📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 অতীত আর কখনো ফিরে আসবে না

📄 অতীত আর কখনো ফিরে আসবে না


“যা তোমরা পাওনি তা নিয়ে তোমরা যাতে দুঃখ না কর।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২৩)

আদম (আ) মূসা (আ)-কে বলেছেন— “আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করার ৪০ (চল্লিশ) বছর পূর্বে আমার তকদীরে বা ভাগ্যে যা নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন তাঁর জন্য তুমি কি আমাকে দোষারোপ কর?” এ কথাটি সম্বন্ধে নবী করীম ﷺ বলেছেন— “আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন, আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন, আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন।”

তোমার নিজের মাঝে সুখের সন্ধান করো, তোমার চারিপাশে বা বাহিরে নয়। উর্বর ইংরেজ কবি মিল্টন বলেছেন— "Verily, the mind on its own is capable of transforming paradise into hell and hell into paradise!" (অর্থাৎ মন নিজেই স্বর্গ থেকে নরকে এবং নরক থেকে স্বর্গে রূপান্তরিত হতে পারে।)

আরব কবি মুতানাব্বি বলেছেন— “বুদ্ধিমান ব্যক্তি ধনী অবস্থায় তাঁর প্রতিভার কারণে ভোগে; অথচ, মূর্খ ব্যক্তি দরিদ্র অবস্থায় সুখী।”

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 আপনার জীবন মহামূল্য সময়ে পরিপূর্ণ

📄 আপনার জীবন মহামূল্য সময়ে পরিপূর্ণ


আলী তানতাবী দুটি তীক্ষ্ণ মর্মভেদী ও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে—বৈরুত সমুদ্র উপকূলে তিনি প্রায় ডুবে গিয়েছিলেন। তিনি যখন ডুবে যাচ্ছিলেন ও তাঁর মৃত্যুর অবস্থা ঘনিয়ে আসছিল তখন তিনি তাঁর প্রভুর নিকট সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করলেন এবং আকাঙ্ক্ষা করতে ছিলেন যদি তিনি এক ঘণ্টার জন্য হলেও জীবন ফিরে পান তবে তিনি তাঁর ঈমানকে ও তাঁর আমলে সালেহাকে নতুনভাবে শক্তিশালী করবেন। যাতে করে তাঁর ঈমান সর্বদিক ছড়ায়া পৌঁছায়ে। এমন সময় তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন ও সে অবস্থায়ই তাঁকে তীরে উঠানো সম্ভব হলো।

দ্বিতীয়টি : সিরিয়া থেকে মক্কায় হজ্ব করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এক মক্কারী কাফেলার সাথে যোগ দিলেন। তাবুকের মরুভূমিতে তারা পথ হারিয়ে তিন দিন উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ালেন। যখন তাঁদের পানাহারের সরবরাহ শেষ হয়ে যেতে শুরু করল তখন তাঁদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল যে মৃত্যু আসন্ন। এ অবস্থায় তিনি দাঁড়িয়ে লোকদের সামনে এক ভাষণ দিলেন। এটা জীবনের বিদায়কালীন ভাষণের মতো ছিল। এ ভাষণ এমনই হৃদয়গ্রাহী ছিল যে এতে তিনি ও তাঁর শ্রোতাগণ কেঁদে ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর ঈমান বাড়ছে এবং তিনি যথার্থই বুঝতে পারলেন যে মহান আল্লাহ ছাড়া কেউই তাঁদেরকে রক্ষা করতে বা সাহায্য করতে পারবে না।

“আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। তিনি প্রতি দিন (এখানে দিন বলতে মুহূর্ত বা সময় বুঝায়) কাজে রত।” (৫৫-সূরা আর রাহমান : আয়াত-২৯)

“আর কত নবী যুদ্ধ করেছেন আর তাঁদের সাথে বহু ধার্মিক লোকজন ছিল। আল্লাহ্র পথে তাঁদের যে বিপদ হয়েছিল তাতে তারা মনোবল হারায়নি, দুর্বল হয়নি ও নত হয়নি, আর আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৬)

আল্লাহ্র অবশ্যই সে সব শক্তিশালী মুমিনদেরকে ভালোবাসেন যারা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে তাঁদের শত্রুদের মোকাবেলা করেন। তারা হাল ছেড়ে দেন না বা রণে ভঙ্গ দেন না, হতাশ বোধ করেন না বা অন্যদের হাতে নিজেদেরকে অপমানিত হতে দেন না। বরং, তারা কঠোর চেষ্টা বা সংগ্রাম করেন। আল্লাহ্র প্রতি ঈমান, রাসূলের প্রতি ঈমান ও ইসলাম ধর্মের প্রতি ঈমানের কারণে ঈমানদারদের উপর এসব কাজ বাধ্যতামূলক। নবী করীম ﷺ বলেছেন— “শক্তিশালী মুমিন ব্যক্তি দুর্বল মুমিন ব্যক্তির চেয়ে আল্লাহ্র নিকট অধিক ভালোবাসা ও প্রিয়; আর তাঁদের প্রত্যেকের মাঝে কল্যাণ আছে।”

আবু বকর (রা) নবী করীম ﷺ-কে বিষধর দংশন থেকে রক্ষা করার জন্য গর্তের মুখে নিজের একটি অঙ্গুলি রেখে দিয়েছিলেন আর এর ফলে বিষাক্ত প্রাণী তাকেই দংশন করেছিল, তাই নবী করীম ﷺ কুরআনের আয়াত পড়ে তাঁর অঙ্গুলিতে ফুঁক দিলেন আর এতেই আল্লাহ্র হুকুমে তাঁর অঙ্গুলি ভালো হয়ে গেল। একজন লোক আনতারাকে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বীরত্বের রহস্য কী যা দিয়ে তুমি মানুষকে পরাজিত কর?” তিনি উত্তর দিলেন, “তোমার অঙ্গুলি আমার মুখে রাখ আর আমার অঙ্গুলি তোমার মুখে রাখতে দাও।” প্রত্যেকেই নিজের অঙ্গুলি অন্যের মুখে রাখল এবং প্রত্যেকেই একে অপরের অঙ্গুলি কামড়াতে শুরু করল। লোকটি বেদনায় চিৎকার দিয়ে উঠল, সে ধৈর্য ধরতে পারল না। আনতারা তাই তাঁর মুখ থেকে লোকটির অঙ্গুলি বের করে ফেলল এবং বললেন, “এভাবেই আমি বীরদেরকে পরাজিত করি।” অন্য কথায়, ধৈর্যের মাধ্যমে ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি অন্যকে পরাজিত করেন।

ঈমানদার যখন বুঝতে পারে, সে আল্লাহ্র রহমতের, দয়া ও ক্ষমার সান্নিধ্যে আছে তখন তাঁর মনোবল বৃদ্ধি পায়। সে তাঁর ঈমান অনুপাতে আল্লাহ্র রক্ষণাবেক্ষণকে অনুভব করতে পারে। “এমন কোন বস্তু নেই যা আল্লাহ্র সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা ও মহিমা বর্ণনা করে না (অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুই আল্লাহ্র তসবীহ পাঠ করে), অথচ তোমরা তাঁদের তসবীহ পাঠ বুঝতে পার না।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-৪৪)

এদেশের কৃষকেরা জমি চাষ করার সময় প্রায়ই গল্পগুজব করে তাঁদের সময় কাটায়। “হে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা! তোমার হাতে একটি শুষ্ক দেশে একটি শুষ্ক বীজ!” “তবে কি তোমরা যে বীজ বপন কর তাঁর কথা ভেবে দেখেছ? (তাহলে বলো তোমরা কি সে বীজ থেকে ফসল) উৎপন্ন কর নাকি আমি উৎপন্ন করি?” (৫৬-সূরা ওয়াকিয়া : আয়াত-৬৩-৬৪)

অন্ধ বাগ্মী বক্তা আব্দুল হামিদ কিশক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মিম্বরে উঠলেন। তারপর তাঁর পকেট থেকে এমন একখানি খেজুরের ডাল বের করলেন যাতে প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর হরফে ‘আল্লাহ’ শব্দটি লেখা ছিল। তারপর তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন— “চাহো ওই শ্যামশায়ী তরু পানে, কে সুজিয়ায় তারে, তারে সাজাল সবুজ শোজনে? তিনি আল্লাহ্, প্রকৃষ্ট ক্ষমতার আধার যিনি।”

এই বাগ্মী (হৃদয়গ্রাহী কথা) শুনে সমবেত জনতা কান্নায় ভেসে পড়ল। তিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, সারা জগতে তাঁর নিদর্শনের ছাপ আছে। সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিটি একক সত্তা, অনুৎপাদক, প্রভু ও উপাস্য হিসেবে তাঁকে ডাকো। “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এ বিশ্বজগতকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি; (আমরা আপনার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি।)” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৯১)

আমাদের প্রভু যে করুণাময় এবং যে ব্যক্তি তওবা করে তাঁর অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন এবং সুখে তাঁর অনুগ্রহ করেন তা আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে বেষ্টন করে আছে। মহান আল্লাহ্ বলেন— “আর আমার করুণা সব কিছুকে ঘিরে রেখেছে।” আল্লাহ্র দয়া কতইনা বিশাল! একটি সহীহ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক মরুবাসী আরব নবী করীম ﷺ-এর সাথে সালাম আদান প্রদান করছিল, সে হাসি মুখে প্রার্থনা করল, “হে আল্লাহ্! আমাকে ও মুহাম্মাদকে করুণা করুন এবং আমাদের সাথে অন্য কাউকে করুণা করবেন না।” তখন নবী করীম ﷺ তাঁকে বললেন, “তুমি অবশ্যই প্রশস্ত জিনিসকে সংকীর্ণ করে দিলে।”

“এবং তিনি মুমিনদের প্রতি সদা পরম করুণাময়।” (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-৪৩)

এক যুদ্ধের পর এক মহিলা তাঁর সন্তানকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করার জন্য নবী করীম ﷺ-এর সাহাবীদের মাঝে দৌঁড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে নবী করীম ﷺ বললেন— “এই মহিলা তাঁর সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি তাঁর চেয়েও বেশি দয়ালু।”

একটি সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে আদেশ করে গেছে যে, তাঁর মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর ছাইকে যেন জমিনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ্ সেগুলোকে একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আমার বান্দা! তুমি যে কাজ করেছ তা কী উদ্দেশ্যে করেছ?” লোকটি বলল, “হে আমার প্রভু! আমি আপনাকে ভয় করেছি এবং আমার পাপের ভয় করেছি।” তাই তখন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন। “আর যে ব্যক্তি তাঁর প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করল ও নিজেকে কুপ্রবৃত্তি হতে বিরত রাখল, নিশ্চয় জান্নাত হবে তাঁর ঠিকানা।” (৭৯-সূরা আন নাযি'আত : আয়াত-৪০-৪১)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 এক সময়ে একটি মাত্র পদক্ষেপ

📄 এক সময়ে একটি মাত্র পদক্ষেপ


জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণদানকালে বক্তাকে অবশ্যই পর্যায়ক্রমিক, নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক বলতে বুঝায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রথমে আলোচনা করা উচিত। নবী করীম ﷺ যখন মুয়াজ (রা)-কে ইয়েমেনে পাঠান তখন রাসূল ﷺ তাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা দ্বারা এ কথার সত্যতার সমর্থন পাওয়া যায় : “প্রথমে তাদেরকে তোমরা যে কাজের প্রতি আহ্বান করবে তা হলো এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া—আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল।”

আমাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আমরা অনেকেই বুঝি যে, আমাদের ক্রমশ উন্নতি চাওয়া উচিত। তবে কেন আমরা একসাথে সবকিছু মানুষের গলার ভিতর ঢুকিয়ে দেই! “এবং কাফেররা বলল, ‘তবে কেন গোটা কুরআন একসাথে, একবারে তাঁর উপর অবতীর্ণ হলো না?’ এর দ্বারা আপনার অন্তরকে আমি মজবুত করার জন্যই এভাবে (ধাপে ধাপে) আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং একে সুস্পষ্ট ক্রমে ধাপে ধাপে আবৃত্তি করিয়েছি এবং আপনার নিকট অবতীর্ণ করেছি।” (২৫-সূরা আল ফুরকান : আয়াত-৩২)

ইসলামের শিক্ষা অর্জনে মুসলমানদের শান্তি ও আরামবোধ করা উচিত, বিশেষ করে এ কারণে যে, ইসলাম মানুষকে অর্থজড়ত্ব থেকে রক্ষা করার জন্য এসেছে। ‘তাকলিফ’ কথার একটি গূঢ়ার্থ হলো—বোঝা চাপানো, যা কুরআনে নেতিবাচক অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে। “আল্লাহ কারো উপর তাঁর সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-২৮৬)

সাহাবীগণ যখন নবী করীম ﷺ-এর নিকট সাধারণ উপদেশ বা দিক-নির্দেশনা চাইতে আসতেন তখন তিনি তাদেরকে ব্যাপক অর্থবোধক কিন্তু সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিতেন, যা সহজেই মনে থাকত। প্রশ্নকারীর অবস্থা বুঝার পর আল্লাহ্র নবী ﷺ সর্বদা বাস্তব ও সহজ উত্তর দিতেন। যখন আমরা ভ্রান্তির নিকট আমাদের অধিকারের যত উপদেশ, শিক্ষা, আচার-আচরণ ও প্রজ্ঞা আছে তাঁর সবটাই উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, তখন আমরা সাংঘাতিক ভুল করি। “আর কুরআনকে আমি (আয়াতে আয়াতে) বিভক্ত করে আপনার নিকট অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি একে মানুষের নিকট থেমে থেমে পাঠ করতে পারেন।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-১০৬)

📘 লা-তাহযানঃ হতাশ হবেন না 📄 মূল্যবান মুহূর্ত

📄 মূল্যবান মুহূর্ত


আত-তানুখী বাগদাদের এক গভর্নরের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেই গভর্নর তাঁর প্রদেশের এক বৃদ্ধা মহিলার সম্পদকে জবর দখল করে নিয়েছিল। সে বৃদ্ধা মহিলার সকল অধিকার হরণ করে নেয় ও তাঁর সম্পদকে ক্ষমতার বলে বাজেয়াফত করে দেয়। বৃদ্ধা তাঁর নিকট গেল, তাঁর সামনে কান্নাকাটি করল ও তাঁর অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। গভর্নর যা করেছে তাঁর জন্য সে না হলো অনুতপ্ত আর না হলো লজ্জিত। রাগান্বিত হয়ে বৃদ্ধা বলে ফেলল— “আমি তোমার বিরুদ্ধে বদ দোয়া করব।” গভর্নর উপহাসের হাসি হেসে বৃদ্ধাকে বলল, “তাহলে তো রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আপনার প্রার্থনা করা উচিত।”

তাঁর ঔদ্ধত্যই তাঁকে বৃদ্ধাকে একথা বলতে বাধ্য করেছিল। বৃদ্ধা চলে গেল এবং গভর্নরের বিদ্রূপাত্মক উপদেশ অনুসারেই বৃদ্ধা অবিচলচিত্তে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রার্থনা করতে থাকেন। মাত্র কয়েকদিন যেতে না যেতেই গভর্নরকে অফিস থেকে প্রচণ্ড অপমানে অপসারণ করা হলো। তাঁর অত্যাচারের ফলস্বরূপ তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং তাঁকে প্রকাশ্যে চাবুক মারা হলো। চাবুক মারার পর, বৃদ্ধা তাঁর পাশ দিয়ে গেল ও তাঁকে বলল, “তুমি খুব ভালো কাজ করেছ! তুমি আমাকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে প্রার্থনা করতে বলেছ আর তদনুযায়ী আমি সর্বাপেক্ষা সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছি!”

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ আমাদের জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান সময়। কেন? এ সময় মহান আল্লাহ্ বলেন— “কোন প্রার্থী আছে কি যাকে আমি দান করব? কোন ক্ষমা প্রার্থী আছে কি যার ডাকে আমি ক্ষমা করব? কোন আহ্বানকারী আছে কি যার ডাকে আমি সাড়া দিব?”

শৈশবকাল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত আমি কিছু ঘটনা মনে করতে পারি যাতে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাহায্য একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। প্রায় দশ বছর আগে, আমি বিমানে চড়ে আবহা থেকে রিয়াদ যাচ্ছিলাম। বিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ঘোষণা দেওয়া হলো যে, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বিমান আবহাতে ফিরে যাচ্ছে। অতপর তারা সমস্যা সমাধান করেছে বলে দাবি করল এবং আমরা দ্বিতীয়বারের মতো আকাশে উড়লাম। রিয়াদে রানওয়ের নিকটবর্তী হওয়ার সময় অবতরণের চাকাগুলো খুলছিল না। আমরা পুরো এক ঘণ্টা রিয়াদ শহর প্রদক্ষিণ করলাম। পাইলট বিমান অবতরণ করার জন্য দশবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই ল্যান্ডিং গিয়ার কাজ করল না।

আমরা যখন আকাশে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে ছিলাম তখন বিমানের বহু লোক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেল এবং প্রচুর পরিমাণে চোখের পানি ঝরতে লাগল। সেই মুহূর্তে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম যে, জীবন কত তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী এবং আমাদের আস্থা পরকালমুখী হয়ে গিয়েছিল। আমরা বারবার বলতে লাগলাম— “একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ্ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য আর তিনি সকল বিষয়ের উপরই ক্ষমতাশীল।” এক বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে লোকজনকে আল্লাহর নিকট তওবা করার জন্য, তাঁর নিকট প্রার্থনা করার জন্য, ক্ষমা চাওয়ার জন্য এবং অনুতপ্ত হওয়ার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন।

আর আল্লাহ্ মা'বূদ সম্বন্ধে বলেছৈন— “আর যখন তারা জাহাজে (নৌযানে) চড়ে তখন তারা আল্লাহর প্রতি ঈমানকে খাঁটি করে তাঁকে (আল্লাহকে) ডাকে।” (২৯-সূরা আল আনকাবুত: আয়াত-৬৫) আমরা একমাত্র তাঁর নিকটেই সনির্বন্ধ অনুরোধ করলাম যিনি বিপদাপদের ডাকে সাড়া দেন। এবার বারবার চেষ্টার সময় আমরা নিরাপদে অবতরণ করলাম। আর যখন বিমান অবতরণ করল তখন আমরা যেন কবর থেকে ফিরে আসছিলাম। চোখের পানি শুকিয়ে গেল, মুখে হাসি ফুটল আর আমাদের মনের শান্তি ফিরে এল। আল্লাহ্ কতইনা করুণাময় ও দয়াময়!

একজন আরবী কবি বলেছেন—
“কুতুবওয়াহীন যখন আমরা বিপদগ্রস্ত হয়েছি তখন আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি! কিন্তু যখন আমাদের বিপদ কেটে গেছে তখন আমরা তাকে ভুলে গেছি!
সাগরে থাকাকালে আমাদের জাহাজকে রক্ষা করার জন্য আমরা তাকে ডেকেছি! কিন্তু যখন আমরা নিরাপদে তীরে ভিড়েছি তখন আমরা তার অবাধ্যতা করেছি!
আর আমরা (বিমানে করে) নিরাপদে ও শান্তিতে আকাশে উড়ছি; অথচ আমরা পড়ে যাই না; কেননা, (আমাদের) রক্ষক হলেন আল্লাহ!”

ফন্ট সাইজ
15px
17px