📄 প্রতিদিন ভোরে একবার হাসুন
সুন্দরভাবে বিছানা ছেড়ে উঠে বসুন ও সুন্দরভাবে দিনের শুরু করতে হলে স্বামীর তাঁর স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে মুচকি হাসা এবং স্ত্রীরও অনুরূপ করা উচিত। এ হাসি হল সন্তুষ্টি ও আপস-মীমাংসার প্রাথমিক ঘোষণা।
নবী করীম ﷺ বলেছেন- “আর তোমার ভাইয়ের মুখের সামনে তোমার মুচকি হাসি সদকা স্বরূপ।” আর আল্লাহ্র রাসূলের মুখে সদা হাসি ফুটে থাকত। “তোমরা একে অপরকে সালাম দাও, এটা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এমন এক অভিবাদন যা বরকতময় (মোবারক) ও পবিত্র।” (২৪-সূরা আন নূর : আয়াত-৬১) “যখন তোমাদেরকে অভিবাদন করা হয় তখন তোমরা এর চেয়ে উত্তম অভিবাদন কর অথবা এর অনুরূপ উত্তর দাও।” (৪-সূরা আন নিসা : আয়াত-৮৬)
আর ঘরে প্রবেশ করার সময় নিম্নোক্ত দু'আ পড়তে হয়- “হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট উত্তম প্রবেশ ও উত্তম প্রস্থান কামনা করি, আল্লাহ্র নামে আমরা প্রবেশ করি এবং আল্লাহ্র নামেই আমরা বের হই এবং আমাদের প্রভু আল্লাহ্র উপরই আমরা ভরসা করি।”
বন্ধু সুলভ চেহারা ও হাসিমুখে বাড়িতে সমঝোতার সৃষ্টি হয়। “আমার বান্দাদেরকে যা সর্বোত্তম যা সবচেয়ে ভালো তা বলতে বল।” (১৭-সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-৫৩)
এমন যদি হতো যে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উভয়ের দোষত্রুটি ভুলে গিয়ে একে অপরের গুণের কথাই মনে রাখত। স্বামী যদি স্ত্রীর দোষের কথা ভুলে গিয়ে (শুধুমাত্র) তার গুণের কথাই মনে রাখে তবে সে সুখ-শান্তি পাবে। একজন আরব কবি বলেছেন- “এমন কে আছে যে কখনও ভুল করেনি? আর এমন কে-ই বা আছে যে শুধুমাত্র কল্যাণের অধিকারী?”
“আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তবে তোমাদের কেউ কখনও পবিত্র হতে পারত না। কিন্তু, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করেন। আর আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।” (২৪-সুরা আন নূর : আয়াত-২১)
ছোটখাটো ব্যাপারই অধিকাংশ পারিবারিক সমস্যার কারণ এবং আমি নিজেই এমন অনেক বিবাহ ভেঙে যেতে দেখেছি যেগুলোতে আপোষ-মীমাংসার অসাধ্য বিবাদের কারণে ভেঙে গেছে তা নয়, বরং ছোটখাটো তুচ্ছ কারণে তা ভেঙে গেছে। এ ধরনের একটি পারিবারিক বিবাদ দেখেছিলাম যার কারণ ছিল সময়মতো খাবার রান্না হয়নি বিধায়, অন্য আরো একটি ঝগড়ার কারণ ছিল স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অত্যধিক সংখ্যায় মেহমান আসার কারণে স্ত্রীর আপত্তি। এসব ও অন্যান্য সমস্যার একটি তালিকা পারিবারিক সম্পর্কচ্ছেদ—যা সন্তান-সন্ততিদেরকে মাতা-পিতাহীন করে দেয়।
আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হলো বাস্তব জগতে বাস করা (বিশেষ করে দাম্পত্য ব্যাপারে) এবং কল্পরাজ্যের স্বপ্ন না দেখা। মানুষ হিসেবে আমরা রাগান্বিত, খিটমিটে, দুর্বল হতে পারি এবং ভুল করতে পারি। অতএব আমরা যখন পারিবারিক কল্যাণ সম্বন্ধে কথা বলি বা পারিবারিক কল্যাণ চাই তখন আপেক্ষিক বা তুলনামূলক সুখের কথা আমাদের মনে রাখা উচিত—পরিপূর্ণ সুখের কথা বা পরম সুখের কথা নয়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের অমায়িক স্বভাব ও উত্তম সাহচর্যের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বলেছিলেন, “সে চল্লিশ বছর আমার সঙ্গিনী ছিল, কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে তার সাথে আমার কখনও মনোমালিন্য হয়নি।”
স্ত্রী যখন রাগান্বিত হয় স্বামীকে তখন অবশ্যই শান্ত থাকতে হবে এবং এর বিপরীতে (স্বামী রাগান্বিত হলে স্ত্রীকে অবশ্যই চুপ থাকতে হবে), কমপক্ষে যতক্ষণ পর্যন্ত রাগ না কমে ও ঝগড়া না থামে। ইবনুল জাওযী তাঁর রচিত ‘সায়দুল খাতির’ নামক কিতাবে বলেছেন। “আপনার সঙ্গী যখন আপনাকে অন্যায় কোন কিছু বলে তখন এটাকে খুব কঠিনভাবে আপনার গ্রহণ করা উচিত নয়। তাঁর অবস্থা মাতাল লোকের মতো যে—কী বলছে সে বেখবর। এর বদলে আপনি অল্প সময় ধৈর্য ধারণ করুন। আপনি যদি তাঁর সাথে কঠোর ভাষায় কথা-কাটাকাটি করেন তবে আপনি তো সেই সুস্থ ব্যক্তির মতো হলেন যে নাকি পাগলের উপর প্রতিশোধ নিতে চায় অথবা সেই সচেতন লোকের মতো হলেন যে নাকি অচেতন লোকের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায়। তাঁর কাজের জন্য তাঁর দিকে দয়া-মায়া দৃষ্টিতে তাকান।”
জেনে রাখুন যখনই সে তাঁর অবজ্ঞা থেকে জেগে উঠবে তখনই সে যা ঘটেছে তার জন্য অনুতপ্ত হবে এবং আপনার ধৈর্যের জন্য আপনার মূল্য বুঝতে পারবে। আপনাকে বিশেষ করে তখন ধৈর্য ধরতে হবে যখন রুক্ষ ব্যক্তি দম্পতির একজন বা মাতা-পিতার কেউ হন। তারা যতক্ষণ শান্ত না হন ততক্ষণ তাদেরকে তাদের যা মনে চায় তা বলতে দিন এবং তাদেরকে তাঁদের কথার জন্য দায়ী মনে করবেন না। রুক্ষ ব্যক্তির সাথে রাগ করলে তার রাগ কমবে না।
📄 পরম সুখ-শান্তি জান্নাতেই
“আমি অবশ্যই মানুষ সৃষ্টি করেছি কষ্ট সহিষ্ণু করার জন্য (তারা যাতে কষ্ট সহ্য করে পরিশ্রম ও নেক আমল করে)।” (৯০-সূরা আল বালাদ : আয়াত-৪)
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “কখন বিশ্রাম পাওয়া যাবে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “তুমি যখন জান্নাতে পা রাখবে তখন তুমি বিশ্রাম পাবে।”
জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত স্থায়ী প্রকৃতির কোনো বিশ্রামও নেই, কোন শান্তিও নেই। এ জীবন সমস্যা, ফেতনা-ফাসাদ, রোগ-শোক ও দুশ্চিন্তায় ভরা। আমার এক নাইজেরীয় সহপাঠী আমাকে বলেছেন যে, সে যখন শিশু ছিল তখন তাঁর মা তাঁকে রাতের শেষ তৃতীয়ায় সালাত পড়ার জন্য জাগিয়ে দিত। তখন সে বলত, “মা, আমি আরেকটু বিশ্রাম করতে চাই।” তাঁর মা তখন বলত, “শুধুমাত্র তোমার আরামের খাতিরেই আমি তোমাকে জাগাচ্ছি, বাবা, তুমি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন তুমি পরম শান্তি পাবে।”
মাসরুক নামে ইসলামের প্রাথমিক যুগের একজন আলেম সেজদায় গিয়ে এত সময় থাকতেন যে তাঁর ঘুম এসে পড়ত। একবার এমন ঘটনার সময় তাঁর এক সঙ্গী তাঁকে বললেন, “খানিক বিশ্রাম করুন।” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি তো বিশ্রামই খুঁজছি।”
বাস্তবতামূলক সালাত বাদ দিয়ে যারা এ দুনিয়ায় শান্তি তালাশ করে তারা শুধুমাত্র ভুরি ভুরি দুশ্চিন্তার ব্যবস্থা করবে। অবিশ্বাসীরা এখানে তাঁর পূর্ণ শান্তি চায়, একারণেই সে বলে— “হে আমাদের প্রতিপালক! বিচার দিবসের পূর্বেই আমাদেরকে আমাদের প্রাপ্য দিয়ে দিন।” (৩৮-সূরা ছোয়াদ : আয়াত-১৬)
আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ ‘কিতলানা’ অর্থ হলো আমাদের ভালো-মন্দ কাজের নথিপত্র অর্থাৎ আমাদেরকে বিচার দিবসের আগেই আমাদের ভালো-মন্দ কাজের নথিপত্র দিয়ে দিন যাতে আমরা তা দেখতে পারি। কোন কোন আলেম কিতলানার ব্যাখ্যা করেছেন, “আমাদের ভালো অংশ এবং আমাদের রিযিকের অংশ বিচার দিবসের পূর্বেই আমাদেরকে দিয়ে দিন।”
“নিশ্চয় এরা (এই কাফেররা) এ দুনিয়ার জীবনকে ভালোবাসে এবং তাদের পিছনে ফেলে রাখে এক গুরুতর দিনকে।” (৭৬-সূরা দাহর বা ইনসান : আয়াত-২৭)
তারা আগামীকাল বা ভবিষ্যৎতের কথা ভাবে না। আর এ কারণেই তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টাই হারায়। এ জীবন পরিবর্তনশীল; এ জীবন একদিন শান্তির ও ধনাঢ্যতার আরেক দিন কষ্টের ও দারিদ্র্যতার। এটাই এ দুনিয়ার সার কথা। “অতঃপর তাঁদেরকে তাঁদের সত্যিকার প্রভুর নিকট ফিরিয়ে আনা হবে। জেনে রাখ! বিচার করার অধিকার তারই। আর তিনি সর্বাপেক্ষা ত্বরিত হিসাব গ্রহণকারী।” (৬-সূরা আল আনআম : আয়াত-৬২)