📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আবেগ নিয়ন্ত্রণ

📄 আবেগ নিয়ন্ত্রণ


মনের আগুন জ্বলে উঠে দু’কারণে- হয়তো আনন্দে নয়তো অন্তর্রাতনায়।

নবী করীম ﷺ এক হাদীসে বলেন-
“অবশ্য আমাকে দু’টি (তার একটি) বোকামীপ্রসূত (হায়! শব্দ) ও (অপরটি) পাপব্যঞ্জক (হুররে!) শব্দ উচ্চারণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। তার একটি (পাপব্যঞ্জক-হুররে) শব্দ বলা হয় নেয়ামত পেলে আর অপরটি (বোকামীপ্রসূত হায়!) উচ্চারণ করা বিপদের সময়।”

মহান আল্লাহ বলেন-
لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ ۗ
“যা আপনি পাননি, তার জন্য দুঃখ করবেন না। আর যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে তার জন্য ফুর্তি করবেন না।” (সূরা-৫৭ আল হাদীদ : আয়াত-২৩)

এ কারণেই নবী করীম ﷺ বলেন-
“অবশ্যই প্রথম আঘাতের সময়ই ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়।”

সুতরাং, আনন্দময় ও বিপদমুক্ত উভয় ঘটনার সময়ই যে লোক তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তারই শান্তি, প্রশান্তি, সুখ, আরাম ও নিজের উপর বিজয়ের স্বাদ অর্জন করার কথা। আল্লাহ তায়ালা মানুষের পরিচয় দিয়েছেন যে, তারা বিজয়ীওলাসি, দাম্ভিক, খিটখিটে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা তাদের খারাপ কিছু হলে অসুস্থ এবং তাদের কোন কল্যাণ হলে তারা কৃপণোচিত হয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন, ব্যতিক্রম হলো তারা, যারা সদা সালাতে নিয়োজিত। কেননা, তারা আনন্দ-বেদনা উভয় সময়ই মধ্যপন্থী। তারা সচ্ছলতার সময় কৃতজ্ঞ এবং অসচ্ছলতার সময় ধৈর্যশীল।

লাগামহীন আবেগ মর্মবেদনা ও অনিদ্রা সৃষ্টি করে মানুষকে শেষ করে দিতে পারে। কেউ যখন ক্রুদ্ধ হয় তখন সে রাগে আগুন হয়ে যায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং ধৈর্যহারা ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। অপরদিকে, যদি সে সুখী হয়, তবে সে পরোৎক্ষিপ্ত ও বন্য হয়ে যায়। আনন্দের ঘোরে সে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে। সে যখন অন্যদের সঙ্গ ত্যাগ করে তখন সে তাদেরকে অবজ্ঞা করে, তাদের গুণাবলিকে ভুলে গিয়ে তাদের সৎ গুণাবলিকে পদদলিত করে। অপরপক্ষে, সে অন্যদেরকে যখন ভালোবাসে তখন সে তাদেরকে পরম নিষ্ফল কল্পনা করে। তাদেরকে সর্বপ্রকার সম্মান করতে কোনরূপ ত্রুটি করে না।

নবী করীম ﷺ বলেন-
“যাকে তুমি ভালোবাস তাকে তুমি সংযত পরিমাণে ভালোবাস। কারণ, এমন দিন আসতে পারে যখন তুমি তাকে ঘৃণা করবে। আর যাকে তুমি ঘৃণা কর তাকে সংযত পরিমাণে ঘৃণা কর। কেননা, এমন দিন আসতে পারে তখন তুমি তাকে ভালোবাসবে।”

অন্য হাদীসে নবী করীম ﷺ বলেন-
“(হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট ক্রুদ্ধ ও সন্তুষ্ট উভয়ই অবস্থায় মধ্যপন্থা কামনা করি।”

কেউ যখন তার আবেগের মুখে লাগাম পরিয়ে দেয়, তখন সে তার মনকে দমন করতে পারে এবং যখন সে প্রতিটি বিষয়কে এর গুরুত্বানুসারে মেনে নেয় তখন সে প্রজ্ঞা ও সঠিক বুদ্ধির দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেল।

মহান আল্লাহ বলেন-
“অবশ্যই আমি আমার নবী-রাসূলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও মীযান (ন্যায়নীতি) অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষেরা ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” (সুরা-৫৭ আল হাদীদ : আয়াত-২৫)

বাস্তবিক, ইসলাম নীতি ও আচার-আচরণে এতটাই ভারসাম্য এনেছে, যতটা সে এনেছে জীবনের সরল, পবিত্র ও সভ্য পথে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا ۚ
“এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থা জাতি বানিয়েছি।” (সুরা-২ বাকারা : আয়াত-১৪৩)

আমাদের আচার-আচরণ ও বিচার-আচার উভয় ক্ষেত্রেই ন্যায়পরায়ণ হওয়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম সকল বিষয়ে সত্য ও ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ ন্যায়নীতি বিচারকার্যে, কথা-বার্তায়, কাজ-কর্মে ও আচার-আচরণে, যা আমরা অবতীর্ণ কিতাব (কুরআন) থেকে শিখতে পারি।

মহান আল্লাহ বলেন-
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۗ
“এবং তোমার প্রতিপালকের কথা সত্য ও ন্যায়নীতিতে ভরপুর।” (সূরা-৬ আল আন’আম : আয়াত-১১৫)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 ভদ্রতা সংঘর্ষ এড়ায়

📄 ভদ্রতা সংঘর্ষ এড়ায়


একজন জাপানী শিক্ষক তার ছাত্রকে বলেছেন- “নমনীয়তা উইলো গাছের মতো আর বিরোধহীনতা ওক গাছের মতো।”

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে বলেছেন- “মুমিন ব্যক্তি (সবুজ) কোমল শস্যের (চারা গাছের) মতো, বায়ু একে ডানে বামে দোলায় (এটা এতটাই কোমল)।”

জ্ঞানী ও বিজ্ঞ ব্যক্তি পানির মতো; কেননা, পানি পাথরের সাথে সংঘর্ষ করে না, বরং পানি পাথরের ডান, বাম, উপর ও নিচ দিয়ে চলে যায়。

অন্য একটি হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “মুমিন ব্যক্তি হলো উটের মতো; এটাকে লাগাম পরিয়ে পাথরে বসিয়ে রাখলে এটা তাই করবে অর্থাৎ পাথরেই হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 সদাচার

📄 সদাচার


সদাচার সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়, পক্ষান্তরে, কদাচার দুঃখ-দুর্দশার পথে নিয়ে যায়। একটি হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “সদাচরণের মাধ্যমে ঐ লোকের মর্যাদা লাভ করা যায় যে নাকি দিনভর নফল রোযা রাখে ও রাতভর নফল সালাত পড়ে।”

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- “আমি কি তোমাদেরকে সে লোকের কথা বলব না যে নাকি আমার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে? তারা হলো ; তোমাদের মাঝে যাদের আচরণ সর্বোত্তম।”

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
“এবং নিশ্চয়ই আপনি (হে মুহাম্মদ!) মহান চরিত্রের অধিকারী।” (৬৮-সূরা আল কালাম : আয়াত-৪)

“তখন আপনি (হে মুহাম্মদ!) আল্লাহর রহমতে তাদের প্রতি কোমল হয়েছিলেন; আর যদি আপনি কর্কশ-কঠোরাত্মা হতেন তবে তারা আপনার পাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে যেত।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৫৯)

“আর তোমরা মানুষের সাথে ভালো কথা বল।” (২-সূরা বাক্বারা : আয়াত-৮৩)

আয়েশা (রা) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র সম্বন্ধে বলেছেন- “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনেরই জীবন্ত বা বাস্তব রূপ।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 রাগ করবেন না

📄 রাগ করবেন না


“আর যদি তোমার মনে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা আসে তবে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-২০০)

নবী কারীম ﷺ তাঁর একজন সাহাবীকে এই বলে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, “তুমি রাগ করিও না!” একথা তিনি তিনবার বলেছিলেন। নবী কারীম ﷺ-এর সামনে যখন এক লোক রাগান্বিত হয়েছিল তখন তিনি ﷺ তাকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাইতে আদেশ করেছিলেন। “এবং আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, হে আমার প্রতিপালক! যাতে শয়তানরা আমার নিকট হাজির হতে না পারে।” (২৩-সূরা আল মু'মিনুন : আয়াত-৯৮)

“নিশ্চয় যারা মুত্তাকী, তাদেরকে যখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তৎক্ষণাৎ তাদের অন্তরদৃষ্টি খুলে যায়।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-২০১)

যা মানুষকে হতাশ ও বিষণ্ণ করে ক্রোধও তার মধ্যে একটি। নিচে রাগ দমন করার কয়েকটি পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-

১. রাগকে আপনার শত্রু মনে করে তা দমন করার জন্য প্রতিযোগিতা করুন। “এবং ক্রোধ সংবরণকারীগণ এবং মানুষদেরকে ক্ষমাকারীগণ, আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৩৪)
“আর যখন তারা ক্রুদ্ধ হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।” (৪২-সূরা আশ শুরা : আয়াত-৩৭)
“আর যখন মূসার রাগ পড়ল তখন তিনি ফলকগুলো তুলে নিলেন।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৫৪)

২. অজু করুন, কেননা ক্রোধ আগুনের একটি কণা, এটাকে পানি দ্বারা নিভানো যায়।

৩. আপনি দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়ুন আর বসা অবস্থায় থাকলে শুয়ে পড়ুন।

৪. ক্রুদ্ধ অবস্থায় চুপ থাকুন।

৫. যারা রাগ দমন করে ও যারা ক্ষমা করে তাদের পুরস্কারের কথা স্মরণ করুন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px