📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 অন্বেষণকারীর পথের নিশানা

📄 অন্বেষণকারীর পথের নিশানা


“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।” (৫৮-সূরা আল মুজাদালা: আয়াত-১১)

১. যে যত বেশি আমলে সালেহ করে সে তত বেশি সতর্ক, ভীত ও মোত্তাকী হয়। এ আশঙ্কায় যে সে ভুল থেকে (নিজেকে) নিরাপদ পা মুক্ত ভাব নাবে, যেমন নাকি কথার ভুল, অন্তরের পরিবর্তন (পাপ চিন্তা)। সে সর্বদা নিজেকে পাহারা দেয় ও সতর্ক থাকে। সে সতর্ক পাখির মতো : যখনই সে গাছের কোন ডালে বসে তখনই সে দক্ষ শিকারী ও তার তলির ভয়ে এটাকে ছেড়ে আরেক ডালে উড়ে চলে যায়।
২. যে যত বেশি বঞ্চক বা বৃদ্ধ হয় এ দুনিয়ায় প্রতি তার তত কম লোভী হওয়া উচিত। কেননা সে নিশ্চয় বুঝতে পারছে যে, তার সময় শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে।
৩. যে যত বেশি সম্পদশালী হয়, তার অন্যের প্রতি তত বেশি বদান্য ও উদার হওয়া উচিত। একজন ধনী মুসলিমের বুঝা উচিত যে, তার সম্পদ তাকে আমানতস্বরূপ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ্ তাকে সে সম্পদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন এ মনোভাব পোষণ করা।
৪. সমাজে যার যত বেশি পদমর্যাদা হয়, জনগণের প্রতি বিনয় প্রদর্শন করে ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করে তার তত বেশি তাদের নিকটবর্তী হওয়া উচিত।

কিছু অবনতির চিহ্নও আছে
১. যে যত বেশি জ্ঞানার্জন করে সে তত বেশি উদ্ধত হয়। এ ধরনের লোকের জ্ঞান কল্যাণকর নয়। তার হৃদয় শূন্য ও তার সঙ্গ দুর্বিষহ।
২. যে যত বেশি কাজের হয়, তত বেশি সে গর্বিত হয় এবং তত বেশি সে অন্যদেরকে অবজ্ঞা করে। সে শুধুমাত্র নিজেকেই সন্দেহের কলাপ (ক্ষতি ও ধ্বংস- অনুবাদক) দান করে। এভাবে সে ভাবে যে, সেই শুধুমাত্র মুক্তি অর্জন করছে। আর অন্যেরা সবাই ধ্বংস হতে বাধ্য।
৩. যে যত বেশি বয়স্ক হয় তত বেশি কৃপণতা ও অর্থ-লিপ্সা তার চরিত্রের অংশ হয়। সে সঞ্চয় করে কিন্তু সে কখনওও বিলি করে না। দুর্ভোগ-দুর্দশাক ইত্যাদি তাকে অন্যদের প্রতি বদান্য হতে নাড়া দিতে ব্যর্থ হয়।
৪. সমাজে তার যত মর্যাদা হয়, তার উদ্ধততার মাত্রাও ততবেশি হয়। নবী করীম ﷺ বলেছেন-
يَحْشُرُ الْمُتَكَبِّرُوْنَ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ فِيْ صُوْرَةِ الذَّرِّ يَرْبَطُهُمُ النَّاسُ بِاَقْدَامِهِمْ
ভাবার্থ: “বিচার দিবসে অহংকারীদেরকে পিঁপড়ার আকারে জমায়েত করা হবে। মানুষেরা তাদেরকে পদদলিত করবে।”

উপরে বর্ণিত প্রতিটি বিষয়ে আমি আল্লাহ্ এমন কিছু কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছি। যা দ্বারা আল্লাহ্ তার বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন, সে সব বান্দাদের কিছু বান্দা পরীক্ষায় পাস করবে অন্যেরা হবে ব্যর্থ।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আশাবাদ

📄 আশাবাদ


ইবনে আবি দুনাইয়ার ‘হুসনূযযুন্ন বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি সুধারণা’ নামক কিতাবে (পুস্তকে) কুরআন-হাদীস থেকে দেড়শতাধিক পাঠ সন্নিবেশিত আছে, যেহেতু ঈমানদারকে অনুরোধ করে আশাবাদী হতে, হতাশাকে ছুঁড়ে ফেলতে এবং কাজের মাধ্যমে কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা করতে এবং একটি আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হলো- নেক আমলের কারণে কল্যাণ পাওয়া যাবে -এ অঙ্গীকার প্রদানকারী আয়াতের সংখ্যা সে সব আয়াতের সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি, যেসব আয়াত পাপকাজ করার কারণে আসন্ন শাস্তির হুমকি দেয়। আর মহান আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য পরিমাণ (তকদীর বা বিধান) তৈরি করেছেন।

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ত্বরিত প্রতিদান

📄 ত্বরিত প্রতিদান


ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) ও আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন যে, মক্কায় থাকাকালে এক আবাদের সকল সম্পদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি চরম ক্ষুধার্ত হয়ে গেলেন ও বাচোঁর অভাবে মরণাপন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। একদিন মক্কার চত্বরে হাঁটতে বেড়ানোর সময় তিনি একটি হার পেলেন। এটাকে তিনি তার আঙ্গিনের ভিতরে রেখে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। পথে একজন মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে যিনি একটি হার হারিয়েছেন। গরীব লোকটি পরে বলেছেন যে, আমি আমার নিকট এর বিবরণ দেওয়ার জন্য তাকে বললাম।

আর তিনি এত নিখুঁতভাবে এর বিবরণ দিলেন যে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ রইল না। আমি তার কাছ থেকে কোনরূপ পুরস্কার গ্রহণ না করে হারটি দিয়ে দিলাম। আমি বললাম : হে আল্লাহ্! আমি এটাকে তোমার কারণে দিয়ে দিয়েছি, অতএব, যা এর চেয়ে উত্তম তা দিয়ে আমাকে প্রতিদান দিন।” এরপর তিনি সাগরে একটি নৌকায় করে যাত্রা শুরু করলেন। অল্প সময় যেতে না যেতেই প্রচন্ড ঝড়ো বায়ুসহ বরফ আর তার (নৌকাটির) ঘূর্ণি শুরু দিল। নৌকাটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল আর লোকটি একটি কাঠের টুকরো ধরে ঝুলে থাকতে বাধ্য হলেন।

প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বাবু তাকে বামে নিয়ে গেলেন। অবশেষে তিনি ভাসতে ভাসতে একটি দ্বীপের তীরে গেলেন। সেখানে লোকজন ভরা একটি মসজিদ পেলেন- লোকেরা সেখানে সালাত পড়ছিল, তাই তিনিও তাদের সাথে সালাতে যোগ দিলেন। তিনি অংশ বিশেষ লিখিত কিছু কাগজ পেলেন ও সেগুলো পড়তে শুরু করলেন। দ্বীপের লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কুরআন পড়েন? তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” তারা বলল, “আমাদের শিশুদেরকে কুরআন শিক্ষা দিন।” তাই তিনি তাদেরকে শিক্ষা দেওয়া শুরু করলেন ও তাঁর কাজের জন্য তিনি একটি ভাতা (বেতন) গ্রহণ করলেন। একদিন তারা তাকে শিখতে দেখল ও জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আমাদের শিশুদেরকে লেখা শেখাবেন? আবারও তিনি “হ্যাঁ” বললেন ও একটি বেতনের বিনিময়ে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া শুরু করলেন।

কিছুদিন পর তারা তাকে বলল, “আমাদের নিকট একটি এতিম বালিকা আছে। তার পিতা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আপনি কি তাকে বিয়ে করবেন?” তিনি বিয়েতে রাজী হলেন। তিনি পরে বর্ণনা করেছেন, আমি তাকে বিয়ে করে যখন বাসর রাতে তার দিকে তাকালাম তখন আমি দেখতে পেলাম যে, সে হুবহু একই হার পরে আছে। আমি তাকে বললাম আমাকে হারের গল্প বলতে। সে বলল যে, তার পিতা এটাকে মক্কায় হারিয়ে ফেলেছিল এবং একটি লোক এটাকে পেয়ে তার নিকট এটাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে বলল যে, তার পিতা সর্বদা সেজদার সময় তার মেয়ের জন্য দু'আ করত সে যেন ঐ লোকের মতো সৎ স্বামী পেয়ে ধন্য হয়। আমি তখন তাকে জানালাম যে আমিই সে লোক ছিলাম।”

তিনি আল্লাহর জন্য কোন কিছু ত্যাগ করেছেন, তাই আল্লাহ্ তাকে এমন জিনিস দিয়ে প্রতিদান দিলেন যা ছিল আরো ভালো।
إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ الْعَامِلِينَ الْبَرَّارِينَ
ভাবার্থ : “নিশ্চয় আল্লাহ্ উত্তম ও পবিত্র এবং তিনি উত্তম ও পবিত্র জিনিস ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ (কবুল) করেন না।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সর্বাপেক্ষা খারাপ ঘটনার দৃশ্য অবলোকনের জন্য প্রস্তুত থাকুন

📄 সর্বাপেক্ষা খারাপ ঘটনার দৃশ্য অবলোকনের জন্য প্রস্তুত থাকুন


আলিয়া মাদ্রাসায় (উচ্চতর বিদ্যালয়ে) আমি টপ গ্রেডস (উচ্চতর মানসমূহ) পাওয়ার জন্য অভাবনীয় প্রতিযোগী হয়ে গেলাম, একটি বিশেষ সাময়িক পরীক্ষায় আমি এতটা পরিশ্রম করেছিলাম যে, আমি ক্লাস সেকেন্ড (দ্বিতীয়) হওয়ার নিচে অন্য কোনো কিছু হওয়ার জন্য আশা করিনি। কিন্তু তা ঘটেছিল বলে আপনি মনে করেন? আমি ইংরেজিতে ফেল করেছিলাম- যেটাকে আমি ভয় করতাম। আমি এর কারণ একেবারে বুঝতে পারলাম না।

আমার মাথার উপর হতাশার কালো মেঘ গেল আর এরপর কয়েক রাত আমার ঘুমাতে কষ্ট হলো। আমার কয়েকজন সহপাঠী আমার ব্যর্থতাতে খুশিও হলো বটে। যা ঘটেছিল তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। পরবর্তী কয়েক দিনের মত আমি বিষণ্ণ ও দুঃখ তারাকায় পড়ে গেলাম। একজন শিক্ষক আমার অবস্থা লক্ষ্য করেছিলেন এবং আমাকে উৎসাহিত করার জন্য ও আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। জীবনের এ সময়ের কথা যখনই আমার মনে পড়ে তখনই একথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়ে যাই যে, কত কৃতঘ্নতা ও বঞ্চনা আমাকে আক্রান্ত করেছিল। যে হতাশায় আমি ভুগছিলাম তা আমাকে একটুও সাহায্য করেনি এবং তা আমার সেই ‘ফেল’ কে ‘পাস’ বানিয়ে দিতে পারেনি। আমি আপনাকে যা বলতে চাই তা হলো: ব্যর্থতার কারণে যদি আপনি হতাশ ও ভগ্নহৃদয় হয়ে যান তবে এ কথা মনে করবেন না যে, হঠাৎ করে আপনি সফলতা অর্জন করতে পারবেন। এমনটা কখনও ঘটবে না। আপনার উপর এ ধরণের ব্যর্থতার একমাত্র প্রভাব হলো যে, এটা আপনাকে আরো বেশি ব্যর্থ করে দিবে। আমি যখন মাস্টার্স কোর্সের থিসিস পুরো করলাম তখন ‘A’ গ্রেড পাওয়ার আশা করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আমার সম্পাদনা ‘A’ গ্রেড পাওয়ার যোগ্য; কিন্তু, অবশেষে আমি শুধুমাত্র ‘B’ গ্রেড পেয়েছিলাম। এ ঘটনা যখন ঘটল তখন আমি বাড়াবাড়ি করলাম এবং আমার গ্রেড নিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়লাম。

আমার এক বুদ্ধিমান বন্ধু আমাকে বললেন, ‘ধর, কোন কারণবশত তুমি তোমার মাস্টার ডিগ্রি কখনও শেষ করতে পারলে না। তখন তুমি কী করবে? তাছাড়া, তুমি যদি মাস্টার ডিগ্রির সময়ও করে তবে ‘A’ অথবা ‘B’ গ্রেডে সত্যিকার তেমন কি-ই-বা পার্থক্য আছে?” সে যা বলেছিল তা ছিল জাজ্বল্যমান সত্য আর এতে আমার বোধোদয় হয়েছিল। এখন আমি বুঝি যে, এরূপ অবস্থার মোকাবিলায় উত্তম পন্থা হলো – সম্ভাব্য সর্বাপেক্ষা খারাপ ফলাফলের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা। এ অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি উত্তম শিক্ষা গ্রহণ করলাম। যখন আমার ডাক্তার কোর্সের থিসিস জমা দেয়ার সময় হলো তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগ থিসিস জমা দেওয়ার তারিখকে অনেক পিছিয়ে দিল। আমার থিসিস ইতোমধ্যেই উত্তমরূপে সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু আমি সব কিছুর জন্যেই প্রস্তুত ছিলাম তাই তাদের বিলম্ব আমার উপর বড় ধরনের কোন প্রভাব ফেলেনি। যে ব্যক্তি তার ব্যবসায় দেউলিয়া হয়ে যাবার জন্য মানসিকতাকে প্রস্তুত আছে সে ব্যক্তি আংশিক লোকসানের কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px