📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সান্ত্বনার দু’টি মহান বাণী

📄 সান্ত্বনার দু’টি মহান বাণী


ইমাম আহমদ (র)-কে যখন কঠিন সময়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল ও অত্যাচার করা হচ্ছিল তখন তাকে দু’টি কথা বলা হয়েছিল যা তিনি বর্ণনা করেছেন। মদ পান করার কারণে এক লোককে জেলখানায় বন্দী করা হয়েছিল। যখন সে ইমাম আহমদ (র)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিল তখন সে তাঁকে বলেছিল– "হে আহমদ, দৃঢ় চিত্ত হয়ে থাকুন, কেননা আপনি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে চাবুকের বাড়ি খাবেন। আর আমি মদ পান করার কারণে বহুবার চাবুকের বাড়ি খেয়েছি অথচ ধৈর্য ধরেছি।"
(অর্থাৎ আমি অন্যায়ের কারণে শাস্তি পেয়েও ধৈর্য ধরেছি; সুতরাং ন্যায়ের কারণে আপনি শাস্তি পেলে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করবেন - অনুবাদক।)
আর এটিই সে দু’টি কথার প্রথমটি।

فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ
"অতএব ধৈর্য ধারণ করুন, নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি সত্য। আর যারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না, তারা যেন আপনাকে বিচলিত না করে।" (৩০-সূরা আর রুম: আয়াত-৬০)

"যদি তোমরা যন্ত্রণা ভোগ কর তবে তারাও তো তোমাদের মত যন্ত্রণা ভোগ করে অথচ তারা যা আশা করতে পারে না তোমরা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তা (পুরস্কার তথা জান্নাত) আশা করতে পার।" (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-১০৪)

আর দ্বিতীয় বাণীটি হলো- যখন ইমাম আহমদ (র)-কে শিকল পরিয়ে জেলখানায় আনা হচ্ছিল তখন একজন বেদুইন তাকে দেখে বলেছিল– “হে আহমদ! ধৈর্য ধরুন কেননা, এ দুর্ঘটনায় যদি আপনার মৃত্যু হয় তবে এ ঘটনার কারণেই আপনি জান্নাতে যাবেন।”

“তাদেরকে তাদের প্রভু নিজের পক্ষ থেকে একটি করুণা, সন্তুষ্টি ও তাদের জন্য অনেক জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন যেখানে (তাদের জন্য) রয়েছে চিরস্থায়ী সুখ শান্তি।” (৯-সূরা আনফাল: আয়াত-২৬)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 দুঃখ-কষ্টের কিছু উপকারিতা

📄 দুঃখ-কষ্টের কিছু উপকারিতা


কষ্টের কারণে মানুষ বিনীতভাবে তার প্রভুর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়। কেউ একবার বলেছিলেন, “আল্লাহ্ই কষ্ট দেন ও তিনিই (বান্দাকে) কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে দোয়া করান।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তার কোনো বান্দাকে কোন এক বিষয়ে পরীক্ষা করে ফেরেশতাদেরকে বললেন, “তার কথা (দোয়া, প্রার্থনা, আবেদন) শোনার জন্য এ পরীক্ষা ছিল” অভাব-অনটন ও সংকটের কারণে মনে নম্রতা আসে (আর বিনীত-নম্রতাকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন। –অনুবাদক)।

كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنَى
“বরং মানুষ নিশ্চয় সীমালঙ্ঘন করে, কেননা, সে নিজেকে অভাবমুক্ত দেখে বা স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।” (৯৬-সূরা আল আলাক্ব: আয়াত-৬-৭)

দুর্দশাগ্রস্ত লোকেদেরকে মানুষেরা সান্ত্বনা দেয় এবং তার বা তাদের জন্য দোয়া করে। এভাবে সংকটের সময় মুমিনরা ভ্রাতৃত্ববোধে দুর্দশাগ্রস্ত লোকের পাশে এসে দাঁড়ায়। একটি মুসিবত বহু আরেকটিকে মুসিবত থেকে রক্ষা করে বিধায় মুসিবতও লোকের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। অধিকন্তু (এ ছাড়া) বিপদাপদের কারণে অনেক পাপ মোচন হয়। যখন আল্লাহ্র কোন বান্দা এ বিষয় (কথা)গুলো বুঝতে পারবে তখন সে কৃতজ্ঞ হয়।

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“কেবলমাত্র ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের পুরস্কার পূর্ণমাত্রায় বেহিসাবে দেওয়া হবে।” (৩৯-সূরা আয় যুমার: আয়াত-১০)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আশাপ্রদ মনোভাবের গুরুত্ব

📄 আশাপ্রদ মনোভাবের গুরুত্ব


একজন লেখক যথার্থই বলেছিলেন, “আশা মানুষকে নিশ্চয় ধৈর্য ধরতে সাহায্য করে এবং ধৈর্যের পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ্ও সবরকম সুধারণা থেকেই আশার সঞ্চার হয়। আল্লাহ্র নিকট আশা ব্যর্থতার সম্ভাবনাকে প্রতিহত করে। কিন্তু কেন আমাদেরকে এভাবে হতাশ হতে হবে যে– আশা ব্যর্থতার সম্ভাবনাকে বাধা দেয়? আবার যদি মহামানবদের চরিত্র নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করতাম তবে আমরা দেখতাম যে- যারা সাহায্যের জন্য তাদের শরণাপন্ন হতে তাদের কথা খুব ভালো ভাবে ভাবত, তারা তাদের বিশেষ যত্ন নিত। যারা তাদেরও মহৎ কামনা করত তারা তাদের অভিপ্রায়ে চলার প্রবণতাও দেখাত। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- যারা সাহায্যের জন্য তাদেরকে নির্বাচন করত তারা তাদেরকে আশাহত করত না। (সাহায্য প্রার্থীদেরকে তারা সাহায্য না দিয়ে ফিরিয়ে দিত না বরং তারা তাদেরকে সাহায্য করত। –অনুবাদক) (এই যদি মানুষের অবস্থা হয়) তাহলে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালুর অবস্থা কেমন, যার রাজ্য সামান্যতমও কমে না যখন কোন আশাবাদী প্রথম তাঁর নিকট আশা করে তখন তিনি তাকে তাঁর আশার চেয়েও বেশি দান দেবেন।”

একলোক জটিল-কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তির কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি (অবশেষে আল্লাহ্র সাহায্য পাওয়ার পর) আল্লাহ্র এক বান্দার প্রতি (তার নিজের প্রতি অর্থাৎ 'এক বান্দা' বর্ণনাকারী নিজেই) তাঁর (আল্লাহ্র) সর্বাপেক্ষা মর্মভেদী উদারতা, বাধ্যতা ও পথ-নির্দেশ প্রদর্শনের বর্ণনা দেন। সাহায্যের জন্য তিনি যাদের কাছে গিয়েছিলেন তাদের সকলের নিকট তাঁর সব আশা হারানোর পর তিনি ভাবতে বাধ্য হলেন যে, একটি দরজা খোলা আছে এবং একমাত্র মহান আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে আশা করা উচিত নয়। তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, প্রথমত আল্লাহ্র নিকট আশা না করার কারণে তাকে সংশোধন করার জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং তখনই (আল্লাহ্র পক্ষ থেকে) সাহায্য ও শান্তি আসল।

“নিশ্চয় আল্লাহ্কে ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহ্বান কর, তারা তোমাদের মতই (আল্লাহ্র) বান্দা। অতএব, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তারা যাতে তোমাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এজন্য তাদেরকে আহ্বান করে দেখ (তারা সাড়া দেয় কি-না) (যদি আহ্বান কর তবে দেখবে যে তারা সাড়া দিতে পারে না)।” (৭-সুরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৯৪)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আশাবাদ বনাম সন্দেহবাদ

📄 আশাবাদ বনাম সন্দেহবাদ


"এটা মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তাদের আনন্দ করে। কিন্তু যাদের অন্তরে রোগ আছে এটা তাদের কলুষতার সাথে আরও কলুষতা যোগ করে এবং তারা তাদের অন্যায় দ্বারা মারা যায়।" (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-১২৪, ১২৫) (এখানে কলুষতা বলতে সন্দেহ, কুফরি ও মুনাফেক্বী বুঝায়।)

আগেকার ধার্মিক মুসলমানগণ কোন জটিল-কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলে আশাপ্রদ মনোভাব নিয়ে থাকতেন। এর হিসেবে আশাপ্রদ মনোভাব নিয়ে থাকতেন যে, তারা জানতেন যদিও তারা সংকটের মোকাবেলা করতেন তবুও তাদের কিছু সুবিধা পাওয়ার কথা, কিছু ক্ষতি দূর হওয়ার কথা এবং কালের আবর্তে (কালক্রমে) তাদের শান্তি, স্বস্তি ও আরামের সাক্ষাৎ পাওয়ার ছিল (এবং তা পেয়েছিলেনও বটে)।

"সম্ভবত তোমরা এমন জিনিস অপছন্দ কর, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং সম্ভবত তোমরা এমন জিনিস পছন্দ কর, যা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর।" (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-২১৬)

আবু দারদা (রা) বলেছেন, "আমি এমন তিনটি জিনিসকে ভালোবাসি, যা মানুষেরা অপছন্দ করে; আমি দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও মৃত্যুকে ভালোবাসি। কেননা, দারিদ্র্যতা হলো বিনয় এর কারণ, অসুস্থতা হলো পাপের প্রায়শ্চিত্ত (গোনাহ মাফের কারণ) এবং মৃত্যু হলো আল্লাহর সাক্ষাৎ এর কারণ।"

কিছু কিছু আরব কবি দারিদ্র্যতাকে চরম ঘৃণা করত, যা নিচের কবিতার পংক্তি হতে বুঝা যায় যেখানে কবি দাবি করছেন যে এমনকি কুকুররাও দারিদ্র্যদেরকে ঘৃণা করে-
﴿إِذَا رَأَتْ فَقِيرًا مُعْدَمًا ٭ مَرَّتْ عَلَيْهِ وَكَشَّرَتْ أَنْيَابَهَا.﴾
ভাবার্থ : "এটা (কুকুর) কোনদিন কোন দরিদ্র ও নিঃস্ব লোককে দেখলে ডনডন গর্জন, ঘড়ঘড় ও খেউ খেউ করে এবং শিকারী দাঁত বের করে করে মুখ ভেংচায়।"

নবী ইউসুফ (আ) জেলখানায় বন্দী হওয়া সম্পর্কে বলেছিলেন : "হে আমার প্রভু! তারা আমাকে যে দিকে ডাকে তার চেয়ে আমার নিকট জেলখানাই অধিক পছন্দনীয়।" (১২-সূরা ইউসুফ : আয়াত-৩৩)

অনেক ধার্মিকরাই মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছেন। মুয়াজ (রা) বলেছেন : "মৃত্যুকে অভিবাদন- এটা এমনাই প্রিয় যেটা (বহু মানুষের) প্রয়োজনের সময়ে এসেছে। এবং যে ব্যক্তি তার জীবনের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয় (তওবা করে) সে সফলকাম।"

যদিও অন্যরা মৃত্যু থেকে পালানো চেষ্টা করে এবং এরপর আপনাকে অভিশাপ ও গালি দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইহুদীরা জীবনের জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি লোভী। মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন-
﴿قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ ٭ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ.﴾
"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে।" (৬২-সূরা আল জুমুআ : আয়াত-৮)

আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ধার্মিকদের (কাঙ্ক্ষিত) স্বপ্ন এবং আনন্দদায়ক আকাঙ্ক্ষা।
"কেউ কেউ তাদের ব্রতপূর্ণ করেছে (অর্থাৎ শাহাদাতও বরণ করেছে)। আর কেউ কেউ শাহাদাতের অপেক্ষায় আছে।" (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-২৩)

বস্তুতপক্ষে, অন্যারা (অনেকেই) মৃত্যুকে অপছন্দ করেছে এবং মৃত্যু থেকে পালাতে চেষ্টা করেছে। এক মরুবাসী আরব বলেছে- "আল্লাহর কসম, আমি আমার বিছানায় যেয়ে মরতেও অপছন্দ করি। অতএব কিভাবে আশা করা যেতে পারে যে, আগের কাতারে যেয়ে আমি মৃত্যুকে খুঁজে বের করতে পারি?"

"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তোমাদেরকে মৃত্যুকে হটিয়ে দাও।" (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৬৮)

"(হে মুহাম্মাদ ﷺ!) আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা তোমাদের ঘরেও থাকতে তবুও তোমাদের জন্য মৃত্যুকে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল, তারা অবশ্যই (তাদের ঘর থেকে) বের হয়ে তাদের মৃত্যুস্থলে আসত (বা যেত)।" (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫৪)

ইতিহাসের পাতায় পাতায় ঘটনা একটাই (আর তা হলো) : কর্মীরাই (অবস্থার কাঙ্ক্ষিত) পরিবর্তন ঘটায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px