📄 মনে করুন আজই শেষ দিন
আপনি যখন প্রত্যুষে জেগে ওঠেন তখন সন্ধ্যাকে প্রত্যক্ষ করার আশা করবেন না বরং এমনভাবে জীবনযাপন করুন যেন আজই আপনার শেষ সকাল। গতকাল ভালোয় আর মন্দে কেটে গেছে, আর আগামীকাল তো এখনো আসেনি। আপনার জীবনকাল মাত্র একদিন, আপনি যেন আজই জন্মগ্রহণ করেছেন আর দিনের শেষে মারা যাবেন। এ মনোভাব থাকলে আপনি অতীতের সকল দুশ্চিন্তা ও ভবিষ্যতের সকল অনিশ্চিত আশার নেশায় ব্যস্ত হয়ে থাকবেন না। কেবল আজকের দিনটির জন্যই যেন বেঁচে থাকবেন; সারাটা দিন আপনার উচিত জাগ্রত হৃদয়ে প্রার্থনা করা, বুঝে-শুনে কুরআন তিলাওয়াত করা, মহান আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা। প্রতিটি দিনেই আপনার কার্যক্রমে ভারসাম্য বজায় রাখা, তকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আপনার স্বাস্থ্য ও বাহ্যাকৃতি তথা সাজসজ্জা, রূপচর্চা, বেশভূষা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পোশাক পরিচ্ছদ সম্বন্ধে সতর্ক থাকা উচিত।
নোট : যারা কুরআন তিলাওয়াত করার সময় পান না তাঁদের জন্য একটি পরামর্শ হচ্ছে— পুরুষগণ প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত জামায়াতের কিছু সময় আগে মসজিদে চলে যান ও জামায়াতের পূর্বের অতিরিক্ত সময়টুকু কুরআন তিলাওয়াতে অতিবাহিত করুন আর মহিলারা প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর কিছু সময় সালাতের জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত করুন। –মোঃ রফিকুল ইসলাম।
দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিকভাবে পরিচালিত করুন বা যথাযথভাবে কাজে লাগান, যাতে করে আপনি কয়েক মিনিটে কয়েক বছরের ফায়দা এবং কয়েক সেকেন্ডে কয়েক মাসের ফায়দা হাসিল করতে পারেন। আপনার প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তাঁর জিকির করুন, এ ধরাধাম (দুনিয়া) থেকে শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত থাকুন এবং অবশিষ্ট সময়টুকুকে সুখ-শান্তিতে বেঁচে থাকুন। আপনার রিযিক, আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানাদি, আপনার কাজ, আপনার গৃহ এবং আপনার জীবনযাপনের উপর সন্তুষ্ট থাকুন।
“আমি আপনাকে যা দান করেছি তা গ্রহণ করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হোন।” (৭-সূরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৪৪)
আজকের দিনটি দুঃখ-বেদনা, বিরক্তি, ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত অবস্থায় কাটান। আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় একটি কথা সোনার হরফে খোদাই করে লিখে রাখুন, আর সেটা হচ্ছে— “আজই আমার একমাত্র দিন।” আজ যদি আপনি টাটকা খাবার খেয়ে থাকেন তবে গতকালের বাসি খাবার ও আগামীকালের প্রত্যাশিত খাবারে তেমন কী আসে যায়?
আপনার নিজের উপর যদি আপনার আস্থা থেকে থাকে এবং আপনার যদি একটা দৃঢ়, বলিষ্ঠ, অনড় ও স্থির সংকল্প থেকে থাকে তবে আপনি নিজেই সন্দেহাতীতভাবে পরবর্তী কথাটির উপর দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদন করতে পারবেন : (কথাটি হলো) “আজই আমার জীবনের শেষ দিন।” যখন আপনি এই মনোভাব অর্জন করতে পারবেন তখন আপনি আপনার ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে, আপনার ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়িয়ে এবং আপনার কাজকর্মকে পরিশুদ্ধ করে আপনার দিনের প্রতিটি মুহূর্ত হতেই মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। তারপর আপনি মনে মনে বলুন—
আজ আমি আমার কথাবার্তাকে পরিশুদ্ধ করব এবং কোনোরূপ মন্দ ও অশ্লীল কথা উচ্চারণ থেকে বিরত থাকব। আমি কারো গীবতও করব না। আজ আমি ঘর ও অফিস গুছাবো। সেগুলো অগোছালো ও এলোমেলো থাকবে না, বরং গোছালো ও ফিটফাট থাকবে। আজ আমি আমার শরীরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বাইরের ঠাঁট সম্বন্ধে বিশেষ যত্নবান হব। আমি আমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা সম্বন্ধে অতিশয় সতর্ক হব এবং আমার চলাফেরা, কথাবার্তা ও কাজকর্মে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখব।
আজ আমি আমার প্রতিপালকের প্রতি অনুগত থাকতে, সম্ভাব্য সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সালাত আদায় করতে, অধিক নফল ইবাদত করতে, কুরআন তিলাওয়াত করতে এবং উপকারী বই-পুস্তক ও ভালো কিতাবাদি পড়তে আপ্রাণ চেষ্টা করব। আজ আমি আমার অন্তরে ভালো কাজের বীজ বপন করব এবং অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, ভণ্ডামি, কপটতা ও মোনাফেকির মতো মন্দ কাজের মূলোৎপাটন করব। আজ আমি অন্যদেরকে সাহায্য করার (তথা রোগী দেখতে যাবার, জানাযার সালাতে উপস্থিত হবার, পথহারাকে পথ দেখানোর এবং ক্ষুধার্থকে খাবার খাওয়ানোর) চেষ্টা করব। আজ আমি মজলুমের পাশে দাঁড়াব। আমি বিজ্ঞ জনকে সম্মান প্রদর্শন করব, দয়াড়ু হব আর বৃদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব।
হে অতীত! তুমি তো বিদায় হয়ে চলে গিয়েছ, আমি তোমাকে নিয়ে কাঁদব না। তোমাকে স্মরণ করলে বা তোমার কথা মনে করলে তুমি তো আমাকে আর দেখতে আসবে না, এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও না, কেননা, তুমি তো আমাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো বিদায় হয়ে চলে গিয়েছ। হে ভবিষ্যৎ! তুমি তো অজ্ঞাত, অজানা ও অদৃশ্য জগতে আছো, সুতরাং আমি তোমার কল্পনায় বিভোর হব না। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে আগেভাগেই মাথা ঘামাব না। কেননা, ভবিষ্যৎ কিছুই না এবং এমনকি তা এখনো সৃষ্টিই হয়নি। যারা পরিপূর্ণ জাঁকজমক ও চমৎকারভাবে জীবনযাপন করতে চায় তাদের জন্য সুখের অভিধানে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো— “আজই আমার শেষ দিন।”
📄 অতীত আর কখনো ফিরে আসবে না
“যা তোমরা পাওনি তা নিয়ে তোমরা যাতে দুঃখ না কর।” (৫৭-সূরা আল হাদীদ : আয়াত-২৩)
আদম (আ) মূসা (আ)-কে বলেছেন— “আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করার ৪০ (চল্লিশ) বছর পূর্বে আমার তকদীরে বা ভাগ্যে যা নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন তাঁর জন্য তুমি কি আমাকে দোষারোপ কর?” এ কথাটি সম্বন্ধে নবী করীম ﷺ বলেছেন— “আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন, আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন, আদম (আ) মূসা (আ)-কে তর্কে হারিয়ে দিলেন।”
তোমার নিজের মাঝে সুখের সন্ধান করো, তোমার চারিপাশে বা বাহিরে নয়। উর্বর ইংরেজ কবি মিল্টন বলেছেন— "Verily, the mind on its own is capable of transforming paradise into hell and hell into paradise!" (অর্থাৎ মন নিজেই স্বর্গ থেকে নরকে এবং নরক থেকে স্বর্গে রূপান্তরিত হতে পারে।)
আরব কবি মুতানাব্বি বলেছেন— “বুদ্ধিমান ব্যক্তি ধনী অবস্থায় তাঁর প্রতিভার কারণে ভোগে; অথচ, মূর্খ ব্যক্তি দরিদ্র অবস্থায় সুখী।”
📄 আপনার জীবন মহামূল্য সময়ে পরিপূর্ণ
আলী তানতাবী দুটি তীক্ষ্ণ মর্মভেদী ও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে—বৈরুত সমুদ্র উপকূলে তিনি প্রায় ডুবে গিয়েছিলেন। তিনি যখন ডুবে যাচ্ছিলেন ও তাঁর মৃত্যুর অবস্থা ঘনিয়ে আসছিল তখন তিনি তাঁর প্রভুর নিকট সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করলেন এবং আকাঙ্ক্ষা করতে ছিলেন যদি তিনি এক ঘণ্টার জন্য হলেও জীবন ফিরে পান তবে তিনি তাঁর ঈমানকে ও তাঁর আমলে সালেহাকে নতুনভাবে শক্তিশালী করবেন। যাতে করে তাঁর ঈমান সর্বদিক ছড়ায়া পৌঁছায়ে। এমন সময় তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন ও সে অবস্থায়ই তাঁকে তীরে উঠানো সম্ভব হলো।
দ্বিতীয়টি : সিরিয়া থেকে মক্কায় হজ্ব করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এক মক্কারী কাফেলার সাথে যোগ দিলেন। তাবুকের মরুভূমিতে তারা পথ হারিয়ে তিন দিন উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ালেন। যখন তাঁদের পানাহারের সরবরাহ শেষ হয়ে যেতে শুরু করল তখন তাঁদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল যে মৃত্যু আসন্ন। এ অবস্থায় তিনি দাঁড়িয়ে লোকদের সামনে এক ভাষণ দিলেন। এটা জীবনের বিদায়কালীন ভাষণের মতো ছিল। এ ভাষণ এমনই হৃদয়গ্রাহী ছিল যে এতে তিনি ও তাঁর শ্রোতাগণ কেঁদে ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর ঈমান বাড়ছে এবং তিনি যথার্থই বুঝতে পারলেন যে মহান আল্লাহ ছাড়া কেউই তাঁদেরকে রক্ষা করতে বা সাহায্য করতে পারবে না।
“আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। তিনি প্রতি দিন (এখানে দিন বলতে মুহূর্ত বা সময় বুঝায়) কাজে রত।” (৫৫-সূরা আর রাহমান : আয়াত-২৯)
“আর কত নবী যুদ্ধ করেছেন আর তাঁদের সাথে বহু ধার্মিক লোকজন ছিল। আল্লাহ্র পথে তাঁদের যে বিপদ হয়েছিল তাতে তারা মনোবল হারায়নি, দুর্বল হয়নি ও নত হয়নি, আর আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন।” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৪৬)
আল্লাহ্র অবশ্যই সে সব শক্তিশালী মুমিনদেরকে ভালোবাসেন যারা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে তাঁদের শত্রুদের মোকাবেলা করেন। তারা হাল ছেড়ে দেন না বা রণে ভঙ্গ দেন না, হতাশ বোধ করেন না বা অন্যদের হাতে নিজেদেরকে অপমানিত হতে দেন না। বরং, তারা কঠোর চেষ্টা বা সংগ্রাম করেন। আল্লাহ্র প্রতি ঈমান, রাসূলের প্রতি ঈমান ও ইসলাম ধর্মের প্রতি ঈমানের কারণে ঈমানদারদের উপর এসব কাজ বাধ্যতামূলক। নবী করীম ﷺ বলেছেন— “শক্তিশালী মুমিন ব্যক্তি দুর্বল মুমিন ব্যক্তির চেয়ে আল্লাহ্র নিকট অধিক ভালোবাসা ও প্রিয়; আর তাঁদের প্রত্যেকের মাঝে কল্যাণ আছে।”
আবু বকর (রা) নবী করীম ﷺ-কে বিষধর দংশন থেকে রক্ষা করার জন্য গর্তের মুখে নিজের একটি অঙ্গুলি রেখে দিয়েছিলেন আর এর ফলে বিষাক্ত প্রাণী তাকেই দংশন করেছিল, তাই নবী করীম ﷺ কুরআনের আয়াত পড়ে তাঁর অঙ্গুলিতে ফুঁক দিলেন আর এতেই আল্লাহ্র হুকুমে তাঁর অঙ্গুলি ভালো হয়ে গেল। একজন লোক আনতারাকে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বীরত্বের রহস্য কী যা দিয়ে তুমি মানুষকে পরাজিত কর?” তিনি উত্তর দিলেন, “তোমার অঙ্গুলি আমার মুখে রাখ আর আমার অঙ্গুলি তোমার মুখে রাখতে দাও।” প্রত্যেকেই নিজের অঙ্গুলি অন্যের মুখে রাখল এবং প্রত্যেকেই একে অপরের অঙ্গুলি কামড়াতে শুরু করল। লোকটি বেদনায় চিৎকার দিয়ে উঠল, সে ধৈর্য ধরতে পারল না। আনতারা তাই তাঁর মুখ থেকে লোকটির অঙ্গুলি বের করে ফেলল এবং বললেন, “এভাবেই আমি বীরদেরকে পরাজিত করি।” অন্য কথায়, ধৈর্যের মাধ্যমে ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি অন্যকে পরাজিত করেন।
ঈমানদার যখন বুঝতে পারে, সে আল্লাহ্র রহমতের, দয়া ও ক্ষমার সান্নিধ্যে আছে তখন তাঁর মনোবল বৃদ্ধি পায়। সে তাঁর ঈমান অনুপাতে আল্লাহ্র রক্ষণাবেক্ষণকে অনুভব করতে পারে। “এমন কোন বস্তু নেই যা আল্লাহ্র সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা ও মহিমা বর্ণনা করে না (অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুই আল্লাহ্র তসবীহ পাঠ করে), অথচ তোমরা তাঁদের তসবীহ পাঠ বুঝতে পার না।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-৪৪)
এদেশের কৃষকেরা জমি চাষ করার সময় প্রায়ই গল্পগুজব করে তাঁদের সময় কাটায়। “হে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা! তোমার হাতে একটি শুষ্ক দেশে একটি শুষ্ক বীজ!” “তবে কি তোমরা যে বীজ বপন কর তাঁর কথা ভেবে দেখেছ? (তাহলে বলো তোমরা কি সে বীজ থেকে ফসল) উৎপন্ন কর নাকি আমি উৎপন্ন করি?” (৫৬-সূরা ওয়াকিয়া : আয়াত-৬৩-৬৪)
অন্ধ বাগ্মী বক্তা আব্দুল হামিদ কিশক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মিম্বরে উঠলেন। তারপর তাঁর পকেট থেকে এমন একখানি খেজুরের ডাল বের করলেন যাতে প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর হরফে ‘আল্লাহ’ শব্দটি লেখা ছিল। তারপর তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন— “চাহো ওই শ্যামশায়ী তরু পানে, কে সুজিয়ায় তারে, তারে সাজাল সবুজ শোজনে? তিনি আল্লাহ্, প্রকৃষ্ট ক্ষমতার আধার যিনি।”
এই বাগ্মী (হৃদয়গ্রাহী কথা) শুনে সমবেত জনতা কান্নায় ভেসে পড়ল। তিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, সারা জগতে তাঁর নিদর্শনের ছাপ আছে। সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিটি একক সত্তা, অনুৎপাদক, প্রভু ও উপাস্য হিসেবে তাঁকে ডাকো। “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এ বিশ্বজগতকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি; (আমরা আপনার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি।)” (৩-সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৯১)
আমাদের প্রভু যে করুণাময় এবং যে ব্যক্তি তওবা করে তাঁর অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন এবং সুখে তাঁর অনুগ্রহ করেন তা আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে বেষ্টন করে আছে। মহান আল্লাহ্ বলেন— “আর আমার করুণা সব কিছুকে ঘিরে রেখেছে।” আল্লাহ্র দয়া কতইনা বিশাল! একটি সহীহ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক মরুবাসী আরব নবী করীম ﷺ-এর সাথে সালাম আদান প্রদান করছিল, সে হাসি মুখে প্রার্থনা করল, “হে আল্লাহ্! আমাকে ও মুহাম্মাদকে করুণা করুন এবং আমাদের সাথে অন্য কাউকে করুণা করবেন না।” তখন নবী করীম ﷺ তাঁকে বললেন, “তুমি অবশ্যই প্রশস্ত জিনিসকে সংকীর্ণ করে দিলে।”
“এবং তিনি মুমিনদের প্রতি সদা পরম করুণাময়।” (৩৩-সূরা আল আহযাব : আয়াত-৪৩)
এক যুদ্ধের পর এক মহিলা তাঁর সন্তানকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করার জন্য নবী করীম ﷺ-এর সাহাবীদের মাঝে দৌঁড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে নবী করীম ﷺ বললেন— “এই মহিলা তাঁর সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি তাঁর চেয়েও বেশি দয়ালু।”
একটি সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে আদেশ করে গেছে যে, তাঁর মৃতদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর ছাইকে যেন জমিনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ্ সেগুলোকে একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আমার বান্দা! তুমি যে কাজ করেছ তা কী উদ্দেশ্যে করেছ?” লোকটি বলল, “হে আমার প্রভু! আমি আপনাকে ভয় করেছি এবং আমার পাপের ভয় করেছি।” তাই তখন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন। “আর যে ব্যক্তি তাঁর প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করল ও নিজেকে কুপ্রবৃত্তি হতে বিরত রাখল, নিশ্চয় জান্নাত হবে তাঁর ঠিকানা।” (৭৯-সূরা আন নাযি'আত : আয়াত-৪০-৪১)
📄 এক সময়ে একটি মাত্র পদক্ষেপ
জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণদানকালে বক্তাকে অবশ্যই পর্যায়ক্রমিক, নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক বলতে বুঝায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রথমে আলোচনা করা উচিত। নবী করীম ﷺ যখন মুয়াজ (রা)-কে ইয়েমেনে পাঠান তখন রাসূল ﷺ তাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা দ্বারা এ কথার সত্যতার সমর্থন পাওয়া যায় : “প্রথমে তাদেরকে তোমরা যে কাজের প্রতি আহ্বান করবে তা হলো এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া—আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল।”
আমাদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আমরা অনেকেই বুঝি যে, আমাদের ক্রমশ উন্নতি চাওয়া উচিত। তবে কেন আমরা একসাথে সবকিছু মানুষের গলার ভিতর ঢুকিয়ে দেই! “এবং কাফেররা বলল, ‘তবে কেন গোটা কুরআন একসাথে, একবারে তাঁর উপর অবতীর্ণ হলো না?’ এর দ্বারা আপনার অন্তরকে আমি মজবুত করার জন্যই এভাবে (ধাপে ধাপে) আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং একে সুস্পষ্ট ক্রমে ধাপে ধাপে আবৃত্তি করিয়েছি এবং আপনার নিকট অবতীর্ণ করেছি।” (২৫-সূরা আল ফুরকান : আয়াত-৩২)
ইসলামের শিক্ষা অর্জনে মুসলমানদের শান্তি ও আরামবোধ করা উচিত, বিশেষ করে এ কারণে যে, ইসলাম মানুষকে অর্থজড়ত্ব থেকে রক্ষা করার জন্য এসেছে। ‘তাকলিফ’ কথার একটি গূঢ়ার্থ হলো—বোঝা চাপানো, যা কুরআনে নেতিবাচক অর্থে উল্লেখ করা হয়েছে। “আল্লাহ কারো উপর তাঁর সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না।” (২-সূরা বাকারা : আয়াত-২৮৬)
সাহাবীগণ যখন নবী করীম ﷺ-এর নিকট সাধারণ উপদেশ বা দিক-নির্দেশনা চাইতে আসতেন তখন তিনি তাদেরকে ব্যাপক অর্থবোধক কিন্তু সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিতেন, যা সহজেই মনে থাকত। প্রশ্নকারীর অবস্থা বুঝার পর আল্লাহ্র নবী ﷺ সর্বদা বাস্তব ও সহজ উত্তর দিতেন। যখন আমরা ভ্রান্তির নিকট আমাদের অধিকারের যত উপদেশ, শিক্ষা, আচার-আচরণ ও প্রজ্ঞা আছে তাঁর সবটাই উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, তখন আমরা সাংঘাতিক ভুল করি। “আর কুরআনকে আমি (আয়াতে আয়াতে) বিভক্ত করে আপনার নিকট অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি একে মানুষের নিকট থেমে থেমে পাঠ করতে পারেন।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-১০৬)