📄 পাঠের উপকারিতা
১. পাঠ উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা দূর করে।
২. পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকাকালে মিথ্যাতে ডুবে থাকা থেকে বাঁচা যায়।
৩. স্বভাবগত পাঠ বা পড়ার অভ্যাস মানুষকে এত ব্যস্ত রাখে যে, অলস ও অকর্মাদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করা যায় না।
৪. ঘনঘন পাঠের দ্বারা বাগ্মিতার এবং স্পষ্ট বক্তব্যের গুণ লাভ করা যায়।
৫. পাঠ মনকে উন্নত করতে এবং চিন্তা-ভাবনাকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
৬. পাঠ জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং স্মৃতি ও বোধশক্তি উভয়কেই উন্নত করে।
৭. পড়ার মাধ্যমে অন্যদের অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞদের প্রজ্ঞা ও পণ্ডিতদের বোধ (বা বুঝ) দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়।
৮. ঘনঘন পড়ার দ্বারা জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্বন্ধে শিক্ষা করে সেগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করা ও উভয়বিধ যোগ্যতাই অর্জন করা যায়।
৯. কল্যাণকর বই পড়ার সময় বিশ্বাস বাড়ে বিশেষ করে আমলকারী মুসলিম লেখকদের বই পাঠে। এ ধরনের পুস্তক ধর্মোপদেশে পরিপূর্ণ আর এসব ধর্মোপদেশ কল্যাণের পথ দেখাতে ও অকল্যাণ থেকে দূরে সরাতে খুবই শক্তিশালী।
১০. পাঠ মনকে বিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করে এবং সময়কে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচায়।
১১. বারবার পাঠের দ্বারা বহু শব্দের উপর দক্ষতা অর্জন করা যায় এবং বিভিন্ন বাক্য গঠন শিক্ষা করা যায়। অধিকন্তু, ধারণা করার ও বুঝার ক্ষমতা উন্নত হয় যার কথা নিচের দু’পংক্তি কবিতার মাঝে লিখা আছে– “আত্মার পুষ্টি ধারণা করার ও বুঝার মাঝেই—খাদ্য ও পানির মাঝে নয়।”
📄 উপকরী জ্ঞান ও অপকারী জ্ঞান
“আর যাদেরকে ইলম ও ঈমান দান করা হয়েছে তারা বলবে : ‘সত্যিই তোমরা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আল্লাহর বিধান অনুসরণ করেছিলে (কিন্তু তোমরা তা জানতে না)’।” (৩০-সূরা আর রুম : আয়াত-৫৬)
কিন্তু জ্ঞান আছে উপকারী ও কিছু জ্ঞান আছে অপকারী। উপকারী জ্ঞানের ফলে ঈমানদারের ঈমান বৃদ্ধি পায়, পক্ষান্তরে কাফেররা এ ধরনের জ্ঞান অর্জন করে কোনরূপ উপকার লাভ করতে পারে না। যদিও অর্জিত তথ্য একই রকম ফলপ্রসূ। আল্লাহ তাঁর শত্রুদের সম্পর্কে বলেন : “তারা শুধু পার্থিব জীবনের বাইরের দৃশ্যটাই জানে বা চিনে। অথচ তারা পরকাল সম্বন্ধে গাফেল।” (৩০-সূরা আর রুম : আয়াত-৭) “বরং আখেরাত সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞান নেই, বরং তারা এ বিষয়ে সন্দেহে পড়ে আছে, বরং তারা এ বিষয়ে অন্ধ।” (২৭-সূরা আন নামল : আয়াত-৬৬) “ওটাই তাঁদের বিদ্যার দৌড়।” (৫৩-সূরা আন নাজম : আয়াত-৩০)
“(হে মুহাম্মাদ!), আপনি তাঁদেরকে ওই ব্যক্তির ঘটনা পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শনাবলি দান করেছিলাম, পরে সে সেসব নিদর্শনাবলি এড়িয়ে গেল। ফলে শয়তান তাঁর পিছু নিল, আর তাই সে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল। আর আমি যদি চাইতাম তবে তাকে আমি সেসব নিদর্শনাবলি দ্বারা উচ্চ মর্যাদা দান করতাম। কিন্তু সে পৃথিবীর প্রতি ঝুঁকে পড়ল ও তাঁর প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। অতএব, তাঁর উদাহরণ হলো কুকুরের মতো, যদি আপনি তাঁর উপর বোঝা চাপান তবে সে হাঁপাতে থাকে অথবা যদি আপনি (তাঁর উপর বোঝা না চাপিয়ে) তাকে এমনি ছেড়ে দেন তবুও সে হাঁপাতে থাকে। যে সম্প্রদায় আমার নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করেছে, তাঁদের উপমাও এরূপ। অতএব আপনি ঘটনা বর্ণনা করুন যাতে করে তারা ভেবে দেখে।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৭৫-১৭৬)
আল্লাহ ইহুদীদের সম্বন্ধে ও তাঁদের সত্য বিষয়ে জ্ঞান সম্বন্ধে বলেছেন : “যাদের উপর তাওরাতের দায়ভার অর্পণ করা হয়েছিল অতঃপর তারা তা বহন করেনি, তাঁদের উপমা হলো পুস্তকের বিশাল বোঝা বহনকারী গাধার মতো। যে সম্প্রদায় আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করল তাঁদের উপমা কতইনা নিকৃষ্ট!” (৬২- সূরা আল জুমুআ : আয়াত-৫)
তারা তাওরাতের সত্য বিষয়ে জানত। তবুও তারা তা মানত না। তারা তাওরাতের কথাকে বিকৃত করত। যারা জ্ঞানকে এরূপ জঘন্যভাবে ব্যবহার করত তারা কিভাবে সুখ পেতে পারত? এটা অবশ্যই তাঁদের জন্য সুসংবাদ হলো না, কেননা তারা তাঁদের সাধ্যমতো সর্বদাই সত্যকে নির্মূল করে দিতে চেষ্টা করত। “কিন্তু তারা হেদায়েতকে পছন্দ না করে বরং অন্ধত্বকে পছন্দ করল।” “এবং তাঁদের কথা, ‘আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত’ (একথা ঠিক নয়), বরং তাঁদের কুফরির কারণে আল্লাহ তাঁদের অন্তরসমূহের উপরে মোহর এঁটে দিয়েছিলেন। সুতরাং অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া তারা কেউই ঈমান আনবে না।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১৫৫)
ওয়াশিংটনের কংগ্রেসের লাইব্রেরিতে হাজার হাজার সম্ভবত মিলিয়ন মিলিয়ন পুস্তক আছে। সেখানে প্রত্যেক শতাব্দী, প্রত্যেক জাতি, প্রত্যেক সম্প্রদায় এবং প্রত্যেক কৃষ্টি ও সভ্যতা সম্বন্ধে পুস্তক আছে, অথচ এ মহামূল্যবান লাইব্রেরীর মালিক এমন এক জাতি, যারা তাঁদের প্রতিপালক আল্লাহকে অস্বীকার করে; এমন এক জাতি যাদের জ্ঞান এ পার্থিব বা বস্তু জগতের সীমাকে অতিক্রম করে না। যা এ পার্থিব জগতের বাইরে তারা তা শোনে না, দেখে না, অনুভব করে না এবং তারা তা বোঝে না। “এবং আমি তাঁদেরকে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তরকরণ সৃষ্টি করে দিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁদের শ্রবণশক্তি, দর্শনশক্তি ও তাঁদের হৃদয় তাঁদের কোন কাজে লাগেনি।” (৪৬-সূরা আল আহকাফ : আয়াত-২৬)
সত্য ও কাফেরদের সত্যের প্রতি বিরাগের উপমা হলো, যদিও পানি বিশুদ্ধ ও মিষ্ট তবুও যে পানি পান করছে তাঁর কাছে তা তিক্ত লাগছে (অর্থাৎ রোগের কারণে তাঁর মুখের স্বাদ বিকৃত হয়ে গেছে)। “আমি তাঁদেরকে কতইনা স্পষ্ট নিদর্শনাবলি দিয়েছিলাম!” (২-সুরা বাকারা : আয়াত-২১১) “আর তাঁদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি হতে কোন নিদর্শন তাঁদের নিকট আসলেই তারা তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিতো।” (৬-সুরা আন’আম : আয়াত-৪)
📄 বুঝে-শুনে ও ভেবেচিন্তে বেশি বেশি পড়াশুনা করুন
বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার লাভ করে ধন্য হতে হলে যা দরকার তা হলো : গবেষক মন, তত্ত্ব অন্বেষণ এবং এমন মেধা বা বুদ্ধি যা কারণ ও উদ্দেশ্য তালাশে পৃষ্ঠদেশের তলদেশের গভীরে ডুব দেয়। আর এগুলোই মনের শান্তি এনে দেয়।
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবলমাত্র জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।” (৩৫-সুরা ফাতির : আয়াত-২৮)
“বরং তারা যে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি তারা তা অস্বীকার করেছিল।” (১০-সুরা ইউনুস : আয়াত-৩৯)
আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তির সাধারণত খোলা মন থাকে এবং তিনি শান্তিতে থাকেন। পাশ্চাত্যের এক গবেষক বলেছেন— “আমি আমার টেবিলের ড্রয়ারে একটি বড় খাতা রাখি। এ খাতার ওপরে লেখা আছে, ‘যে সব বোকামি আমি করেছি,’ সারাদিন আমি যে সব বোকামি করি আমি এতে তা লিখে রাখি। আমি আমার ভুলসমূহ জেনে তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই আমি এ কাজ করি।”
এ বিষয়ে পূর্বের মুসলিম আলেমগণ তাঁকে পিছনে ফেলে দিয়েছেন। তারা যথাযথভাবে তাঁদের আমলের বিবরণ রাখতেন। “আর আমি আত্ম-তিরস্কারকারী ব্যক্তির শপথ করছি।” (৭৫-সুরা আল কিয়ামাহ : আয়াত-২)
হাসান বসরি (রা) বলেছেন— “একজন ব্যবসায়ী তাঁর অংশীদারের হিসাব যেভাবে রাখে একজন মুসলমান তাঁর নিজের হিসাব তাঁর চেয়েও কঠিনভাবে রাখে।”
রবী’ ইবনে মুসাইয়াব এক তওবা থেকে আরেক তওবা পর্যন্ত যা বলতেন তাঁর সবকিছুরই লিখে রাখতেন। যদি তাতে ভালো কথা পেতেন তবে আল্লাহর প্রশংসা করতেন আর যদি তাতে মন্দ কথা পেতেন, তবে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগের একজন ধার্মিক লোক বলেছেন— “চল্লিশ বছর আগে আমি একটি পাপ করেছি যার জন্য এখনও আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি।” “আর যারা যা দান করার তা দান করে অথচ সে অবস্থায় (আল্লাহর ভয়ে) তাঁদের অন্তরসমূহ প্রকম্পিত থাকে।” (২৩-সুরা মুমিনুন : আয়াত-৬০)
📄 বিদ্যা
ইবনে হাইয়্যাম উল্লেখ করেছেন যে, ইলমের (জ্ঞানের) একটি উপকারিতা এই যে, এটা মন থেকে কুমন্ত্রণাসমূহ দূর করে ও জ্ঞানীকে (আলেমকে) দুশ্চিন্তা ও সমস্যা থেকে মুক্ত করে। এটা নিশ্চিত জ্ঞান চর্চা, পড়াশোনা ও গবেষণা এবং যে অর্জিত বিদ্যাকে বাস্তবে প্রয়োগ করে (আমল করে), তাকেই আলেম (বিদ্যা শিক্ষার্থী) এর উচিত মুখস্থ করা, পড়া, পুনরায় পড়া, (ভুলচুক) খোঁজ করা ও গবেষণা করার মাঝে তাঁর সময়কে ভাগ করে দেওয়া।