তি পাওয়া যায় তা অনুপম। মসজিদে মসজিদে খানা খাওয়া, ঝর্ণাধারা থেকে পানি পান করা এবং যেখানে রাত সেখানে কাত (অর্থাৎ ঘুমায়ানো)- এসব কিছু ব্যক্তির মনে ধীরে ধীরে অমায়িকতা এবং বিনয় ও নম্রতা সঞ্চারিত করে।

ভ্রমণকারী বা পরিব্রাজক আল্লাহর উদ্দেশ্যে যাদের ভালোবাসে সে তাদেরকে তাঁর বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তোষামোদ করার বা কৃত্রিম হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা তাঁর নেই। এসব উপকারিতার সাথে সেসব সুখকে যোগ করে নিন যেসব সুখ ভ্রমণকারী বা পর্যটক তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার পর তার অন্তরে অনুভব করে এবং সে শিহরণকেও যোগ করে নিন যে শিহরণ সে পথের সব বাধা অতিক্রম করার পর অনুভব করে। যারা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে বের হতে নারাজ তারা যদি এসব কথা জানত তবে তারা বুঝতে পারত যে পৃথিবীর সকল স্বতন্ত্র আনন্দ ভ্রমণের মহান স্মৃতির মাঝেই নিহিত। ভ্রমণকারীর নিকট সুন্দর সুন্দর দৃশ্য ও আল্লাহর প্রশস্ত জমিনে ভ্রমণের অংশ আশ্চর্য সব ক্রিয়াকলাপের চেয়ে অধিক উপভোগ্য আর কিছুই নেই। কিন্তু অপরিভ্রাজক এসব কিছু থেকে বঞ্চিত।"

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية