📄 জ্ঞানের কল্যাণ
“আপনি যা জানতেন না, আল্লাহ আপনাকে তা শিখিয়েছেন। আর আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ চির মহান।” (সূরা-৪ আন নিসা : আয়াত-১১৩)
মূর্খতা মানুষের বিবেক ও আত্মাকে হত্যা করে। “আমি আপনাকে সতর্ক করছি, আপনি যেন একজন মূর্খ না হন।” (১১-সূরা হূদ: আয়াত-৪৬)
জ্ঞান এমন এক আলো, যা প্রজ্ঞার দিকে নিয়ে যায়। এটি মানুষের আত্মার প্রাণ ও চরিত্রের ইন্ধন। “যে মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি ও মানুষের মধ্যে চলার জন্য একটি আলো দিয়েছি, সে কি তার মতো, যে অন্ধকারে আছে এবং সেখান থেকে সে কখনও বের হয়ে আসতে পারবে না?” (৬-সূরা আল আন'আম: আয়াত-১২২)
সুখ ও মনের তেজ শিক্ষার মাধ্যমে আসে। কারণ জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ তাঁর উদ্দেশ্য পুরো করতে পারে এবং পূর্বে তাঁর থেকে যা গোপন করা হয়েছিল, তা আবিষ্কার করতে পারে। আত্মা স্বভাবগতভাবেই মনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। মূর্খতা হলো বিরক্তি ও বিষণ্ণতা। কেননা মূর্খ ব্যক্তি এমন জীবন যাপন করে, যা কখনও নতুন বা মন-উত্তেজক কিছু উৎসর্গ করে না। গতকাল আজকের মতোই, আজও পালাক্রমে আগামীকালের মতোই।
আপনি যদি সুখ চান তবে জ্ঞান ও শিক্ষার সন্ধান করুন, তাহলেই দেখবেন, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও দুঃখ-বেদনা আপনাকে ছেড়ে পালাবে। “এবং বলুন: ‘প্রভু! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন’।” (সূরা-২০ ত্বাহা: আয়াত-১১৪) “তোমার প্রভু–যিনি (তোমাকে এবং সবকিছু) সৃষ্টি করেছেন, তোমার সে (মহান) প্রভুর নামে পড়।” (৯৬-সূরা আল আলাক্ব: আয়াত-১)
নবী করীম ﷺ বলেছেন: “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।” অতএব, কেউ মূর্খ হলে সে যেন তাঁর সম্পদ ও তাঁর সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বড়াই না করে : তাঁর জীবন অর্থহীন এবং তাঁর কৃতিত্ব শোচনীয়ভাবে অসম্পূর্ণ। “আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার নিকট যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা সত্য বলে যে জানে তবে কি সে তাঁর মতো যে অন্ধ?” (১৩–সূরা রা‘আদ : আয়াত-১৯)
কুরআনের প্রসিদ্ধ মুফাস্সির আল্লামা যামাখশারী (রহ) কবিতাকারে বলেছেন–
১. ইলম শিক্ষায় আমি যে বিনিদ্র রজনী যাপন করি তা আমার কাছে সোহাগকারিণী রমণীর সঙ্গ বা আলিঙ্গনের চেয়েও বেশি প্রিয়।
২. কোন জটিল বিষয় বুঝার সময় আমার হৃদয়ের গভীরে আনন্দ-উল্লাস হয় তা আমার নিকট সর্বাপেক্ষা চমৎকার পানীয়ের চেয়েও বেশি সুস্বাদু।
৩. কাগজের উপরে (লেখার সময়ে) আমার কলমে যে খস্খস্ শব্দ হয় তা প্রেমিক-প্রেমিকার (আলিঙ্গনের শব্দের) চেয়েও বেশি মজাদার।
৪. কাগজের ধূলি ঝাড়ার সময় আমার হাতে যে শব্দ হয় তা ঢোল বাজানোর সময় নারীর হাতে যে শব্দ হয় তার চেয়েও বেশি আনন্দদায়ক।
৫. ওহে! যে শুধু বৃথা আশার মাধ্যমে আমার সমান মর্যাদা পাওয়ার চেষ্টা করে, অনেক বেশি উচ্চ বলে যে চড়তে কষ্ট পায় তাঁর মাঝে আর অন্যজন যে চড়ে ও ছোঁয়ায় পৌঁছে তাঁর মাঝে কতইনা বেশি পার্থক্য!
৬. আমি রাতভর জেগে থাকি আর তুমি তখন ঘুমিয়ে থাক, অথচ তুমি আমাকে ছাড়িয়ে যেতে চাও! শিক্ষা কতই না মহৎ! আর এর মাধ্যমে আত্মা কতই না সুখী হয়!”
“যে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর আছে সে কি তাঁর মত, যার জন্য তাঁর মন্দ কাজকে সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে আর যারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে?” (৪৭-সূরা মুহাম্মাদ বা কেতাল : আয়াত-১৪)
📄 বই আপনার উত্তম সঙ্গী
যে কাজ আনন্দ বয়ে আনে তা হলো বই পড়ে জ্ঞানার্জন করে মনকে উন্নত করা। আল জাহিয নামে একজন আরব লেখক কয়েক শতাব্দী পূর্বে বই পড়ে উদ্বিগ্নতা দূর করার জন্য নিম্নরূপ উপদেশ দিয়েছেন—
“(ভালো) বই এমন এক সঙ্গী যা অমঙ্গল, অকল্যাণ ও ক্ষতির দিকে আপনাকে প্রলোভন দেখায় না। এটা এমন বন্ধু যা আপনাকে বিরক্ত করে না। এটা এমন প্রতিবেশী যা আপনার কোন ক্ষতি করে না। এটা এমন একজন পরিচিত ব্যক্তি যিনি তোষামোদ করে আপনার থেকে কোন সুবিধা বাগিয়ে নিতে চায় না। এটা ছলনা ও মিথ্যার মাধ্যমে আপনাকে প্রতারণা করে না। বইয়ের পাতাগুলো পাঠকালে আপনার অনুভূতি শক্তিশালী ও মেধা তীক্ষ্ণ হয়। জীবনী পড়ে মানুষকে মূল্যায়ন করতে পারবেন।
এমনও বলা হয় যে, মাঝে মাঝে এক মাসে বইয়ের যে ক’পাতা পড়ে যা শেখা যায় তা সাধারণ জনগণের মুখ থেকে একশত বছরেও শেখা যায় না। এসব কিছুই উপকার করে অথচ এতে সম্পদের ক্ষতি হয় না এবং বেতনের জন্য অপেক্ষাকারী শিক্ষকের দরজায় ধরনা ধরতে হয় না অথবা এমন কারো কাছ থেকে শিখতে হয় না যে আচার-আচরণে আপনার চেয়ে নিম্ন মানের। বই দিনে ও রাত্রে, ঘরে ও বাইরে (ভ্রমণকালে) আপনার আনুগত্য করে। বই (শিক্ষকের মতো) তন্দ্রা আসাতে এমনকি গভীর রাতেও ক্লান্ত হয়ে পড়ে না।
এটা এমনই শিক্ষক, যখনই আপনার দরকার তখনই এটা আপনার সেবায় নিয়োজিত। এটা এমন শিক্ষক যাকে আপনি বেতন না দিলেও এটা আপনাকে সেবা (তথা জ্ঞান) দিতে নারাজ হয় না। আপনি এটাকে পরিত্যাগ করলেও এটা আপনার আনুগত্য কমিয়ে দেয় না। সবাই যখন আপনার বিরোধী হয়ে শত্রুতা দেখায় তখন এটা আপনার পাশে থাকে (ও আপনাকে সাহায্য করে)। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বইয়ের সাথে সম্পর্ক রাখবেন ততক্ষণ পর্যন্ত অলসদের সঙ্গ আপনার দরকার নেই। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পথচারীদেরকে দেখা থেকে এটা আপনাকে বিরত রাখবে। হ্যাংলা, চপল স্বভাব, অশ্লীল ভাষাভাষী ও গণ্ডমূর্খদের সাথে মেলামেশা করা থেকে বই আপনাকে রক্ষা করবে। বইয়ের শুধুমাত্র যদি এ একটাই উপকারিতা থাকত যে, এটা আপনাকে বোকার মতো দিবাস্বপ্ন দেখা থেকে ও হ্যাল্লাপনা করা থেকে বিরত রাখে, তবুও এটাকে অবশ্যই আপনার এমন একজন সত্যিকার ও প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গণ্য করতে হবে যিনি নাকি আপনাকে মহা অনুগ্রহ দান করেছেন।”
📄 বইয়ের মাহাত্ম্য নিয়ে কিছু কথা
আবু উবাইদা বলেছেন— “মুহাল্লাব তাঁর পুত্রকে নিম্নোক্ত উপদেশ দিয়েছেন, ‘হে বৎস! বর্ম বিক্রেতা বা পুস্তক বিক্রেতার সান্নিধ্য ছাড়া বাজারে সময় নষ্ট করবে না’।”
হাসান লু’লুয়ী বলেছেন— “চল্লিশ বছর যাবৎ দিনে-রাতে যখনই ঘুমতে যাই না কেন একটা পুস্তক আমার বুকের উপর থাকেই।”
ইবনে যাহম বলেছেন— “প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুমানো ক্ষতিকর; ঘুমের সময় আমার যখন তন্দ্রা আসে তখন আমি একটি জ্ঞানগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বই হাতে তুলে নেই এবং কোন (প্রজ্ঞার) মুক্তার সাক্ষাৎ বা সন্ধান পেলে আমি কল্যাণ লাভ করি। যখন মনের সুখে বই পড়ায় ডুবে থাকি ও (জ্ঞানগর্ভ কথা) শুনতে থাকি তখন গাধার তীক্ষ্ণ ডাক ও কোন কিছু ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দ শুনে যতটা সতর্ক হই তাঁর চেয়েও বেশি সতর্ক থাকি।”
তিনি আরও বলেছেন— “যদি আমি কোন বইকে মনোরম ও উপভোগ্য পাই এবং আমি এটাকে উপকারী মনে করি তবে তুমি আমাকে দেখবে যে, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে খুঁজছি যে কত পৃষ্ঠা বাকি আছে এ ভয়ে যে (এ মজাদার বইটি পড়া) শেষ হয়ে যাচ্ছে কিনা। যদি এটা বহু পৃষ্ঠা সম্বলিত অনেক খণ্ডের পুস্তক হয় তবে আমার জীবনকে ধন্য ও সুখেতে পরিপূর্ণ পাই।”
“এ কিতাব যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, অতএব এ কিতাব দিয়ে (মানুষকে) সতর্ক করতে এর সম্বন্ধে আপনার মনে যেন কোন সঙ্কোচ না থাকে এবং (এ কিতাব) মুমিনদের জন্য উপদেশ।” (৭-সূরা আল আ’রাফ : আয়াত-২)
📄 পাঠের উপকারিতা
১. পাঠ উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা দূর করে।
২. পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকাকালে মিথ্যাতে ডুবে থাকা থেকে বাঁচা যায়।
৩. স্বভাবগত পাঠ বা পড়ার অভ্যাস মানুষকে এত ব্যস্ত রাখে যে, অলস ও অকর্মাদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করা যায় না।
৪. ঘনঘন পাঠের দ্বারা বাগ্মিতার এবং স্পষ্ট বক্তব্যের গুণ লাভ করা যায়।
৫. পাঠ মনকে উন্নত করতে এবং চিন্তা-ভাবনাকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।
৬. পাঠ জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং স্মৃতি ও বোধশক্তি উভয়কেই উন্নত করে।
৭. পড়ার মাধ্যমে অন্যদের অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞদের প্রজ্ঞা ও পণ্ডিতদের বোধ (বা বুঝ) দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়।
৮. ঘনঘন পড়ার দ্বারা জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্বন্ধে শিক্ষা করে সেগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করা ও উভয়বিধ যোগ্যতাই অর্জন করা যায়।
৯. কল্যাণকর বই পড়ার সময় বিশ্বাস বাড়ে বিশেষ করে আমলকারী মুসলিম লেখকদের বই পাঠে। এ ধরনের পুস্তক ধর্মোপদেশে পরিপূর্ণ আর এসব ধর্মোপদেশ কল্যাণের পথ দেখাতে ও অকল্যাণ থেকে দূরে সরাতে খুবই শক্তিশালী।
১০. পাঠ মনকে বিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করে এবং সময়কে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচায়।
১১. বারবার পাঠের দ্বারা বহু শব্দের উপর দক্ষতা অর্জন করা যায় এবং বিভিন্ন বাক্য গঠন শিক্ষা করা যায়। অধিকন্তু, ধারণা করার ও বুঝার ক্ষমতা উন্নত হয় যার কথা নিচের দু’পংক্তি কবিতার মাঝে লিখা আছে– “আত্মার পুষ্টি ধারণা করার ও বুঝার মাঝেই—খাদ্য ও পানির মাঝে নয়।”