📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলে রহমতের দুয়ার খুলে যায়

📄 আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলে রহমতের দুয়ার খুলে যায়


ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেছেন-
“যখন আমি একটি ধর্মীয় বিষয় বুঝতে পারছিলাম না তখন অবিলম্বে আমি কম-বেশি এক হাজার বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলাম। তখন আল্লাহ আমাকে তা বুঝার তাওফীক (বা ক্ষমতা) দান করলেন।

“আমি ভাই (তাদেরকে) বললাম : “তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহা ক্ষমাশীল। (তাহলে) তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।” (৭০-সূরা আল মা'আরিজ : আয়াত-১০-১১)

মনের ভিতরে শান্তি পাওয়ার একটি পথ হলো সর্বদা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। ঈমানদার যদি কোন পাপ করে পরে অনুতাপ সহকারে তাঁর প্রভুর নিকট তাওবা করে তবে সে পাপই পুণ্য বা সওয়াবে পরিণত হয়।

মুসনাদে আহমদে একটি হাদীস আছে। তাতে বলা হয়েছে— “আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য যাই করেন না কেন তা তার ভালোর জন্য করেন।”

এ হাদীস সম্বন্ধে ইমাম ইবনে তাইমিয়াহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “পাপ কি তার ভালোর জন্য?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, যদি পাপ করার পর তওবা, অনুশোচনা, অনুতাপ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।”

“যখন তারা আপনার নিকট আসল যদিও তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল- ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, তখন তারা আল্লাহকে অবশ্যই পাপ ক্ষমাকারী ও দয়ালু হিসেবে পেল।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৬৪)

وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ -
“এবং দিনসমূহও অনুরূপ (ভালো ও মন্দ); আমি পর্যায়ক্রমে মানুষের মাঝে ওগুলোকে আবর্তন করি।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪০)

“সেদিন তাদের মনে হবে, তারা যেন (পৃথিবীতে) শুধুমাত্র এক সন্ধ্যা বা এক সকাল অবস্থান করেছিল।” (৭৯-সূরা আন নাযি'আত : আয়াত-৪৬)

আমি কতিপয় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে যখন ভাবি তখন আশ্চর্যবোধ করি। যদিও তারা সংকটের মুখে পড়েছেন তবুও তাদের কাছে যে সংকট যেন পানির ফোঁটার মতো স্বাভাবিক মনে হয়েছে। এই অভিজাত সম্প্রদায়ের একবারে পুরোভাগে রয়েছেন সৃষ্টির নেতা মুহাম্মাদ ﷺ।

আবু বকর (রা)-কে সাথে নিয়ে তিনি গুহাতে ছিলেন আর তখন তাঁর শত্রুরা কাছেই ছিল তবুও তিনি (বিচলিত না হয়ে) তাঁর সাথীকে বললেন : “হতাশ হবেন না (বা ভয় করবেন না), নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৪০)

بُشْرَى مِنَ الْغَيْبِ أَلْقَتْ فِي فَمِ النَّارِ وَخَبَا وَأَفْضَتْ إِلَى الدُّنْيَا بِأَسْرَارِ -
“গুহার মুখে গায়েব হতে ওহী আকারে সুসংবাদ এলো এবং সারা জাহানে সুখের ঢল বয়ে গেল।”

বদরের যুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে নবী করীম ﷺ সাগ্রহে তাঁর বর্ম পরিধান করে নিলেন আর তখন বলতে ছিলেন-
سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ.
“এই দলতো অচিরেই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে (পালিয়ে) যাবে।” (৫৪-সূরা আল ক্বামার : আয়াত-৪৫)

ওহুদের যুদ্ধে তাঁর কিছু সাহাবী শহীদ ও কিছু সাহাবী আহত হওয়ার পর নবী করীম ﷺ তাঁর সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন : “তোমরা আমার পিছনে কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়াও যাতে আমি আমার প্রভুর প্রশংসা করতে পারি।”

একজন নবীর প্রতিজ্ঞা ও ইচ্ছা শক্তি এমনই ছিল যা পাহাড়-পর্বতকেও কাঁপিয়ে দিতে পারত।

আরবদের মাঝে কায়েস ইবনে আসিম আলমানক্বারী তাঁর ধৈর্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। একদা তিনি তাঁর কতিপয় সঙ্গীদের নিকট একটি গল্প বলতে ছিলেন। এমন সময় একটি লোক এসে কায়েসকে বলল : অমুকের পুত্র আপনার পুত্রকে হত্যা করে ফেলেছে।” কায়েস তার গল্পকে সংক্ষিপ্ত না করে বরং শান্তভাবে তা বর্ণনা করে শেষ করলেন। তারপর তিনি বললেন, “আমার ছেলেকে গোসল দাও, তাকে কাফনের কাপড় পরাও এবং আমাকে তার জানাযার সালাত পড়তে দাও।”

وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ.
“এবং তারা যারা অভাব-অনটনে, রোগ-শোক-দুঃখ-কষ্ট ও সংকটে এবং যুদ্ধের সময় ধৈর্যশীল।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-১৭৭)

মৃত্যুর সময়ে ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল (রা)-কে পানি পান করতে দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, “অমুক অমুককে পানি দাও।” সেখানে (এক যুদ্ধের ময়দানে) অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত ছিল এবং প্রত্যেকেই এভাবে পানি দেওয়া হয়েছিল এবং প্রত্যেকেই পানি পান না করে বরং অন্যের কথা বলেছিল। আর এরকম আশ্চর্যজনক ভ্রাতৃত্ব দেখিয়ে সকলেই ইন্তেকাল করেছিল।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 কষ্টের মাধ্যমে পাপ ক্ষমা হয়

📄 কষ্টের মাধ্যমে পাপ ক্ষমা হয়


আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন– “দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, বেদনা, ক্লান্তি, অসুস্থতা এমনকি কাঁটা ফোটার দ্বারাও মুমিন ব্যক্তির কিছু গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন।”

এ পুরস্কার শুধু তার জন্যই যে ধৈর্য ধরে, যে তার পুরস্কার শুধু আল্লাহর কাছেই চায়, যে আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত হয় এবং যে একথা বুঝে যে তার সকল কাজ একমাত্র পরম করুণাময় আল্লাহর সাথেই সম্পৃক্ত। বিখ্যাত আরব কবি মুতানাব্বি লিখেছেন।

“যতক্ষণ দেহে আত্মা থাকবে ততক্ষণ কালের আবর্তনে যা ঘটবে তা বিরাগ ভাজন হয়েই গ্রহণ করিও। যা নিয়ে তুমি খুশি থাক তা ক্ষণস্থায়ী। আর দুঃখ বা বিষণ্ণতা তোমার হারানো প্রিয়জনকে ফিরিয়ে এনে দিবে না।”

“যা তোমরা হারিয়েছ তা নিয়ে যাতে তোমরা দুঃখ না কর এবং যা তোমরা পেয়েছ তা নিয়ে তোমরা যাতে আনন্দ-ফুর্তি না কর।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২৩)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 পাপ মার্জনা দু’টি রহস্য

📄 পাপ মার্জনা দু’টি রহস্য


কিছু কিছু বিদ্বজন উল্লেখ করেছেন যে-
১. পাপ থেকে তওবা করার পর আত্ম-গরিমা ও কৃত্রিম ধার্মিকভাব দূরীভূত হয়ে যায়।
২. আল্লাহ্র রহীম (পরম করুণাময়), গফুর (পরম ক্ষমাশীল) ও তাওয়াব (তওবা কবুলকারী) ইত্যাদি নাম ও গুণ তাঁর অন্যান্য নাম ও গুণের তুলনায় পাপ থেকে তওবাকারীর নিকট অধিক অর্থবহ বা কার্যকর বা উপকারী। (অর্থাৎ এসব নামের দোহাই দিয়ে তওবা করলে আল্লাহ পাপ মার্জনা করে দেন।) [অনুবাদবাদক]

(ইংরেজি অনুবাদক অনুরোধ করে বলেন) আপনি এ দু'টি রহস্য জানা সত্ত্বেও যেন পাপ না করেন।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ভাইদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করা

📄 ভাইদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করা


خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَهِلِينَ.
“ক্ষমা কর, সৎ কাজের আদেশ দাও এবং মূর্খদেরকে উপেক্ষা কর।” (অর্থাৎ তাদেরকে শাস্তি দিও না) (৭-সূরা আল আ’রাফ : আয়াত-১৯৯)

আপনার ভাইয়ের দু’একটি ভুলের জন্য তাকে ত্যাগ করা আপনার উচিত নয়; বিশেষ করে, যদি তার বাদ বাকি চরিত্রাবলী প্রশংসনীয় হয়। যেহেতু আমরা জানি, আমাদের যে কোন লোকের পক্ষেই একেবারে নির্ভুল চরিত্রের অধিকারী হওয়া অসম্ভব। আলক্বিশি বলেছেন- “তুমি কিভাবে আশা কর যে তোমার বন্ধু এক বিশেষ চরিত্রের অধিকারী হোক যখন নাকি তোমার নিজের আত্মা-যা নাকি তোমার সবচেয়ে নিকটতম সে-ই তোমার কথা সর্বদা মানে না। তাহলে অন্যের আত্মা তোমার ইচ্ছার অনুসরণ করুক ও আশাও করার কী অধিকার তোমার আছে?”

كذَلِكَ كُنتُم مِّن قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا.
“তোমরা তো পূর্বে এমনই ছিলে, অতপর আল্লাহ্ তোমাদেরকে করুণা করেছেন (তোমাদেরকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করেছেন)।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৯৪)

“অতএব তুমি নিজের পবিত্রতা বর্ণনা করো না। তিনি জানেন কে তোমাদের মধ্যে অধিক মোত্তাকী।” (৫৩-সূরা আন নাজম : আয়াত-৩২)

এটা আপনার জন্য যথেষ্ট যে আপনি আপনার ভাইয়ের চরিত্রের প্রধান অংশের প্রতি সন্তুষ্ট।

আবু দারদা (র) বলেছেন-
مُعَاتَبَةُ الْأَخِ خَيْرٌ مِنْ فَقْدِهِ.
“কোন দোষের কারণে তোমার ভাইকে একেবারে পরিত্যাগ করার চেয়ে তাকে বরং তিরস্কার করা ই ভালো।”

কোন কোন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন- “আমরাই আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট নই, সুতরাং অন্যের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার আশা আমরা কিভাবে করতে পারি?”

একথাও বলা হয়েছে যে, “যে ব্যক্তির কোন ভালো চরিত্র ও বিচক্ষণ বিচার আপনাকে প্রভাবিত করে তার ছোট খাটো এমন কোন কোন ভুলের জন্য তার থেকে দূরে থাকবেন না, যা নাকি শুকর মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত (তার এসব ছোট খাট দোষ ছাড়া ও তার মহাসাগরের মতো বিশাল গুণ আছে। সুতরাং তাকে পরিত্যাগ করা বোকামী –অনুবাদক) আপনি যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন এমন সংস্কৃতি, ভদ্র ও উন্নত একটি লোকও খুঁজে পাবেন না, যা নাকি সকল কলঙ্ক ও পাপ থেকে মুক্ত। নিজের আত্মা সম্বন্ধে তবে দেখুন যে, এটা কত বেশি ভুল করে ও বিচ্যুত হয়। এ ধরনের অন্তর্দর্শন (আত্মদর্শন) অন্যের প্রতি আপনার চাহিদাকে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ করবে এবং আপনাকে পাপীদের প্রতি সহনশীল করে তুলবে।”

একজন আরব কবি বলেছেন-
وَمَن ذَا الَّذِي تُرْضَى سَجَايَاهُ كُلُّهَا ❁ كَفَى الْمَرْءَ نُبْلًا أَن تُعَدَّ مَعَايِبُه.
ভাবার্থ : “এমন কে আছে যে, যার গোটা চরিত্র নিষ্পাপ? যার দোষ গণনা করা যায় (যার দোষ হাতে গোনা ১০টি বা বার দোষ তলের তুলনায় কম।) এটাই তার মহত্ত্বের জন্য যথেষ্ট। (অর্থাৎ গুণের তুলনায় দোষ কম হওয়া ই) তাহার মহত্ত্বের (পরিচয়) জন্য যথেষ্ট।

বলা হয়েছে যে, ভাইয়ের প্রতি সহনশীল যেন বিচক্ষণতাকে ধ্বংস না করে। জা’ফর ইবনে মুহাম্মাদ তার ছেলেকে বলেছেন, “বৎস! তোমার যে ভাই তোমার প্রতি তিনবার রাগ করেছে এবং প্রতিবারই সে তোমার সম্বন্ধে সত্য কথা বলেছে, তাকে তুমি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর।”

হাসান ইবনে ওহাব বলেছেন: “পারস্পরিক ভালোবাসার অর্থ হলো ক্ষমা করা এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অমার্জিতকে উপেক্ষা করা।”

“অতএব তুমি মহান ক্ষমার মাধ্যমে তাদের ভুল-ত্রুটিসমূহকে উপেক্ষা কর।” (১৫-সূরা আন নাজম : আয়াত-৮৫)

ইবনে কুফী বলেছেন:
هُمُ النَّاسُ وَالدُّنْيَا وَلَمْ يُدْمِنْ قَدَى ❁ فَلَمْ يُمْنَغِ الْإِنْصَافِ أَنَّكَ تَبْغِي ❁ الْمُهَذَّبُ فِي الدُّنْيَا وَلَسْتَ الْمُهَذَّبَا.
ভাবার্থ : এ-ই হলো মানুষ ও দুনিয়া, ধূলি-ময়লা লোপ করা অসম্ভব। (ধূলি চোখে যাতনা দেয় ও ময়লা) পানিকে ময়লা করে। দুনিয়াতো তুমি অবিবেচনার মাধ্যমে ভদ্র-সজা মানুষ তালাশ করছ অথচ তুমি নিজেই সংকুত ও উন্নত নও।

وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا.
“তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউ কখনও (পাপ থেকে) পবিত্র হতে পারবে না।” (২৪-সূরা আন নূর: আয়াত-২১)

একজন কবি বলেছেন-
تَرِيدُ مُهَذَّبًا لَا عَيْبَ فِيهِ * وَهَلْ عُودٌ يَفُوحُ بِلَا دُخَانِ.
ভাবার্থ: তুমি নিষ্কলঙ্ক এক সভ্য মানুষ খুঁজছ! কিন্তু মুসকর (ধূপকুমারী) কি ধুঁয়া ছাড়া সুগন্ধি ছড়ায়?

“অতএব নিজেদের পবিত্রতা বর্ণনা করো না, তিনি জানেন কে অধিক মুত্তাকী।” (৫০-সূরা আন নাজ্ম: আয়াত-৩২)

ফন্ট সাইজ
15px
17px