📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আবদ্ধ গৃহ ছেড়ে পৃথিবীতে ভ্রমণ করুন

📄 আবদ্ধ গৃহ ছেড়ে পৃথিবীতে ভ্রমণ করুন


فَلْيَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ-
“হে মুহাম্মদ ﷺ! বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর।” (৬-সূরা আল আন'আম: আয়াত-১১)

এখানে উল্লেখযোগ্য একটি কাজ আছে। কেননা এটা আপনাকে আনন্দ দান ও আপনার মাথার উপরের কালো মেঘ দূর করা; উভয় কাজই করে। এ কাজটি হল পৃথিবী ভ্রমণ করা ও সৃষ্টির উন্মুক্ত রহস্যাবলি অবলোকন করে দেখা এবং এর সকল বিষয়াবলিকে উপলব্ধি করা। আপনার ভ্রমণকালে আপনি চমৎকার ও সুন্দর সবুজ মাঠের বাগ-বাগিচা দেখতে পাবেন। আপনার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন ও আপনার চারপাশে যা আছে তা নিয়ে একটু ভেবে দেখুন। পাহাড়-পর্বতে আরোহণ করুন, মাঠের পর মাঠ পাড়ি দিন, এ গাছ থেকে ঐ গাছে চড়ুন এবং সুমিষ্ট, বিশুদ্ধ ঝর্ণার পানি পান করুন।

তাহলেই আপনি আপনার আত্মাকে পরমানন্দে গান গেয়ে গেয়ে আকাশে উড়ন্ত চলা পাখির মতোই স্বাধীন পাবেন। আপনার গৃহ ত্যাগ করুন, আপনার চোখের কালো চশমা খুলে ফেলুন। আর তারপর আল্লাহর জিকির ও তসবিহ পাঠ করে করে (আল্লাহর স্মরণ ও পবিত্রতা বর্ণনা করে করে), তাঁর প্রশস্ত জমিনে ভ্রমণ করুন।

মারাত্মক ধ্বংসাত্মক অলসতায় সময় বৃথা নষ্ট করে নিজেকে আপন গৃহে বন্দি করে রেখে নিজেকে ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনার ঘরটাই পৃথিবীতে একমাত্র স্থান নয় আর আপনিও এ পৃথিবীর একমাত্র বাসিন্দা নন। তবে কেন আপনি দুর্দশা ও নির্জনতার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন?

اِنْفِرُوْا خِفَافًا وَّثِقَالًا-
“(স্বাস্থ্যবান, যুবক ও সম্পদশালী হওয়ার কারণে) হাল্কা হলেও এবং (অসুস্থ, বৃদ্ধ ও দরিদ্র হওয়ার কারণে) ভারী হলেও তোমরা বেরিয়ে পড়।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৪১)

আসুন, একটি পাহাড়ি ঝর্ণার পাশে বসে বা পাখিরা যখন গান করে তখন তাদের আসরের পাশে বসে কুরআন তিলাওয়াত করুন।

বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করা এমন এক কাজ যা চিকিৎসকরা বিশেষ করে সেসব রোগীদের জন্য প্রেসক্রিপশন করেন-যারা নিজেদের ঘরের সংকীর্ণতার কারণে নিজেদেরকে সংকুচিত মনে করে।

“যারা আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা করে, (আর বলে,) হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এ বিশ্বজগতকে বৃথা সৃষ্টি করেননি। আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি।” (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৯১)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 গরীব হওয়াতে দুঃখ করবেন না

📄 গরীব হওয়াতে দুঃখ করবেন না


দেহ যতই ভোগ করে আত্মা ততই কলঙ্কিত হয় এবং অল্প থাকার মধ্যে নিরাপত্তা আছে। এ পৃথিবীতে প্রয়োজন মাফিক গ্রহণ করা (বা ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করা) এমন এক আসন্ন শান্তি যা সর্বশক্তিমান, পরম করুণাময় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা দান করেন। “নিশ্চয় পৃথিবী এবং এতে যা কিছু আছে সব কিছুর মালিকানা আমারই।” (১৯-সুরা মারইয়াম : আয়াত-৪০)

একজন কবি বলেছেন-
مَاءٌ وَخُبْزٌ وَظِلٌّ * ذَاكَ النَّعِيْمُ الْأَجَلُ. كُفْرَتْ نِعْمَةُ رَبِّى * إِنْ قُلْتُ إِنِّى مُقِلٌّ.
“পানি, রুটি ও ছায়া এগুলো হলো মহা নেয়ামত। যদি আমি বলি যে, ‘আমি অভাবী’, তবে আমি তো আমার প্রভুর নেয়ামতকে অস্বীকার করি।”

এ দুনিয়াতে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তা হলো শুধু ঠান্ডা পানি, গরম রুটি বা টাটকা খাবার এবং পর্যাপ্ত ছায়া।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 নির্জনতা ও নির্জন বাসের উপকারিতা

📄 নির্জনতা ও নির্জন বাসের উপকারিতা


সঠিকভাবে বুঝে কাজে লাগাতে পারলে নি:সঙ্গতা খুবই উপকারী। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেন-

“ইবাদত, সালাত, দোয়া, জিকির, কুরআন তেলাওয়াত এবং নিজেকে এবং নিজের আমলের মূল্যায়ন করার জন্য ইবাদতগুজার বান্দার মাঝে মাঝে নি:সঙ্গ হওয়া বা নির্জনবাস করা উচিত। প্রার্থনা করতে, গুনাহ মাফ চাইতে, পাপ কাজ হতে দূরে থাকতে ও ইত্যাদি নেক আমল করতেও একাকীত্ব বান্দাকে সাহায্য করে।”

ইমাম ইবনুল জাওজী তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘সাইদুল খাতির’-এর তিনটি অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন : “আমি এমন কিছু দেখিনি বা এমন কোন কিছুর কথা শুনিনি যা নির্জনতার সমান শান্তি, সম্মান ও মর্যাদা এনে দিতে পারে। এটা বান্দাকে পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে, এটা তাঁর সম্মান রক্ষা করে, এবং এটা সময় বাঁচায়। নির্জনতা আপনাকে হিংসুকদের থেকে দূরে রাখবে এবং যারা আপনার বিপদে খুশি হয় তাদের থেকেও আপনাকে দূরে রাখবে। এটা আখেরাতের স্মরণকে বর্ধিত করে এবং এটা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের কথা ভাবায়। নির্জনবাসের সময় বান্দার চিন্তা যা উপকারী এবং যাতে হেকমত বা প্রজ্ঞা আছে তাতে ঘুরে বেড়াতে পারে।”

নির্জনতার পুরো উপকারিতা একমাত্র আল্লাহই জানেন; কেননা, নির্জন বাসে বান্দার মন উন্নত হয়, দৃষ্টভঙ্গি পরিপক্ব হয়, আত্মা শান্তি পায় এবং বান্দা নিজেকে ইবাদতের আদর্শ পরিবেশে দেখতে পায়। মাঝে মাঝে একাকী থেকে বান্দা নিজেকে ফেতনা-ফাসাদ থেকে, যে লোক প্রশংসার যোগ্য নয় তার তোষামোদ করা থেকে এবং হিংসুকের চোখ বা নজর থেকে দূরে রাখতে পারে। এভাবে সে অহংকারীদের উদ্ধত ও বোকাদের পাপ কাজসমূহ থেকে দূরে থাকতে পারে। নি:সঙ্গতায় ভুল-ভ্রান্তি, কাজ-কারবার এবং কথা-বার্তা সব কিছুই একটি পর্দার আড়ালে নি:সঙ্গ হয়ে থাকে।

নি:সঙ্গ সময় যাপনকালে ধ্যান-ধারণা ও মতবাদের সাগরের গভীরে ডুব দেওয়া যায়। এমন সময়ে মন তার মতামত গ্রহণের মতো মুক্ত ও স্বাধীন থাকে। অন্যদের সাহচর্য হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মা পরমানন্দ লাভ করতে এবং উদ্দীপক চিন্তা-ভাবনা তালাশ করতে মুক্তি পায়। একাকী থাকাকালে মানুষ কোন কিছুই দেখানোর জন্য বা জাঁক দেখানোর জন্য অথবা বড়াই করার জন্য করে না; কেননা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে দেখে না এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তাঁর কথা শুনতে পায় না।

প্রতিভাবান, বড় মাথা ওয়ালা (অর্থাৎ মেধাবী) অথবা মানব জাতির প্রতিভার মহান স্বাক্ষর আছে এমন প্রতিটি ব্যক্তিই নির্জনতার কূপের (পানি) দ্বারা তাঁর মহত্বের বীজকে সিক্ত করেছিল। তারপর সে বীজ থেকে চারা গাছ, অবশেষে সে চারা বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।

কাজী জুরয়ানি (রা) বলেছেন-
“গৃহ ও পুস্তকের সঙ্গী হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি। জ্ঞানের চেয়ে বেশি সম্মানজনক আর কিছুই নেই, তাই আমি অন্য কিছুতে সঙ্গী খুঁজি না, আসলে জনগণের সাথে মাখামাখি করলেই মানহানি ঘটে। অতএব তাদেরকে ত্যাগ কর এবং মহত্বভাবে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবন যাপন কর।”

আরেকজন বলেন-
“আমি নি:সঙ্গতার মাঝে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছি এবং পরম আগ্রহের সাথে আমার গৃহেই অবস্থান করেছি। তাই আমার সুখ স্থায়ী হয় এবং আমার সুখ বৃদ্ধি পায়। আমি মানবসত্ত্ব ত্যাগ করেছি এবং আমি ভ্রুক্ষেপ করিনি যে, সেনাবাহিনী আগে বেড়ে গেল না-কি বাদশাহ আমাদেরকে পরিদর্শন করতে এসেছেন।”

আহমদ ইবনে খলীল হাঞ্চলী বলেছেন “যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আশা থেকে মর্যাদা ও শান্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, সে যেন মানুষ থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং অল্পে তুষ্ট থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষতিকর জীবন-যাপন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত, প্রতারকদের মাঝে থেকে প্রতারিত হয়ে, আত্মম্ভরী বা অহংকারীদেরকে তোষামোদ করে, হিংসুকের হিংসার আগুন সহ্য করে, এবং কৃপণ ও বদমেজাজীদেরকে সহ্য করে কীভাবে সে জীবনে আনন্দ পেতে পারে? মানুষ, তাদের নানান পথ ও তাদের বোঝামির সাথে পরিচিত হওয়া ধ্বংসের শামিল!”

ইবনে ফারিস বলেছেন “তারা জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কেমন আছি সে কথা, আর আমি বলেছিলাম, ভালো আছি, তোমাদেরকে ধন্যবাদ; একটি অভাব পূর্ণ হয়েছে আরেকটি অবহেলিত হয়ে আছে, যাতনা যখন এমনই তখন আমার আত্মা সংকুচিত হয়ে যায়, আমি বলি একদিন হয়তো কোনো সাহায্য আসবে। আমার সঙ্গী হলো আমার বিড়াল এবং আমার আত্মার সঙ্গী হলো আমার কিতাবাদি। আর আমার ভালোবাসার বন্ধু হলো আমার যামিনী-দীপ (বা রাতের বাতি)।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মৌলিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি থাকা পর্যন্ত হতাশ হবেন না

📄 মৌলিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি থাকা পর্যন্ত হতাশ হবেন না


“যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে তা তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি নয়; কিন্তু যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও আমলে সালেহ করে তাদের জন্য তাদের আমলের বিনিময়ে রয়েছে বহু গুণ পুরস্কার এবং তারা (জান্নাতে বহুতল) ভবনে নিরাপদে থাকবে।” (৩৪-সূরা আস সাবা : আয়াত-৩৭)

ডেল কার্নেগী বলেছেন-
"পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকাতে উদ্বিগ্নতা ও মানসিক চাপই এক নম্বর হত্যাকারী। গত বিশ্বযুদ্ধে আমাদের সেনাদের এক মিলিয়নের এক-তৃতীয়াংশ নিহত হয়েছে। একই সময়ে হৃদ-রোগে মারা যায় দুই মিলিয়ন। দ্বিতীয় দলে দুশ্চিন্তা উদ্বিগ্নতা ও মানসিক চাপই এক মিলিয়ন লোকের রোগের মূল কারণ।"

এলেক্সিস কার্লাইল বলতে চান।
"যে সব কাজের লোক মানসিক চাপ দমন করতে জানে না তারা অকালে মারা যায়।"

যে যুক্তির কারণে কার্লাইল একথা বলতে চান তা সঠিক এবং আমাদেরকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে।
“আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ও নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কোনো লোকেরই মৃত্যুবরণ করার সাধ্য নাই।” (৩-সুরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৫)

কৃষ্ণ আমেরিকানরা ও চীনারা খুব কমই হৃদ-রোগের শিকার হয়। তারা সৌম্যতার সাথে ও শান্ত ভাবের সাথে জীবন যাপন করে। পক্ষান্তরে, আপনি দেখতে পাবেন যে, যেসব চিকিৎসকেরা হৃদ-রোগে মারা যায় তাদের সংখ্যা হৃদরোগে মারা যাওয়া কৃষকের সংখ্যার তুলনায় বিশগুণ বেশি। চিকিৎসকেরা এক কঠিন ও চাপ যুক্ত জীবন যাপন করেন- যার কারণে তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px