📄 কাজের মাধ্যমে একঘেঁয়েমিজনিত বিরক্তি দূর করুন
যাদের জীবনে কোন কাজ করতে হয় না তারাই গুজব ও মিথ্যা কথা ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের অধিকাংশ সময় নষ্ট করে। বিশেষ করে কল্যাণ-চিন্তাহীন মানসিকতার কারণেই তারা এমনটি করে থাকে।
رَضُوْا بِاَنْ يَّكُوْنُوْا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلٰى قُلُوْبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُوْنَ .
“পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থাকতে পারাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে, তাই তারা বুঝতে পারে না।” (৯-সূরা তাওবা : আয়াত-৮৭)
যখন আপনি নিজেকে অলস মনে করবেন তখন বিষণ্নতা ও হতাশাবোধ করবেন। কেননা, অলসতা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যত সব মুসিবতের কথা ভাবার মাধ্যমেই হয়। সুতরাং আপনার প্রতি আমার আন্তরিক উপদেশ এই যে, অলস না থেকে ফলপ্রসূ কাজ সম্পাদন করুন। কেননা, অলসতা হল ধীর ও ছদ্মবেশী আত্মহত্যা। অর্থাৎ অলসতার কারণে ধীরে ধীরে ও অজ্ঞাতে আত্মহত্যার ইচ্ছা মনে জাগ্রত হয়।
চীনদেশে কয়েদিদেরকে যে ধরনের ধীর অত্যাচার করা হয় বা শাস্তি দেওয়া হয় অলসতা হল সে ধরনের নিপীড়ন (আর তা হল) : তাদেরকে এমন এক টেপের (পানির কলের) নিচে রাখা হয় যে টেপ থেকে এক ঘণ্টা পর পর মাত্র এক ফোঁটা পানি পড়ে। কয়েক ফোঁটা পানির জন্য যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় ততক্ষণে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যায় আর তাতে অনেকে পাগল হয়ে যায়।
অকর্মা হওয়া মানে নিজের দায়িত্বের অবহেলা প্রদর্শন করা। অলসতা এক দফতর আর আপনার মন হল এর বলি বা শিকার। সুতরাং কাল বিলম্ব না করে এখনই উঠে পড়ুন ও প্রার্থনা করুন বা একটি ভালো বই পড়ুন, আপনার প্রভুর প্রশংসা করুন, লেখা-পড়া করুন। আপনার পাঠাগারকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখুন। আপনার বাড়িতে কোন কিছু এনে দিন, অথবা অন্যের উপকার করুন যাতে করে আপনি আপনার অকর্মণ্যতাকে শেষ করে দিতে পারেন বা কাটিয়ে উঠতে পারেন। আমি আন্তরিকভাবে আপনার কল্যাণ কামনা করি বিধায় আমি একথা বলছি। কাজ করে করে একঘেয়েমি জনিত বিরক্তি বিনাশ করে দিন। আপনি যখন শুধুমাত্র এ সাধারণ নীতি কথাটাই মানবেন তখন আপনি কমপক্ষে পঞ্চাশভাগ সুখের পথ পাড়ি দিলেন। কৃষক, কাঠমিস্ত্রি ও রুটি প্রস্তুতকারীকে দেখুন এবং ভালোভাবে লক্ষ্য করুন তারা কাজের সময় কীভাবে পাখির মতো সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে যায়, কারণ তারা পরিতৃপ্ত। তারপরে নিজের অবস্থা ভালোভাবে বিবেচনা করুন যে, সর্বদা নিজেকে নিপীড়ন করে, সর্বদা অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে চোখের পানি মুছতে মুছতে কীভাবে আপনার বিছানার উপর গড়াগড়ি খাচ্ছেন।
📄 অনেক কাজ জমে গেলে অতিরিক্ত কষ্টবোধ করবেন না
রবার্ট লুই স্টিভেনসন বলেছেন- “প্রতিটি ব্যক্তিই তার দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম-সে কাজগুলো যতই কঠিন হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না এবং প্রতিটি লোকই সূর্য ডুবা বা অস্ত পর্যন্ত তার সারাটা দিন সুখে কাটাতে সক্ষম আর সেটাই জীবনের অর্থ।”
স্টিফেন লীকক বলেছেন- “শিশু বলে: আমি যখন বালক হব…। বালক বলে: আমি যখন তরুণ হব… আর যখন সে সময় আসে তখন সে বলে: আমি যখন বিয়ে করব…। বিয়ের পরে কী ঘটে? আর এসব পর্যায় পার হওয়ার পর কী হয়? সবাই একটি চিন্তার পিছনে সদাই পড়ে আছে যে, যখন আমি অবসর হতে পারব…। কিন্তু, সে যখন সত্যিই বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে তখন পিছন ফিরে তাকায় (অর্থাৎ অতীতের বিষয় নিয়ে চিন্তা করে দেখে।) আর এক শীতল বায়ু প্রবাহে আক্রান্ত হয় (অর্থাৎ অতীতের দুঃসময় ঘটনার কথা ভেবে বিষাদিত হয়ে যায়)। (সে ভাবে যে) সে তার সারা জীবন (বৃথা) নষ্ট করেছে, এক মুহূর্তও (সুখে) কাটাতে পারেনি। আর আমরা এভাবেই অনেক পরে বা দেরীতে শিখতে পারি যে, বর্তমান কালের প্রতিটি মুহূর্তেই জীবনকে উপভোগ করাই বা বর্তমান কালের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোই (প্রকৃত সুখের) জীবন।”
যারা তওবা করতে বিলম্ব করে-এই হলো তাদের অবস্থা।
আমাদের একজন ধার্মিক পূর্বসূরি বলেছেন- “বিলম্ব করার ব্যাপারে এবং ‘আমি পরে করব’ এ কথা বলার ব্যাপারে আমি তোমাকে সতর্ক করছি কারণ, এটা এমন কথা যা মানুষকে ভালো কাজ করা থেকে বিরত রাখে এবং সওয়াবের কাজ করা থেকে পিছনে ফেলে দেয়।”
“তাদেরকে খাওয়া-দাওয়া ও ফুর্তি করতে দাও এবং মিথ্যা আশায় তারা মোহাচ্ছন্ন থাকুক। কেননা, শীঘ্রই তারা (প্রকৃত ঘটনা) জানতে পারবে।” (১৫-সুরা হিজর : আয়াত-৩)
📄 গুরুত্বপূর্ণ কাজে চাপ বেশি
গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত লোকের ঘাড়ে ভীষণ কাজের চাপ পড়ে। তাদের গুরুদায়িত্বের কারণে তাদের স্বাস্থ্য ও সুখ দূর হয়ে যায়। প্রচুর শ্রমসাধ্য ও চাহিদা পূর্ণ কাজে যে চাপ পড়ে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম।
কথিত আছে: “নেতা বা শাসক হতে চেয়ো না।”
“(আমাকে রক্ষা করার মতো) আমার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।” (৬৯-সূরা আল হাক্কাহ : আয়াত-২৬)
মনে করুন গোটা পৃথিবীটাই আপনার। অবশেষে এসব কিছু কোথায় যাবে? নিঃসন্দেহে এসব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।
“এবং একমাত্র তোমার মহাপ্রতাপশালী ও মহিমান্বিত প্রভুর সত্তাই চিরকাল অবশিষ্ট থাকবে।” (৫৫-সূরা আর রাহমান : আয়াত-২৭)
একজন বিজ্ঞলোক তার ছেলেকে সাবধান করে বলেছেন, “নেতা হতে চেয়ো না, কেননা নেতারা সর্বদা কষ্ট পায়।” অন্য কথায় বলা যায়, সর্বদা নেতা হওয়ার বা প্রধান হওয়ার আশা করিও না। নেতাদের ভাগ্যে থাকে তিক্ত সমালোচনা, গালি এবং কঠিন সমস্যা।
একজন আরব কবি বলেছেন-
إِنَّ نِصْفَ النَّاسِ أَعْدَاءٌ لِمَنْ * وَلِّيَ السُّلْطَةَ هَذَا إِنْ عَدْلٌ ۔
“অর্ধেক মানুষ শাসকের শত্রু, এটা তখন যখন নাকি সে ন্যায়পরায়ণ (আর অত্যাচারী হলে তো কথাই নেই, তখন সকলেই শত্রু)।”
📄 লৌহ-দৃঢ় ইচ্ছা
একটি মুসলিম দেশ থেকে একজন ছাত্র লন্ডনে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল। তাঁর ভাগ্যগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সে এক ব্রিটিশ পরিবারের সাথে থাকত। সে তার ধর্মের মূলনীতির প্রতিও একনিষ্ঠ ছিল এবং প্রতিদিন ভোররাত্রে ফজরের সালাত পড়ার জন্য উঠে পড়ত। সে অযু করত, সালাতের জায়গায় যেত, তাঁর প্রভুর উদ্দেশ্যে সেজদা করত (আল্লাহর) মহিমা গাইতো ও তাঁর প্রশংসা করত। সে বাড়ির এক বৃদ্ধা মহিলা এ ছাত্রটির এ আশ্চর্য অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করার জন্য আগ্রহী হল। কয়েকদিন পর বৃদ্ধা ছাত্রটিকে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি করছ?” “আমার ধর্ম আমাকে এরূপ করার আদেশ করে-” উত্তরে ছাত্রটি একথা বলল। পরিপূর্ণ বিশ্রাম করে আরেকটু পরে তুমি এ সালাত পড়তে পার না? ছাত্রটি এ কথার উত্তরে বলল, “কিন্তু আমি যদি সালাতের নির্ধারিত সময়ের পরে তা আদায় করি তবে আমার প্রভু আমার পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করবেন না।” তখন বৃদ্ধা মাথা নেড়ে বিস্ময়ে চিৎকার করে বলল, “এ এমন ইচ্ছা যা লৌহকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়।”
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيْهِمْ تِجَارَةٌ وَّ لَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللّٰهِ وَ اِقَامِ الصَّلٰوةِ وَ اِيْتَآءِ الزَّكٰوةِ ۚ
“এমন কিছু লোক আছে যাদেরকে না ব্যবসা, আর না বিক্রয়, কোনটাই আল্লাহর যিকির থেকে ও সালাত আদায় করা থেকে ভুলিয়ে রাখতে পারে না।” (২৪-সূরা আন নূর: আয়াত-৩৭)
এ ধরনের কাজ কেবলমাত্র দৃঢ় ঈমান থেকে উৎসারিত হয় যা ফেরাউনদের যাদুকরদিগকে (ঈমান আনতে) প্ররোচিত করেছিল। যখন মূসা (আ) ও ফেরাউন একে অপরের সাথে তর্ক করছিল তখন তারা সবকিছুর প্রভু আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে প্ররোচিত হয়েছিল। তারা ফেরাউনকে বলেছিল–
“আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর উপর আপনাকে আমরা কখনোই প্রাধান্য দিব না, সুতরাং আপনার যা মনে চায় সে ফায়সালাই করুন।” (২০-সূরা ত্বাহা: আয়াত-৭২)
এটা ফেরাউনদের বিরুদ্ধে এমন এক চ্যালেঞ্জ ছিল যা সে মুহূর্তের আগ পর্যন্ত (কেউ কখনও) শুনেনি। উন্মত্ত নাস্তিকের ইসলামের সত্য ও শক্তিশালী বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ায় হঠাৎ করে (তত্ক্ষণাৎ) তাদের প্রভুত্ব লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। হাবীব ইবনে যাযিদ (রা) মুসায়লামাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন। উত্তরে মুসায়লামা তরবারি দিয়ে হাবীব (রা)-এর দেহ থেকে এক এক করে এক এক অঙ্গ কেটে ফেলতে লাগল। সে হাবীব (রা)-এর ভোগান্তি বাড়ানোর জন্য ওরূপে ধীরে ধীরে তাকে কাটতে ছিল। এ সময় হাবীব (রা) কাঁদাকাটি, চেঁচামেচি ও নড়াচড়া করেননি, অবশেষে শহীদ হয়ে তাঁর প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করতে চলে গেলেন।
وَ الشُّهَدَآءُ عِنْدَ رَبِّهِمْ لَهُمْ اَجْرُهُمْ وَ نُوْرُهُمْ ؕ
“আর শহীদগণ তাদের প্রভুর সান্নিধ্যে থাকবে, (সেখানে) তাদের জন্য রয়েছে তাদের পুরস্কার ও তাদের নূর।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ: আয়াত-১৯)