📄 যাদের সঙ্গ দুর্বিসহ তাদের সঙ্গ শান্তি নষ্ট করে
যাদের সঙ্গ বিরক্তিকর ও অপ্রীতিকর তাদেরকে ইসলামী পণ্ডিতবর্গের লেখা কিতাবাদিতে ভুরিভুরি জায়গায় ‘দুর্বিষহ’ বলা হয়েছে। তারা এমন লোক যাদের সঙ্গ অসহায়ক। ইমাম আহমদ তাদেরকে বিদআতী বা অভিনব লোক বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে তারা সমাজের বোকা লোকজন। আবার কেউ কেউ এদেরকে অমার্জিত লোকজন বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথবা তারা হলো নিরস ও বেচারিন চরিত্রের লোকজন।
“তারা যেন (দেয়ালে) ঠেকান কাঠের গুঁড়ি।” (৬৩-সুরা আল মুনাফিকুন : আয়াত-৪)
“অতএব এসব লোকদের কী হলো যে তারা কোন কথা বুঝার উপক্রম করে না।” (৪-সুরা আন নিসা : আয়াত-৭৮)
ইমাম শাফিঈ বলেছেন— “যখন কোন বোকা লোক আমার পাশে বসতে আসে, তখন আমার মনে হতে থাকে যেন তাঁর সাহচর্যের কারণে তাঁর নিচের মাটি দেবে যাচ্ছে।” আল আ’মাশ এ ধরনের লোক দেখলে তেলাওয়াত করতেন— “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে শাস্তি দূর করুন। আমরা অবশ্যই ঈমানদার (হব)!” (৪৪-সূরা আদ দোখান : আয়াত-১২)
মহান আল্লাহ বলেছেন— “আর যারা আয়াতসমূহ নিয়ে বাজে কথায় লিপ্ত হয় আপনি তাদেরকে দেখলে এড়িয়ে চলুন...!” (৬-সূরা আল আন’আম : আয়াত-৬৮) “অতএব, তোমরা তাদের সাথে বসবে না।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১৪০)
গুণহীন লোকজনের উদ্দেশ্য নীচমানের এবং যারা সহজেই তাদের আকাঙ্ক্ষার কাছে হার মানে তাদের সাহচর্য সর্বাপেক্ষা বেশি অসহ্যকর। “অতএব যতক্ষণ না তারা অন্য কথা বলতে শুরু করে ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে বসবে না, (অন্যথায়) তোমরাও অবশ্যই তাদের মতো হয়ে যাবে।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-১৪০)
একজন আরবী কবি বলেছেন— “এই যে তুমি তো ভারী, মোটা ও বিশাল দেহী, তুমি দেখতে মানুষ অথচ ওজনে হাতি।”
ইবনুল কায়্যিম বলেছেন— “অসহায়ত্ব কোন লোকের কথা যদি তোমাকে জোর করে শোনানো হয় তবে তুমি তাঁর কথা কান দিয়ে শুনিও কিন্তু মন দিয়ে গ্রহণ করিও না এবং তোমার মন নিয়ে তুমি অন্যত্র চলে যেও (অর্থাৎ তাঁর কথায় মন দিও না)। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাকে তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে যাওয়ার পথ করে দেন ততক্ষণ তুমি তাঁর কথা শুনেও শুনবে না ও তাঁকে দেখেও দেখবে না।”
“এবং আপনি তাঁর অনুসরণ করবেন না যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ বা যিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তাঁর প্রবৃত্তির অনুসরণ করে আর কাজ কর্ম লাগামহীন।” (১৮-সূরা আল কাহাফ : আয়াত-২৮)
📄 বোকাদের নিয়ে কিছু কথা
আর রিত্সালা (الرِّسَالَةُ) নামক পত্রিকায় ইয়াহয়াত্ব কর্তৃক লিখিত কমিউনিজম এর উপর এক চমৎকার প্রবন্ধ আমি পেয়েছি। রাশিয়ানরা মহাবিশ্বে এক মহাকাশযান প্রেরণ করেছিল। এই মহাকাশযানটি ফিরে আসার পর এক নভোচারী প্রাভদা (Pravda) নামক পত্রিকায় লিখেছেন— “আমরা আকাশে চড়লাম কিন্তু সেখানে কোন প্রভু, কোন বেহেশত, কোন দোজখ ও কোন ফেরেশতা পেলাম না।”
উত্তরে ইয়াহয়াত্ব লিখেছেন— “হে লাল পাখরওয়াল! তোমরা বড়ই অদ্ভুত! তোমরা কি ভাবছ যে তোমরা প্রকাশ্যে আল্লাহকে তাঁর সিংহাসনে বসে দেখতে পাবে? তোমরা কি হঠকারিতা করে এ কথা ভাবছ যে তোমরা জান্নাতে রেশমী পোশাক পরা অবস্থায় দেখতে পাও? বা বেহেশতে হাউজে কাওসারে প্রবাহের শব্দ শুনতে পাবে? বা জাহান্নামে যাদেরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তোমরা তাঁদের দুর্গন্ধ শুকতে পাবে? তোমরা যদি সত্যিই একথা ভেবে থাক তবে তোমাদের ক্ষতি ও ব্যর্থতা সবাই প্রকাশ্যে দেখতে পাবে। তোমাদের গোমরাহী (বিপথগামিতা), ভ্রান্তি ও বোকামির কারণ ব্যাখ্যায় আমি যা বলতে চাই তা হলো কমিউনিজম ও তোমাদের মাথার নাস্তিকতাই এর মূল কারণ। কমিউনিজমের কোন ভবিষ্যৎ নেই এবং কোন আকাশ (ছাদ) নেই, এটা অর্থহীন খাটুনি ও সর্বদা নিষ্ফল পরিশ্রম মাত্র।”
“তুমি কি মনে কর যে তাদের অধিকাংশ লোকই শুনতে পায় বা বুঝতে পারে? তারা তো কেবল চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তারা এদের চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট।” (২৫-সুরা আল ফুরকান : আয়াত-৪৪)
“তাদের অন্তর আছে কিন্তু তারা তা দিয়ে বুঝতে পারে না, তাদের চক্ষু আছে কিন্তু তারা তা দিয়ে দেখতে পায় না এবং তাদের কান আছে কিন্তু তারা তা দিয়ে শুনতে পায় না।” (৭-সুরা আল আ'রাফ : আয়াত-১৭৯)
“আর আল্লাহ যাকে অপমান করেন তাকে কেউ সম্মানিত করতে পারে না।” (২২-সুরা আল হাজ্জ : আয়াত-১৮)
“তাদের কাজ কারবার মরুভূমির মরীচিকার মতো।” (২৪-সুরা আন নূর : আয়াত-৩৯)
“তাদের কাজকারবার ঝড়ের দিনের ঝঞ্ঝাবায়ুতে উড়ন্ত ছাইয়ের মতো।” (১৪-সুরা ইবরাহীম : আয়াত-১৮)
‘আক্কাদ’ কমিউনিজমকে ও এর মিথ্যা নাস্তিকতার মতবাদকে নিন্দাপূর্ণ বাক্যবান ছুঁড়ে বলেন : “যে আস্থা স্বাভাবিকভাবেই সুস্থ তা ইসলামের এই সত্য ধর্মকে গ্রহণ করে। যাদের মন পঙ্গু বা যাদের ধারণা নিম্নমানের ও অদূরদর্শী তাঁদের কাছেই নাস্তিক হওয়া আপাত দৃষ্টিতে ন্যায় সঙ্গত।”
“তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে তাই তারা বুঝতে পারে না।” (৯-সুরা তাওবা : আয়াত-৮৭)
নাস্তিকতা চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে এক মারাত্মক আক্রমণ। এটা শিশুদের কল্পরাজ্যের মতো এক কষ্টকল্পিত ধারণা মাত্র এবং এটা এমন এক ভুল যার নজির দুনিয়ার ইতিহাসে নেই। এ কারণেই মহান আল্লাহ বলেন— “আসমানসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোন সন্দেহ আছে?” (১৪-সুরা ইবরাহীম : আয়াত-১০)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন— “ফেরাউন ছাড়া অন্য কেউ স্রষ্টার অস্তিত্বকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করেনি। এমনকি সেও মনে মনে স্রষ্টার অস্তিত্বের অনুভব করত।”
এ কারণেই মূসা (আ) বলেছেন— “তুমি জান যে আসমানসমূহ ও পৃথিবীর প্রতিপালকই এসব নিদর্শনাবলিকে প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ অবতীর্ণ করেছেন। হে ফেরাউন! আমি অবশ্যই তোমাকে ধ্বংসের মুখে পতিত মনে করি।” (১৭-সুরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-১০২)
অবশেষে, ফেরাউন তাঁর অন্তরের কথা ঘোষণা করে বলেছিল— “আমি ঈমান আনলাম যে, বনী ইসরাঈল যার প্রতি ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আমি একজন মুসলিম।” (১০-সুরা ইউনুস : আয়াত-৯০)
📄 মানুষকে জয় করা
মানুষকে ভালোবাসা, সম্মান ও সহমর্মিতা অর্জন করার গুণ সৌভাগ্যের, সাফল্যের, উন্নতির ও সমৃদ্ধির একটি লক্ষণ। নবী ইব্রাহীম (আ) বলেছেন— “এবং পরবর্তী জাতিদের মাঝে আমার জন্য সুখ্যাতি সৃষ্টি করে দিন।” (২৬-সুরা আশ শোয়ারা : আয়াত-৮৪)
মূসা (আ) সম্বন্ধে আল্লাহ বলেছেন— “আমি আমার পক্ষ থেকে তোমার উপর ভালোবাসা দিয়ে দিয়েছিলাম।” (২০-সুরা ত্বাহা : আয়াত-৩৯)
নিচে বর্ণিত দুটি হাদীসের উভয়টিই নির্ভরযোগ্য :
“তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।”
জিব্রাঈল (আ) আকাশবাসীদের মাঝে ঘোষণা দেন : “নিশ্চয় আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, সুতরাং তোমরাও তাঁকে ভালোবাস।” অতএব আকাশবাসীরা তাঁকে ভালোবাসে এবং পৃথিবীতে তাঁর জন্য গ্রহণযোগ্যতা মঞ্জুর করা হয়।
একটি হাসি-খুশি মুখ, সদয় কথা-বার্তা ও সদাচরণ হলো মানুষের মনে নিজেকে অনুগ্রহভাজন করার সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী উপায়। আরও বেশি শক্তিশালী উপায় হলো কোমলতা, নম্রতা, ভদ্রতা ও সহানুভূতি। এ কারণেই নবী করীম ﷺ বলেছেন— “যার মধ্যে নম্রতা-ভদ্রতা আছে তা সুন্দর। আর যার মধ্যে নম্রতা-ভদ্রতা নেই তা কলঙ্কিত।” “যে নম্রতা-ভদ্রতা থেকে বঞ্চিত সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।”
একজন বিজ্ঞ লোক বলেছেন— “সহানুভূতি ও কোমলতা সাপকেও তার গর্ত থেকে বের করে আনে।” অর্থাৎ শত্রুর অন্তরে লুকায়িত শত্রুতাও দূর করে দেয়।
📄 অন্যের ব্যক্তিত্বে নিজেকে বিলিয়ে দিবেন না
মানুষ তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে : ১. অনুকরণ, ২. নির্বাচন ও পছন্দ, ৩. আবিষ্কার ও সৃষ্টি করার গুণ (সৃজনশীলতা)। অন্যের ব্যক্তিত্ব ও আচার-আচরণের অনুকরণ করা হয় হয়তোবা যে ব্যক্তিকে অনুকরণ করা হচ্ছে তাঁর প্রতি ভালোবাসার কারণে অথবা তাঁর সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে। যখন অন্যের অনুকরণ চর্চা চরম আকারে করা হয়, যখন অনুকরণকারী অন্যের গলার স্বরেরও নকল করে অথবা অন্যের শারীরিক ভঙ্গিরও অনুকরণ করে তখন আসলে সে যা করছে তা হলো তাঁর নিজের ব্যক্তিত্বকে কবর দিচ্ছে।
আজকালকার তরুণদের দিকে তাকান, হাস্যকর মনে হলেও দেখতে পাবেন যে, তারা নামকরা লোকেদেরকে তাঁদের হাঁটা-চলা, কথা বলা ও নড়াচড়াতেও অনুকরণ করছে। তাঁদের আদর্শদের অনুকরণ করার খাতিরে তাঁদের সকল স্বভাব বৈশিষ্ট্য পরিত্যক্ত হয়। যদি তাঁরা মহৎ বৈশিষ্ট্য ও মহান ব্যক্তিত্বকে অনুকরণ করতে থাকত তবে আমি তাদেরকে তা করতে সুপারিশ করতাম (তাদেরকে এ কাজ করার জন্য প্রশংসা করতাম); কেননা, জ্ঞান অন্বেষণে, উদার ও মহৎ হতে বা সদাচরণ অর্জনকল্পে অন্যের অনুকরণ করা সত্যিই মহৎ কাজ।
পূর্বে আমি যা বলেছি এখানে তাঁর পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছি : আপনি এক অনন্যা সত্তা এবং আল্লাহ্ আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত কোন দুজন লোককেও দেখতে হুবহু একই রকম করে সৃষ্টি করেননি।
“এবং তোমাদের ভাষায় ও রঙের বিভিন্নতা।” (৩০-সুরা আর রুম : আয়াত-২২)
তবে কেন আমরা অন্যান্য বিষয়ে হুবহু একই রকম হতে চাই? আপনার ঘরের সৌন্দর্য এর অনুপমতায় এবং আপনার চেহারার সৌন্দর্য আপনার জন্য এর নির্দিষ্ট হওয়ার মাঝে।
“আর পাহাড়ের মাঝে রয়েছে নানা রঙের পথ (সেগুলো) সাদা, লাল ও মিশমিশে কালো।” (৩৫-সুরা ফাতির : আয়াত-২৭)