📄 আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি বা জন্মগত স্বভাব-প্রকৃতি
যখন প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বয়, বজ্র গর্জন করে ও অন্ধকারে আকাশ ছেয়ে যায় তখন সাহায্য চাওয়ার জন্য আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়ার মানুষের সহজাত প্রয়োজন সুপ্ত অবস্থা থেকে জেগে ওঠে।
“তখন এর নিকটে (জাহাজের নিকটে) ঝঞ্ঝা যুক্ত বায়ু আসে এবং তাদের নিকট সর্বাধিক ঢেউ আসে। তারপর তারা ভাবতে থাকে যে, তারা এ সবে্র মাঝে আটকা পড়ে গেছে, তখন তারা আল্লাহকে তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে আহ্বান করে।” (১০-সূরা ইউনুস: আয়াত-২২)
তাছাড়া মুসলমানরা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায়ই তাদের প্রভুকে আহ্বান করে।
“যদি সে (ইউনুস নবী) আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত তবে তাকে কিয়ামতৈর দিন পর্যন্তও মরতে হতো।” (১০-সূরা আল আম্বিয়া: আয়াত-১৪৩-১৪৪)
অধিকাংশ লোকই প্রয়োজনের সময় আল্লাহর নিকট সাহায্য চায়, আর যখন তাদের আশা শেষ হয়ে যায় তখন তারা প্রভুদের তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। তারা কি মনে করে যে, আল্লাহকে ধোঁকা দিলে তারা সত্য ও সুন্দর সৃষ্ট দুর্বল সব।
“নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু তিনিই তাঁদেরকে ধোঁকা দিয়ে ফেলেন।” (৪-সূরা আন নিসা: আয়াত-১৪২) (আল্লাহ মুনাফিকদেরকে ধোঁকা দিলেন এর অর্থ হলো তিনি তাঁদেরকে ধোঁকাবাজির কারণে শাস্তি দিয়ে দিলেন। কেননা আল্লাহর পক্ষে ধোঁকা দেওয়া শোভা পায় না। – অনুবাদক)
যারা কেবলমাত্র বিপদের সময়েই আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয় তারা তো ফেরাউনদের শিষ্য। ফেরাউন যখন সময় পার হয়ে যাবার পর ঈমান এনেছিল তখন তাকে বলা হয়েছিল–
“অথচ তুমি পূর্বে অবাধ্যতা করেছ (ঈমান আনতে অস্বীকার করেছ) এবং তুমি ফাসাদকারী ছিলে।” (১০-সূরা ইউনুস: আয়াত-৯১)
আমি BBC রেডিওতে খবর শুনেছি যে, ইরাক যখন কুয়েত দখল নিয়েছিল তখন মার্গারেট থ্যাচার কলোরাডোতে ছিল, তখন তিনি অতি দ্রুত চার্চে গিয়ে সেজদা করেছিলেন।
এ একমাত্র ব্যাখ্যা আমি মনে করি যে, তার সহজাত প্রকৃতি জেগে গিয়েছিল ও তিনি কুফুরী ও পথভ্রষ্টতা সত্ত্বেও তার প্রভুর মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন। মানুষের মাঝে স্বভাবজাত বলতে কিছু একটা আছে যা তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে সাহায্য করে।
كُلُّ مَوْلُوْدٍ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَاَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهٖ اَوْ يُنَصِّرَانِهٖ اَوْ يُمَجِّسَانِهٖ
“প্রতিটি শিশুই স্বভাব ধর্মের উপর (ঈমান ও ইসলামের উপর) জন্মগ্রহণ করে; পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খ্রিস্টান বা অগ্নিউপাসক বানায়।”
📄 প্রধান বৈশিষ্ট্য দ্বারাই মানুষকে গণ্য করা হয়
সফল হওয়ার অর্থ হলো আপনার এমন ভালো গুণাবলী থাকতে হবে, যা আপনার মন্দ গুণাবলীকে সংখ্যায় ছাড়িয়ে যাবে ও সেগুলোকে ম্লান করে দিবে। আপনার জীবনে এ অবস্থা যখন বাস্তব রূপ নিবে তখন জনগণ আপনাকে তপের মালা পরিয়ে দিবে এমনকি যে গুণ আপনার নেই তার জন্যও। জনগণ আপনার সম্বন্ধে কোনরূপ সমালোচনাও গ্রহণ করবে না; যদি আপনার সম্বন্ধে যা বলা হচ্ছে তা সত্যি। (ব্যাপারটি তেমনই যেমন নাকি) একটি পাহাড়ের একটি পাথর বাড়লে বা কমলে পাহাড়ের কিছুই কমে বা বাড়ে না。
যদিও আমি এখানে ইবনে মহান উদার ও বদান্য আরবের কায়সের এবং বিখ্যাত নেতা কুতাইবা ইবনে মুসলিমের কিছু সমালোচনা পড়েছি তবুও আমি সেসব লোকের সেসব সমালোচনা ও নিন্দাকে পুস্তকাবলিতে ব্যাপক আকারে পাইনি এবং সেগুলো জগতের নিকট গৃহীতও হয়নি। এর কারণ এই যে, তাদের মন্দ গুণাবলী হারিয়ে গেছে এবং তা তাদের ভালো গুণাবলীর অতলে তলিয়ে গেছে। অপরপক্ষে, হাজ্জাজ, আবু মুসলিম খোরাসানী ও উবাইদায়ী সম্বন্ধেও আমি ভালো কিছু পড়েছি।
কিন্তু কেউ সে সব প্রশংসার কথা মনে করে না এবং কেউ বিশ্বাস করে না যে, এমন ধরনের লোকের মাঝে ভালো গুণ ছিল। এর কারণ হল তাদের বিপুল মন্দ কাজের মাঝে এসব ভালো গুণ হারিয়ে গেছে। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ব্যাপার নিয়ন্ত্রণে কতই না নিপুণ ও ন্যায়পরায়ণ!
📄 মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য
নবী করীম ﷺ বলেছেন-
كُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
ভাষার্থ : “যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয় তার জন্য সে কাজ সহজ।” তাহলে প্রতিভাকে কেন অগ্রাহ্য করা হয়েছে? সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাসনা সে ব্যক্তি, যে নাকি (নিজের দক্ষতা বাদ দিয়ে) অন্যকে জয়ী হতে চায় (নতুবা অন্যের অনুসরণও করতে চেষ্টা করে)। বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী সে ব্যক্তি যে নাকি নিজেকে নিয়ে গবেষণা করে এবং তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা পূর্ণ করে। যদি ড্রাইভার হওয়ার কথা থাকে তবে গাড়ি চালাবে। যদি কৃষক হওয়ার কথা থাকে তবে সে চাষাবাদ করবে। আরবী ব্যাকরণবিদ ‘সীবওয়াইহ’ হাদীসশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু এ শাস্ত্র তাঁর কাছে কঠিন লাগল। তাই তিনি (আরবী) ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন এবং শুধুমাত্র দক্ষই হলেন না, অধিকন্তু, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ একজন (আরবী) ব্যাকরণবিদ হয়ে গেলেন।
একজন জ্ঞানী লোক বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কাজ করতে চেষ্টা করে যা তাকে মানায় না সে ঐ লোকের মতো যে-নাকি দামেস্কের খেজুর গাছ লাগায় অথবা তার মতো যে নাকি আরব উপদ্বীপে লেবুগাছ লাগায়।”
তবে দেখুন : হাসসান বিন সাবিত (রা) -এর গলার আওয়াজ মুয়াজ্জিন হওয়ার উপযোগী ছিল না। কেননা তিনি বিলাল (রা) ছিলেন না এবং খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা) যুদ্ধের সম্পদ বণ্টনও করেন না কারণ তিনি যায়েদ বিন সাবিত (রা) ছিলেন না। {যায়েদ বিন সাবিত (রা) ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে সুবিজ্ঞ ছিলেন।} অতএব, বিষয়ের পরিকল্পনায় আপনার অবস্থান তালাশ করে তা নির্দিষ্ট করুন। (অর্থাৎ, আপনার জন্য উপযুক্ত কাজটি- আপনার জন্য বেছে নিন।)
একজন আরব কবি বলেছেন-
وَلِلْمَعَارِفِ أَبْطَالٌ خُلِقُوا * وَلِلْوِدَادِ أَوْحَابُ حِسَابُ وَكِتَابِ
ভাষার্থ : যুদ্ধের জন্য বীর (সৃষ্টি করা) আছে আর বইয়ের জন্য লেখক ও কবি (সৃষ্টি করা) আছে।” (ইংরেজিতে পুস্তক অনুবাদ করা হলো।)
📄 আপনার ঈমান ও চরিত্র অনুসারে আপনার মূল্য
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“অতপর, যখন (জুমআর) সালাত শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় ও আল্লাহর করুণা (রিযিক) অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর যাতে তোমরা সফল হও।” (৬২-সূরা আল জুমআ: আয়াত-১০)
তিনি দরিদ্র, মলিন ও দুর্বল। তিনি বহুতালি বিশিষ্ট ছেঁড়া পোশাক পরতেন। তিনি ছিলেন নগণ্য ও ক্ষুদ্রাতর। অজ্ঞাতকুল হওয়ার পাশাপাশি তাঁর না ছিল কোন সামাজিক মর্যাদা, না ছিল কোন সম্পদ আর না ছিল কোন পরিবার। আশ্রয় নেওয়ার জন্য তাঁর কোন ছাওয়ালয় ছিল না, তিনি মসজিদে ঘুমাতেন ও সরকারী বর্ডার পানি পান করতেন। তাঁর বালিশ ছিল তাঁর নিজের হাত আর তাঁর চাদর ছিল তাঁর দেহের নিচের অংশ, কর্কশ ভূমি। কিন্তু তিনি সর্বদা তাঁর প্রভুকে স্মরণ করতেন ও সর্বদা আল্লাহর কিতাবের আয়াত তেলাওয়াত করতেন। তিনি সালাতের ও যুদ্ধের প্রথম কাতার থেকে অনুপস্থিত থাকতেন না।
একদিন তিনি নবী করীম ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। নবী করীম ﷺ তাঁকে দেখে তাঁর নাম ধরে ডেকে বললেন, “হে জুলাইবীব! তুমি কি বিয়ে করবে না?” তিনি (রা) নম্র ও ভদ্রভাবে উত্তর দিলেন, “কে আমাকে তাদের কন্যা দিবে?” নবী করীম ﷺ আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন। তার পরও তিনি একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনি (রা) সে প্রশ্নের একই উত্তর দিলেন। নবী করীম ﷺ তাঁকে বললেন, “তুমি অমুক আনসারীর নিকট গিয়ে তাকে বল, আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং “আপনার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।”
সে আনসারী ছিলেন মহান ও শ্রদ্ধেয় পরিবারের। জুলাইবীব (রা) যখন নবী করীম ﷺ এর আদেশ পালন করলেন তখন আনসারী উত্তর দিলেন, “এবং আল্লাহর রাসূলের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। হে জুলাইবীব! আমি কিভাবে তোমার নিকট আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিই, যখন নাকি তোমার কোন সম্পদও নেই এবং মর্যাদাও নেই?” তাঁর স্ত্রীও সংবাদটি শুনে ঐ বিষয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “জুলাইবীব! যার কোন সম্পদও নেই, কোন সামাজিক মর্যাদাও নেই!”
কিন্তু তাঁদের ঈমানদার কন্যা জুলাইবীবের কথা শুনল, তার সম্বন্ধে কথা, যাতে আল্লাহর রাসূলের বাণী আছে। তিনি তাঁর পিতাকে বললেন, “আপনারা কি আল্লাহর রাসূলের অনুরোধকে অগ্রাহ্য করছেন? আল্লাহর কসম, তা হবে না।” সাথে সাথে সে বরকতময় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। তাদের বাসর রাতে রাতারাতি এক ঘোষক জিহাদের ঘোষণা দিয়েছিল। জুলাইবীব অবিলম্বে যুদ্ধের ময়দানে উদ্দেশ্য বের হয়ে গেলেন। নিজ হাতে সাতজন কাফিরকে হত্যা করে জুলাইবীব নিজেও শহীদ হয়ে গেলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে এবং যে আদর্শের জন্য তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। যুদ্ধের পর আল্লাহর রাসূল ﷺ শহীদদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, লোকজন রাসূল ﷺকে নিহতদের সম্বন্ধে জানাতে লাগলেন।
কিন্তু তারা জুলাইবীবকে তার পরিচয়হীনতার কারণে ভুলে গেলেন। তা সত্ত্বেও নবীজীর কিছু কথা মনে পড়ে গেল এবং তিনি বললেন, “কিন্তু জুলাইবীবকে হারিয়েছি।” তারপর রাসূল ﷺ জুলাইবীবের মৃতদেহ খুঁজে বের করলেন, যার মুখ ধূলোতে ঢেকে ছিল। রাসূল ﷺ তাঁর মুখ থেকে ধূলি ঝেড়ে ফেললেন এবং বললেন, “তুমি সাতজনকে হত্যা করে তুমি নিজেই নিহত হলে! তুমি আমার, আমি তোমার; তুমি আমার, আমি তোমার; তুমি আমার, আমি তোমার!” আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে এই ‘সম্মান-পদবী’ই অনেক বড় পুরস্কার।
আল্লাহর রাসূলের প্রতি ও যে আদর্শের জন্য তিনি (জুলাইবীব) নিহত হয়েছেন তার প্রতি ঈমান ও ভালোবাসার কারণেই জুলাইবীব (রা)-এর এতটা মূল্য হয়েছিল। তাঁর দীন-হীন অবস্থা এবং অজ্ঞাতকুল পরিচয় তাঁকে তাঁর মহা সম্মান থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর অল্প সম্পদ তিনি দ্বীন, শাহাদাত, সন্তুষ্টি এবং এ পৃথিবী ও পরকালের সুখ অর্জন করেছিলেন।
"আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা দান করেছেন, তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের জন্য আনন্দ প্রকাশ করে যারা তাদের পিছনে রয়ে গেছে, এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি। এ কারণে (আনন্দ প্রকাশ করে) যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না।" (৩-সূরা আল ইমরান : আয়াত-১৭০)
অতএব, একথা মনে রাখুন যে, আপনার আদর্শ ও চরিত্রই আপনার মূল্য নির্ধারণ করে। মর্যাদার পথে ও উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের পথে দারিদ্র্য কখনও অনর্থ হয়ে দাঁড়ায় না।