📄 যা কিছু ক্ষতিকর মনে হয় তার অনেক কিছুই কল্যাণকর
উইলিয়াম জেমস বলেছেন- “আমাদের বাধা-বিপত্তি আমাদেরকে এতটাই সাহায্য করে যে, আমরা তা কখনো আশাই করতে পারিনি। যদি উদ্দীপক ও উল্টো দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত জীবন যাপন না করত তবে তারা তাদের কালজয়ী পুস্তকাদি লিখতে সক্ষম হতো না। অতএব, এতিম, অন্ধ ও দরিদ্র হওয়া বা গৃহ ও আরাম-আয়েশ হতে দূরে থাকা হলো এমন সব অবস্থা যা আপনাকে অর্জন, খ্যাতি, অগ্রসর হওয়া ও অবদান রাখার পথে পরিচালিত করতে পারে।”
একজন আরব কবি বলেছেন-
قَدْ يَنْتِعُمُ اللَّهُ بِالْبَلْوَى وَإِنْ عَظُمَتْ * وَيَبْتَلِي اللَّهُ بَعْضَ الْقَوْمِ بِالنَّعِيمِ
অর্থাৎ“ আল্লাহ বালা-মুসিবতের মাধ্যমে (তাঁর বান্দাদেরকে) অনুগ্রহ ধন্য করতে পারেন- আর সে বালা-মুসিবত যতই গুরুতর (মনে) হোক না কেন; পক্ষান্তরে, কিছু লোককে নেয়ামত দিয়ে বালা-মুসিবতে ফেলতে পারেন।”
এমনকি সন্তান-সন্ততি ও সম্পদও (অর্থাৎ জনবল ও ধন বলও) দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
“(হে মুহাম্মাদ ﷺ !) অতএব তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন আপনাকে বিস্মিত না করে; আসলে আল্লাহ্ তো এসব দ্বারা তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৫৫)
ইবনুল আছীর পঙ্গু হওয়ার কারণে তাঁর বিখ্যাত দু’টি কিতাব ‘জামেউল উসুল’ এবং ‘আন-নিহায়াহ’ সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সারাখসি তাঁর সর্ব মহলে সাদরে গৃহীত। পনেরো খন্ড কিতাব ‘আল মাবসূত’ কূপের তলদেশে বন্দী থাকাকালে লিখেছেন।
ইবনুল কাইয়্যেম সাওয়ারীতে চড়ে ভ্রমণকালে ‘যাদুল মাআদ’ লিখেছেন। ইমাম কুরতুবী জাহাজে চড়ে ভ্রমণকালে ‘সহীহ মুসলিম শরীফ’-এর ব্যাখ্যা লিখেছেন। ইবনে তাইমিয়া জেলে থাকাকালে তাঁর ‘ফাতাওয়া’র অধিকাংশ লিখেছেন।
যে সকল হাদীস শাস্ত্রবিদগণ লক্ষ লক্ষ হাদীস সংকলন করেছেন তাঁরা দরিদ্র ও পরবাসী ছিলেন। একজন ধার্মিক লোক আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি কিছুদিন কারাবাস করেছেন এবং তাঁর কারাবাস কালে তিনি সমগ্র 'কুরআন মাজীদ' মুখস্ত করে ফেলেছেন আর ইসলামী আইন শাস্ত্রের (ফিকাহর) বড় বড় চল্লিশ খণ্ড কিতাব পড়েছেন।
আবুল আলা মুআররি অন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর কিতাবাদি অন্যদেরকে দান করে দিয়েছিলেন। তা-হা হোসাইন তাঁর দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলার পরপরই তাঁর প্রসিদ্ধ পত্রিকাবলি ও পুস্তকসমূহ লেখা শুরু করেছিলেন। অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তিই পদচ্যুত বা চাকরিচ্যুত হওয়ার পর জ্ঞান ও চিন্তার জগতে তাঁদের (চাকরিচ্যুত হওয়ার বা পদচ্যুত হওয়ার) পূর্ববর্তী জীবনের তুলনায় অনেক বেশি অবদান রেখেছেন。
ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন যে- "A little philosophy makes one lean towards disbelief, and to delve into philosophy brings the mind closer to religion."
"অল্প দর্শন (জ্ঞান) মানুষকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যায় আর দর্শন নিয়ে গভীর গবেষণা মনকে ধর্মের নিকটবর্তী করে।"
"আমি মানবজাতির জন্য এসব উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত পেশ করি, অথচ জ্ঞানী ব্যক্তিরা ছাড়া অন্যরা এসব বুঝতে পারে না।" (২৯-সূরা আল আনকাবুত : আয়াত-৪৩)
“আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে হতে শুধুমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” (৩৫-সূরা ফাতির : আয়াত-২৮)
“এবং যাদেরকে জ্ঞান ও ঈমান দান করা হয়েছে তাঁরা বলবে, “তোমরাতো আল্লাহর বিধানানুযায়ী কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করেছিলে।” (৩০-সূরা আর রুম : আয়াত-৫৬)
হে মুহাম্মাদ ﷺ আপনি বলে দিন যে, “আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে বিশেষভাবে উপদেশ দিচ্ছি, আর তা হলো যে, তোমরা জোড়ায় জোড়ায় বা পৃথক পৃথকভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে দাঁড়াও এবং তারপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখ যে, তোমাদের এই সঙ্গী (মুহাম্মাদ) পাগল নন, তিনি তো আসন্ন এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের জন্য একজন সতর্ককারী মাত্র।” (৩৪-সূরা আস সাবা : আয়াত-৪৬)
📄 বিশ্বাসই শ্রেষ্ঠ ঔষধ
আমাদের যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী ডা. কার্লজাং তাঁর The Modern Man in Search of Spirit” নামক পুস্তকের ২৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-
“বিগত ত্রিশ বছর যাবত পৃথিবীর সবখান থেকেই লোকজন আমার নিকট উপদেশ গ্রহণ করার জন্য এসেছে। আমি শত শত রোগী চিকিৎসা করেছি। এদের অধিকাংশই মধ্যবয়সী বা ৩৫ বছরের অধিক বয়স্ক। প্রত্যেকের সমস্যার একটিই সমাধান দেওয়া হয়েছিল (আর তা হলো) ধর্মের মাঝে আশ্রয় সন্ধান করে জীবনের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি (বা উদ্দেশ্য) ধারণ করতে সক্ষম হওয়া। আমি যথার্থই বলতে পারি যে, তারা প্রত্যেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এ কারণে যে, বিশ্বাসীদেরকে ধর্ম যে কল্যাণ দান করে তারা তা নির্ণয় করতে পারেনি। আর যে নাকি সত্যিকার বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না তাকে আরোগ্য করা যায় না।
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
"আর যে ব্যক্তি আমার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় অবশ্যই তার জন্য কঠোর জীবন রয়েছে।" (২০-সূরা ত্বাহা: আয়াত-১২৪)
"আমি অচিরেই কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করব, কেননা, তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করেছে।" (৩-সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৫১)
"একএর উপর আরেক অন্ধকারের স্তরসমূহ (এর মাঝে) কখনো যদি কেউ নিজের হাত বাহির করে তবে সে তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যার জন্য আলো সৃষ্টি করেননি তার জন্য কোনো আলো নেই। (২৪-সূরা আন নূর: আয়াত-৪০)
📄 আশাহারা হবেন না
দুঃখ-কষ্টে আছে এমন কাফেরদের প্রার্থনতে আল্লাহ সাড়া দেন। অতএব, যে মুসলিমগণ আল্লাহর সাথে শরীক করে না তারা কত বেশি আশা করতে পারে? বুদ্ধের পর ভারতে সম্ভবত দ্বিতীয় জনপ্রিয় নেতা মহাত্মা গান্ধী; তিনি যদি তাঁর প্রার্থনার শক্তির উপর স্বাধীন না থাকতেন তবে পদস্খলনের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। একথা আমি কীভাবে জানি? (আমার জানার) কারণ এই যে, তিনি নিজেই বলেছেন "আমি যদি প্রার্থনা না করতাম তবে আমি অনেক আগেই পাগল হয়ে যেতাম।" এ ছিল প্রার্থনার ফল। আর গান্ধী মুসলিমও ছিলেন না। সন্দেহাতীতভাবে তার প্রাপ্তি বিরাট ছিল; কিন্তু যা তাকে নিরাপদ পথে পরিচালিত করেছিল তা ছিল এমন এক পথ বা মত যাকে বলা যায়- কাজের সময় কাজী কাজ ফুরালে পাজি- আর তা কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ -
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ
“আর যখন তারা জাহাজে চড়ে তখন তারা বিপদগ্রস্ত হয়ে আল্লাহুকে ডাকে, ফলে যখন তিনি তাদেরকে তীরে পৌছিয়ে উদ্ধার করেন তখন তারা শিরক করে।” (২৯-সূরা আল আনকাবুত : আয়াত-৬৫)
(“তোমরা যাদেরকে আল্লাহুর সাথে শরীক কর তারা ভালো) নাকি তিনি (ভালো) যিনি দুর্দশাগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন- যখন সে তাঁকে ডাকে?” (২৭-সূরা আন শোয়ারা : আয়াত-৬২)
“এবং তারা মনে করে তারা তাতে পরিবেষ্টিত, তারা (তখন) একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহুকে ডাকে (আর বলে) : “আপনি যদি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে মুক্তি দেন তবে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ হব।” (১০-সূরা ইউনুস : আয়াত-২২)
মুসলিম পণ্ডিতবর্গ, মুসলিম ঐতিহাসিকবৃন্দ ও মুসলিম লেখকবৃন্দের জীবনীসমূহকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পাঠ করেও আমি তাদের একজনকেও এমন পাইনি যে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত ও মানসিকভাবে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ এই যে, তারা সুখে-শান্তিতে জীবন-যাপন করেছে এবং তারা এমন সরল জীবন-যাপন করত যে তা সব ধরনের আবেগমুক্ত ছিল।
“আর যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে ঈমান আনে- আর তা (কুরআন) হলো তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্য (কিতাব)- তিনি তাদের থেকে তাদের পাপ সমূহকে বিদূরিত করে দিবেন এবং অবস্থা ভালো করে দিবেন। (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা কেতাল : আয়াত-২)
ইবনে হাজিমের নিম্নোক্ত কথাকে গভীরভাবে ভেবে দেখুন-
“বাদশা ও আমার মাঝে পার্থক্যকারী মাত্র একটি দিনই আছে।”
অতীত সম্বন্ধে আমার কোনো অভিরুচি নেই; তারা এবং আমি উভয়ই ভবিষ্যতে যা ঘটবে তাকে সমভাবে ভয় করি, এভাবে মাত্র আজকের দিনটিই থাকে। আজ কি ঘটবে?”
নবী করীম বলেছেন-
“হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট আজকের দিনের কল্যাণ চাই এর বরকত সাহায্য, নূর ও হেদায়েত চাই।”
“হে মুমিনগণ! সতর্কতা অবলম্বন কর”। (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৭১)
“আর সে যেন সতর্ক থাকে এবং তোমাদের সম্বন্ধে কাউকে ও জানতে না দেয়।” (১৮-সূরা আল কাহাফ : আয়াত-১৯)
“তারা শুধু একথাই বলেছিল যে, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপসমূহকে এবং আমাদের কাজে আমাদের সীমালঙ্ঘনকে আপনি ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের কদমকে (পদক্ষেপকে) দৃঢ় রাখুন এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৭)
📄 খসরু ও বৃদ্ধা
বুজুর্গজামের নামে পারস্যের এক বিজ্ঞ ব্যক্তি খসরু ও এক বৃদ্ধা রমণীর গল্প বলেছেন। বৃদ্ধার সম্পদ বলতে ছিল একটি মুরগির বাচ্চা ও একটি কুঁড়ে ঘর। কুঁড়ে ঘরখানা রাজপ্রাসাদের পাশে ছোট এক টুকরো জমির উপর ছিল। একদিন বৃদ্ধাকে (বিশেষ কাজে) পাশের গ্রামে যেতে হলো। যাবার আগে সে প্রার্থনা করেছিল, “হে আমার প্রভু! আমি মুরগি ছানাটিকে আপনার নিকট সোপর্দ করছি (আপনি এটাকে হেফাজত করুন)।” বৃদ্ধা যখন তাঁর বাড়িতে ছিল না তখন রাজা খসরু তার রাজপ্রাসাদের বাগান বানানোর জন্য বৃদ্ধার সম্পত্তিকে জবর দখল করে নিল। খসরুর সেনাবাহিনী বৃদ্ধার মুরগি ছানাটিকে জবাই করে ফেলল আর কুঁড়ে ঘরটিকে ধ্বংস করে দিল। বৃদ্ধা ফিরে এসে যখন এই হৃদয়বিদারক কীর্তি দেখল তখন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “হে আমার প্রভু! আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম। কিন্তু তুমি কোথায় ছিলে?” তখন সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তাব কবুল করলেন। খসরুর ছেলে একটি ছুরি দিয়ে তার পিতাকে হত্যা করে ফেলল। (ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ:) তাঁর আল মুনতাযাম (الْفَهْرَسْتُ) নামক কিতাবে এরূপ একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন যে, বৃদ্ধার অভিশাপের পর আল্লাহ রাজাকে দুধার করে দিয়েছিলেন। –অনুবাদক)
“আল্লাহ কি তার বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? (অবশ্যই যথেষ্ট) অথচ তারা তোমাকে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন পথ প্রদর্শক নেই।” (৩৯-সূরা আয যুমার : আয়াত-৩৬)
কতইনা ভালো হতো! আমরা যদি আদম (আ)-এর দু'পুত্রের সে একজনের মতো হতাম যে তার ভাইকে বলেছিল- “যদি তুমি আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়িয়ে থাক তবে আমি তোমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াবো না। নিশ্চয় আমি সমগ্র বিশ্ব জগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।” (৫-সূরা মায়িদা : আয়াত-২৮)
নবী করীম ﷺ বলেছেন-
كُنْ عَبْدَ اللَّهِ الْمَقْتُولَ وَلاَ تَكُنْ عَبْدَ اللَّهِ الْقَاتِلَ
অর্থাৎ, “আল্লাহর নিহত বান্দা হইও কিন্তু আল্লাহর হত্যাকারী বান্দা হইও না।”
মুসলমানদের একটি ত্রুটি ও একটি (বড়) বাণী আছে যা প্রতিশোধ, হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।