📄 বিনয় ও নম্রতা লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে
আগের অধ্যায়সমূহে আমি বিনয়, নম্রতা ও ভদ্রতা গুরুত্ব বুঝানোর জন্য কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছি। এখানে আমি কিছু উদাহরণ পেশ করার মাধ্যমে একই বিষয়কে কিছুটা বাড়াচ্ছি। মনে করুন, উভয় পাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা অতি সংকীর্ণ এক রাস্তা দিয়ে আপনি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। অত্যন্ত যত্ন, শালীনতা ও সতর্কতার ছাড়া সেখান দিয়ে গাড়ি পার হয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। যাহোক যদি কোন ড্রাইভার এ রাস্তা দিয়ে খুব জোরে গাড়ি চালিয়ে যেতে চায় তবে সে অনবরত একবার ডান পাশের দেয়ালে আরেকবার বাম পাশের দেয়ালে ধাক্কা খাবে। অবশেষে তার গাড়িকে ভেঙে ফেলতে হবে। সতর্কতার সাথে গাড়ি চালানো এবং খুব জোরে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো এ দুই ক্ষেত্রে রাস্তা একই কিন্তু গাড়ি চালানোর পদ্ধতির ভিন্নতা।
আমরা যে ছোট চারাকে যত্ন করি এটাকে বিভিন্নভাবে পানি দেওয়া যায়। আপনি যদি এটার উপর আস্তে আস্তে পানি ঢালেন তবে এটা পানি শোষণ করে নিবে এবং পুষ্টি পাবে। কিন্তু আপনি যদি জলের পাত্রের পানি একেবারেই ঢেলে দেন তাহলে আপনি এটাকে সম্পূর্ণ উলটে ফেলবেন। ব্যবহৃত পানির পরিমাণ একই কিন্তু পদ্ধতি ভিন্ন। কেউ একজন ধীরস্থিরতার সাথে তার পোশাকাদি নাড়াচাড়া করেন, সেগুলোকে পরিধান করে ও খোলেন, সে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারে যে, তার পোশাকাদি দীর্ঘদীন টিকবে। যে লোক ধীরস্থিরভাবে (অর্থাৎ বেপরোয়াভাবে) তার পোশাকাদি ব্যবহার করে সে সর্বদাই (তার পোশাকাদি) ছিঁড়া ফাটা দেখবে (অর্থাৎ তার পোশাক ঘনঘন ছিঁড়ে ফেটে যায়)। আমাদের প্রয়োজন আমাদের জীবনে ও আমাদের নিজেদের সাথে বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, ধীরস্থিরতা ও শালীনতার প্রতিষ্ঠা করা।
وَإِنْ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا
“(অর্থাৎ ‘তোমার উপর তোমার আত্মার অবশ্যই অধিকার আছে’।” (অর্থাৎ অবজ্ঞা, উত্তেজিত, অস্থির ও ব্যস্ত হয়ে নিজের আত্মাকে কষ্ট দেওয়া যাবে না বরং নম্রতা, শান্তভাব, সৌম্যতা, স্থিরতা, বিনয়, নম্রতা ও ধীর-স্থিরতার সাথে কাজ-কারবার ও আচার আচরণ করে নিজের আত্মাকে শান্তি দিতে হবে।) -অনুবাদক)
আপনাদের ডাইরেক্টর সাহেব এবং অধস্তনদের সাথেও (এক কথায় সকলের সাথেও –অনুবাদক) ভদ্রতা, নম্রতা ও বিনয়ের সাথে আচরণ করতে হবে। তুর্কীরা বিভিন্ন নদীর উপর দিয়ে অনেক কাঠের পুল (সেতু) নির্মাণ করেছিল। এগুলোর উভয় পাশে তারা (ফলকে) খোদাই করে লিখে রাখত “ধীরে চলুন।” যে ব্যক্তি ধীরে পুল বা সেতু পার হয় সে এ ব্যক্তির মতো পড়ে যায় না বা ক্ষতিগ্রস্থভাবে পার হয়। কিছু ফুলবাগানের প্রবেশ পথে (গেইটে) লিখা থাকে “শান্ত থাকুন (বা ধীরে চলুন)।” যে ব্যক্তি বাগানের ভিতর দিয়ে বেপরোয়াভাবে দৌড়ায় সে অনেক ফুল দেখতে পারবে না- শুধুমাত্র এ-ই নয়, বরং সে ফুলের ব্যাপক ধ্বংস সাধন করবে।
প্রবাদ আছে, “চড়ুই পাখি মৌমাছির মতো উদার ও অমায়িক নয়।” হাদীস নবী করীম ﷺ বলেছেন-
الْمُؤْمِنُ مَنْ لَا تَعْجَلُ طَبْقاً وَمَنْ تَضَعُ طَبْقاً وَإِذَا وَضَعْتُ عَلَىٰ عَيْنِهِ لَمْ تَكْسِرُهُ
“মুমিন ব্যক্তি মৌমাছির মতো, যা পবিত্র তা খায়। সে পবিত্র জিনিসের উপরে বসে এবং যে ছোট ডালপালায় সে বসে ওটাকে সে নষ্ট করে না।”
ফুলের উপর বসে যখন মৌমাছি মধু খায় ফুল তখন মৌমাছির উপস্থিতি টের পায় না। এভাবে শান্তস্বভাবের মাধ্যমে সে তার লক্ষ্য অর্জন করে। পক্ষান্তরে, চড়ুই পাখি যখন কোন কিছুর উপর বসে তখন এটা (কিচির-মিচির ও লাফালাফি করে) মানুষের নিকট এর উপস্থিতি ঘোষণা দেয়।
আমাদের একজন ধর্মন্বেষী বলেছেন- “ধর্ম সম্বন্ধে কারো জ্ঞান উপলব্ধি করা হলো- যদি সে বিনয়ের সাথে প্রবেশ করে, বিনয়ের সাথে বাহির হয়। বিনয়ের সাথে পোশাক পরিধান করে ও জুতা খোলে এবং বাহনে চড়ে।”
আপনি যখন ব্যস্ত ও বেখেয়াল হবেন তখন সাধারণত আপনি ক্ষতিই করবেন; কেননা, ধীরস্থিরতা ও অমায়িকতার মাঝেই কল্যাণ নিহিত।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَا كَانَ الرِّفْقُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ وَمَا نُزِعَ الرِّفْقُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
ভাষার্থ : “যতক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুতে বিনয়, নম্রতা, কোমলতা, ধীরতা, উদারতা, অমায়িকতা ও ভদ্রতা থাকে ততক্ষণ সেটা সুন্দর আর যখন ওসবগুণ তা থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন তা দোষী (অসুন্দর)।”
যার বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, কোমলতা, উদারতা ইত্যাদি গুণ আছে তার প্রতি মানুষের অন্তর আকৃষ্ট থাকে।
“কেননা, আপনি আল্লাহর রহমতে তাদের প্রতি সদয় আচরণ করেছিলেন, আর যদি আপনি কর্কশ ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতেন তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে পড়ত।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫৯)
📄 শিষ্টাচারী, মার্জিত, ভদ্র ও সৌজন্যশীল হোন
আপনার বন্ধুদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করুন এবং তারা যে নাম সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাদেরকে সে নামে ডাকুন; তারা যে নাম অপছন্দ করে তাদেরকে সে নাম ধরে ডাকবেন না। অন্যরা যদি আপনাকে মন্দ নামে ডাকত তবে আপনি কি তা পছন্দ করতেন? আপনার স্ত্রীর সাথে মার্জিত আচরণ করুন। স্ত্রীদের পক্ষে কতইনা এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে যে, সে সারাদিন রান্না-বান্না, ঝাঁড়া-পোছা আর ধোঁয়া-মোছা করার পর তার স্বামী ঘরে ফিরে এসে তার স্ত্রীর কোন কাজকর্ম চোখে দেখতে পায় না! স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন কোন কথা বলত যাতে স্ত্রী তার কাজকে অপর্যাপ্ত ও অবজ্ঞাত ভাবত, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি কি স্বামীর এই বিরাগ? সুতরাং, অন্যদের প্রতি মনোযোগী হোন এবং তারা যা ভালো কাজ করে তার জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ দিন। আপনার স্ত্রী যদি আপনার নিকট সুন্দর দেখানোর জন্য সাজগোজ করতে সময় নেয় তবে তার রূপের প্রশংসা করুন এবং আপনার প্রতি তার দৈনন্দিন ভক্তির জন্য তাকে ধন্যবাদ দিন।
📄 কৃত্রিমতা পরিহার করুন
একবার আমি আবু রীশার’র একটি কবিতা পড়লাম আর সাথে সাথে তার কথার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। আমি কবিতাটি মুখস্থ করলাম এবং আবুরীশাহ’র ঢং নিয়ে গবেষণা করলাম। এর অল্প কিছু দিন পরেই কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আমাকে কবিতা উপস্থাপন করতে হয়েছিল। তখন আমি আবু রীশার’র স্টাইলকে অনুকরণ করতে চেষ্টা করলাম- কিন্তু একমাত্র সমস্যা ছিল যে, আমি আবু রীশাহ্ নই। এইরকম যেসব কথা বেরিয়ে এলো তা ছিল অসংখ্য এবং ব্যাপক অর্থে কবিতা ছিল বাসি, নীরস ও স্বাদহীন। সেদিনের পর থেকে আমি অন্য লোকের স্টাইলকে অনুকরণ করা বন্ধ করে দিলাম। আমি যা ভাবতাম তা অনুসারে আমি লিখতে শুরু করলাম আর এভাবেই আমি স্বতস্ফূর্তভাবে আমার কাজে আমার ব্যক্তিত্বকে সম্মিলিত করতে পারলাম।
একবার আমি জেদ্দাতে এক ইমামের পিছনে সালাত পড়লাম। তিনিও এক বিখ্যাত আবৃত্তিকারের অনুকরণ করতে চেষ্টা করেছিলেন, তবুও তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করার ধারে কাছেও ছিলেন না। তার কণ্ঠস্বর বিখ্যাত আবু’রিফার কণ্ঠস্বরের চেয়ে খুবই ভিন্ন রকমের ছিল এবং তার অনুকরণের চেষ্টা ঠিকঠাকই বা নিখুঁতভাবে কৃত্রিম মনে হয়েছিল। তার চেষ্টা আমার পক্ষে সহজ ছিল না; কারণ, বরাবরই আমি অনুভব করছিলাম যে, সাদৃশ্য খোঁজার জন্য সে কত কঠোর প্রচেষ্টা করছিল (অর্থাৎ সেই বিখ্যাত আবৃত্তিকারের মত (সদৃশ) করে আবৃত্তি করার জন্য সে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল যা আমি বুঝতে পারছিলাম এবং আমার কাছে তা হাস্যকর ও বিরক্তিকর লাগছিল)।
আমি বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ প্রত্যেক লোককে বিশেষ গুণাবলি, বৈশিষ্ট্য ও মেধা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
“তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি বিধান ও স্পষ্ট (বা সরল) পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।” (৫-সূরা مায়িদা: আয়াত-৪৮)
আপনি যদি কোনো কিছুতে চমৎকার হতে চান তবে এমন এক পদ্ধতির অনুসরণ করুন যা আপনার প্রকৃতি ও ক্ষমতা (বা দক্ষতা) উভয়ের সাথে খাপ খায়।
فَكُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى شَاكِلَتِهِ
“(হে মুহাম্মাদ !) আপনি বলে দিন, 'প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসারে কাজ করে।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৮৪)