📄 আশাবাদ বনাম সন্দেহবাদ
"এটা মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তাদের আনন্দ করে। কিন্তু যাদের অন্তরে রোগ আছে এটা তাদের কলুষতার সাথে আরও কলুষতা যোগ করে এবং তারা তাদের অন্যায় দ্বারা মারা যায়।" (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-১২৪, ১২৫) (এখানে কলুষতা বলতে সন্দেহ, কুফরি ও মুনাফেক্বী বুঝায়।)
আগেকার ধার্মিক মুসলমানগণ কোন জটিল-কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলে আশাপ্রদ মনোভাব নিয়ে থাকতেন। এর হিসেবে আশাপ্রদ মনোভাব নিয়ে থাকতেন যে, তারা জানতেন যদিও তারা সংকটের মোকাবেলা করতেন তবুও তাদের কিছু সুবিধা পাওয়ার কথা, কিছু ক্ষতি দূর হওয়ার কথা এবং কালের আবর্তে (কালক্রমে) তাদের শান্তি, স্বস্তি ও আরামের সাক্ষাৎ পাওয়ার ছিল (এবং তা পেয়েছিলেনও বটে)।
"সম্ভবত তোমরা এমন জিনিস অপছন্দ কর, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং সম্ভবত তোমরা এমন জিনিস পছন্দ কর, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর।" (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২১৬)
আবু দারদা (রা) বলেছেন, "আমি এমন তিনটি জিনিসকে ভালোবাসি, যা মানুষেরা অপছন্দ করে; আমি দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও মৃত্যুকে ভালোবাসি। কেননা, দারিদ্র্যতা হলো বিনয় এর কারণ, অসুস্থতা হলো পাপের প্রায়শ্চিত্ত (গোনাহ মাফের কারণ) এবং মৃত্যু হলো আল্লাহর সাক্ষাৎ এর কারণ।"
কিছু কিছু আরব কবি দারিদ্র্যতাকে চরম ঘৃণা করত, যা নিচের কবিতার পংক্তি হতে বুঝা যায় যেখানে কবি দাবি করছেন যে এমনকি কুকুররাও দারিদ্র্যদেরকে ঘৃণা করে-
﴿إِذَا رَأَتْ فَقِيرًا مُعْدَمًا ٭ مَرَّتْ عَلَيْهِ وَكَشَّرَتْ أَنْيَابَهَا.﴾
ভাবার্থ : "এটা (কুকুর) কোনদিন কোন দরিদ্র ও নিঃস্ব লোককে দেখলে ডনডন গর্জন, ঘড়ঘড় ও খেউ খেউ করে এবং শিকারী দাঁত বের করে করে মুখ ভেংচায়।"
নবী ইউসুফ (আ) জেলখানায় বন্দী হওয়া সম্পর্কে বলেছিলেন : "হে আমার প্রভু! তারা আমাকে যে দিকে ডাকে তার চেয়ে আমার নিকট জেলখানাই অধিক পছন্দনীয়।" (১২-সূরা ইউসুফ : আয়াত-৩৩)
অনেক ধার্মিকরাই মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছেন। মুয়াজ (রা) বলেছেন : "মৃত্যুকে অভিবাদন- এটা এমনাই প্রিয় যেটা (বহু মানুষের) প্রয়োজনের সময়ে এসেছে। এবং যে ব্যক্তি তার জীবনের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয় (তওবা করে) সে সফলকাম।"
যদিও অন্যরা মৃত্যু থেকে পালানো চেষ্টা করে এবং এরপর আপনাকে অভিশাপ ও গালি দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইহুদীরা জীবনের জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি লোভী। মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন-
﴿قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ ٭ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ.﴾
"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে।" (৬২-সূরা আল জুমুআ : আয়াত-৮)
আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ধার্মিকদের (কাঙ্ক্ষিত) স্বপ্ন এবং আনন্দদায়ক আকাঙ্ক্ষা।
"কেউ কেউ তাদের ব্রতপূর্ণ করেছে (অর্থাৎ শাহাদাতও বরণ করেছে)। আর কেউ কেউ শাহাদাতের অপেক্ষায় আছে।" (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-২৩)
বস্তুতপক্ষে, অন্যারা (অনেকেই) মৃত্যুকে অপছন্দ করেছে এবং মৃত্যু থেকে পালাতে চেষ্টা করেছে। এক মরুবাসী আরব বলেছে- "আল্লাহর কসম, আমি আমার বিছানায় যেয়ে মরতেও অপছন্দ করি। অতএব কিভাবে আশা করা যেতে পারে যে, আগের কাতারে যেয়ে আমি মৃত্যুকে খুঁজে বের করতে পারি?"
"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তোমাদেরকে মৃত্যুকে হটিয়ে দাও।" (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৬৮)
"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে তবুও তোমাদের জন্য মৃত্যুকে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল, তারা অবশ্যই (তাদের ঘর থেকে) বের হয়ে তাদের মৃত্যুস্থলে আসত (বা যেত)।" (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫৪)
ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঘটনা একটাই (আর তা হলো) : কর্মীরাই (অবস্থার কাঙ্ক্ষিত) পরিবর্তন ঘটায়।
📄 ছদ্মবেশে কল্যাণ
“এবং আমি অবশ্যই তোমাদের আশে পাশের জনপদসমূহ ধ্বংস করেছিলাম।” (৪৬-সূরা আল আহকাফ : আয়াত-২৭)
বারমাক পরিবারে বেদনাদায়ক উদাহরণ রয়ে গেছে। এ পরিবার সমৃদ্ধ, আরামের ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল জীবনযাপন করত। যাহোক, তাদের ধ্বংস তাদের পরবর্তী সকল আরবদের জন্য শিক্ষা ও উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে। তাদের সময়কার শাসক বাদশা হারুনুর রশীদ বারমাক পরিবার ও তাদের সম্পত্তির ওপর এক অপ্রত্যাশিত আক্রমণের হুকুম জারি করেন। তাদের নিকটতম ব্যক্তিরা হাসতে কোন এক সকাল বেলা তাদের উপর আল্লাহর বিধান জারি হয়ে গেল। তিনি তাদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে দিলেন, তাদের চাকর-চাকরদের অধিকার (দখল) করে নিলেন এবং তাদের রক্তপাত ঘটালেন। তাদের প্রিয়জনরা ও সন্তানরা তাদের অপমানে কান্নাকাটি করল। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই। যারা গল্পটি জানেন তাদের এ দুনিয়ার ক্ষমতার ও সম্পদের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতিকে বিশেষভাবে অনুধাবন করা উচিত।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
“অতএব হে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (৫৯-সূরা আল হাশর : আয়াত-২)
তাদের খেল-তামাশার জিন্দেগীতে তারা বড়াই করে চলেছিল। যাহোক, তাদের জন্য এটা দুঃখজনক যে তারা মরীচিকাকে পানি বলে ভুল করেছিল এবং চিরস্থায়ী জীবনের বদলে তারা ইহকালীন জীবনকে বরণ করেছিল। তারা ভুল ভেবেছিল যে, তাদের ওপর ন্যায়বিচার বর্তাবে না এবং অত্যাচারীদের পক্ষে প্রমাণ, ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের ব্যবস্থা করা হবে না।
وَّظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ
“আর তারা ভেবেছিল যে আমাদেরকে আমার নিকটে ফিরিয়ে আনা হবে না।” (২৮-সূরা আল কাসাস : আয়াত-৩৫)
সেদিন প্রাতে তো তারা আনন্দপূর্বভাবেই জেগে উঠেছিল। কিন্তু রাত গড়াতে গড়াতে তারা তাদের কবরে চলে গিয়েছিল। এক রাতের মুহূর্তে ও খেয়ালের বশে বাদশা হারুনুর রশীদ তাদের ওপর তার ক্ষোভের তরবারী উন্মুক্ত করেছিলেন এবং জা’ফর ইবনে ইয়াহইয়া বারমাকিকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করে তার মৃতদেহকে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার পিতা ইয়াহইয়াকে ও ভাই ফজলকে কারাগারে বন্দী করেছিলেন। তাদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তাদের দুর্দশা নিয়ে অনেক আরব কবি শোকগাথা রচনা করেছেন। একজন আরব কবি বলেছেন-
“আমি যখন জাফরের দেহে তরবারী বিষক্ষয় দেখলাম, আর ইয়াহইয়ার বংশীয় সংবাদ যখন একজন ধোঁকাবাজ বাদশার নিকট ঘোষণা করতে শুনলাম। তখন আমি এ দুনিয়ার জন্য বিলাপ করলাম ও সত্যসত্যই বিশ্বাস করলাম যে নিকট দিগন্তে এমন একটি দিন আছে যেদিন এ পৃথিবী থেকে একটি বালক বিদায় নিবে, এক রাজা আরেক রাজাকে ও এক দেশ আরেক দেশকে উচ্ছেদ করবে মাত্র।
নাজ নেয়ামত ভোগের পরের দুঃখ-দুর্দশা ঘটনা ঘটে, একজন যদি সুউচ্চ রাজপ্রাসাদে বাস করে, তবে আরেকজন দুঃখ-দুর্দশার সর্বনিম্ন গভীরতম প্রদেশে ডুবে থাকে।
কিন্তু এখন হারুনুর রশীদ কোথায় আর বারমাক পরিবারই বা কোথায়? কোথায় হত্যাকারী আর কোথায় বা নিহত ব্যক্তি?
নিজের প্রাসাদে বিছানায় শুয়ে শুয়ে যিনি হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন তিনি কোথায়? আর যাকে শূলে চড়ানো হয়েছিল তিনিই বা কোথায়? অতীত ও অতীতের কর্মীরা উভয়েই অতীত হয়ে গেছে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা ন্যায়বিচারক তাদের মাঝে এমন একদিন ন্যায়বিচার করবেন। যেদিন সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই, যে দিনটি এমন একদিন, যেদিন কোন অন্যায়-অবিচার বিচার হবে না।
“ওটার জ্ঞান আমার প্রভুর নিকট নবিপত্রে লিপিবদ্ধ আছে; আমার প্রভু ভুল করেন না এবং তিনি ভুলে ও যান না।” (২০-সুরা ত্বাহা : আয়াত-৫২)
“সেদিন সকল মানুষ সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে (হিসাব-নিকাশ দেওয়ার জন্য) দাঁড়াবে।” (৬০-সুরা আল মুতাফ্ফিক্বীন : আয়াত-৬)
“সেদিন তোমাদেরকে (বিচারের জন্য) হাজির করা হবে, তোমাদের কোন কিছুই গোপন থাকবে না।” (৬৯-সুরা আল হাক্কাহ : আয়াত-১৮)
ইয়াহইয়া ইবনে বাদেদ বারমাকিয়াকে এই মুসিবতের কারণ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনি কি এর কারণ জানেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “সম্ভবত আমরা কোন লোকের উপর অত্যাচার করেছিলাম এটা তার ফরিয়াদ যা রাতারাতি তাদের অভ্যাসারের (আসল জায়গায়) পৌঁছে গিয়েছিল।”
আব্দুল্লাহ ইবনে মুয়াফিয়া ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর জলহাওয়ার থেকে তার বাণী হওয়া সম্বন্ধে বলেছেন:
“আমরা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, অথচ এখনও আমরা দুনিয়ার অধিবাসী।”
আমরা না মৃত, না জীবিত; কোন না কোন কারণে যদি কারারুদ্ধি ভিতরে আসে, আমরা বিস্মিত হয়ে বলি; এ কোন পৃথিবী থেকে এসেছে। কোন স্বপ্ন দেখলে আমরা অতি আনন্দিত হই কেননা, যখন আমরা জেগে উঠি তখন আমাদের অধিকাংশ আলাপই আমরা যে স্বপ্ন দেখেছি তা নিয়ে হয়।
তা যদি ভালো স্বপ্ন হয় তবে তা খুবই ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হয়। আর যদি তা দুঃস্বপ্ন হয় তবে তা অপেক্ষা না করে দ্রুত এসে পড়ে।
শেষের দু’লাইনে অনেকটা নৈরাশ্য ও হতাশা আছে; এ সম্বন্ধে আমার জাহিরের কথা মনে পড়ে গেল।
“ডাক পিয়ন যখন আমাদের নিকট মন্দ ঘটনার সংবাদ নিয়ে আসে তখন সে সময় নষ্ট না করে দ্রুত এসে পড়ে। এভাবে ঘটনা মন্দ হলে একদিন এক বক্তি পরেই তা এসে পড়ে, আর ঘটনা ভালো হলে সময় নিয়ে এক সপ্তাহ পরেই আসে।”
সমৃদ্ধি ও অপচয়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছার পর আন্দালুসের সুলতান ইবনে আব্বাদ (বাদশা) সংকটের সম্মুখীন হলো। যখন চপলতা, বাধ্যবাধ ও নর্তকী তার রাজপ্রাসাদ প্রবল আকার ধারণ করল তখন রোমকগণ তাকে আক্রমণ করে বসল আর তাই সে মরক্কোর সুলতান ইবনে তাশকীনদের নিকট সাহায্য চাইল। ইবনে তাশকীন তার সেনাবাহিনী নিয়ে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইবনে আব্বাদকে বিজয় এনে দিল। কিন্তু ইবনে তাশকীন আব্বাদকে সিংহের মত শিকারী দৃষ্টিকোণ মনোভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল। এবং তার অন্যান্য মতলব ছিল।
মাত্র তিনদিন পরেই ইবনে তাশকীন ও তার সেনাবাহিনী আন্দালুসের দুর্বল রাজাকে আক্রমণ করে বসল। ইবনে আব্বাদকে বন্দী করে তার সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করা হলো। তার প্রাসাদ ও বাগানকে ধ্বংস করে দিয়ে তাকে তার জন্মভূমি আগমাত প্রদেশে বন্দী হিসেবে চালান করা হলো।
“আর দিনসমূহ তো এমনই (ভালোবাসা বা মন্দ), এগুলোকে আমি মানুষের মাঝে পালাক্রমে দিই।” (৩-সুরা আল ইমরান : আয়াত-১৪০)
আন্দালুসের রাজত্ব ইবনে তাশকীনদের হাতে এসে পড়ল। তিনি দাবি করলেন যে, (আন্দালুসের) নেতৃত্ব ন্যায়সঙ্গতভাবেই তার। কারণ আন্দালুসের জনপথই প্রথমে তাকে মরক্কো থেকে তার কাছে এনেছে।
দীর্ঘদিন পরে একদিন ইবনে আব্বাদের মেয়েরা তাকে জেলখানায় এসে দেখার সুযোগ পেল। তারা নগ্নপদে, ক্ষুধার্ত অবস্থায়, শীর্ণ দেহে ও অশ্রুসজল নয়নে (তাকে দেখতে) আসল। ইবনে আব্বাদ যখন তার মেয়েদের এ করুণ অবস্থা দেখল, তখন আর্তনাদ করে উঠল।
“আমার অতীত জীবন এনে আমি বিশেষ ঘনঘটা করে আমোদ করতাম, কিন্তু আগমাতে বন্দি অবস্থায় এ কী শোচনীয় ঘটনা!
তুমি তোমার মেয়েদেরকে শীর্ণ ও ক্ষুধার্ত দেখছ, তারা মানুষের সূতা কেটে দেয় আর তাদের কিছুই নেই। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত ও দুর্বল অবস্থায়, বিষণ্ণ নয়নে ও জীর্ণ হৃদয়ে, নগ্নপায়ে কাদা মাড়িয়ে তোমাকে দেখতে এসেছে, যেন তারা কচ্ছ দাসী সুগন্ধি ও গোলাপ মাড়ানি।”
“অতএব যখন আমার আদেশ এলো তখন আমি (সমকামপ্রবণ নগরীসমূহকে) উল্টিয়ে দিলাম।” (১১-সুরা হুদ : আয়াত-৮২)
“দুনিয়ার উদাহরণ তো এরূপ যেমন নাকি আকাশ থেকে আমি পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করি, তা দিয়ে ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে জন্মায়, যা মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তু খায়। এমনকি যখন ভূমি সুশোভিত হয় ও নয়নাভিরাম হয় তখন এর মালিকেরা মনে করে যে, তারা এগুলোর উপর ক্ষমতাবান (বা এগুলো তাদের আয়ত্তাধীন), এমন সময় কোন এক রাতে বা দিনে আমার নির্দেশ এসে পড়ে তখন আমি সেগুলোকে নির্মূল করে দিই যেন ওগুলোর অস্তিত্বও গতকালও ছিল না। এভাবেই আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য আমার নিদর্শনাবলিকে বিশদভাবে বর্ণনা করি।” (১০-সুরা ইউনুস : আয়াত-২৪)
📄 অন্বেষণকারীর পথের নিশানা
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।” (৫৮-সূরা আল মুজাদালা: আয়াত-১১)
১. যে যত বেশি আমলে সালেহ করে সে তত বেশি সতর্ক, ভীত ও মোত্তাকী হয়। এ আশঙ্কায় যে সে ভুল থেকে (নিজেকে) নিরাপদ পা মুক্ত ভাব নাবে, যেমন নাকি কথার ভুল, অন্তরের পরিবর্তন (পাপ চিন্তা)। সে সর্বদা নিজেকে পাহারা দেয় ও সতর্ক থাকে। সে সতর্ক পাখির মতো : যখনই সে গাছের কোন ডালে বসে তখনই সে দক্ষ শিকারী ও তার তলির ভয়ে এটাকে ছেড়ে আরেক ডালে উড়ে চলে যায়।
২. যে যত বেশি বঞ্চক বা বৃদ্ধ হয় এ দুনিয়ায় প্রতি তার তত কম লোভী হওয়া উচিত। কেননা সে নিশ্চয় বুঝতে পারছে যে, তার সময় শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে।
৩. যে যত বেশি সম্পদশালী হয়, তার অন্যের প্রতি তত বেশি বদান্য ও উদার হওয়া উচিত। একজন ধনী মুসলিমের বুঝা উচিত যে, তার সম্পদ তাকে আমানতস্বরূপ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ্ তাকে সে সম্পদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন এ মনোভাব পোষণ করা।
৪. সমাজে যার যত বেশি পদমর্যাদা হয়, জনগণের প্রতি বিনয় প্রদর্শন করে ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করে তার তত বেশি তাদের নিকটবর্তী হওয়া উচিত।
কিছু অবনতির চিহ্নও আছে
১. যে যত বেশি জ্ঞানার্জন করে সে তত বেশি উদ্ধত হয়। এ ধরনের লোকের জ্ঞান কল্যাণকর নয়। তার হৃদয় শূন্য ও তার সঙ্গ দুর্বিষহ।
২. যে যত বেশি কাজের হয়, তত বেশি সে গর্বিত হয় এবং তত বেশি সে অন্যদেরকে অবজ্ঞা করে। সে শুধুমাত্র নিজেকেই সন্দেহের কলাপ (ক্ষতি ও ধ্বংস- অনুবাদক) দান করে। এভাবে সে ভাবে যে, সেই শুধুমাত্র মুক্তি অর্জন করছে। আর অন্যেরা সবাই ধ্বংস হতে বাধ্য।
৩. যে যত বেশি বয়স্ক হয় তত বেশি কৃপণতা ও অর্থ-লিপ্সা তার চরিত্রের অংশ হয়। সে সঞ্চয় করে কিন্তু সে কখনওও বিলি করে না। দুর্ভোগ-দুর্দশাক ইত্যাদি তাকে অন্যদের প্রতি বদান্য হতে নাড়া দিতে ব্যর্থ হয়।
৪. সমাজে তার যত মর্যাদা হয়, তার উদ্ধততার মাত্রাও ততবেশি হয়। নবী করীম ﷺ বলেছেন-
يَحْشُرُ الْمُتَكَبِّرُوْنَ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ فِيْ صُوْرَةِ الذَّرِّ يَرْبَطُهُمُ النَّاسُ بِاَقْدَامِهِمْ
ভাবার্থ: “বিচার দিবসে অহংকারীদেরকে পিঁপড়ার আকারে জমায়েত করা হবে। মানুষেরা তাদেরকে পদদলিত করবে।”
উপরে বর্ণিত প্রতিটি বিষয়ে আমি আল্লাহ্ এমন কিছু কল্যাণের কথা উল্লেখ করেছি। যা দ্বারা আল্লাহ্ তার বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন, সে সব বান্দাদের কিছু বান্দা পরীক্ষায় পাস করবে অন্যেরা হবে ব্যর্থ।
📄 আশাবাদ
ইবনে আবি দুনাইয়ার ‘হুসনূযযুন্ন বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি সুধারণা’ নামক কিতাবে (পুস্তকে) কুরআন-হাদীস থেকে দেড়শতাধিক পাঠ সন্নিবেশিত আছে, যেহেতু ঈমানদারকে অনুরোধ করে আশাবাদী হতে, হতাশাকে ছুঁড়ে ফেলতে এবং কাজের মাধ্যমে কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টা করতে এবং একটি আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হলো- নেক আমলের কারণে কল্যাণ পাওয়া যাবে -এ অঙ্গীকার প্রদানকারী আয়াতের সংখ্যা সে সব আয়াতের সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি, যেসব আয়াত পাপকাজ করার কারণে আসন্ন শাস্তির হুমকি দেয়। আর মহান আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য পরিমাণ (তকদীর বা বিধান) তৈরি করেছেন।